---
সন্ধ্যা নামতেই ভন্ডপার্টিরা তাসিফার বাসায় হাজির।
আয়রা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মেয়ের বন্ধুরা প্রথমবার বাসায় এসেছে, খালি মুখে তো আর ছাড়া যায় না। তাই চটজলদি ট্রে সাজাচ্ছেন সমুচা, নুডলস, চিপস আর পাস্তা দিয়ে।
ড্রয়িংরুমে গোল হয়ে বসে আছে চারজন। সবার হাতে ফোন, নাচের গান সিলেক্ট করা হচ্ছে।
তাসনিম ফোন থেকে চোখ তুলে বলল,
-"তাসু, আমার মনে হয় না এখানে আমরা ঠিকভাবে প্র্যাকটিস করতে পারব রে।"
ইয়াশ চারপাশে তাকিয়ে বলল,
-"হ্যাঁ রে! এই রুমটা ছোট হয়ে গেছে বেশি। হাত-পা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নাচতেই পারব না।"
সাদ মুখ কালো করে বলল,
-"ছাদে তো আর প্র্যাকটিস করতে পারব না। জুয়িন ভাইয়ের কড়া নিষেধ।"
তাসিফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"উম, তা ঠিক। আচ্ছা দাঁড়া, আমি উনাকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করি একটু জায়গা দিতে পারবে কিনা।"
বলেই তাসিফা "খ্যাকখ্যাক ওয়ালা" নামে সেভ করা নাম্বারে ডায়াল করল।
প্রথমবার কল দিলো, ধরল না। দ্বিতীয়বার দিলো, রিং বাজতেই ধরল।
তাসিফা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
-"আসালামু আলাইকুম, জুয়িন ভাইয়া।"
ওপাশ থেকে জুয়িন ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"ওয়ালাইকুম আসসালাম। বল।"
তাসিফা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,
-"আসলে একটা দরকারে কল দিয়েছি।"
জুয়িন সাথে সাথেই বলল,
-"তোর দরকারের কথা পরে শুনব। আগে ছাদে এসে ফুল গাছগুলোতে পানি দিয়ে যা।"
বলেই খট করে কল কেটে দিলো।
পুরো ড্রয়িংরুম ৩ সেকেন্ডের জন্য পিনপতন নীরব। কারণ কলটা লাউডস্পিকারে ছিল।
ইয়াশ সবার আগে দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"যা যা, তোর রোমিও ছাদে ডাকছে তোকে।"
সাদ নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল,
-"তাসিফা, তোর সাথে আমরাও যাব। দেখি জুয়িন ভাইকে মানানো যায় কিনা।"
সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
তখনই আয়রা বেগম ট্রে হাতে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন।
ইয়াশ তাড়াহুড়ো করে বলল,
-"আরে আন্টি, এসবের কোনো প্রয়োজন ছিল না।"
সাদ একটা সমুচা হাতে নিয়ে বলল,
-"থ্যাংক ইউ আন্টি। অনেক ক্ষুধা লেগেছিল। আপনি ইয়াশের কথা কানে নিয়েন না একদম।"
আয়রা বেগম ওদের বাঁদরামি দেখে হেসে দিলেন।
-"আরে সমস্যা নেই। সবাই মিলে খাও।"
তাসনিম নিজের পাশে একটু জায়গা করে দিয়ে বলল,
-"আন্টি আপনিও বসেন আমাদের পাশে।"
আয়রা বেগম বসলেন।
ইয়াশ নুডলস খেতে খেতে বলল,
-"আঙ্কেল কোথায় আন্টি?"
আয়রা বেগম শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বললেন,
-"তাসিফার বাবা বাইরে গেছেন। নতুন ব্যবসা দিয়েছেন তো, তাই একটু ব্যস্ত।"
তিনজন একসাথে "ওহ" বলল।
খাওয়া-দাওয়া শেষ। চার ভন্ডপার্টি এবার ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো। তাসিফার বুক ধুকপুক করছে। জানে না ছাদে গিয়ে কী অপেক্ষা করছে।
---
চারজন চুপিচুপি ছাদে এলো। দেখল ছাদের সব লাইট জ্বলছে। আলোয় পুরো ছাদটা ঝলমল করছে।
তাসিফা প্রথমে জুয়িনের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালো। ধীরে ধীরে দরজায় নক করল।
আচমকা দরজা খুলে গেল। জুয়িন দরজার ওপাশে।
দরজা খুলে জুয়িন কিছুটা হতভম্ব হলো। কারণ সামনে তাসিফা একা না, তাসিফার সাথে তার বন্ধুরাও আছে। জুয়িনের পরনে সাদা টি-শার্ট আর ধূসর রঙের ট্রাউজার। চুলগুলো একটু এলোমেলো হয়ে আছে।
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে পুরো ভন্ডপার্টির দিকে তাকালো। তারপর গম্ভীর গলায় বলল,
-"তোমরা সবাই এখানে কেন?"
