--
তাসিফা আপনমনে বিরিয়ানির প্লেট হাতে ছাদের দিকে যাচ্ছিল। সিঁড়ির মাঝে হঠাৎ ভার্সিটির দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠল,জুয়িনকে একটা মেয়ে হঠাৎ জড়িয়ে ধরেছিল।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই তাসিফার বুকের ভেতরটা কেমন মুচড়ে উঠল। ঠোঁট বাঁকিয়ে বিড়বিড় করল,
-"বেয়াদব লোকটার প্রেমিকা আছে, তাতে আমার কী!"
তবুও মন মানছে না। বুকের ভেতর অচেনা খারাপ লাগাটা জেঁকে বসছে। এসব ভাবতে ভাবতেই তাসিফা কখন যে জুয়িনের ফ্ল্যাটের সামনে চলে এসেছে টের পায়নি।
এক মুহূর্ত ভাবল, বিরিয়ানিটা জুয়িনকে না দিয়ে নিজেই খেয়ে ফেলবে। এই লোককে খাওয়ানোই লস। তবু মানবতার খাতিরে দরজায় টোকা দিল দু’বার।
দরজা খুলল জুয়িন। হাতে তোয়ালে, চুল বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। সদ্য গোসল সেরে এসেছে বোঝা যাচ্ছে। তাসিফাকে দেখে জুয়িন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"এখানে কী চাই?"
তাসিফা মুখ কালো করে প্লেটটা এগিয়ে দিল,
-"মা পাঠিয়েছে আপনার জন্য।"
জুয়িন এক পলক তাকিয়ে প্লেট নিল, তারপর হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ে দিল,
-"মুখ কালো করে রেখেছিস কেন?"
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"তাতে আপনার কী?"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে ধমকের সুরে বলল,
-"মুখে মুখে তর্ক করছিস? থাপ্পড় দিয়ে গাল লাল করে দেব।"
ধমক শুনে তাসিফার চোখ ছলছল করে উঠল। এই লোকটা কেন শুধু ওর সাথেই এমন করে! আর দাঁড়াল না সে। দৌড়ে নিজের বাসায় চলে এলো। পেছনে জুয়িন আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
---
আয়রা বেগম আর আলমগীর আলম এতিমখানা থেকে আলমগীর আলমের বোনের বাসায় যাবেন কুমিল্লায়। তাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন দুজনেই। আয়রা বেগম তাড়া দিয়ে বললেন,
-"তাসিফা, আমাদের সাথে চল। একা থাকতে পারবি না তো।"
তাসিফা মাথা নাড়ল,
-"না মা। থাকতে পারব। তোমরা কবে আসবে?"
আলমগীর আলম বললেন,
-"আগামীকাল বিকেলেই চলে আসব।"
তাসিফা শুধু "ওহ" বলে মাথা দুলাল।
দুপুরে মা-বাবা বের হয়ে গেছেন। এখন সন্ধ্যা নামছে। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। আকাশটা মেঘে ঢাকা, থেকে থেকে বিদ্যুতের ঝলকানি। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো বৃষ্টির পানিতে প্রতিফলিত হয়ে চারপাশটা খুব স্নিগ্ধ লাগছে।
তাসিফা বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল বৃষ্টির ছোঁয়া নিতে। ঠান্ডা পানি হাত ছুঁয়ে যেতেই শরীরটা কেঁপে উঠল। এই আবহাওয়াটা ওর বড্ড প্রিয়।
মাথাটা সামান্য চিনচিন করছে। তাই বেলকনির দরজা টেনে দিয়ে রুমে চলে এলো। পড়তে বসল না। চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে। লাইট নিভিয়ে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। বাইরে তখনও বৃষ্টি ঝরছে একটানা।
অন্যদিকে জুয়িন ছাদে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি বিলাস করছে। কানে হেডফোন "অনেক করে পাবো" গানটা বাজছে। চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখছে। হঠাৎ পরিবারের কথা মনে পড়ে গেল। কী সুন্দর পরিবার ছিল তাদের! বাবার ভুলের কারণেই সব ছাড়তে হয়েছে তার।
চোখ বন্ধ করতেই ভার্সিটির সেই দৃশ্য,
"বৃষ্টিতে ভেজা তাসিফা"। জুয়িন আজ থমকে গিয়েছিল। মেয়েটার চোখে বৃষ্টির মতোই একরোখা জেদ।
---
পরের দিন ভার্সিটিতে ভন্ডপার্টির সবাই হাজির, শুধু একজন নেই,আর সে হলো তাসিফা। সবাই চিন্তায় পড়ে গেল। মেয়েটার কিছু হলো না তো? তাসিফাকে বারবার কল করা হলো, কিন্তু ও কারো কলই ধরল না।
ইয়াশ বিরক্ত হয়ে বলল,
-"ভাই, বিরক্ত লাগছে। কল ধরে না কেন শালি?"
সাদ চিন্তিত গলায় বলল,
-"কোনো বিপদ হয়নি তো?"
তাসনিম আবার কল দিল, ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই।
--
দুপুরে জুয়িন এলো তাসিফাদের বাসায় প্লেট ফেরত দিতে। কলিং বেল বাজাল প্রায় ১০ মিনিট ধরে। অবশেষে দরজা খুলল তাসিফা। চোখ দুটো লাল, চুল উষ্কখুষ্ক।
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
-"শরীরের এমন অবস্থা দেখাচ্ছে কেন?"
তাসিফা ঠিকমতো চোখ মেলতে পারছে না, দাঁড়াতেও কষ্ট হচ্ছে। জুয়িন তার কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠল।গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে।
এক মুহূর্ত দেরি না করে প্লেটটা ডাইনিংয়ে রেখে মেইন দরজা বন্ধ করে তাসিফাকে কোলে তুলে রুমে নিয়ে গেল। বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওয়াশরুম থেকে ভেজা তোয়ালে এনে কপালে জলপট্টি দিতে লাগল।
জ্বরের তাপ কমছে না দেখে জুয়িনের হাত-পা কাঁপছে। চোখে পানি টলমল করছে। তাসিফার গালে হাত রেখে ফিসফিস করে ডাকল,
-"সোনা? আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?"
তাসিফা কোনো উত্তর দিল না। জুয়িনের বুকটা দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ তাসিফার ফোন বেজে উঠল।ভন্ডপার্টিদের গ্রুপ ভিডিও কল এসেছে। জুয়িন কল ধরতেই ওপাশের সবাই হতভম্ব।
ইয়াশ অবাক হয়ে বলল,
-"ভাইয়া, আপনি?"
জুয়িন গলা পরিষ্কার করে বলল,
-"তোমরা জলদি তাসিফার বাসায় আসো। ওর শরীর ভালো না।" বলেই কল কেটে দিল।
১০ মিনিটের মধ্যেই ভন্ডপার্টির সবাই হাজির। তাসনিম দৌড়ে তাসিফার কাছে গেল। মেয়েটা নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে, চোখের নিচে কালি।
ইয়াশ আর সাদ চেয়ার টেনে বসল।
ইয়াশ বলল,
-"বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর এসেছে নিশ্চিত।"
সাদ মাথা নাড়ল,
-"হুম।"
জুয়িন উঠে দাঁড়াল,
-"তাসিফা মনে হয় কিছু খায়নি। ওকে কিছু খেতে দাও। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।" বলে বেরিয়ে গেল।
তাসনিম রান্নাঘরে গিয়ে দেখল কিছুই রান্না নেই। ইয়াশ আর সাদকে ডাকল,
-"তোরা ঘরটা গুছিয়ে নে, আমি রান্না করছি।"
সাদ আর ইয়াশ ঘর গোছানোর কাজে লেগে পড়ল।
--
তাসনিম কোমরে ওড়নার একপাশ শক্ত করে গিঁট দিয়ে বাঁধল। চুলগুলো খোঁপা করে নিল।
চুলায় মাঝারি আঁচে কড়াই বসানো। প্রথমে মসুর ডাল ধুয়ে প্রেশার কুকারে দিল। হলুদ, লবণ আর দুইটা কাঁচা মরিচ ফালি করে দিয়ে দিল। কুকারের সিটি পড়তেই "ফুশশশ" করে বাষ্প বের হচ্ছে। ঘরময় ভেজা ডালের গন্ধ।
পাশের চুলায় কড়াই গরম করে সরিষার তেল ঢালল। তেল গরম হতেই রুই মাছের পিসগুলো একে একে ছেড়ে দিল। "ছ্যাঁৎ" করে শব্দ। মাছের গায়ে সোনালি বাদামি রং ধরছে। মচমচে করে ভেজে একটা স্টিলের প্লেটে তুলে রাখল। কড়াইয়ে লেগে থাকা মাছের গন্ধটাই অন্যরকম।
এবার ওই তেলেই পেঁয়াজ কুচি দিল। পেঁয়াজ নরম হয়ে কাঁচা গন্ধ চলে গেলে আদা-রসুন বাটা,হলুদ-মরিচ-ধনিয়া গুঁড়া দিল। মসলা কষতে কষতে তেল ছেড়ে দিল। ঝাঁঝালো মসলার ঘ্রাণে রান্নাঘর ভরে গেল। তারপর ভাজা মাছগুলো দিয়ে অল্প পানি দিয়ে ঢেকে দিল। ৫ মিনিট দমে রাখলেই মাছ ভুনা রেডি। উপরে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিল।
অন্যদিকে ড্রয়িংরুমে যুদ্ধ চলছে। ইয়াশ ঝাড়ু হাতে টিভির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ফ্লোরে ধুলার সাথে চুল, চিপসের প্যাকেট সব পড়ে আছে। এক হাতে ঝাড়ু, অন্য হাতে রিমোট। স্ক্রিনে গানের লিস্ট স্ক্রল করছে।
সাদ সোফা থেকে লাফ দিয়ে বলল,
-"বাল! ১০ মিনিট ধরে স্ক্রল করতেছিস! গান বাজাবি নাকি আহাম্মকের মতো দাড়িয়েই থাকবি?"
ইয়াশ চোখ গরম করে বলল,
-"সুন্দর গান পাচ্ছি না তো, শালার পুত। মুডের মতো গান লাগবে।"
সহ্য হলো না সাদের। রিমোট কেড়ে নিয়ে "জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন" প্লে করে দিল।
বাজনার প্রথম বিট পড়তেই ইয়াশ ঝাড়ুটা মাইক বানিয়ে ফেলল। সাদ টেবিলের উপর এক পা তুলে দিল। দুইজনই ঘামতে ঘামতে নাচছে। ঝাড়ু দিতে দিতে ফ্লোরও মুছে যাচ্ছে, নাচও হচ্ছে। কাজ আর মজা একসাথে। ভন্ডপার্টি মানেই এরকম।সিরিয়াস কাজ দু -মিনিট আর পাগলামি দশ মিনিট।
কিছুক্ষণ পর জুয়িন দরজা খুলে ঢুকল। হাতে নাপা, সেকলো আর একটা জ্বরের সিরাপ।
--
তাসিফা বিছানায় নিস্তেজ হয়ে শুয়ে আছে। গায়ের কম্বলটা এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। চোখ বন্ধ, কপালে জ্বরের তাপ।
জুয়িন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার ফ্যাকাশে মুখ, লাল হয়ে থাকা চোখ,দেখে বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আসছে ওর।
হঠাৎ তাসনিম হাতে গরম ভাত-ডাল-মাছের প্লেট নিয়ে রুমে ঢুকল। পেছনে পেছনে সাদ আর ইয়াশও এলো। ঘামে ভেজা শরীর, তবু মুখে চিন্তা।
তাসনিম এসে তাসিফার পাশে বসল। প্লেটটা পাশের টেবিলে রাখল। তারপর তাসিফার কপালে হাত রেখে ধীরে ধীরে ডাকতে লাগল,
-"তাসু! উঠ না দোস্ত? একটু খেয়ে নে।"
তাসিফা বিরক্ত স্বরে গুঙিয়ে বলল,
-"উম্ম... না।"
তাসনিম ছাড়ল না। বারবার জোরাজুরি করতে লাগল। অনেক ডাকাডাকির পর তাসিফা পিটপিট করে চোখ মেলল। চারপাশটা ওর কাছে কেমন অন্ধকার হয়ে আছে। ঘোলাটে, কিছুই স্পষ্ট না।
তাসনিম ধীরে সুস্থে তাসিফাকে কোলের ভর দিয়ে বসাল। পিঠে একটা বালিশ ঠেকিয়ে দিল। তারপর ছোট ছোট লোকমা করে ভাত মেখে তাসিফার মুখে তুলে দিতে লাগল। তাসিফা দুই-এক লোকমা খেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল। জ্বরের মুখে খাবার নামছে না। বেশি খেতে পারল না।
জুয়িন চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছে। হাতের ওষুধের প্যাকেটটা মুঠো করে ধরে আছে।
---
তাসিফা ওষুধ খেয়ে আবার শুয়ে পড়ল। নাপা খাওয়ার পর শরীরটা একটু ঠান্ডা লাগছে, কিন্তু জ্বরের ব্যাথায় হাত-পা টনটন করছে। চোখ বুজে আসছে বারবার।
ভন্ডপার্টিরা দেরি করল না। তাসনিম দ্রুত আয়রা বেগমকে ভিডিও কল দিল। রিং হতেই ওপাশ থেকে আয়রা বেগমের উদ্বিগ্ন মুখ ভেসে উঠল।
তাসনিম আয়রা বেগমকে ভিডিও কলে তাসিফার মুখ দেখালেন। মেয়ের জ্বরে পোড়া মুখ দেখেই আয়রা বেগমের বুকটা ধক করে উঠল। মায়ের মন কি আর মানে? চোখের সামনে মেয়েটা কাহিল হয়ে শুয়ে আছে, কপালে জলপট্টি। আয়রা বেগমের গলা কেঁপে গেল। হাত-পা কাঁপতে লাগল দুশ্চিন্তায়। বারবার বলতে লাগলেন,
-"আমার মেয়েটার কী হলো রে! জ্বর এত বেশি কেন? খেয়েছে কিছু? ওষুধ দিয়েছিস তোরা?"
মায়ের চোখে পানি চলে এলো। আলমগীর আলম কুমিল্লায় বোনের বাসায় বসে শান্তি পাচ্ছিলেন না একদম। মেয়েকে ছাড়া এক রাতও থাকতে পারেন না, আর মেয়ে জ্বরে কাতরাচ্ছে,এটা শুনে স্থির থাকা যায়?
আয়রা বেগম আর আলমগীর আলম এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। ব্যাগ-ট্যাগ যা আছে গুছিয়ে দ্রুত কুমিল্লা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই সিএনজি নিয়ে স্টেশনের দিকে ছুটলেন। আলমগীর আলমের মুখও শক্ত হয়ে আছে। মেয়ের অসুস্থতার কথা শুনে বাবার বুকেও ঝড় বইছে।