----
এর পরের দিন তাসিফা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। যাওয়ার আগে জুয়িনকে অবশ্য কিছুই জানিয়ে যায়নি।
তাসিফারা বাসে করে ঢাকা থেকে কুমিল্লার পথে রওনা হলো। বাসে উঠেই তাসিফা নিজের সিটে বসে কানে হেডফোন গুঁজে দিয়ে “Cheap Thrills” গানটা চালিয়ে দিল।
জানালার বাইরে তাকিয়ে গান শুনতে শুনতেই কখন যে সময় কেটে গেল, তাসিফা টেরই পেল না।
প্রায় দুই ঘণ্টা পর তারা কুমিল্লায় পৌঁছে গেল।
কিছুক্ষণ পর তাসিফারা এসে দাঁড়াল বিশাল “চৌধুরী মেনশনের” সামনে।
ডুপ্লেক্স বাড়িটা বেশ বড়। সামনে খোলা জায়গা, চারপাশে গাছপালা আর সুন্দর একটা বাগান। বহু বছর পর ফুপ্পির বাড়িতে এসে তাসিফা কিছুক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
ছোটবেলায় হাতে গোনা তিন-চারবারই এই বাড়িতে এসেছিল সে। এমনিতেই তখন খুব একটা বাসা থেকে বের হতো না। তাই এই বাড়ির সঙ্গে তেমন বেশি স্মৃতিও নেই তার।
সবাই বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই হঠাৎ একটা মেয়ে এগিয়ে এসে তাসিফাকে জড়িয়ে ধরল।
তাসিফা প্রথমে একটু থমকে গেলেও পরক্ষণেই মেয়েটাকে চিনতে পেরে হেসে তাকে জড়িয়ে ধরল আর বলল,
-"কেমন আছিস, হিয়া আপুই?”
হিয়া তাসিফাকে ছেড়ে ভান করা রাগে বলল,
-“তোর সঙ্গে কথা নেই আমার। কত বছর পর এলি এই বাড়িতে।"
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-“সরি আপুই।”
হিয়া হেসে তাসিফার গাল টেনে দিল আর বলল,
-“কত বড় হয়ে গেছিস।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে গাল সরিয়ে নিয়ে বলল,
-“আহা! ছাড় তো।"
হিয়া হেসে ফেলল।
হিয়া তাসিফার ফুফাতো বোন। বয়সে তাসিফার থেকে মাত্র তিন বছরের বড় হলেও তাদের সম্পর্কটা বরাবরই বন্ধুর মতো। ছোটবেলা থেকেই দুজনের মধ্যে বেশ ভাব ছিলো।
এরপর হিয়া আয়রা বেগম ও আলমগীর আলমকে সালাম করল।
আয়রা বেগম হেসে সালামের উত্তর দিয়ে বললেন,
-"ভালো আছিস মা?”
-“জি মামি, ভালো আছি।”
আলমগীর আলমও হিয়ার সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন।
এরই মধ্যে ভেতর থেকে হাফসা এগিয়ে এলেন।
তাসিফাকে দেখেই হাফসার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তাসিফাও সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল আর বলল,
-“ফুপ্পি!”
হাফসা তাসিফার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললেন,
-"কিরে মামণি, কেমন আছিস?”
-“ভালো আছি, ফুপ্পি।”
হাফসা একটু দূরে সরিয়ে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"বাহ! অনেক বড় হয়ে গেছিস তো!”
তাসিফা হেসে বলল,
-"এই কথাটাই সবাই বলছে।”
হিয়া পাশ থেকে মুচকি হেসে বলল,
-"কারণ, কথাটা সত্যি।”
তাসিফা এবার শুধু হিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
হাফসা সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-“চল, সবাই বস। জার্নি করে এসেছিস অনেকটা পথ, নিশ্চয়ই ক্লান্ত হয়ে গেছিস।”
সবাই বসার ঘরে গিয়ে সোফায় বসে পড়ল।
হাফসা কিছুক্ষণ সবার সঙ্গে কথা বললেন। তারপর বললেন,
-“তোরা বস, আমি একটু আসছি।”
এই বলে তিনি রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন।
তাসিফা সোফায় বসে চারপাশে তাকাচ্ছিল। বহু বছর পর এই বাড়িতে এসে সবকিছুই যেন একটু নতুন নতুন লাগছিল।
প্রায় পাঁচ মিনিট পর হাফসা হাতে একটা ট্রে নিয়ে ফিরে এলেন। ট্রেতে কয়েক গ্লাস ঠান্ডা শরবত।
-“এই নে, আগে শরবত খেয়ে নে সবাই।”
তিনি একে একে সবার হাতে শরবতের গ্লাস তুলে দিলেন।
তাসিফা গ্লাস হাতে নিয়ে এক চুমুক দিতেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল আর বলল,
-“আহ্! অনেক ভালো হয়েছে।”
হাফসা হেসে বললেন,
-"তাহলে পুরোটা খেয়ে নে।”
তাসিফা মাথা নেড়ে আবার শরবতে চুমুক দিল।
এদিকে হিয়া নিজের শরবত শেষ করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর তাসিফার হাত ধরে টান দিয়ে বলল,
-“চল, ওপরে যাই।”
তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-“এখনই?”
