---
কয়েকদিন কেটে গেল।
দেখতে দেখতে আজ সবার মিডটার্ম পরীক্ষাও শেষ হয়ে গেল। টানা কয়েকদিনের পড়াশোনা, পরীক্ষার টেনশন আর রাত জেগে পড়ার ধকল,সবকিছুর অবশেষে সমাপ্তি ঘটেছে।
পরীক্ষার হল থেকে বের হয়েই ভণ্ডপার্টির সবাই ভার্সিটির মাঠে এসে বসেছে। সবার মুখেই ক্লান্তির ছাপ, তবে সেই ক্লান্তির মাঝেও একটা স্বস্তি আছে। কারণ আপাতত পড়াশোনা আর পরীক্ষার কোনো চিন্তা নেই।
ইয়াশ ঘাসের ওপর বসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-"কোন মাদারবোর্ডের বাচ্চা রে কইছে, ভার্সিটি লাইফ চিল আর চিল? ওই শালারে সামনে পাইলে ধুচমু ধইরা!”
সাদের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
-"ভাই, আজকে থেকে আমরা ফ্রি,উফ! এই কয়েকদিন পড়ালেখা নিয়ে অনেক প্যারা খেয়েছি।
ইয়াশ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“সত্যি কইছস।"
তাসিফা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার মুচকি হেসে বলল,
-"হুম। এখন আরামে শুয়ে শুয়ে রিলস দেখতে পারব।"
তাসনিম তাসিফার কথায় হেসে ফেলল। তারপর হঠাৎ তার চোখ চলে গেল তাসিফার ব্যাগের দিকে।
ব্যাগটা অস্বাভাবিক রকম ফুলে আছে দেখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-"এই, তোর ব্যাগটা এমন ফুলে আছে কেন?”
তাসিফা একবার নিজের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিকভাবে বলল,
-"জুয়িন ভাইয়ার জ্যাকেট আছে ভেতরে।”
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।
-"এখনও দিস নি?”
তাসিফা একটু অপ্রস্তুত হয়ে ব্যাগের চেইনের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
-“উঁহু,আজকে দিয়ে দিব।”
জ্যাকেটটা পাওয়ার পর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। কিন্তু জুয়িনের সামনে গেলেই তাসিফার কেমন যেন অস্বস্তি লাগত। লজ্জায় ঠিকমতো চোখ তুলে তাকাতেই পারত না। তাই জ্যাকেটটা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও প্রতিবারই কোনো না কোনোভাবে সেটা পিছিয়ে গেছে।
কিন্তু আজ আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।আজ জ্যাকেটটা জুয়িনকে ফেরত দিতেই হবে।
ঠিক তখনই হঠাৎ ইয়াশের মোবাইলটা বেজে উঠল।
ইয়াশ বিরক্ত মুখে পকেট থেকে মোবাইল বের করলেও স্ক্রিনে নামটা দেখামাত্রই তার মুখের ভাব বদলে গেল।জুয়িন কল করেছে।
ইয়াশের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। সে তাড়াতাড়ি কল রিসিভ করে কানে ধরল।
-"হ্যালো, জুয়িন ভাই।"
অপরপ্রান্ত থেকে জুয়িন শান্ত গলায় বলল,
-"ভার্সিটির বাইরে আছি আমরা। তোমরা চলে এসো। আজকে মিড শেষ হয়েছে, তাই তোমাদের ট্রিট দিব।"
‘ট্রিট’ শব্দটা কানে যেতেই ইয়াশের চোখ-মুখ চকচক করে উঠল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,
-"আচ্ছা ভাই।আমরা এক্ষুনি আসতেছি।"
কল কেটে দিয়েই ইয়াশ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
তারপর ভণ্ডপার্টির দিকে তাকিয়ে আনন্দে প্রায় চিৎকার করে বলল,
-“ওই শোন! জুয়িন ভাই কল করছে, বলছে আজকে উনি ট্রিট দিবে!”
সাদ এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-“কী বলস! ট্রিট?"
ইয়াশ গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
-"হ, ট্রিট।"
এক এক করে সবাই উঠে দাঁড়াল। ইয়াশ আর সাদ সামনে সামনে হাঁটতে শুরু করল। তাসনিমও তাদের পেছনে হাঁটতে লাগল।
তাসিফা ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে কয়েক পা এগিয়েও হঠাৎ থেমে গেল।
ব্যাগের ভেতর থাকা জুয়িনের জ্যাকেটটার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
আজ এতদিন পর জুয়িনের সামনে দাঁড়াতে হবে।জ্যাকেটটা ফেরত দেওয়ার সময় কী বলবে?
তাসনিম পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
-"কী হলো? দাঁড়িয়ে আছিস কেন? চল।"
তাসিফা দ্রুত নিজের ভাবনা ঝেড়ে ফেলে বলল,
-“আসছি।”
ব্যাগটা শক্ত করে ধরে সে সবার পেছনে হাঁটতে শুরু করল।
----
ভণ্ডপার্টিরা ভার্সিটির বাইরে এসে দেখল, জুয়িন আর তার বন্ধুরা আবারও সেই একই জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছে।
তাদের দেখেই সবাই সেদিকে এগিয়ে গেল। একে একে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় হলো। কিছুক্ষণ পর আগের মতোই জমে উঠল আড্ডা।
জুয়িন তখন বাইকের ওপর বসে ছিল। হাতে তার গিটার। আঙুলগুলো অন্যমনস্কভাবে গিটারের তারে ঘুরছিল।
ভণ্ডপার্টির সবাইকে দেখে জুয়িন গিটারটা একপাশে রেখে বলল,
-“তোমরা আজকে কে কী খাবে? আজকে আমার পক্ষ থেকে ট্রিট। যার যা খেতে ইচ্ছা করে, অর্ডার করে এসো।”
‘ট্রিট’ শব্দটা শুনতেই যেন সবার মধ্যে নতুন প্রাণ ফিরে এলো।সবাই হৈহৈ করতে করতে ফুচকা,ঝাল মুড়ি,বেলপুরি অর্ডার দিতে চলে গেল।
আর অন্যদিকে সেখানে শুধু তাসিফাই দাঁড়িয়ে রইল।
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ব্যাগটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ব্যাগ খুলে ভেতর থেকে জুয়িনের জ্যাকেটটা বের করল।
জ্যাকেটটা হাতে নিতেই তার ভেতরটা কেমন যেন অস্বস্তিতে ভরে গেল।এতদিন পর আজ জুয়িনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে।
তাসিফা চোখ না তুলেই জ্যাকেটটা দুহাতে ধরে জুয়িনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
-"নিন,আপনার জ্যাকেট।”
জুয়িন জ্যাকেটটার দিকে তাকাল না পর্যন্ত।বরং ভ্রু কুঁচকে সরাসরি তাকাল তাসিফার মুখের দিকে।
তাসিফা কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করেও জুয়িনের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ তুলল।
দুজনের চোখাচোখি হতেই তাসিফা আবার দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল।
জুয়িন ঠান্ডা গলায় বলল,
-“আমাকে ইগনোর করার রিজন কী?”
তাসিফা থতমত খেয়ে গেল আর বলল,
-"আমি কোথায় আপনাকে ইগনোর করলাম?”
জুয়িন এবার গম্ভীর মুখে বলল,
-“নাটক করছিস আমার সাথে?”
তাসিফা চুপ করে রইল। তারপর আর কথা না বাড়িয়ে আবারও জ্যাকেটটা জুয়িনের দিকে বাড়িয়ে বলল,
-“নিন আপনার জ্যাকেট। ভালো করে ধুয়ে এনেছি। আর হ্যাঁ, সেদিনের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
জুয়িন এবার জ্যাকেটটার দিকে একবার তাকিয়ে ফোস করে শ্বাস ছাড়ল আর বলল,
-"লাগবে না এটা আর। আমার বাসায় অনেক পড়ে আছে।”
তাসিফা হতভম্ব হয়ে বলল,
-“এটা আবার কেমন কথা? এটা এখন কী করব আমি?”
জুয়িন একদম নির্বিকার মুখে বলল,
-"খেয়ে ফেল।”
তাসিফা কয়েক সেকেন্ড জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ভ্যাবাচেকা খেয়ে হেসে ফেলল আর বলল,
-“এটা আবার খাওয়া যায় নাকি?”
জুয়িন গম্ভীর ভাবটা একটুও না বদলে বলল,
-"যায় তো। পানিতে মিশিয়ে খেয়ে ফেলিস।”
তাসিফা এবার চোখ কুঁচকে বলল,
-"মজা করছেন আমার সাথে?”
জুয়িন ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"তুই কি আমার বেয়াইন? যে তোর সাথে মজা করব?”
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।এবার সে নিশ্চিত,জুয়িন ইচ্ছা করেই তাকে রাগানোর চেষ্টা করছে।আর দুর্ভাগ্যবশত, তাসিফাও ঠিক রেগে যাচ্ছে।
তাসিফার মুখের রাগ দেখে জুয়িনের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“পেতনির মতো সেজে এসেছিস কেন?”
তাসিফা হতবাক হয়ে গেল আর বলল,
-"আমি মোটেও সাজিনি।”
জুয়িন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-"হয়েছে, এখন আর ঢং করতে হবে না।”
তাসিফা চোখ বড় বড় করে বলল,
-“কী?! আমি ঢং করছি? আপনি কিন্তু এবার বেশি বেশি করছেন!”
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে একেবারে নিরীহ মুখ করে বলল,
-“যাহ বাবা! আমি আবার কী করলাম?”
তাসিফা এবার রাগে গজগজ করতে করতে বলল,
-"এবার কিন্তু আমি আপনাকে ছাড়ব না।”
জুয়িন যেন ইচ্ছে করেই তাকে আরও উসকে দিতে একটু সামনে ঝুঁকে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-“কী করবি তুই? দেখা তো!”
ব্যস!আর কোনো কথা নয়।তাসিফা এক মুহূর্তও দেরি না করে হাত বাড়িয়ে জুয়িনের পরিপাটি করে সাজানো চুলগুলো মুঠো করে ধরে জোরে টান দিল।
হঠাৎ এমন আক্রমণের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না জুয়িন।সে আচমকা মাথা পেছনে টেনে চোখ খিচে ফেলল।
-“আহ্! এই মেয়ে!”
তাসিফা রাগে দাঁত কটমট করে বলল,
-“বেশি কথা বললে আরও টানব!”
জুয়িন ব্যথায় কুঁকড়ে গেলেও তাসিফার কাণ্ড দেখে তার মুখের কোণে আবারও হাসি ফুটে উঠল।
তবে জুয়িনও কম কিসের?তাসিফা যখন রাগের মাথায় জুয়িনের চুলের মুঠো ধরে টানছিল, জুয়িনও সঙ্গে সঙ্গে তাসিফার বেনীটা ধরে ফেলল। বেনীতে টান পড়তেই তাসিফার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল আর বলল,
-"এই।”
মুহূর্তের মধ্যেই দুজন দুজনের চুল ধরে টানাটানি শুরু করে দিল।
জুয়িন নিজের চুল কাউকে ধরতে দেয় না। বন্ধুরা মজা করে চুল এলোমেলো করে দিতে চাইলেও সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে দেয়। অথচ তাসিফা দিব্যি তার চুলের মুঠো ধরে টানছে, আর জুয়িনও তাকে কিছু বলছে না,বরং নিজেই পাল্টা তার বেনী ধরে টানছে।
তাসিফা এবার আরও শক্ত করে জুয়িনের চুল চেপে ধরল। জুয়িনও তাসিফার বেনীটা জোরে টেনে ধরল।
তাসিফা ব্যথায় মুখ কুঁচকে বলল,
-“ছাড়েন বলছি।”
জুয়িনও ছাড়ার পাত্র নয়। সে বলল,
-“আগে তুই ধরেছিস! তাই তুই ছাড়।”
-“আপনিই তো আগে আমাকে রাগিয়েছেন।"
-"তাই বলে চুল ধরবি?”
-"আপনিও তো ধরেছেন।"
দুজনের চুল টানাটানির মাঝেই হঠাৎ ভণ্ডপার্টির সবাই খাবারের অর্ডার দিয়ে ফিরে এলো। তাদের সঙ্গে রিদ আর সিয়ামও ছিল।কিন্তু সামনে আসতেই সবাই থমকে দাঁড়াল।
সামনে এমন দৃশ্য দেখে সবার চোয়াল ঝুলে যাওয়ার মতো অবস্থা।
তাসিফা নাহয় রাগের মাথায় বাচ্চামি করে ফেলেছে, কিন্তু জুয়িনের সঙ্গে এসব একদমই মানাচ্ছে না। জুয়িন যথেষ্ট ম্যাচিওর একটা ছেলে। অথচ সেও কিনা পাবলিক প্লেসে দাঁড়িয়ে তাসিফার সঙ্গে চুল টানাটানি করছে।
দুজনকে এভাবে দেখে দূর থেকে কেউ দেখলে হয়তো ভাবত,এরা ভার্সিটির স্টুডেন্ট না, বাচ্চা দুজন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করছে।
সবাই মিলে শেষ পর্যন্ত কোনোভাবে দুজনকে আলাদা করল।
চুল ছেড়ে তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে নিজের বেনীটা ঠিক করতে লাগল। মুখটা রাগে টকটকে লাল। তারপর জুয়িনের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে আঙ্গুল তুলে বলল,
-“আপনাকে আমি পরে দেখে নেব।"
জুয়িনও নিজের এলোমেলো চুল ঠিক করতে করতে তাসিফার দিকে তাকাল।আর ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"আমিও দেখব, তুই কীভাবে আমাকে দেখবি।"
তাসিফা রাগে চোখ বড় বড় করে বলল,
-“দেখবেন! খুব ভালো করেই দেখাব।"
জুয়িন চোখ টিপ মেরে বলল,
-“আচ্ছা, দেখি কতটা ভালো করে দেখাস।”
তাসিফা আর কিছু বলল না। শুধু রাগে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল। আর জুয়িন তার সেই রাগী মুখ দেখে মিটিমিটি হাসতে লাগল।
----
জুয়িন আর তাসিফাকে থামাতে থামাতে সবাই প্রায় ক্লান্ত হয়ে গেছে। অবশেষে দুজনের ঝগড়ারও ইতি ঘটল।
এরই মধ্যে ঝালমুড়ি, বেলপুরি আর ফুচকা,সবকিছুই তৈরি হয়ে গেল।
সবাই দোকানের সামনে রাখা বেঞ্চ আর চেয়ারগুলোতে বসে পড়ল। আজ জুয়িনও যোগ দিয়েছে তাদের আড্ডায়। তাই খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্প-হাসিতেও বেশ জমে উঠল পরিবেশটা।
ইয়াশ ঝালমুড়ি মুখে দিয়ে খেতে খেতে হঠাৎ জুয়িনের হাতে থাকা গিটারটার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জুয়িন ভাই, আপনার কাছে তো গিটার আছেই। চলেন, একটা গান হয়ে যাক সবার একসাথে।"
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-"না না, আমরা কিন্তু গান গাইব না।"
তাসিফাও তাড়াতাড়ি সায় দিয়ে বলল,
-“হ্যাঁ! আমরা গান গাইব না। ছেলেরা গাক।"
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“ঠিক আছে, মেয়েরা বাদ। আজকে শুধু ছেলেরা গাইবে।"
জুয়িন তখন ফুচকা মুখে দিয়ে আরাম করে চিবাচ্ছিল। ইয়াশের কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“উঁহু, আগে খেয়ে নেই। তারপর গান হবে।”
সবাই একসঙ্গে বলল,
-“আচ্ছা।”
এরপর আবার শুরু হলো খাওয়া আর আড্ডা।
তাসনিম আর তাসিফা নিজেদের মধ্যে এমনভাবে ফুচকা খাওয়াচ্ছিল, যেন পৃথিবীতে তাদের দুজনের চেয়ে ভালো বন্ধু আর কেউ নেই।
দৃশ্যটা দেখে সাদ আর ইয়াশ একে অপরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“আজ আমাদের বান্ধবী নেই বলে।"
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে নাক কুঁচকে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
-“কোথা থেকে যেন পোড়া পোড়া গন্ধ পাচ্ছি।"
তাসিফা হেসে বলল,
-"নে, তোরাও খা।”
বলেই দুহাতে দুটো ফুচকা নিয়ে ইয়াশ আর সাদের মুখে গুঁজে দিল। দুজন কিছু বলার সুযোগই পেল না।
তাসনিম আর তাসিফার সঙ্গে ইয়াশ-সাদের এমন খুনসুটির মুহূর্তটার দিকে তাকালে কেউ বুঝতেই পারবে না, এরা শুধু বন্ধুবান্ধব। বরং দেখলে মনে হবে, এরা চার ভাই-বোন, যাদের একসঙ্গে হাসাহাসি, ঝগড়া আর খুনসুটি করেই দিন কাটে।
কিছুক্ষণ পর সবার খাওয়াও প্রায় শেষ হয়ে এলো।
এবার জুয়িন গিটারটা কোলে নিয়ে বসল।
আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে তারগুলোতে টান দিল। দুই-তিনবার সুর মিলিয়ে নিল।
তারপর চারপাশে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসল।
এতক্ষণ যারা নিজেদের মধ্যে গল্প করছিল, তারাও চুপ হয়ে গেল। সবার চোখ এখন জুয়িনের দিকে।
জুয়িন গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ালো। প্রথম লাইনটা একাই ধরল,
"এলে নীলচে মাস,"
তার কণ্ঠ শেষ হতেই ইয়াশ, সাদ, রিদ আর সিয়াম একসাথে গলা মেলালো,
"আমি সাজাবো ঘাস,
তুমি পা ফেলে আনবে বাহার।
এলে মেঘলা দিন,
আমি খুব রঙ্গিন,
হয়ে সামলাবো আকাশ তোমার।"
পাঁচটা গলা আর জুয়িনের গিটারের সুর মিলে জায়গাটা মুহূর্তেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। কারও সুর এদিক-ওদিক হলেও কেউ সেটা ধরল না। বরং সবাই আরও জোরে গাইতে লাগল,
"তাই তো তোমাকে খুঁজি,
অল্প আলোতে রোজই,
ইচ্ছে তোমার বুঝি,
কে জানে!
তাই জানি না জানি,
হয়ে অভিমানী,
হেরেছি জিতেছি কে কত খানি,
এভাবে স্বভাবে,
করেছি তোমায় আমার।"
তাসনিম মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। আর তাসিফা চুপচাপ বসে ছিল। চোখ ভরা মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে ছিল জুয়িনের দিকে।
ঠিক তখনই জুয়িন গিটার বাজাতে বাজাতে একবার চোখ তুলল। চোখাচোখি হয়ে গেল দুজনের।
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। লজ্জায় কান লাল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।
জুয়িনের ঠোঁটের কোণে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠল। সে কিছু বলল না। শুধু গিটারের সুরের সাথে গলা মিলিয়ে গানটা শেষ করল।
তারপর সবাই একসাথে হাততালি দিয়ে উঠল।
---
বিকেলটা গল্পে, হাসিতে আর গানে বেশ ভালোই কেটে গেল। সবার মনেই আজকের আড্ডাটার রেশ লেগে আছে।
কিন্তু দিনের আলো ফুরিয়ে আসছে। আকাশে সন্ধ্যার ছায়া।
ইয়াশ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
-"চল, এবার যেতে হবে।"
সাদও উঠে দাঁড়ালো আর বলল,
-"হুম, দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
এক এক করে সবাই নিজের গন্তব্যের দিকে পা বাড়ালো।
তাসনিম রিক্সা ডাকল। তাসিফা একবার পেছন ফিরে তাকাল।
কিছুটা দূরে জুয়িন বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে হেলমেট। চোখ ওদের দিকেই।
তাসনিম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল,
-"উনার সাথে যাবি?"
তাসিফা চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
-"না। আজকে আমরা একসাথেই যাই।"
কথা না বাড়িয়ে চারনজন রিক্সায় উঠে বসল। রিক্সা আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল।
জুয়িন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলল না। শুধু রিক্সাটা দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকল। অতঃপর হেলমেট পরে বাইকে উঠল।বাইক স্টার্ট দিয়ে নিজের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিলো।
----
তাসিফা বাসায় ফিরেই নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে নিল। সারাদিনের ক্লান্তি আর মিড পরীক্ষার ব্যস্ততার পর একটু স্বস্তি পেতে বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিল।
কিছুক্ষণ পর আয়রা বেগম রুমে এসে বললেন,
-"তাসিফা, ব্যাগটা গুছিয়ে নে
জামা-কাপড়গুলো নিয়ে রাখ।”
তাসিফা ফোন থেকে চোখ না তুলেই বলল,
-“কোথায় যাব যে জামা-কাপড় গুছাব?”
