---
বাইরে তখন বিকেলের আলো। সবাই ক্লান্ত শরীর নিয়ে যে যার বাসায় ফিরেছে।
তাসিফাও তার ব্যতিক্রম না। ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ক্লান্ত পায়ে নিজের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়ালো। কলিং বেল চাপার একটু পরেই দরজাটা খুলে গেল।
দরজায় আয়রা বেগম। মেয়ের ক্লান্ত মুখটা দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। কোনো কথা না বলে শাড়ির আঁচল দিয়ে যত্ন করে তাসিফার ঘামে ভেজা মুখটা মুছে দিলেন।
মায়ের এই ছোট্ট আদরে তাসিফার মনটা ভরে গেল। হেসে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-"মা, লাভ ইউ।"
আয়রা বেগমও মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
-"জানি তো মা। যা, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে।"
তাসিফা মাকে ছেড়ে নিজের রুমে চলে গেল। কাবার্ড থেকে একটা আরামদায়ক জামা বের করে ওয়াশরুমে ঢুকল। সারাদিনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলার জন্য লম্বা একটা শাওয়ার নিলো।
---
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চারপাশে আজানের সুর ভাসছে।
তাসিফা পড়ার টেবিলে বসেছে। কিন্তু পেটে খিদে আর চোখে ঘুম।
রান্নাঘর থেকে আয়রা বেগমের ডাক এলো,
-"তাসিফা, নাস্তা খেয়ে যা।"
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-"মা, খাবো না। পড়তে হবে।"
তখন আয়রা বেগম রুমে এসে বইটা বন্ধ করে দিলেন আর বললেন,
-"পাগলি। খালি পেটে পড়া হয় না। আগে নাস্তা, তারপর পড়া।"
মায়ের কথার ওপর আর কথা চলে না। তাসিফা অনিচ্ছা সত্ত্বেও উঠে নাস্তার টেবিলে গিয়ে বসলো।
---
নাশতা শেষ করে তাসিফা আবার নিজের রুমে ফিরে এলো।
বই-খাতা গুছিয়ে টেবিলের ওপর রাখল, তারপর চেয়ারটায় বসে মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু পড়ার বইয়ের অক্ষরগুলোর চেয়ে বারবার তার চোখ চলে যাচ্ছিল বিছানার ওপর পড়ে থাকা মোবাইলটার দিকে।
মোবাইলটা যেন নীরবে তাকে ডাকছিল।
তাসিফা কয়েকবার নিজেকে বোঝাল,
-“না! আজকে মোবাইল ধরব না। অনেক পড়া জমে আছে।”
কিন্তু মন কি আর সবসময় কথা শোনে?
কিছুক্ষণ পর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে তাসিফা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।
স্ক্রিন অন করতেই অভ্যাসবশত ইন্সটাগ্রাম অ্যাপটায় ঢুকে পড়ল।তারপর শুরু হলো একের পর এক রিলস দেখা।
সময় যে কখন পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেল, তাসিফার খেয়ালই ছিল না।
হঠাৎ নিজের ওপরই বিরক্ত হয়ে গেল সে। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটা বন্ধ করে বিছানার ওপর ছুড়ে দিয়ে নিজেকেই বোঝাতে লাগল,
-"ব্যস! শেষ। পৃথিবীতে মোবাইল নামের কোনো যন্ত্রই নেই। মোবাইল বলে কিছু আমার জীবনে ছিল না, এখনো নেই!”
কথাগুলো বলেই কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে বসে রইল তাসিফা। যেন নিজেকেই নিজের কথা বিশ্বাস করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে।
তারপর একবার গভীর শ্বাস নিয়ে আবার বইটা হাতে তুলে নিল।
এবার আর কোনো দিকে তাকাল না সে। মোবাইলটা বিছানাতেই পড়ে রইল, আর তাসিফা ডুবে গেল পড়াশোনায়।
মাঝে মাঝে চোখ ক্লান্ত হয়ে এলে কয়েক মুহূর্তের জন্য বই বন্ধ করে চোখ দুটো বন্ধ করেছে, আবার নিজেকে সামলে নিয়ে পড়ায় মন দিয়েছে।
এভাবেই টানা অনেকটা সময় মনোযোগ দিয়ে পড়ল তাসিফা।
---
এর পরের দিন যথারীতি ভার্সিটিতে চলে এলো ভণ্ডপার্টির সবাই। ক্লাসে ঢুকেই তারা আর কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা গিয়ে লাস্ট সিটটা দখল করে বসে পড়ল। সামনে বসলে স্যারের নজরে পড়ার সম্ভাবনা বেশি তাই লাস্ট সিটই যেন তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"সবাই পড়ে এসেছিস তো?”