তাসনিম জুয়িনকে দেখে মনে ঢোক গিলল। সাদা টি-শার্টে ছেলেটাকে দেখতে একদম কড়া লাগছে।
তাসিফা আমতা আমতা করে বলল,
-"শুনন না, একটু জায়গা দিতে পারবেন ছাদে? ডান্স প্র্যাকটিসের জন্য আরকি।"
জুয়িন হাত ভাঁজ করে দরজায় হেলান দিলো। ভ্রু কুঁচকে এক শব্দে বলল,
-"নো।"
ইয়াশ হাত জোড় করে বলল,
-"প্লিজ ভাইয়া, দেন না একটু জায়গা।"
জুয়িন এক পলক তাসিফার দিকে তাকালো। তারপর ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি এনে বলল,
-"আমার লাভ কী হবে?"
তাসিফা বিড়বিড় করে বলল,
-"এই শালা শুধু লাভ খোঁজে, ফালতু।"
ইয়াশ বলল,
-"কী চান আমাদের থেকে? বলেন।"
জুয়িন আবার তাসিফার দিকে তাকালো। চোখে চোখ রেখে ইয়াশকে বলল,
-"ওকে। তবে সেটা তোমাকে একান্তভাবে বলব।"
সবাই একে অপরের দিকে তাকালো। পরে মেনে নিলো জুয়িনের কথা।
জুয়িন হঠাৎ করে বলল,
-"তাসিফা, আগে আমার ফুল গাছগুলোতে পানি দে।"
তাসিফা জুয়িনের কথামতো সবগুলো ফুল-গাছে পানি দিয়ে দিলো।
--
তাসিফা ফুল গাছে পানি দেওয়া শেষ করে ডান্স প্র্যাকটিস করতে এলো। সবাই প্রথমে গ্রুপ ডান্সের প্র্যাকটিস শুরু করল।
ইয়াশ বলল,
-"গাইস তোরা ভালোভাবে প্র্যাকটিস করিস। যাতে ডান্সের স্টেপ ভুল না হয়।"
তাসিফা বলল,
-"ওকে।"
সাদ মোবাইলে "vachindamma" গানটা প্লে করল। এই গানে সবাই গ্রুপ ডান্স করবে।
সবাই মোবাইল থেকে দেখে দেখে ডান্সটা ভালোভাবে শিখে নিচ্ছে।
আর অন্যদিকে জুয়িন পলকহীন চোখে তাসিফার দিকে তাকিয়ে আছে। তাসিফা আজ সাদা রঙের গোল জামা পরেছে। আর ওড়নাটা কোমরে বেঁধে নিয়েছে। লম্বা চুলগুলো বেনি করে রেখেছে। কপালে ছোট একটি পাথরের সাদা টিপ দিয়েছে। জুয়িন হঠাৎ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। আর ছাদ থেকে নিজের রুমে চলে গেল।
-
-"সাদের বাচ্চা তাড়াতাড়ি করবি? তুই বারবার ডান্সের স্টেপ ভুল করছিস!" - রেগে বলল তাসনিম
সাদ বলল,
-"আরে মাতারি চুপ কর! তাড়াহুড়ো শয়তানের কাজ। তোর জন্য আমার ডান্সের স্টেপ ভুল হচ্ছে।"
তাসিফা হঠাৎ সাদের কান চেপে ধরল আর বলল,
-"কুত্তা, তোর জন্য আমাদের বারবার প্র্যাকটিস করতে হচ্ছে। এবার ঠিকভাবে না করলে আমরা তোকে ডান্সে নিবো না।"
সাদ বলল,
-"আরে ভাই কান ছাড়, লাগছে তো। তোর কসম এবার ঠিকভাবে ডান্সের স্টেপগুলো করব।"
তাসিফা সাদের কান ছেড়ে দিল। সবাই আবার ডান্স করল, এবার সাদ ঠিকভাবে করেছে ডান্সের স্টেপগুলো।
গ্রুপ ডান্সের প্র্যাকটিসের পর, সবাই কাপল ডান্সের প্র্যাকটিসও শেষ করল।
সাদ নিজের চুল সামান্য টেনে বলল,
-"এখন বাসায় যেতে হবে রে, মাথা ব্যথা করছে আমার।"
তাসিফা বলল,
-"হুম চল, এখন নিচে যাওয়া যাক।"
ইয়াশ বলল,
-"জুয়িন ভাই আমাকে কী যেন বলবে বলেছিল। আমি তার কথাটা শুনে আসছি। তোরা যা।" বলেই জুয়িনের ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে গেল ইয়াশ।
কেউ আর দাঁড়ালো না। তিনতলায় চলে এলো।
তাসনিম সোফায় বসতে বসতে তাসিফাকে বলল,
-"ভাই একটু পানি দে তো, গলা শুকিয়ে গেছে একদম।"
তাসিফা দৌড়ে ডাইনিং রুম থেকে পানি এনে তাসনিমকে খেতে দিলো।
আর অন্য দিকে সাদ বলল,
-"ভাই রাত ১১:৩০ বাজে। এখনই রওনা দিতে হবে।"
তাসিফা সোফায় বসে বলল,
-"এখনই রওনা দিতে হবে কেন? খেয়ে-দেয়ে তারপর বাসায় যাবি।"
সাদ বলল,
-"বাল! বুঝিস না কেন? আমার আম্মু আমাকে ধোলাই দিবে। সাথে আব্বু ফ্রি।"
তাসিফা হেসে বলল,
-"সমস্যা হবে না। তুই আন্টি, আঙ্কেলকে বুঝিয়ে বলিস যে কাল আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান, তার জন্য ডান্স প্র্যাকটিস করতে আমার বাসায় এসেছিস সবাই।"
সাদ বলল,
-"ওকে।"
তাদের কথার মাঝে ইয়াশ চলে এলো।
তাসিফা বলল,
-"জুয়িন ভাইয়া কী বলল?"
ইয়াশ আমতা আমতা করে বলল,
-"ইয়ে না মানে! তোকে বলা যাবে না দোস্ত।"
তাসিফা চোখ ছোট ছোট করে বলল,
-"কেন?"
ইয়াশ বলল,
-"প্লিজ জোর করিস না।"
তাসিফা আর ঘাঁটল না।
হঠাৎ আয়রা বেগম সবাইকে ডাইনিং রুমে খেতে আসতে বললেন।
সবাই ডাইনিং রুমে এসে দেখল টেবিলে হরেকরকমের মাছ, গরুর মাংস, মুরগির মাংস, সালাদ, পোলাও, ডিম সিদ্ধ, মুরগির কলিজা ভুনা দিয়ে পুরা টেবিল সাজানো।
তাসনিম বলল,
-"আন্টি আপনি এত কাজ করতে গেলেন কেন? এত খাবার আমরা শেষ করতে পারব না।"
আয়রা বেগম হেসে বললেন,
-"এত খাবার কোথায়? চুপচাপ খাও তো সবাই।"
সবাই একে একে বসে পড়ল খেতে। তাসিফার বাবা মাত্র বাহির থেকে ফিরেছেন, মেয়ের বন্ধুদের দেখে বললেন,
-"কিরে বাচ্চারা, কেমন আছো সবাই?"
সবাই একসাথে মিষ্টি হেসে বলল,
-"ভালো আছি আঙ্কেল। আপনি কেমন আছেন?"
আলমগীর আলম হেসে জবাব দিলেন,
-"আলহামদুলিল্লাহ। আচ্ছা তোমাদের আর ডিস্টার্ব করলাম না। আমি এখন গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসছি।" বলেই নিজের রুমে চলে গেলেন আলমগীর আলম।
--
ভন্ডপার্টিরা নিজেদের বাসায় ফিরেছে ১ ঘণ্টা হলো। তাসিফা ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে রুমের লাইট নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।