সারা রাত ঘুমাতে পারল না সাইফা।বিছানায় শুয়ে বারবার সেই ছবিটার কথাই ভাবছে।গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা।আর তার নিচে লেখা— "খুব শীঘ্রই দেখা হবে।" — আরমান
বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে।কিন্তু তার ভেতরের ঝড়টা থামেনি।ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল।আর তখনই...সে আবার সেই স্বপ্নটা দেখল।একটা পুরোনো বাড়ি।আগুনে জ্বলছে।চারদিকে ধোঁয়া।মানুষ চিৎকার করছে।ছোট্ট সাইফা কাঁদছে।আর একজন ছেলে তার হাত শক্ত করে ধরে আছে।
— "ভয় পেও না।"
— "আমি আছি।"সাইফা এবার ছেলেটার মুখ দেখতে পেল।সেই ছেলেটা আরমান।
প্রথমবারের পুরোপুরি দেখতে পেয়েছে। তার চোখে পানি চলে এলো।কারণ ছেলেটার মুখে ভয় ছিল।কিন্তু তবুও সে সাইফার হাত ছাড়েনি।হঠাৎ একটা বিস্ফোরণের শব্দ।ধাম! তারপর...সবকিছু অন্ধকার।সাইফা ঘুম ভেঙে উঠে বসল।তার নিঃশ্বাস দ্রুত চলছে।কপাল ঘামে ভিজে গেছে।
— "আমি তোমাকে চিনতাম..."সে ফিসফিস করে বলল।
— "আমি সত্যিই তোমাকে চিনতাম..."
সকালের নাস্তার টেবিলে আজ অদ্ভুত নীরবতা।সাফোয়ানও আজ তেমন মজা করছে না।রিয়ানও চুপ।কারণ সবাই বুঝতে পারছে—কিছু একটা ঘটতে চলেছে।সাইফ টেবিলে বসে কফি খাচ্ছে।কালো শার্ট।গম্ভীর মুখ।সাইফা তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।— "আমার তোমার সাথে কথা আছে।"সাফোয়ান আস্তে করে রিয়ানকে বলল,
— "যুদ্ধ শুরু।"রিয়ান মাথা নাড়ল।
— "নিশ্চিত।"সাইফ চুপচাপ উঠে দাঁড়াল।— "চল।"দুজন বাড়ির পেছনের বাগানে চলে গেল।সকালের হালকা বাতাস।ভেজা ঘাস।নীরবতা।সাইফা এবার আর ঘুরিয়ে কথা বলল না।
— "আমি আরমানকে স্বপ্নে দেখেছি।"সাইফের চোখ মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।
— "তার মুখও দেখেছি।"নীরবতা।
— "তুমি কি তাকে চিনতে?"---দীর্ঘ নীরবতা।তারপর...
— "হ্যাঁ।"একটা শব্দ।কিন্তু সেই একটা শব্দই যেন সাইফার বুক কাঁপিয়ে দিল।
— "সে কে ছিল?"সাইফ দূরে তাকাল।অনেকক্ষণ।মনে হলো সে অতীতের কোনো স্মৃতি দেখছে।তারপর ধীরে ধীরে বলল
— "সে আমার ভাইয়ের মতো ছিল।"সাইফা অবাক হয়ে গেল।
— "ভাই?"
— "রক্তের সম্পর্ক না।"
— "কিন্তু পরিবারের চেয়েও কাছের।"তার কণ্ঠে এমন এক শূন্যতা ছিল...যেটা শুনলে কষ্ট হয়।-ঠিক তখনই—সাইফের ফোন বেজে উঠল।সে ফোনটা দেখেই মুখ শক্ত করে ফেলল।
— "আমি আসছি।"এটুকু বলেই কল কেটে দিল।সাইফা খেয়াল করল—ওর চোখের ভেতর আবার সেই অন্ধকার ছায়া নেমে এসেছে।যেটা সে মাঝে মাঝে দেখে।যেন অন্য একজন মানুষ।সেই রাত।শহরের এক পরিত্যক্ত গুদামঘর।কালো বাইক থেকে নামলো সাইফ।ভেতরে ঢুকতেই কয়েকজন লোক উঠে দাঁড়াল।
— "Boss."সাইফ চুপ।একজন লোক সামনে এগিয়ে এলো।
— "আমরা তাকে খুঁজে পেয়েছি।"সাইফের চোখ সরু হয়ে গেল।
— "কোথায়?"লোকটা একটা ছবি এগিয়ে দিল।ছবিতে—একজন মানুষ।কালো কোট।বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে।আর তার মুখ...এবার পুরোপুরি দেখা যাচ্ছে।সাইফ ছবিটা দেখেই জমে গেল।কারণ...ছবির মানুষটা সত্যিই আরমান।একদম আরমান।বছরের পর বছর আগের সেই মুখ।শুধু চোখ দুটো বদলে গেছে।আগের চেয়ে অনেক বেশি অন্ধকার।অনেক বেশি বিপজ্জনক।সাইফ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।তারপর খুব আস্তে বলল—"তাহলে তুই সত্যিই ফিরে এসেছিস..."আর অনেক দূরে...একটা অন্ধকার ঘরে বসে কেউ একজন ছবির দিকে তাকিয়ে হাসল।তার সামনে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছবি।সবগুলোই সাইফার।শৈশবের বর্তমানের।এমনকি...গতকালেরও।লোকটা একটা ছবি হাতে তুলে নিল।সাইফার ছবি।তারপর ফিসফিস করে বলল— "আর একটু অপেক্ষা করো, সাইফা।"
"খুব তাড়াতাড়ি তোমার সব মনে পড়ে যাবে।"আর সেই মানুষটা...আর কেউ নয়। আমিই আরমান।