ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 13

লেখক: মিশু

--
ছাদের বাতাসটা হঠাৎ করেই থমকে গেলো।
আকস্মিকভাবে জুয়িন নিজের গিটারটা একপাশে নামিয়ে রাখল। তারপর ধীর পায়ে তাসিফার দিকে এগিয়ে এলো।

জুয়িন এক হাত বাড়িয়ে তাসিফার কপালে রাখল।
স্পর্শটা ঠান্ডা। কিন্তু তাসিফার শরীরে যেন কারেন্টের মতো শক লাগল।
তাসিফার শরীরে এখনো জ্বর আছে, তবে আগের থেকে অনেকটা কমেছে। তবু গাল দুটো এখনো হালকা লাল।

জুয়িনের আঙুলের ছোঁয়া পেয়ে তাসিফা কেঁপে উঠল। নিঃশ্বাস আটকে এলো।

জুয়িন হাত নামিয়ে নিলো। তারপর কপাল কুঁচকে ধমকের স্বরে বলল, 
-"এই সময়ে ছাদে কি কাজ? জ্বর তো পুরোপুরি সারেনি ডাফার।"

জুয়িনের ধমক খেয়ে তাসিফা চমকে উঠল।
এই লোকটা শুধু ওকেই কেন ধমকায়? একটু কি আদুরে কন্ঠে কথা বলতে পারে না?
এর বদলে নাহয় তাসিফা নিজের জান-টা পর্যন্ত ওর নামে লিখে দিতো।

তাসিফা মনে মনে জুয়িনকে ইচ্ছেমতো বকল। "রাগী কুমড়া! গম্ভীর ভূত!।
কিন্তু সামনাসামনি কিছু বলল না। শুধু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঠোঁট ফুলিয়ে।

অন্যদিকে জুয়িন তাসিফার সামনে রুড সাজার এক্টিং করলেও ভেতরে ভেতরে প্রশান্তি কাজ করছে।
এই মেয়েটাকে দেখতে বড্ড ইচ্ছে করছিল,কাল রাত থেকে।

জুয়িন আবার ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল, 
-"সমস্যা কি?"

তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল, 
-"কোথায় কিসের সমস্যা?"

জুয়িন ভ্রু নাচিয়ে বলল, 
-"বাসায় যা। এখানে এসেছিস কেন?"

-"এমনি।"

-"এমনি কেন?"

এবার তাসিফা কিছুটা চটে গিয়ে বলল, 
-"এমনি মানে এমনি এসেছি। আপনার সমস্যা?"

জুয়িন প্যান্টের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে বলল, 
-"এবার এখান থেকে ফুট হ।"

তাসিফা জুয়িনের কথা কানে নিলো না। উল্টো একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, 
-"আপনি আমার সেবা করেছিলেন জুয়িন ভাইয়া?"

জুয়িনের কুঁচানো ভ্রু জোড়া শীতল হয়ে এলো। 
-"কে বলল?"

-"আমার বন্ধুরা।"

-"আমার ঠ্যাকা লেগেছে যে একটা খ্যাত মেয়ের সেবা করব?"

কথাটা শুনে তাসিফার চোখ বড় হয়ে গেলো।
-"আপনি আমাকে খ্যাত বললেন? আপনি নিজেকে একবার আয়নায় দেখেছেন? হিরো আলমের জমজ ব্রাদার লাগছে।"

জুয়িন হতভম্ব হয়ে গেলো।
কি? তাকে হিরো আলমের জমজ ভাইয়ের মতো দেখতে লাগে? লাইক সিরিয়াসলি?
আমার এই জিম করা বডি, এই হাইট,এসব তাসিফার কাছে হিরো আলমের মতো দেখতে লাগে?