সাদ সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল,
-"হ্যাঁ, পড়েছি। শালা, আজকে যদি এক্সামে কিছু না পারিস, তাহলে কিন্তু আমি তোকে পিটাবো!”
ইয়াশ মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-"আরে, এত চিন্তা করিস কেন? আজকে হল গার্ডটা কড়া না হলে আমরা সবাই পাশ!”
তাসনিম আর তাসিফা একসঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
-"হুম।”
ইয়াশ তখন বেশ আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ল। মনে হচ্ছে, পরীক্ষা নিয়ে তার কোনো চিন্তাই নেই। শুধু গার্ড একটু নরম হলেই তার কাজ হয়ে যাবে!
ঠিক তখনই হঠাৎ ক্লাসরুমের দরজার দিকে সবার চোখ আটকে গেল।
ক্লাসে প্রবেশ করলেন ভার্সিটির সবচেয়ে কড়া স্যার।
স্যারকে দেখেই মুহূর্তের মধ্যে পুরো ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেল। যে যার জায়গায় সোজা হয়ে বসে পড়ল। কেউ আর কথা বলছে না, কেউ নড়াচড়াও করছে না।
ভণ্ডপার্টির পাঁচজনের মুখও একসঙ্গে ভোতা হয়ে গেল।
ইয়াশের মুখ থেকে আত্মবিশ্বাসের হাসিটাও মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেলো।
সে ধীরে ধীরে সাদের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-“ভাই,আজকে মনে হয় আমরা শেষ!”
সাদ দাঁত চেপে বলল,
-“চুপ কর শালা! তুই একটা কুফা।"
সাদের কথা শুনে ইয়াশ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
-“আমি কুফা? কুফা তো তুই! আমি তো শুধু বললাম গার্ড কড়া না হলে পাশ করব!”
সাদ ফিসফিস করে বলল,
-“চুপ! এখন কথা বললে স্যার আমাদের দুজনকেই বের করে দেবে!”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করার ভঙ্গি করল। তারপর খুব সাবধানে সামনে তাকাল।
স্যার ইতোমধ্যেই পুরো ক্লাসে চোখ বুলিয়ে দেখছেন। তার চোখে এমন একটা কড়া ভাব, যেন কারও সামান্য নড়াচড়াও তার চোখ এড়িয়ে যাবে না।
হঠাৎ স্যার গম্ভীর গলায় বললেন,
-“সবাই চুপচাপ বসো। আজকের পরীক্ষায় কোনো ধরনের কথা বলা বা একজনের খাতা আরেকজন দেখার চেষ্টা করলে সঙ্গে সঙ্গে খাতা নিয়ে নেওয়া হবে।”
কথাটা শুনে ইয়াশের মুখটা আবার শুকিয়ে গেল।সে ধীরে ধীরে সাদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বলল,
-"বন্ধু আজকে শেষ আমরা!"
সাদও চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।তারপর ফিসফিস করে বলল,
-“হো রে।”
ইয়াশ আর কোনো জবাব দিল না। চুপচাপ নিজের প্রশ্নপত্রের অপেক্ষায় বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর স্যার সবার হাতে প্রশ্নপত্র দিয়ে বললেন,
-“সময় শুরু।"
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই ভণ্ডপার্টির চোখ কপালে উঠল।
ইয়াশ প্রথম কয়েকটা প্রশ্ন পড়েই মনে মনে বলল,
-"এই প্রশ্ন তো আমি জীবনে দেখিই নাই!”
পাশ থেকে সাদও একই রকম হতাশ মুখে প্রশ্নপত্রের দিকে তাকিয়ে রইল।
---
পরীক্ষা শুরু হয়েছে। হলরুমের ফ্যান ঘুরছে।
প্রশ্ন হাতে পেয়েই সাদ, তাসিফা আর ইয়াশের মুখ কালো। কমন পড়ে নাই একটাও।
শুধু তাসনিমের ঠোঁটে হাসি। কারণ আজকে সব কমন ওর।
তাসনিম আর তাসিফা পাশাপাশি বসেছে। তাই তাসিফা চুপিচুপি, খুব সাবধানে তাসনিমের খাতা দেখে লিখছে।
কিন্তু সাদ আর ইয়াশ সামনে। ঘাড় ঘুরানোর উপায় নাই। ওরা দুইজন সোজা হয়ে বসে আছে, অসহায়ের মতো।
ইয়াশ আড়চোখে একবার পেছনে তাকাতে গেল। সাথে সাথেই স্যার ধমকে উঠলেন,
-"এই! সোজা হয়ে বসো!"