আয়রা বেগম বললেন,
-“ভুলে গেলি? সেদিন না তোর বাবা বলেছিল, হাসিব দেশে ফিরবে?”
তাসিফা এবার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"হ্যাঁ, কিন্তু সে তো ১৭ তারিখ ফিরবে। আজ ১৫ তারিখ। আমার সবে মিড পরীক্ষা শেষ হলো। আজকে একটু বিশ্রাম নিই।”
আয়রা বেগম শান্তভাবে বললেন,
-“আমরা তো আজ যাচ্ছি না। আগামীকাল রওনা দেব। কুমিল্লায় তোর ফুপ্পির বাসায় গিয়ে একদিন আগে থাকলে অসুবিধা কী?”
তাসিফা আর কিছু বলল না। হালকা বিরক্তি নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-“আচ্ছা, গোছাচ্ছি।”
সে উঠে কাবার্ড খুলে প্রয়োজনীয় কয়েকটা জামা বের করল। সঙ্গে দু-একটা প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ব্যাগে গুছিয়ে রাখল। খুব বেশি কিছু নেওয়ার দরকার নেই ভেবে পাঁচটা জামাই যথেষ্ট মনে হলো তার।
ব্যাগ গুছানো শেষ হলে তাসিফা আবার বিছানায় এসে বসল। তারপর ভণ্ডপার্টির গ্রুপে অডিও কল দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়াশ, তাসনিম আর সাদ কল রিসিভ করল।
তাসিফা বলল,
-“শোন, আমি কাল কুমিল্লা যাচ্ছি। কয়েকদিন ফুপ্পির বাসায় থাকব।”
ইয়াশ অবাক হয়ে বলল,
-“হঠাৎ?”
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-“হঠাৎ না। হাসিব ভাই ১৭ তারিখ দেশে ফিরবে। তাই বাবা-মার সঙ্গে ফুপ্পির বাসায় যাচ্ছি।”
তাসনিম একটু আগ্রহ নিয়ে বলল,
-“হাসিব ভাই? তোর কি হয়?"
তাসিফা বলল,
-"ফুফাতো ভাই।"
তাসনিম হেসে বলল,
-"দেখতে কেমন?”
তাসিফা হেসে উত্তর দিল,
-"সেটাই তো জানি না। আমি নিজেই তাকে এখনও দেখিনি।”
সাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“তুই আবার কেমন কাজিন রে? নিজের কাজিনকেই চিনিস না!”
তাসিফা হেসে বলল,
-"ছোটবেলায় দেখেছি নাকি। এত বছর পর তো আর মনে থাকার কথা না।”
তাসনিম মজা করে বলল,
-“যাই হোক, গিয়ে দেখে জানাস।”
-"কী জানাব?”
-“কেমন দেখতে, সেটাই।”
তাসিফা হেসে মাথা নাড়ল।
-"আচ্ছা, আগে গিয়ে দেখি। তারপর জানাব।”
কিছুক্ষণ আরও গল্প করার পর সবাই কল রেখে দিল।
ফোনটা পাশে রেখে তাসিফা ব্যাগটার দিকে একবার তাকাল। আগামীকাল আবার কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হতে হবে। মিড পরীক্ষার পর কয়েকটা দিন ফুপ্পির বাসায় কাটাতে মন্দ লাগবে না,ভাবতেই তার মনটা ভালো হয়ে গেল।
তবে হঠাৎ জুয়িনের কথা মনে পড়তেই মুখের হাসিটা একটু ম্লান হলো।
কয়েকদিন জুয়িনের সঙ্গে দেখা হবে না।তাসিফা নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জুয়িনকে যে সে মনে মনে পছন্দ করে, সেটা কাউকে না বললেও নিজের কাছে অস্বীকার করতে পারে না। তাই কয়েকদিন দেখা হবে না ভাবতেই মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল।
#চলবে
(ইয়েএএএ হাসিব বেব আসছে ১৭ তারিখে🤘)