জুয়িন কিছু বলতে যাবে,
ঠিক তখনই তাসিফা "ভো" করে দৌড় দিলো। সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে গেলো।

জুয়িন কয়েক সেকেন্ড "থ" হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
অতঃপর আনমনে হেসে দিলো। তারপর বিড়বিড় করে গাইতে লাগল,
-স্বপ্নে আমার তোমার ছবি
চুপটি করে আসে,
সকাল থেকে রাতের শেষে
থাকো আমার পাশে..."

---

সন্ধ্যা ৭ টা বাজছে।
ড্রয়িং রুমে আলমগীর আলম সোফায় বসে টিভিতে খবর দেখছেন।
আর তাসিফা বাবার কাঁধে মাথা রেখে মোবাইলে "ভন্ডপার্টি" গ্রুপে চ্যাট করছে।

অন্যদিকে রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছে ফুলকপির পকোড়ার গন্ধ আর চায়ের মিষ্টি স্মেল।
আয়রা বেগম ব্যস্ত। সন্ধ্যায় পরিবারের সাথে বসে গরম গরম পকোড়া আর চা খাওয়া তার বহু বছরের অভ্যাস।
আজ বানাচ্ছেন ফুলকপির পকোড়া, আলুর চপ আর আদা দেওয়া লাল চা।

তাসিফা বোর হয়ে ইন্সটাগ্রামে ঢুকল। স্ক্রল করতে হঠাৎ স্ক্রিনে একটা আইডি ভেসে উঠল, juyin_shikder।

প্রোফাইল পিকচারটা দেখে তাসিফার হার্টবিট মিস হয়ে গেলো।

সাজেকের ছবি। পেছনে মেঘের পাহাড়।
জুয়িনের পরনে আকাশি রঙের টি-শার্ট আর সাদা গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। চুলগুলো কপালে এলোমেলো হয়ে পড়েছে। হাতে চকচকে রোলেক্সের ওয়াচ। পায়ে সাদা স্নিকারস। রোদের আলো ওর গায়ে পড়ে যেন হিরোর মতো লাগছে।

তাসিফা ঢোক গিলল।সে প্রোফাইলে ঢুকতে গেলো। কিন্তু লেখা উঠল,"This Account is Private"

তাসিফা ঠোঁট উলটালো। শুধু ডিপিটাই দেখতে পারল।

পাশ থেকে আলমগীর আলম বললেন, 
-"কি রে মা, কার ছবি দেখে এত লজ্জা পাচ্ছিস?"

তাসিফা তড়িঘড়ি করে ফোন লুকিয়ে ফেলল। 
-"কই বাবা! কিছুনা।"

কিন্তু কান দুটো লাল হয়ে গেছে।
মোবাইল আর দেখল না। সোফার উপর রেখে দিলো মোবাইলটি।

এরই মাঝে আয়রা বেগম সন্ধ্যার খাবার নিয়ে চলে এলেন।
গরম পকোড়ার প্লেট, চায়ের কাপ। তিনজন গোল হয়ে বসে গল্প করতে সন্ধ্যার হালকা খাবার খেলো।

খাওয়া শেষে তাসিফা নিজের রুমে চলে এলো পড়তে।
--
তাসিফা ঘন্টা দুয়েক পড়ে বই বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল। হাতে মোবাইল।
হঠাৎ স্ক্রিনে "ভন্ডপার্টি" গ্রুপ থেকে ভিডিও কল আসলো।
তাসিফা হেসে কলটা রিসিভ করল।

এক এক করে সবাই জয়েন হলো।
কিন্তু সাদকে দেখেই তিনজন একসাথে থমকে গেলো।

সাদের মুখ ক্লিন সেভ। একটা দাড়িও নেই।

তাসনিম চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠল, 
-"আরে জানোয়ার! তোর দাড়ি কই গেলো?"

তারপর নাক কুঁচকে বলল, 
-"ছিহ সাদ। তোকে দেখতে একদম ছোলা মুরগির মতো লাগছে।"

ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলল, 
-"আরে বেডা, হেতে তো মুরগিই।"

সাদ ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করল। 
-"থাম তোরা। আজকে সেলুনে গিয়ে ক্লিন শেভ করলাম। ভাবলাম কোরিয়ান নায়কদের মতো হ্যান্ডসাম লাগবে। আর তোরা কিনা আমাকে নিয়ে মজা করছিস?"

তাসনিম চোখ ছোট ছোট করে বলল, 
-"তোকে কি সাধে অপমান করছি? আয়নায় একবার নিজের থোবড়াটা দেখ। তারপর নিজেই 'ওয়াক ওয়াক' করবি, শালার পুত।"

কথা শুনে সাদের মুখটা চুপসে গেলো।
আর অন্যদিকে ইয়াশ হো হো করে হেসেই যাচ্ছে।

সাদ বিরক্ত হয়ে বলল, 
-"এখন কি করব আমি?"

তাসিফা হতভম্ব হয়ে বলল, 
-"এখন তো আর আমরা তোর দাড়ি বড় করে দিতে পারব না, তাই না? চুপচাপ অপেক্ষা কর যতদিন না দাড়ি আবার গজায়।"

সাদ মুখ গোমড়া করে বলল, 
-"ভাই, আমাকে কেন এমন লাগছে? জুয়িন ভাইকে তো ক্লিন শেভে অনেক সুন্দর লাগে।"

এই কথা শুনে তাসিফা চোখ উলটালো। মুখ বেঁকিয়ে বলল, 
-"কোথায় আগরতলা, আর কোথায় চকির তলা। কিসের সাথে কি মিলাস? নিজের চেহারার কাটিং আগে আয়নায় দেখ বলদ, তারপর জুয়িন ভাইয়ার সাথে কম্পেয়ার করিস।"

অপমানে সাদের মুখ থমথমে হয়ে গেলো।
আর অন্যদিকে ইয়াশ আর তাসনিম পেট চেপে হাসছে।

এভাবেই আধা ঘন্টা ধরে হাসি-ঠাট্টা, খোঁচাখুঁচি করে কলটা কাটল ওরা।

---

১ মাস  কেটে গেলো।সময়টা দ্রুত চলে গেছে। আর এই এক মাসে জুয়িন আর তাসিফার ঝগড়াও কমেনি। সুযোগ পেলেই দুইজন দুইজনকে খোঁচায়। জুয়িন ধমকায়, তাসিফা পাল্টা জবাব দেয়।

আজ ভার্সিটিতে নতুন লেকচারার জয়েন করেছে। এই খবর শুনে ভন্ডপার্টির তেমন কোনো ভাবাবেগ হলো না। ওরা চারজন ক্লাসে বসে আড্ডাই দিচ্ছে।

এরই মাঝে ক্লাসে নতুন লেকচারার প্রবেশ করলেন।

সাথে সাথে ক্লাসের সব মেয়ে থমকে গেলো। তাসিফা আর তাসনিমও হালকা  ক্রাশ খেলো।

লোকটি খুব সুন্দর ভাবে এন্ট্রি নিলেন।
পরনে ফরমাল গেটআপ। কালো ব্লেজার, ভিতরে সাদা ইন করা শার্ট। গায়ের রং ধবধবে ফর্সা। চুলগুলো সেট করা। হাতে একটা ফাইল।

পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা।  ইয়াশ ফিসফিস করে বলল, 
-"ভাই, এইটা লেকচার নাকি মডেল?"

তাসিফা আড়চোখে তাকালো। তারপর বিড়বিড় করে বলল, 
-"হ্যান্ডসাম তবে, জুয়িন ভাইয়ার মতো না।"

লোকটি গলা খাঁকারি দিয়ে গম্ভীর মুখে বললেন, 
-"হ্যালো এভরিওয়ান। আমি তিরান সাফওয়ান। আপনাদের নিউ লেকচার। নাইস টু মিট ইউ অল।"

কথাটা বলেই তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ঘুরলেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন