সকালের আকাশটা মেঘলা।রাতের বৃষ্টির পর পুরো বাড়ির বাগান ভিজে আছে।পাতার ডগা থেকে এখনও পানি পড়ছে।কিন্তু সাইফার মাথায় এখন শুধু একটা কথাই ঘুরছে—"সত্যটা পুরোনো লাইব্রেরিতে খুঁজো।"ডায়েরির পাতায় লেখা সেই লাইনটা যেন তাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না।নাস্তার টেবিলে বসে আছে সবাই।সাফোয়ান এক হাতে চা আর অন্য হাতে বিস্কুট নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে।— "আমি মনে করি পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আমি।"রিয়ান মুখ গম্ভীর করে বলল,
— "কারণ?"
— "আমি না থাকলে এই বাড়িতে হাসির পরিমাণ ৯৫% কমে যেত।"
— "না।"
— "কেন?"
— "তুমি না থাকলে খাবারের খরচ ৮০% কমে যেত।"এক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর পুরো টেবিল হাসিতে ফেটে পড়ল।মাহাদি নাটকীয়ভাবে বুক চেপে ধরল।
— " আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা !"
সাইফা হাসল।কিন্তু তার মন অন্য কোথাও।সাইফ সেটা খেয়াল করল।সে চুপচাপ কফিতে চুমুক দিল।তারপর নিচু গলায় বলল,— "তুই কিছু খুঁজতে যাচ্ছিস?"সাইফা চমকে উঠল।
— "কী?"
— "আমাকে বোকা ভাবিস না।"সাইফের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।
— "তোর চোখ দেখলেই বুঝি।"এক মুহূর্তের জন্য সাইফার বুক কেঁপে উঠল।কেন জানি না...এই মানুষটার সামনে মিথ্যা বলতে তার সবসময় কষ্ট হয়।দুপুরে বাড়ির পুরোনো লাইব্রেরিতে সাইফা আসলো।এই রুমে খুব কম মানুষ আসে।বড় বড় বুকশেলফ।পুরোনো বইয়ের গন্ধ।জানালা দিয়ে আসা ম্লান আলো।পুরো জায়গাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত নীরবতা।সাইফা ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল।তার হাতে সেই ডায়েরির পৃষ্ঠা।সে একটার পর একটা তাক দেখছে।কিন্তু কিছুই পাচ্ছে না।প্রায় আধা ঘণ্টা খোঁজার পর সে বিরক্ত হয়ে গেল।
— "কিছুই তো নেই..."ঠিক তখনই—তার চোখ পড়ল একটা পুরোনো ছবির ওপর।ধুলো জমে আছে।ছবিতে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে।আর মাঝখানে একটা ছোট মেয়ে।তখন সাইফা খুব ছোট্ট।হয়তো ৯ বা ১০ বছরের।সে ছবিটা হাতে তুলে নিল।তার বুক ধক করে উঠল।কারণ ছবির পেছনে লেখা—"আগুনের রাতের এক সপ্তাহ আগে।"তার হাত কেঁপে উঠল।আগুন?আবার আগুন?হঠাৎ মাথার ভেতর ঝলকানি।একটা ঘর।ধোঁয়া।কেউ চিৎকার করছে।একজন মানুষ তাকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে।আরেকজন বারবার বলছে—"ওকে বাঁচাও!"যেভাবেই হোক ওকে বাঁচাও!"
— "আহ!"সাইফা মাথা চেপে ধরল।শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।ঠিক তখনই একটা শক্ত হাত তার কাঁধে এসে পড়ল।
— "সাইফা!"
সাইফকখন যে সে এসেছে, সাইফা খেয়ালই করেনি।
— "বসে পড়।"
— "আমি ঠিক আছি।"
— "না।"সাইফের গলায় আদেশের সুর।
— "বসে পড়।"অজান্তেই সাইফা কথা শুনে ফেলল।সে একটা চেয়ারে বসল।সাইফ তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
— "মাথা ঘুরছে?"
— "একটু।"
— "শ্বাস ধীরে নে।"কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।শুধু নীরবতা।সাইফা নিচের দিকে তাকিয়ে ছিল।হঠাৎ তার চোখ গেল সাইফের হাতে।মুঠো করা।শিরাগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।মনে হচ্ছে সে কোনো কারণে খুব রেগে আছে।অথবা চিন্তিত।
— "তুই কি কিছু মনে করতে পারছিস?"অবশেষে জিজ্ঞেস করল সে।
— "আগুন।"সাইফের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
— "আর?"
— "একজন মানুষ।"
— "কে?"
— "মুখটা দেখতে পাইনি।"
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর সাইফ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।তার চোখে এমন একটা ছায়া নেমে এলো যা সাইফা আগে কখনও দেখেনি।মনে হলোসে কিছু জানে।অনেক কিছু।কিন্তু বলছে না।ঠিক তখনই—দড়াম!লাইব্রেরির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল সাফোয়ান।
— "বাঁচাও!"
— "কী হয়েছে?"
— "রিয়ান আমার লুকিয়ে রাখা চকোলেট খেয়ে ফেলেছে!"পেছন থেকে রিয়ান চিৎকার করল
— "মিথ্যা কথা!"
— "সত্য কথা!"
— "প্রমাণ দাও!"
— "আমার হৃদয় জানে তুই যে খেয়েছিস!"
সাইফা হেসে ফেলল।এতক্ষণ পরে প্রথমবার।মাহাদি বুক ফুলিয়ে বলল
— "দেখছো? আমি মানুষের মন ভালো করি।"সাইফ শুকনো গলায় বলল
— "তুই মানুষের মাথাও খারাপ করিস।"সবাই হাসলেও...কেউ খেয়াল করল না।লাইব্রেরির জানালার বাইরে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে ছিল।স্থির।নীরব।সে কয়েক সেকেন্ড সাইফার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।আর ঠিক সেই সময়—সাইফার ফোনে একটা নতুন মেসেজ এল।Unknown Number কাঁপা হাতে সে মেসেজটা খুলল।আর তার মুখের রং মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। "লাইব্রেরির লাল বইটা খুলো না।"
"সত্যটা জানলে... কেউ বাঁচবে না।"