ইয়াশ থতমত খেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি নিজের খাতায় আঁকিবুঁকি করার ভান ধরল।
সাদ ওর অবস্থা দেখে মুখ চেপে হাসি আটকাচ্ছে।
ইয়াশ ফিসফিস করে রাগে ফেটে পড়ল,
-“হাবাগোবার মতো বসে আছিস কেন? তাসনিমের খাতা দেখে লেখ, বা*ল!”
সাদ ফিসফিস করে জবাব দিল,
-“তুই দেখ? আমার এমনিতেই জীবনটা বাঁশের বাগান হয়ে আছে, নতুন করে বাঁশ খাওয়ার মুড নাই!”
ইয়াশ বিরক্ত হয়ে "উফ!" বলে আবার পেছনে ফিরল।
স্যার সঙ্গে সঙ্গেই কড়া গলায় বললেন,
-“এই ছেলে! এবার কিন্তু সত্যিই বলছি, আর একবার পেছনে ফিরলে খাতা নিয়ে নেব!”
ইয়াশ দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
-“এই শালা এখানে গার্ড না দিয়ে বর্ডারে ডিউটি করলে দেশটাই বাঁচিয়ে দিত! একটা মশাও পার হতে দিত না। আর আমি ব্যাটা পরীক্ষার হলে একটু ঘাড় ঘুরিয়েছি, এমন পাহারা দিচ্ছে, মনে হচ্ছে আমি প্রশ্নপত্র চুরি করে সীমান্ত পার হয়ে যাচ্ছি!”
সাদও হাল ছেড়ে দিয়ে বলল,
-"বা*ল লিখমু স্যারের।"
তাসনিম আর তাসিফা চাইলেও সাদ আর ইয়াশকে দেখাতে পারছে না। স্যারের নজর আজকে ওইদিকেই বেশি।
শেষে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে ইয়াশ আর সাদ উঠে দাঁড়ালো।হনহন করে গিয়ে স্যারের টেবিলে সাদা খাতা জমা দিলো।
স্যার ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল,
-"হয়ে গিয়েছে?"
ইয়াশ ও সাদ কিছু না বলে শুধু মাথা নাড়ল।
ওরা বের হয়ে যেতেই তাসনিম আর তাসিফা আরো কিছু লিখে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে এলো।
ক্লাসের বাইরে ইয়াশ আর সাদ বেশ কিছুক্ষণ ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই দুজনের মুখে এমন একটা ভাব, যেন জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা মাত্র শেষ করে এসেছে। বিশেষ করে ইয়াশের চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, সে এখনই কাউকে ধরে জেরা শুরু করবে।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে তাসিফা আর তাসনিমকে আসতে দেখে ইয়াশের চোখ দুটো চকচক করে উঠল। এতক্ষণ যে রাগটা চেপে রেখেছিল, দুজনকে দেখামাত্র সেটার যেন বিস্ফোরণ ঘটল।
সে কোমরে হাত দিয়ে তাসিফা আর তাসনিমের দিকে তাকিয়ে তেতে উঠে বলল,
-“লেইখা উড়াইয়া ফেলছস তোরা!”
ইয়াশের কথা শুনে তাসিফা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। তারপর এমনভাবে মুখ ফুলিয়ে দাঁড়াল, যেন পরীক্ষার হলে সে কিছুই করেনি, বরং ইয়াশই তার ওপর অন্যায় অভিযোগ চাপাচ্ছে।
তাসনিম পাশে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিল।
তাসিফা এবার একটুও না ঘাবড়ে ইয়াশের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
-“হ, তোর বা*ল লেইখাই তো উড়াইয়া ফেলছি!”
কথাটা শুনে সাদ সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল। হাসি আটকাতে গিয়ে তার কাঁধ পর্যন্ত কাঁপতে শুরু করেছে। আর ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড তাসিফার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল।
----
বিকেলের রোদটা নরম হয়ে আসছে।
ভন্ডপার্টির চারজন ক্যাম্পাসের ঘাসের উপর বসে আছে।
হঠাৎ ইয়াশ গলা ছেড়ে গাইতে শুরু করল,
"সুজন বন্ধুরে চাইলাম, মনে বড় ব্যাথা পাইলাম।
সুজন বন্ধুরে চাইলাম, মনে বড় ব্যাথা পাইলাম।
আমি শুধু তার গান গাইলাম, সে আমার গান গাইলো না।"
গান শেষ হওয়ার আগেই সাদ বিরক্ত হয়ে বলল,
-"বা*লের গান গাস শালার পুত!"
ইয়াশ চোখ রাঙিয়ে বলল,
-"তুই তো সেটাও পারিস না।"
তাসিফা তাসনিমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
কপালে এক হাত, আরেক হাত পেটে। মাথা আর পেট দুইটাই ব্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে।
তাসনিম ফিসফিস করে, তাসিফার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল,
-"আজকে তোর পিরিয়ডের ডেইট নাকি? হঠাৎ পেট ব্যথা করছে যে?"
তাসিফা চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,
-"না, আজকে না। আরও তিন'দিন পর।"
আর কিছু বলল না।
ওদিকে ইয়াশ আর সাদ খিটমিট করেই যাচ্ছে। তাসনিম ওদের ঝগড়া দেখে মুখ টিপে হাসছে।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশ হঠাৎ উঠে দাঁড়ালো আর বলল,
-"উঠ। আর ভাল্লাগে না এখানে। বাসায় যাবো।"
সবাই উঠে দাঁড়ালো। ভার্সিটির গেইটের দিকে পা বাড়ালো।
--
গেইটের পাশেই আজকে জুয়িন। রাস্তার ওপারে না, আজ ভার্সিটির পাশেই বাইক নিয়ে বসে আছে। সাথে সিয়াম আর রিদ। তিনজন মিলে আড্ডা জমিয়েছে।
ভন্ডপার্টিরা জুয়িন'দের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
ইয়াশ হাসি দিয়ে বলল,
-"কেমন আছেন জুয়িন ভাইরা?"
জুয়িন প্রথমে সবার দিকে তাকালো। তারপর চোখ আটকে গেল তাসিফার উপর। মুখটা ফ্যাকাসে ও ঠোঁট শুকনা হয়ে আছে।
জুয়িন জবাবে বলল,
-"ভালো। তোমরা?"
সবাই একসাথে বলল "ভালো"।
সিয়াম আর রিদ এগিয়ে এসে ইয়াশ আর সাদের সাথে হ্যান্ডশেক করল।
হঠাৎ জুয়িনের চোখ পড়ল তাসিফার সাদা জামার উপর। হালকা লাল দাগ।
এক সেকেন্ডও দেরি করল না। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের গায়ের গ্রে কালারের জ্যাকেটটা খুলে ফেলল।
সোজা তাসিফার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে শক্ত করে জ্যাকেট'টা বেঁধে দিল।
চারপাশের সবাই হতভম্ব।
তাসিফা পেট চেপে দাঁড়িয়ে আছে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। মনে হচ্ছে এখনই পড়ে যাবে।
তাসনিম ব্যাপারটা বুঝে গেছে।
জুয়িন আলতো করে তাসিফার হাত ধরল আর দৃঢ় গলায় বলল,
-"আমার বাইকে উঠ।"
তাসিফা লজ্জা পেয়ে কাঁপা গলায় বলল,
-"আমি একা যেতে পারব।"
তাসনিম ধমক দিয়ে বলল,
-"তাসিফা যা। একা যেতে পারবি না তো।"
ইয়াশ আর সাদ দুইজন দুইজনের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিছুই বুঝতেছে না।
জুয়িন আর কথা বাড়াল না। দ্রুত বাইকে উঠে বসল। তারপর চোখের ইশারায় তাসিফাকে পেছনে বসতে বলল।
তাসিফা একবার ভন্ডপার্টির দিকে তাকাল। ওদের চোখেমুখে তখনও বিস্ময়ের ছাপ। কিছু না বলে আস্তে করে জুয়িনের বাইকের পেছনে গিয়ে বসে পড়ল।
ব্যস! দৃশ্যটা চোখে পড়তেই আশপাশের স্টুডেন্টরা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। ভার্সিটির ক্রাশ বয় জুয়িন শিকদার কিনা একটা মেয়েকে নিজের বাইকে উঠাচ্ছে!
