ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ের আউড়ে

৫২তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার শিলা

#প্রণয়ের_আউড়ে

#পার্ট_৫২

#সুমাইয়া_আক্তার_শিলা

​দেখতে দেখতে সময়ের স্রোতে আরও একটি বছর পেরিয়ে গেছে। কাশিফ আর তামিম এখন বেশ বড় হয়েছে, নিজেদের মতো করে আধো আধো বোল ফুটিয়ে বাড়িটা মাথায় করে রাখে। ওদের দুই ভাইয়ের দুষ্টুমিতে এখন তিথির দিশেহারা অবস্থা! কাবির অফিসে থাকলে তো কথাই নেই, আর ছুটিতে থাকলে তিথির কপালে আরও দুর্ভোগ।

​আজ শুক্রবার, সপ্তাহের সবচেয়ে আনন্দময় দিন হলেও তিথির জন্য আজ দিনটা ভীষণ চাপের। ডিসেম্বরে ওর এসএসসি পরীক্ষা, আর ও যেহেতু সায়েন্স স্টুডেন্ট। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন আর উচ্চতর গণিতের পাহাড় সমান সিলেবাস শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে। ড্রয়িংরুমের টেবিলে বই-খাতা আর ক্যালকুলেটর নিয়ে তিথি যখন গভীর মনোযোগে গাণিতিক সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত, ঠিক তখনই একজোড়া ছোট ছোট হাতের স্পর্শ পেল ও।

​মাথা তুলে তাকাতেই দেখল কাশিফ আর তামিম দুই ভাই মিলে তিথির কলম আর ক্যালকুলেটর নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। কাশিফ তিথির কোলের ওপর উঠে এসে চশমাটা টেনে নিয়ে নিজের নাকে বসানোর চেষ্টা করছে, আর তামিম ওর সায়েন্সের খাতাটা নিয়ে ছিঁড়তে শুরু করেছে!

​তিথি বিরক্ত হয়ে বলল,

"আরে আরে! এটা করিস না বাবুরা! মাম্মাকে প্লিজ, একটু পড়তে দে!"

​ঠিক তখনই কাবির ঘরে ঢুকল। পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি, হাতে এক কাপ কফি। বউয়ের বিধ্বস্ত চেহারা আর ছেলেদের খুনসুটি দেখে সে তৃপ্তির হাসি হাসল। কাবির সোফায় বসে পায়ের ওপর পা তুলে আয়েশ করে বলল,

"বিবিজান, পরীক্ষার পড়ার চেয়ে মনে হচ্ছে এই দুই লিটল লায়নের ট্রেনিং দেওয়া বেশি কঠিন, তাই না?"

​তিথি রাগী দৃষ্টিতে তাকাল,

"আপনি হাসছেন? এদিকে দেখুন আপনার ছেলেরা কী করছে! তামিম আমার নোটবুক ছিঁড়ে ফেলেছে, আর কাশিফ এখন আমার ক্যালকুলেটর নিয়ে কিচেনে ছুটবে!"

​কাবির উঠে এসে দুই ছেলেকে এক ঝটকায় দুই হাতে তুলে নিল। কাশিফ তখনো তিথির শাড়ির আঁচল কামড়ে ধরে আছে। কাবির ওদের নিয়ে তিথির কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে বলল,

"দেখলে তো? ওরা বুঝতে পারছে ওদের মা এখন সায়েন্স নিয়ে খুব বিজি, তাই ওরা চাইছে মা যেন বই রেখে ওদের সাথে খেলায় বিজি হয়।"

​তিথি তোতলাতে তোতলাতে বলল,

"আপনি ওদের প্রশ্রয় দেবেন না! পড়াশোনা না করলে রেজাল্ট খারাপ হবে!"

​কাবির এবার তিথির খুব কাছে এগিয়ে এল। ওর চোয়ালের খাঁজে হাত বুলিয়ে নীচু গলায় বলল,

"রেজাল্ট খারাপ হলে কী হবে? এই আইপিএস অফিসারের বউ ফেল করবে না। আর যদি ফেল করোও, তোমার সাজা দেওয়ার দায়িত্ব তো আমার, তাই না?"

​তিথি লজ্জায় লাল হয়ে খাতা দিয়ে নিজের মুখটা আড়াল করল। তখনই তামিম বাবার পাঞ্জাবির পকেট থেকে চাবির রিং বের করে ড্রয়িংরুমের মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়াতে লাগল ঝনঝন শব্দে পুরো ঘর কাঁপছে! কাশিফ আবার চিৎকার করে উঠল,

"আম্মু! আব্বু, আম্মুর-এর সাতে ঝগড়া করো!"

​কাশফের এই অদ্ভুত আবদার শুনে কাবির হো হো করে হেসে উঠল। তিথি বিরক্ত হয়ে বলল,

"দেখেছেন? আপনার শিক্ষা! আমাকে আপনার সাথে ঝগড়া করতে বলছে ওরা!"

​কাবির তিথির চিবুক ধরে আদর করে বলল,

"উমম, ওরা তো আমারই রক্ত! জানে, ঝগড়ার পরেই কিন্তু মিটমাট করার রোমান্টিক পরিবেশ তৈরি হয়। আর ওদিকে দেখ, ওরা তোমার ক্যালকুলেটরটা সোফার নিচে ঢুকিয়ে দিয়েছে!"

​তিথি হতভম্ব হয়ে দেখল ক্যালকুলেটরটা সোফার নিচে। ও পড়িমরি করে সেটা আনতে নিচে নামল, আর এই সুযোগে কাশিফ আর তামিম তিথির মাথার চুলগুলো টেনে ধরে "ঘোড়া ঘোড়া" বলে খেলতে শুরু করল! কাবির সোফায় গা এলিয়ে মজা দেখছে আর কফিতে চুমুক দিচ্ছে।

–

–

–

​তিথি চুলের জট ছাড়াতে ছাড়াতে কাবিরের দিকে তাকাতেই সে চোখ টিপে দুষ্টু হাসি দিল। তিথি মনে মনে ভাবল, এই অসভ্য সিংহটাকে আর এই দুই খুদে সিংহকে সামলানোই এখন ওর জীবনের আসল কঠিন পরীক্ষা!

​—-----

​ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়। বাইরে শীতের হালকা আমেজ, কিন্তু তিথির বাড়ির ভেতরে উত্তাপটা অন্যরকম। আগামী ৬ই ডিসেম্বর থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু, আর চলবে জানুয়ারি পর্যন্ত। তিথির পড়াশোনার অবস্থা এখন খাইতে বসিয়া পড়া আর পড়িতে বসিয়া ঘুমাইয়া পড়া এই দুইয়ের মাঝামাঝি।

​দুপুরের খাবারের সময়। ডাইনিং টেবিলে সবাই বসেছে। তিথি এক হাতে ভাতের লোকমা, অন্য হাতে পদার্থবিজ্ঞানের গাইডবুক। চোখ দুটো গাইডের পাতায়, আর মুখ দিয়ে সে যান্ত্রিকভাবে ভাত খাচ্ছে।

​

কাবিরের বাবা-মা এলেন। কাশিফ আর তামিম তখনো দাদুর কোলে বসার জন্য রীতিমতো লড়াই করছে। কাবিরের মা তাদের দুইজনকে দুই পাশে বসালেন। দাদু লবণের কৌটাটা টেবিলের এক কোণে রাখতেই কাশিফ সেটা নিয়ে তামিমের মাথায় হালকা করে ছিটিয়ে দিয়ে বলল,

"তামিম বাবু নোনতা হয়ে গেছে দাদু! এখন ওকে খেয়ে ফেলো!"

​তামিম সাথে সাথে দাদুর পাঞ্জাবির হাতা ধরে কান্নাকাটি শুরু করল,

"দাদু, ভাইয়া আমাকে নুন দিতে দিয়েছে, আমি এখন ঝাল হয়ে গেতি!"

​কাবিরের বাবা আলতাফ রহমান চশমা ঠিক করে গম্ভীর গলায় বললেন,

"আরেহ! নুন দিলে তো নোনতা হয়, ঝাল হয় নাকি? তোরা তো দেখছি কাবিরের চেয়েও বড় সাইকো হচ্ছিস!"

​কাবির ডাইনিং টেবিলে তিথির পাশে এসে বসল। তিথি বইয়ের পাতায় এতই মগ্ন যে কাবির ওর প্লেট থেকে এক টুকরো ভুনা মাংস তুলে নিয়েছে, তাও ও টের পায়নি। কাবির তিথির কানে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

"বিবিজান, পরীক্ষার খাতায় যদি এভাবে মাংসের ঝোল লাগিয়ে আসো, এক্সামিনার তো খুশিতে তোমাকে গোল্ড মেডেল দেবে!"

​তিথি চমকে উঠে তাকিয়ে দেখল কাবির ওকে নিয়ে মজা করছে। ও রাগী চোখে তাকাতেই কাবির হাসতে হাসতে বলল,

"আরে রাগ করো না! পড়ো, পড়ো। এসএসসিতে এ প্লাস না পেলে কিন্তু বাসায় কঠোর লকডাউন দিয়ে দেব!"

​কাশিফ তখন সুযোগ বুঝে তিথির প্লেট থেকে মাংসের টুকরোটা নিয়ে দাদুর প্লেটে রেখে দিয়ে বলল,

"দাদু, আম্মু মাংস খেতে পাবে না, ওল পেটে বই ঢুকে গেতে!"

​পুরো ডাইনিংয়ে হাসির রোল পড়ে গেল। তিথি লজ্জায় আর বিরক্তিতে গাল ফুলিয়ে কাবিরের দিকে তাকাতেই সে এক চিলতে দুষ্টু হাসি হাসল। কাবির তিথির প্লেটে নিজের হাত থেকে একটু পোলাও তুলে দিয়ে বলল,

"খাও তিথি, মস্তিষ্ক সচল রাখতে শক্তির প্রয়োজন। নয়তো রাতে আমার সাথে দুষ্টুমি করার এনার্জি থাকবে না।"

​তিথি লাল হয়ে টেবিলের নিচ দিয়ে কাবিরের পায়ে একটা লাথি মারল। কিন্তু কাবির নির্বিকার।

তিথি সব ফেলে ও উঠে দাঁড়াল,

"আপনারা সবাই মিলে আমাকে পাগল করে দিচ্ছেন! আমি পড়তে গেলাম!"

​কাশিফ আর তামিমও সাথে সাথে দৌড় দিল,

"আম্মু! আমরাও আসতি! তোমার ওই লাল কলমটা দিয়ে আমরাও অংক কলবো!"

​কাবির চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"সাবধান বিবিজান, অংক করতে গিয়ে আবার অন্য কিছুতে সায়েন্স প্রয়োগ করে ফেলো না যেন!"

​তিথি পেছনে না তাকিয়েই দৌড়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল।

​#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন