#প্রণয়ের_আউড়ে
#পার্ট_৫৩(শেষ পর্ব)
#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা
দেখতে দেখতে সময়ের চাকা ঘুরে আজ ২০শে মার্চ, ২০২৮ সাল। তিথির জীবনের সবচেয়ে বিশেষ দিন। আজ ও ২০ বছরে পা দিল।
রাতের নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা তখন রাত ১২টা ছুঁই ছুঁই। পাশের রুমে ওদের চারজন ক্ষুদে সদস্য কাশিফ, তামিম, তানহা আর কবিতা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সারাদিনের হৈ-চৈ শেষে ওরা এখন শান্ত। কাবির অত্যন্ত সন্তর্পণে তিথির রুমে ঢুকল। তিথি আজ জন্মদিন উপলক্ষে একটা গাঢ় লাল রঙের সিল্কের শাড়ি পরেছে, কপালে ছোট একটা টিপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলন দেখছিল সে।
কাবির পেছন থেকে এসে তিথির কাঁধে হাত রাখল। আয়নার দিকে তাকিয়ে কাবির এক চিলতে হাসল, তারপর তিথির কানের কাছে মুখ নিয়ে গভীর স্বরে বলল,
"শুভ জন্মদিন, আমার বাঘিনী। বিশটা বসন্ত পেরিয়ে গেলে, অথচ এখনো আমার চোখের সামনে সেই ভীতু মেয়েটাই যেন দাঁড়িয়ে আছে।"
তিথি আয়নার মধ্য দিয়েই কাবিরের চোখের দিকে তাকাল। কাবিরের চুলে এখন কিছুটা পরিপক্কতার ছাপ, কিন্তু সেই চাউনি আজও আগের মতোই তীব্র আর মায়াবী। তিথি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করল।
"আপনি এখনো ওভাবে কথা বলেন? চার সন্তানের মা হয়ে গেছি, তাও আপনি আমাকে ওভাবেই দেখেন?"
কাবির তিথিকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করাল। ওর দুহাতে তিথির মুখটা আলতো করে ধরে সে বলল,
"তুমি চার সন্তানের মা হয়েছ ঠিকই, কিন্তু আমার কাছে তুমি সেই তিথিই আছো, যাকে আমি প্রথমবার বৃষ্টির মাঝে কাঁদতে দেখেছিলাম। ওই লাল শাড়িটায় তোমাকে আজ ঠিক সেই বৃষ্টির রাতের চেয়েও বেশি মায়াবী লাগছে।"
তিথি মুচকি হাসল। "কাশিফ আর তামিম তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। তানহা আর কবিতাও দিন দিন আপনার মতোই জেদি আর দুষ্টু হচ্ছে। আপনার সেই অসভ্য সিংহপনা এখনো গেল না।"
কাবির খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর ড্রয়ার থেকে একটা ছোট ভেলভেটের বাক্স বের করল। ভেতরে একটা আংটি, যাতে খোদাই করা—My Eternal Flame।
"এই চারজন লিটল লায়নকে সামলাতে গিয়ে তুমি নিজের জন্য সময় পাওনি, বিবিজান। কিন্তু আমি কখনো ভুলি না, এই দিনটা আমার জীবনে কতটা বড় নিয়ামত।"
আংটিটা পরিয়ে দিয়ে কাবির তিথির কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেল। তিথি কাবিরের বুকে মাথা রাখল। বাইরে ফাল্গুনের বাতাস বইছে। তিথি ফিসফিসিয়ে বলল,
"সব ঝগড়া, অভিমান, আর দৌড়ঝাঁপের পর দিনশেষে এই প্রশান্তিটা আমি পৃথিবীর কোনো মিশনের বিনিময়েও হাতছাড়া করতে চাই না। আপনি কি এখনো সেই আইপিএস অফিসারই আছেন, নাকি শুধুই আমার কাবির?"
কাবির তিথির চুলগুলো আঙুল দিয়ে বিলি করে দিয়ে বলল,
"আইপিএস অফিসার কাবির রহমান কায়নাত হয়তো দেশের জন্য অনেক যুদ্ধ লড়েছে, কিন্তু সেই লড়াইয়ের সবটুকু ক্লান্তি ধুয়ে মুছে ফেলার জন্য আমার শুধু এই ঘরটা আর তুমিই যথেষ্ট। আজ থেকে আর কোনো মিশন নয়, শুধু তুমি আর আমাদের এই ছোট্ট জগত।"
তিথি চোখ বুজে কাবিরের বুকের ওম অনুভব করল। বাইরে চাঁদের আলোয় সারা বাড়িটা ঝকমক করছে। জীবনটা একটা গোলকধাঁধার মতো ছিল, যেখানে প্রেম, ভয়, আর সংঘাত ছিল প্রতিদিনের সঙ্গী। কিন্তু আজ, সব জটিলতা কাটিয়ে, চারটা ফুটফুটে বাচ্চার বাবা-মা হিসেবে, কাবির আর তিথি একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হঠাৎই পাশের রুম থেকে কান্নার আওয়াজ ভেসে এল। তানহা আর কবিতা বোধহয় স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছে। তিথি দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠতে চাইলে কাবির ওর হাত টেনে ধরল।
"তুমি থাকো বিবিজান, আজ জন্মদিনের রাতে আমিই ওদের সামলাব। তুমি বরং একটু শান্তিতে বসো।"
কাবির উঠে গিয়ে ওদের রুমে গেল। কয়েক মিনিট পর দেখা গেল, কাবির দুই হাতে দুই মেয়েকে কোলে নিয়ে, আর পেছনে কাশিফ আর তামিমকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে ফিরে এল। ওরা সবাই মিলে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল—"হ্যাপি বার্থডে মাম্মা!"
তামিম কাবিরের কাঁধ থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামল, তারপর তিথির হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
"মাম্মা, এটা আমি আর কাশিফ ভাইয়া মিলে এঁকেছি! তুমি আর আব্বু অনেক সুন্দর, তাই ছবিও সুন্দর হয়েছে!"
তিথি কাগজটা খুলে দেখল, খুব হিজিবিজি কিন্তু সুন্দর করে ওরা একটা পরিবারের ছবি এঁকেছে। তিথির চোখে জল চলে এল। কাবির মুচকি হেসে বলল,
"দেখেছ? আমার ছেলেরা ছবি আঁকতে শিখেছে, আর মেয়েরা গান গাইতে। তোমার এই অসভ্য সিংহের বাড়িতে এখন শুধু ভালোবাসা আর রঙের খেলা।"
কেক কাটা আর বাচ্চাদের হৈ-চৈ শেষ করে রাত যখন গভীর হলো, কাশিফ, তামিম, তানহা আর কবিতাকে কোনোমতে ঘুম পাড়িয়ে কাবির আর তিথি নিজেদের রুমে ফিরল। সারাদিনের ধকল আর আনন্দ শেষে তিথি ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসল। ওর লাল শাড়ির আঁচলটা একটু এলোমেলো হয়ে আছে, চোখে-মুখে এক অদ্ভুত মায়াবী ক্লান্তি।
কাবির দরজাটা লক করে ধীরপায়ে তিথির দিকে এগিয়ে এল। সে তিথির দুই কাঁধে হাত রেখে আয়নার সামনে নিয়ে দাঁড় করাল। নিজের প্রতিচ্ছবি আর কাবিরের চাউনি দেখে তিথি কিছুটা লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকাল। কাবির ওর কানের কাছে মুখটা নিয়ে এল, সেই পরিচিত পুরুষালি ওম আর পারফিউমের ঘ্রাণে তিথির বুকটা কেঁপে উঠল।
কাবির ফিসফিস করে, বড্ড আদুরে গলায়, অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
"বিবিজান, এইবার কিছু হবে না, দেখে নিও! আমি একদম সব হিসাব মাথায় রেখেছি।"
তিথি মাথা ঘুরিয়ে কাবিরের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকাল। ওর গাল দুটো লজ্জায় লাল হলেও, রাগের ভান করে খিলখিল করে হেসে উঠল,
"আপনি প্রত্যেকবার একই কথা বলেন! আর কিছু দিন যেতে না যেতেই দেখা যায় আমি আবার প্রেগন্যান্ট হয়ে গেছি! আপনার হিসাব আর আমার ভাগ্যের সাথে কোনো মিলই নেই!" 🥲
কাবির তার সেই বিখ্যাত ডেভিল হাসিটা দিয়ে
তিথির কোমরে হাত রাখল।
"আরেহ, ওটা তো ছিল আমার মিশন সাকসেসফুল হওয়ার গল্প! আমি তো ভাবতেও পারিনি আমার ভালোবাসা এতটা বেশি কার্যকর হবে! এটা আমার দোষ নয়, এটা তো আমার ভালোবাসার জোর।"
*********
সময় বয়ে যায়। এরপর কেটে গেল আরও কিছু মাস। জানুয়ারি মাসের এক শীতের সকাল। পুরো বাড়িটা যেন এক উৎসবের মেজাজ। কাশিফ আর তামিম ড্রয়িংরুমে বসে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করছে "তামিম,আমাদের যদি আরেকটা ছোট ভাই-বোন থাকতো ভালো হতো তাই না?"
“না,কবিতা আর তানহা যে জ্বালাতন করে না আরেকটা বোন হলে আমি খাতাম হয়ে যাবো🥲"
“আরে ধুর কিছু হবে না"
ঠিক তখনই কাবির ঘর থেকে বেরিয়ে এল। তার চেহারায় এক অদ্ভুত হাসি। সে বাড়ির সবাইকে
ডেকে বলল,
"সবাই মিষ্টি রেডি রাখো, তিথি আবারও মা হতে যাচ্ছে!"
তিথি বিছানায় শুয়ে রাগী চোখে কাবিরের দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে তখন আনন্দের জল। সে বিড়বিড় করে বলল,
"আমি বলেছিলাম না! আপনি প্রতিবার একই কথা বলেন, বিবিজান দেখে নিয়ো কিছু হবে না! আর রেজাল্ট? আবার প্রেগন্যান্ট হয়ে গেলাম!" 😤
কাবির অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সে তিথির কপালে চুমু খেয়ে বলল,
"বিবিজান, এই পরাজয়টুকু আমি পৃথিবীর সব সুখের চেয়েও বেশি ভালোবাসি!"
রাত গভীর হলে, বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়ার পর, কাবির তিথির পাশে এসে বসল। তিথি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে ছিল। কাবির আলতো করে তিথির হাতটা ধরে ওর কপালে নিজের কপাল ছোঁয়াল।
কাবির নিচু,আবেগঘন গলায় বলল,
"তিথি, তুমি কি জানো? চড়পাড়ার সেই বৃষ্টির রাত থেকে আজ পর্যন্ত, তুমি শুধু আমার স্ত্রী নও, তুমি আমার বাঁচার অবলম্বন। আমার জীবনের সবটুকু অন্ধকার তুমি তোমার ভালোবাসা দিয়ে মুছে ফেলেছ। আমাদের এই সংসার, এই চারজন লিটল লায়ন, আর এখন এই নতুন অতিথি সবই যেন আমার সেই রুক্ষ মরুভূমিতে ফোটা একগুচ্ছ শিউলি ফুল।"
তিথি চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা অশ্রু মুছে কাবিরের বুকে মাথা রাখল। সে ফিসফিসিয়ে বলল,
"আপনি আমার জীবনের প্রথম আর শেষ প্রেম, কাবির। আপনার ওই রাগী রূপের আড়ালে যে হৃদপিণ্ডটা স্পন্দিত হয়, তা আমি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না। আমাদের গল্পের নামটা কতই না সুন্দর—#প্রণয়ের_আউড়ে। আউড়ে মানে যদি অগোছালো হয়, তবে আমি চাই আমাদের প্রণয়টা সারাজীবন এমনই অগোছালো থাক, কারণ এই অগোছালো ভালোবাসাতেই আমি পূর্ণতা খুঁজে পাই।"
কাবির তিথির চিবুক ধরে মুখটা ওপরে তুলল। ওর চোখে গভীর ভালোবাসা। সে শান্ত স্বরে বলল,
"আমাদের এই #প্রণয়ের_আউড়ে কখনো শেষ হবে না, বিবিজান। কারণ আমাদের গল্পটা তো শুধু কাগজে লেখা নয়, আমাদের গল্পটা লেখা হয়েছে আমাদের যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আর আমাদের অনাগত সন্তানদের হাসিতে। আমি তোমাকে আজীবন এভাবেই আগলে রাখব, কসম আমার বাঘিনীর!"
🍂🤍[_____সমাপ্ত_____]🍂🤍
{তোমাদের ভালোবাসায় আজ #প্রণয়ের_আউড়ে উপন্যাসটার একটা সুন্দর সমাপ্তি হলো ✨☁️ আশা করি সবসময় আমার পাশে থাকবে, তোমরা।
ফি আমানিল্লাহ 🌝🌊🫠}