সাইফার হাত কাঁপছে।ফোনের স্ক্রিনে এখনও জ্বলজ্বল করছে সেই মেসেজ।"লাইব্রেরির লাল বইটা খুলো না।" "সত্যটা জানলে... কেউ বাঁচবে না।"তার বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা আরও বেড়ে গেল।কে এই মানুষটা?কীভাবে সে জানে সাইফা এখন লাইব্রেরিতে?আর সবচেয়ে বড় কথা—সে কেন বারবার সাইফাকে সত্যের কাছ থেকে দূরে রাখতে চাইছে?
— "কী হয়েছে?"সাইফের কণ্ঠ শুনে সাইফা চমকে উঠল।সে দ্রুত ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।
— "কিছু না।"
— "আবার মিথ্যা।"সাইফ ভ্রু কুঁচকাল।
— "তুই মিথ্যা বললে চোখের পলক বেশি ফেলিস।"
— "তুমি কি সবসময় মানুষ পর্যবেক্ষণ করো?"
— "হুম।"
— "অদ্ভুত।"
— "ধন্যবাদ।"সাইফা চোখ ঘুরিয়ে তাকাল।লোকটা সত্যিই অদ্ভুত।সাফোয়ান আর রিয়ান তখনও চকোলেট যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত।সুযোগ পেয়ে সাইফা চুপচাপ লাইব্রেরির ভেতরের দিকে চলে গেল।ঘরের এক কোণে পুরোনো একটা বুকশেলফ।ধুলো জমে আছে।কেউ বহু বছর ছুঁয়েও দেখেনি।সেখানে...একটা লাল মলাটের বই। তার বুক ধক করে উঠল।লাল বই।ঠিক যেটার কথা মেসেজে লেখা ছিল।সে ধীরে ধীরে বইটা নামাল।বইটা আশ্চর্য রকম ভারী।মলাটে কোনো নাম নেই।শুধু একটা পুরোনো প্রতীক আঁকা।অর্ধেক পুড়ে যাওয়া গোলাপ।সাইফা বইটা খুলল।প্রথম কয়েকটা পৃষ্ঠা ফাঁকা।তারপর একটা ছবি।পুরো চৌধুরী পরিবারের ছবি।কিন্তু...একজনের মুখ কালো কালি দিয়ে কেটে দেওয়া।
— "এটা কী?"ফিসফিস করে বলল সে।তারপর নিচে লেখা একটা লাইন দেখতে পেল। "যাকে সবাই ভুলে গেছে।"---হঠাৎ তার মাথার ভেতর আবার ঝলকানি।একটা ছোট ছেলে।হাসছে।তার পাশে ছোট্ট সাইফা।দুজন বাগানে দৌড়াচ্ছে।তারপর...আগুন।চিৎকার।ধোঁয়া।সবকিছু মিলিয়ে গেল।— "আহ!"বইটা হাত থেকে পড়ে গেল।ঠিক তখনই—এক জোড়া শক্ত হাত তাকে ধরে ফেলল।সাইফ।
— "শান্ত।"তার কণ্ঠ নিচু।দৃঢ়।নিরাপদ।
— "শ্বাস নে।"সাইফা বুঝতে পারল না কেন...কিন্তু তার বুকের ধড়ফড়ানি ধীরে ধীরে কমে এলো।এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখে চোখ পড়ল।সাইফের চোখ দুটো অদ্ভুত।গভীর।যেন অনেক কথা লুকিয়ে আছে সেখানে।কিন্তু সে কিছুই বলে না।
— "তুই কী দেখেছিস?"সাইফ জিজ্ঞেস করল।
— "একটা ছেলে।"
— "ছেলে?"
— "হুম।"
— "চিনতে পেরেছিস?"
— "না।"কিন্তু সাইফের মুখ দেখে মনে হলো—সে হয়তো চিনেছে।সন্ধ্যায় সাইফা নিজের রুমে বসে স্কেচ করছে।আজ সে বারবার একই মুখ আঁকার চেষ্টা করছে।একটা ছেলের মুখ।কিন্তু প্রতিবারই মাঝপথে থেমে যাচ্ছে।মনে পড়ছে না।ঠিক তখনই জানালায় টুপ করে কিছু একটা আঘাত করল।সে চমকে উঠল।দ্রুত উঠে জানালার কাছে গেল।বাইরে কেউ নেই।শুধু একটা ছোট কালো খাম।তার বুক ধক করে উঠল।কাঁপা হাতে খামটা খুলল।ভেতরে একটা ছবি।পুরোনো।হলদেটে।ছবিটায়—একটা ছোট মেয়ে।ছোট্ট সাইফা।আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে সেই অচেনা ছেলে।দুজনেই হাসছে।ছবির পেছনে লেখা— "তুমি আমাকে ভুলে গেছো, সাইফা।"
"কিন্তু আমি তোমাকে ভুলিনি।"আর নিচে...একটা নাম আরমান। সাইফার হাত থেকে ছবিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।কারণ প্রথমবারের মতো—সে বুঝতে পারল,আরমান শুধু একটা নাম নয়।সে তাদের অতীতের অংশ।খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশ।আর হয়তো...সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্যটাও তার সাথেই জড়িয়ে আছে।