যে জুয়িনকে কোনো মেয়ের সঙ্গে দুটো কথা বলতেও দেখা যায় না, সেই জুয়িন আজ কিনা নিজেই একটা মেয়েকে বাইকে উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছে! চারপাশে মুহূর্তেই শুরু হয়ে গেল ফিসফাস। কৌতূহলী চোখগুলো আটকে রইল জুয়িন আর তাসিফার দিকে।
কিন্তু জুয়িন সেদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করল না। কারও দিকে না তাকিয়ে বাইকটা স্টার্ট দিল। তারপর এক শো করে টান দিতেই বাইকটা ছুটে গেল সামনের দিকে।
হু হু করে বাতাস বইতে লাগল। মুহূর্তের মধ্যেই জুয়িন আর তাসিফা সবার চোখের আড়ালে চলে গেল।
আর পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা স্টুডেন্টদের চোখেমুখে তখনও স্পষ্ট বিস্ময়।
---
বাইকটা কিছুটা দূরে চলে যেতেই ব্যথায় অস্থির তাসিফা আর কিছু ভাবল না। ভারসাম্য ধরে রাখতে সোজা পেছন থেকে জুয়িনের টি-শার্টটা খামচে ধরল।
জুয়িন বাইকের আয়নায় একবার তাসিফার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হালকা মুচকি হাসি। তবে কিছু বলল না। চুপচাপ বাইক চালিয়ে যেতে লাগল।
-----
কিছু সময়ের মধ্যেই জুয়িন তাসিফাকে নিয়ে তার বাসার নিচে এসে বাইক থামাল।
তাসিফার তখন ব্যথায় একেবারে কাহিল অবস্থা। তলপেটে তীব্র ব্যথা উঠছিল বারবার, ব্যথার চোটে মুখটা কুঁচকে যাচ্ছিল। শরীরটা ঘামে ভিজে গেছে, ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে। স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটাও তার জন্য কষ্টকর লাগছিল। কোনোভাবে নিজেকে সামলে বাইক থেকে নামল সে।
বাইক থেকে নেমে তাসিফা একবারও জুয়িনের চোখের দিকে তাকাতে পারল না। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিজের ওড়নার একপ্রান্ত আঙুলে পেঁচাতে লাগল।
জুয়িন বাইকের ওপর বসেই শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
-“সাবধানে চলাফেরা করতে পারিস না? আজকে তোর পিরিয়ডের ডেট, সেটা কি মাথায় ছিল না? আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে পারতি।”
তাসিফা আরও লজ্জায় পড়ে গেল। নিচু স্বরে বলল,
-“আসলে,আমার পিরিয়ডের ডেট আরও তিন দিন পর ছিল। আমি জানতাম না আজকেই হয়ে যাবে।”
জুয়িন ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর কিছুটা নরম গলায় বলল,
-“আচ্ছা। এখন ভেতরে যেতে পারবি, নাকি আমি দিয়ে আসব?”
তাসিফা দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
-“আমি যেতে পারব। আসি।”
বলেই ধীর পায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল তাসিফা। ব্যথার কারণে প্রতিটি পদক্ষেপেই তার গতি ধীর হয়ে আসছিল।
জুয়িন কিছু বলল না। কিছুক্ষণ তাসিফার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বাইকটা গ্যারেজে পার্ক করল। তারপর নিজের ফ্ল্যাটের দিকে চলে গেল।
#চলবে
[কেমন আছো সবাই? আশা করি সবাই ভালো আছো।
গতকাল গল্প দিতে পারিনি, তাই আজ তোমাদের কথা অনুযায়ী একটু বড় পর্ব নিয়ে হাজির হয়েছি। এবার কিন্তু তোমরাও আমাকে বেশি বেশি লাইক, কমেন্ট আর শেয়ার করে উৎসাহ দেবে, ঠিক আছে?
আর পরবর্তী পর্বগুলো সবার আগে পেতে চাইলে অবশ্যই ফলো দিয়ে পাশে থেকো। তোমাদের ভালোবাসা আর সাপোর্টই আমাকে আরও সুন্দর সুন্দর পর্ব লিখতে অনুপ্রেরণা দেয় 🖤]