--
ভন্ডপার্টিরা তাসিফার বাসায় এখনো রয়েছে। সাথে জুয়িনও। জুয়িন জানালার পাশের সোফাটায় বসে এক ধ্যানে তাসিফার দিকে তাকিয়ে আছে। তাসিফার কপালে ভেজা টাওয়েল, গাল দুটো জ্বরে লাল। ঘুমের মধ্যে ওর কপালটা একটু কুঁচকে আছে।
অন্যদিকে ভন্ডপার্টি জুয়িনের এই আবভাব দেখে চোখ কপালে তুলে ফেলল।
যে ছেলেটা ভার্সিটিতে কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায় না, যার মুখে সবসময় বরফের মতো গাম্ভীর্য, সেই জুয়িনই কিনা এখন তাসিফার দিকে চিন্তিত হয়ে তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা যেন জুয়িনের পার্সনালিটির সাথে একদমই মানাচ্ছে না।
ইয়াশ গলা খাঁকারি দিয়ে জুয়িনকে খোঁচালো,
-"ভাইয়া আপনি জানলেন কীভাবে তাসিফার শরীর যে ভালো না?"
জুয়িন হচকচিয়ে গেলো,তবে নিজেকে দ্রুত সামলে দুপুরের সব ঘটনা গম্ভীর গলায় বলে দিলো।
সবাই মাথা দুলিয়ে একসাথে "অহ" বলল।
তাসিফা ঘুমাচ্ছে। জ্বর কিছুটা কমেছে তবে পুরোটা সারেনি। সবাই তাসিফার রুমে গোল হয়ে বসে আছে। রুম জুড়ে একটা চাপা নীরবতা।
হঠাৎ সাদ হাই তুলে বলল,
-"ভাই বোরিং লাগতেছে। আয় গান করি।"
ইয়াশ সাথে সাথে লাফ দিয়ে উঠল,
-"দোস্ত আমি গান গাইবো!"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
-"আস্তে গান গাইবে। নাহয় তাসিফার অসুবিধা হতে পারে।"
ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"ওকে ভাইয়া চিন্তা করবেন না। আপনার তাসিফার একদম অসুবিধা হবে না।"
বলেই চোখ টিপলো। আর অন্যদিকে তাসনিম ও সাদও মুচকি হাসল।
ইয়াশ গলা ছেড়ে গাইতে লাগল,
"বাপ মায়েরা মেয়েদেরকে শাসন করে না,
রাত্রির দশটার আগে তারা বাড়ি ফেরে না।
নিত্যনতুন ফ্যাশন করে চুলে কনের রং,
কথায় কথায় ইংলিশ ঝাড়ে দেখি কত ঢং।
আরে বেতাল ভাবে চলে দিলে নাই রে কোন ভয়,
এদের জন্য ফেঁসে গেল, পাশের বাড়ির ধনঞ্জয়!"
---
সন্ধ্যার দিকে কলিংবেল বেঝে উঠল। আয়রা বেগম ও আলমগীর আলম বাসায় ফিরে এলেন। ক্লান্ত শরীরে ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলেই আয়রা বেগম দৌড়ে গেলেন মেয়ের কাছে।
দরজা ঠেলে দেখলেন তাসিফা ঠোঁট উলটে কম্বল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। জ্বর কমায় মুখটা একটু শান্ত লাগছে।
কিন্তু তাসিফার রুমে মেয়ের বন্ধুদের সাথে আরো একজন নতুন, লম্বা, সুদর্শন ছেলেকে বসে থাকতে দেখে তিনি থমকে গেলেন।
জুয়িন আয়রা বেগমকে দেখতেই সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখ-মুখে বিনয়। মাথা একটু ঝুঁকিয়ে নরম গলায় সালাম দিল,
-"আসসালামু আলাইকুম আন্টি।"
আয়রা বেগমের মুখে ক্লান্তির ছাপ সরে গিয়ে হাসি ফুটল। সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
-"ওয়ালাইকুমুস সালাম বাবা। তোমাকে তো চিনলাম না?"
জুয়িন হালকা হেসে বলল,
-"আন্টি আমি জুয়িন। ছাদের ফ্ল্যাট-টায় থাকি। আর তাসিফার ভার্সিটির সিনিয়র।'
আয়রা বেগম নরম গলায় বললেন,
-"ওহ আচ্ছা বাবা। খেয়েছো কিছু?"
জুয়িন মাথা নেড়ে "জি আন্টি" বলল।
একটু পর আলমগীর আলমও এলেন। মেয়ের কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, তারপর জুয়িনের সাথে হ্যান্ডশেক করে পরিচিত হলেন।
আয়রা বেগমের জুয়িনকে প্রথম দেখাতেই বেশ লেগে গেল। ছেলেটা শুধু দেখতে সুদর্শনই না, কথাবার্তা, ব্যবহারেও মার্জিত।
---
রাত ৯টায় সবাই ফিরে গেল নিজেদের বাসায়।
জুয়িন নিজের ফ্ল্যাটের দরজা লক করে সোফায় ধপ করে বসে পড়ল। বুকের ভেতর একটা অস্থিরতা। কাল ভার্সিটিতে তাসিফাকে দেখতে পারবে না ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-"তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও তাসিফা।"
---
আজ ভার্সিটিতে ভন্ডপার্টির একজনও এলো না। একা একা ক্লাস করতে একদম বোরিং লাগে।
তাই ভন্ডপার্টিরা ক্লাস বাদ দিয়ে সোজা তাসিফার বাসায় হাজির।
তাসিফার বাসার দরজার সামনে ৩ জন দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াশ কলিংবেল চাপতেই টুংটাং আওয়াজ হলো।
আয়রা বেগম ক্লান্ত মাখা মুখে দরজা খুলে দিলেন। চোখের নিচে কালি। সারারাত মেয়ের সেবা করেছে।
মেয়ের বন্ধুদের দেখে ক্লান্তি ভুলে হেসে বললেন,
-"আরে তোমরা! এসো এসো। ভিতরে এসে বসো।"
সবাই একসাথে সালাম দিলো। আয়রা বেগমও হাসিমুখে জবাব দিয়ে সাইডে সরে জায়গা করে দিলেন।
সবাই পা টিপে টিপে তাসিফার রুমে ঢুকল। রুমটা অগোছালো। টেবিলে ওষুধের পাতা, পাশে পানির গ্লাস।
সিলিংফ্যানটা একদম কমিয়ে রাখা, তাই পাতাগুলো ধীরে ধীরে ঘুরছে আর হালকা বাতাস দিচ্ছে।
জানালার পর্দা সরাতেই রোদের আলো এসে বিছানায় পড়ল।
বাইরের অবস্থা একদম উল্টা। গতকাল সারাদিন বৃষ্টি ছিল। রাস্তায় পানি জমে ছিল হাঁটু পর্যন্ত।
আর আজ আকাশ ঝকঝকে নীল। মেঘের চিহ্নও নেই। রোদটা জানালার ফাঁক দিয়ে এসে তাসিফার মুখের উপর পড়েছে।
তাসিফা কম্বল মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। সাদ আর ইয়াশ সোফায় গা এলিয়ে দিলো।
তাসনিম আস্তে করে তাসিফার পাশে বসে কপালে হাত রাখল।
তাসনিম ফিসফিস করে ডাকল,
-"তাসু! উঠ।"
তাসিফা নড়লই না। নাক টেনে ঘুমাচ্ছে।
তাসনিম আবার ডাকল। তাও কাজ হলো না।
এবার ইয়াশ অতিষ্ঠ হয়ে ফোন বের করল। ইউটিউবে ঢুকে ফুল সাউন্ডে ছেড়ে দিলো,
"abhi toh party shuru hui hai..."
সাদ আর তাসনিম একসাথে ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
তাসনিম বলল,
-"কিরে গান কেনো প্লে করলি?"
ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"দেখিস এখন তাসিফা উঠে যাবে।"
ইয়াশের কথা মিথ্যা হয়নি। ২ সেকেন্ডের মাথায় তাসিফা "ধড়ফড়" করে উঠে বসল।
ঘুম আর বিরক্তি মিশানো চোখে সবার দিকে তাকিয়ে চিৎকার দিলো,
-"ইয়াইশ্শার বাচ্চা! বাঙ্গির পুত! গান অফ কর!"
ইয়াশ দ্রুত গান অফ করে বলল,
-"সোজা আঙ্গুলে ঘি না উঠলে আঙ্গুল বাঁকা করতে হয়।"
তাসিফা রাগে বালিশের পাশের কুশন ছুড়ে মারল। ইয়াশ ক্যাচ ধরে ফেলল।
তাসনিম হেসে তাসিফার কপাল ছুঁয়ে দেখল।
-"জ্বর নেই। এখন শরীর কেমন লাগছে?"
তাসিফা মাথা দুলিয়ে বলল,
-"ভালো।"
সাদ লাফ দিয়ে উঠল,
-"তাসু জানিস কি হয়েছে?"
তাসিফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"কী হয়েছে?"
ইয়াশ সুযোগ বুঝে বলে ফেলল,
-"তোর রোমিও গতকাল তোর সেবা করেছিল।"
তাসিফা হতভম্ব হয়ে বলল,
-"কোন রোমিও?"
সাদ বলল,
-"আরে জুয়িন ভাই! বলদি একটা।"
তাসিফা যেন আকাশ থেকে পড়ল,
-"কীহ! কীভাবে সম্ভব?"
তাসনিম চোখ ছোট ছোট করে,
-"তোর কিছু মনে নেই?"
তাসিফা মাথা চুলকে বলল,
-"আমার শুধু মনে আছে সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর কিছু মনে নেই।"
সবাই একসাথে "অহ" বলল।
ইয়াশ ফিসফিস করে বলল,
-"জুয়িন ভাইয়া কালকে তোকে নিয়ে অনেক চিন্তিত ছিল।"
কথাটা শুনে তাসিফার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা হাসি। মনে মনে লাড্ডু ফুটছে, কিন্তু মুখে গম্ভীর ভাব।
--
তাসিফার শরীর এখন মোটামুটি ভালো আছে। তবে মুখটা এখনো ফ্যাকাসে আর হাঁটলে একটু দূর্বল লাগছে।
ভন্ডপার্টিরা তাসিফার রুমেই আড্ডার আসর জমিয়ে বসেছে। মেঝেতে সবাই গোল হয়ে বসে আছে।কিছুক্ষণ আগে আয়রা বেগম ট্রে ভরে "সমুচা, চা, সরমা, পানি" দিয়ে গেলেন।
আন্টি হেসে বললেন,
-"খেয়ে দেয়ে ভালো করে আড্ডা দাও,দুষ্টুমি করবে না।
বলেই চলে গেলেন।
খাওয়া শেষে এখন চলছে "UNO" খেলা। তাসগুলো সবার হাতে এলোমেলো।
এই গেইমের আগামাথা তাসনিম কিছুই বুঝে না তবুও সবার সাথে তাল মিলিয়ে খেলছে আর ভুল কার্ড দিয়ে ধরা খাচ্ছে।
আর এই গেইমের এক্সপার্ট হলো তাসিফা, ইয়াশ আর সাদ। তিনজনই কার্ড ফেলার সময় "UNO!" বলে চিৎকার দেয়।
মোট ৩ বার খেলা হলো।
প্রথম বার ইয়াশ জিতে লাফ দিয়ে বলল,
-"আমিই কিং!"
দ্বিতীয় বার তাসিফা জিতল। দুর্বল শরীর নিয়েও জেতার খুশিতে ওর চোখ চকচক করছিল।
তৃতীয় বার সাদ জিতল। আর বেচারি তাসনিম তিনবারই হারল। শেষে রেগে বলল,
-"এই গেইম আমি আর খেলবই না। সব ভন্ডামি।"
--
দুপুরে সবাই একসাথে লাঞ্চ করল। আন্টির হাতের পাতলা ডাল,আলু ভর্তা ও গরুর মাংস দিয়ে।
খাওয়া শেষে ভন্ডপার্টিরা যে যার বাসায় চলে গেলো। যাওয়ার আগে ইয়াশ বলে গেলো,
-"তাড়াতাড়ি সুস্থ হ। কাল ভার্সিটি মিস দিলে খবর আছে।"
সবাই চলে যেতেই বাসাটা কেমন ফাঁকা লাগল।
তাসিফা ফ্রেশ হয়ে একটা গোল জামা পরে ছাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
মনটা কেমন ছটফট করছে। কাল রাত থেকে একটা মানুষকে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছে।
ছাদের দরজা ঠেলে উপরে উঠতেই হালকা বাতাস এসে চুল উড়িয়ে দিলো। আকাশটা এখনো পরিষ্কার। রোদের তেজ কমে গেছে।
আর ছাদের এক কোণে রেলিঙের উপর জুয়িন বসে আছে।পরনে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্ট । হাতে গিটার।
জুয়িন গান গাইতে পারে। গিটারও দারুণ বাজাতে পারে।
কিন্তু আজকে সুর মিলছে না। বারবার তার কেঁপে যাচ্ছে।
তাসিফা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে গেলো। বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। ডাকবে? নাকি চলে যাবে?
ঠিক তখনই জুয়িন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে গিটারের তারে আঙুল রাখল।
ধীরে ধীরে সুর উঠল,তারপর গলা ছেড়ে গাইলো,
"তোমাকে ছেড়ে আমি কী নিয়ে থাকব?
ভালোবেসে যাব ওগো যত দিন বাঁচব
হেসোনা হেসোনা তুমি, জেনে রাখো তা
বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা"
গান শেষ হতেই আচমকা চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখল তাসিফা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। জুয়িনের হাত থেমে গেলো।গিটারটা কোলের উপর শক্ত করে ধরল।হঠাৎ ভ্রু কুচকে বলল,
-"শরীরের কি অবস্থা এখন?"
তাসিফা জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
-"ভালো।"