-“হ্যাঁ, চল।”বলেই তাসিফাকে টেনে দাড় করালো হিয়া।
আয়রা বেগম মুচকি হেসে বললেন,
-“যা, হিয়ার সঙ্গে যা। এত বছর পর দেখা হয়েছে, গল্প কর।”
তাসিফা হেসে হিয়ার সঙ্গে দোতলার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
----
অন্যদিকে, ভার্সিটিতে এসে তাসিফাকে দেখতে না পেয়ে জুয়িনের একটু চিন্তা হলো। শুধু তাসিফাই নয়, আজ ভন্ডপার্টির কাউকেই দেখা গেল না।
ক্লাসের ফাঁকে কয়েকবার এদিক-ওদিক তাকিয়েও তাসিফার দেখা পেল না সে।
শেষ পর্যন্ত আর অপেক্ষা না করে জুয়িন বাসায় ফিরে এল।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে গিয়ে তাসিফাদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে হঠাৎ থেমে গেল সে।দরজায় বড় একটা তালা ঝুলছে।
জুয়িনের ভ্রু কুঁচকে গেল।
-"কোথায় গেল এরা?"
কিছুক্ষণ তালাটার দিকে তাকিয়ে থাকল। তারপর নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো জুয়িন। তবে তাসিফাদের ফ্ল্যাটে তালা দেখে কৌতূহলটা তার মন থেকে গেল না।
---
তাসিফাকে নিজের রুমে এনে বিছানায় বসিয়ে দিল হিয়া। তারপর হেসে বলল,
-“বল, খবর কী তোর? ভার্সিটি কেমন যাচ্ছে?”
তাসিফা হেসে বলল,
-“খুব ভালো। আমি আগে গোসলটা সেরে নিই? তারপর তোকে একটা কথা বলব।”
হিয়া বলল,
-“ঠিক আছে। যা, তাড়াতাড়ি গোসল করে আয়।”
তাসিফা আবার নিচে নেমে নিজের ব্যাগটা হাতে তুলে নিল। এরপর হিয়ার রুমে এসে ব্যাগটা একপাশে রেখে সেখান থেকে জামাকাপড় বের করে হিয়ার ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
হিয়া ততক্ষণে তাসিফার জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
দশ মিনিটের মধ্যেই গোসল সেরে বেরিয়ে এলো তাসিফা। এসে হিয়ার পাশে বসতেই হিয়া তার হাত টেনে নিয়ে বলল,
-“বল তো, কী বলবি যেন?”
তাসিফা হেসে বলল,
-“জানিস, হিয়া আপুই? আমার তিনজন ফ্রেন্ড আছে। বলতে গেলে একেবারে বেস্ট ফ্রেন্ড। ভার্সিটিতেই ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছে।”
হিয়া হেসে বলল,
-"বাহ, দারুণ তো!”
তাসিফা একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
-"আরেকটা কথা জানিস?”
হিয়া কৌতূহলী হয়ে বলল,
-“কী কথা?”
তাসিফা একটু ইতস্তত করে বলল,
-"আমি না, একটা ছেলেকে পছন্দ করি। তার নাম জুয়িন। ও আমাদের ভার্সিটির ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের টপ স্টুডেন্ট।”
তাসিফার কথা শুনে হিয়ার মুখটা মুহূর্তেই মলিন হয়ে গেল। মনে মনে সে বিড়বিড় করে বলল,
-“তাহলে আমার ভাইয়ের কী হবে?”
হিয়াকে এভাবে চুপ হয়ে যেতে দেখে তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-“কী হলো? শুনবি না?”
হিয়া নিজেকে সামলে নিয়ে জোর করে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল,
-“হুম, বল।”
এরপর তাসিফা জুয়িনের ব্যাপারে হিয়াকে সব খুলে বলল। জুয়িনের সঙ্গে তার যত ঘটনা ঘটেছে, সবকিছুই একে একে জানাল।
সব শুনে হিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“জুয়িন নামের ছেলেটা তোকে পছন্দ করে?”
তাসিফা একটু ভেবে বলল,
-“জানি না। কেউই কখনো মুখে কিছু প্রকাশ করিনি। তবে উনি আমার অনেক খেয়াল রাখেন।”
তাসিফার কথায় হিয়া আরও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-"শোন, তুই একটু রেস্ট কর। আমি একটু আসছি।”
কথাটা বলেই হিয়া রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
হিয়া রুম থেকে বেরিয়ে যেতেই তাসিফা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।হিয়ার হঠাৎ এমন আচরণের কারণটা ঠিক বুঝতে পারল না সে।
বিষয়টা মাথা থেকে সরিয়ে ফোনটা হাতে নিলো তাসিফা।তারপর ভন্ডপার্টি গ্রুপে ভিডিও কল দিলো।
কয়েকবার রিং হওয়ার পরই একে একে ইয়াশ,সাদ আর তাসনিম কলে জয়েন হলো।
কল ধরেই ইয়াশ চেঁচিয়ে উঠল,
-"এই বেয়াদব! অবশেষে আমাদের কথা তোর মনে পড়ল?"
তাসিফা একটু থতমত খেয়ে গেল। তারপর হেসে বলল,
-“এই জানোয়ার! তোদের কথা তো আমার সব সময়ই মনে পড়ে। শুধু শুধু নাটক করিস না।”
তাসনিম মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-“আচ্ছা, বল তো,সাবধানে পৌঁছেছিস?”
তাসিফা বলল,
-“হ্যাঁ, একদম সাবধানে এসেছি। এই তো, মাত্রই গোসল করলাম।”
সাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“তাসিফার বাচ্চা, তাড়াতাড়ি ফিরবি কিন্তু। তোর জন্য আমরাও ক্লাসে যাচ্ছি না।”
তাসিফা মুখ ফুলিয়ে বলল,
-“আচ্ছা ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করব। যার জন্য এসেছি, সেও তো এখনো দেশে ফেরেনি ভাই।”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মুখ লটকে আঞ্চলিক টানে বলল,
-"হো, হেতে আইলে হেতের কোলের উপর গিয়া বইসা থাকিস।”
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে বলল,
-“ছিঃ! জীবনেও না।”
তাসিফার এমন মুখভঙ্গি দেখে তাসনিম হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর তাসনিম একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“জুয়িন ভাইকে জানিয়েছিস? যে তুই ফুপ্পির বাসায় এসেছিস?”
তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-"কেন? উনাকে জানিয়ে আসব?”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-“কেন জানাবি না?”
তাসিফা এবার একটু অভিমানী গলায় বলল,
-“উনি তো আমাকে এখন কলও দেন না, মেসেজও দেন না। তাহলে আমি কেন বারবার নিজে থেকে মেসেজ বা কল করব?”তাসিফার কথায় হালকা অভিমান স্পষ্ট।
তাসনিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা নেড়ে বলল,
-“সেটাও ঠিক। তুই আর নিজে থেকে কিছু করিস না। দেখ, উনি নিজে থেকে কোনো কল বা মেসেজ দেন কি না।”
তাসিফা ছোট করে বলল,
-“হুম।”
এরপর আবারও তাদের আড্ডা জমে উঠল।হাসতে হাসতে কখন যে এতটা সময় কেটে গেল, কেউ খেয়ালই করল না।
অবশেষে তাসিফা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভিডিও কলটা কেটে দিল।
---
অন্যদিকে, হিয়া ছাদে এসে একা বসে আছে। চারপাশটা শান্ত হলেও তার ভেতরটা যেন একটুও শান্ত হতে চাইছে না।
তাসিফার বলা কথাগুলো বারবার তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
তাসিফা যদি অন্য কাউকে পছন্দ করে, তাহলে হাসিব ভাইয়ার কী হবে?
হাসিব ভাই তো তাসিফার জন্যই দেশে ফিরছে। কতটা আশা আর আগ্রহ নিয়ে সে দেশে ফিরছে, সেটা হিয়া ভালো করেই জানে। অথচ তাসিফার মনের জায়গাটা যে অন্য কারও জন্য, সেটা আজই জানতে পারল সে।
নিজের ভাইয়ের কথা মনে হতেই হিয়ার বুকটা ভার হয়ে এলো। ভাইটার জন্য সত্যিই খুব কষ্ট লাগছে তার। কিন্তু তাসিফারই বা কী করার আছে?
ভালো লাগা তো আর জোর করে তৈরি করা যায় না। প্রত্যেক মানুষেরই নিজের পছন্দ থাকতে পারে, নিজের মতো করে কাউকে ভালো লাগতে পারে। তাসিফার মনেও হয়তো ঠিক তেমনই কারও জন্য অনুভূতি তৈরি হয়েছে।
হিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ বসে রইল। ভাইয়ের জন্য খারাপ লাগলেও তাসিফাকে দোষ দেওয়ার মতো কিছুই খুঁজে পেল না সে।
---
দুপুরের খাবারের জন্য সবাই ডাইনিং টেবিল ঘিরে বসেছে। হাফসার ছোট ভাই আলমগীর আলম ও তাঁর স্ত্রী আয়রা বেগমের আসার খবর পেয়েই হাসিব ও হিয়ার বাবা মোজাম্মেল চৌধুরী অফিস থেকে দুপুরেই বাসায় চলে এসেছেন।
অনেক দিন পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়ায় দুপুরের খাবারের সময়টাও বেশ জমে উঠেছে। সবাই খেতে খেতেই নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে আছে।
হাফসা ও আয়রা বেগম পাশাপাশি বসে খেতে খেতে নিজেদের সংসার ও পরিবারের নানা বিষয় নিয়ে গল্প করছেন। অন্যদিকে আলমগীর আলম ও মোজাম্মেল চৌধুরীও খেতে খেতে নিজেদের কাজকর্ম ও ব্যবসার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন।
সবার মাঝেই বসে আছে হিয়া আর তাসিফা। তাসিফা খেতে খেতে কয়েকবার হিয়ার দিকে তাকাল। শেষে একটু ঝুঁকে নিচু গলায় বলল,
-"হিয়া আপুই।"
হিয়া খাওয়া থামিয়ে তাকিয়ে বলল,
-"হুম? কী হয়েছে?"
তাসিফা আরও একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
-"তোর কাছে নীল শাড়ি আছে?"
হিয়া ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"নীল শাড়ি? হঠাৎ নীল শাড়ি দিয়ে কী করবি?"
তাসিফা মুচকি হেসে বলল,
-"আগে বল, আছে কি না।"
হিয়া বলল,
-"আমার একটা আছে। তবে আম্মুর অনেকগুলো নীল শাড়ি আছে। কেন?"
তাসিফার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
-"তাহলে তো হয়ে গেল। আমরা দুজন কাল নীল শাড়ি পরব।"
হিয়া অবাক হয়ে বলল,
-"কাল? হঠাৎ কাল নীল শাড়ি পরব কেন?"
তাসিফা কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
-"এমনিই। দুজন একসঙ্গে নীল শাড়ি পরলে সুন্দর লাগবে। তারপর ছাদে গিয়ে ছবি তুলব।"
হিয়া হেসে বলল,
-"আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি পরব। তবে আম্মুর শাড়ি নিতে হলে আগে আম্মুকে বলতে হবে।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-"ঠিক আছে। আমি ফুপ্পিকে বলে শাড়ি নেব।"
কথা শেষ করে দুজন আবার খেতে শুরু করল।
কিছুক্ষণের মধ্যে হিয়া আর তাসিফার খাওয়া শেষ হয়ে গেল। দুজনেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
তাদের উঠতে দেখে হাফসা বললেন,
-"কিরে, তোদের দুজনের খাওয়া শেষ?"
হিয়া মাথা নেড়ে বলল,
-"হ্যাঁ, আম্মু।"
তাসিফাও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
হিয়া একটু থেমে বলল,
-"আমরা একটু ছাদে যাচ্ছি।"
হাফসা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
-"আচ্ছা, যা। তবে বেশি সময় থাকিস না।"
আয়রা বেগমও স্নেহভরা গলায় বললেন,
-"হ্যাঁ, তাড়াতাড়ি ফিরে আসিস। ছাদে এখন অনেক রোদ।"
তাসিফা হেসে বলল,
-"আচ্ছা, বেশি সময় থাকব না।"
হিয়া তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"চল, তাসিফা।"
দুজনেই কথা বলতে বলতে ডাইনিং রুম থেকে বেরিয়ে গেল। এরপর পাশাপাশি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
----
ছাদে গিয়ে দাঁড়াতেই হঠাৎ তাসিফার মোবাইল বেজে উঠল। তাসিফা মোবাইলের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল। স্ক্রিনে জুয়িনের নাম দেখে মুহূর্তেই তার মুখে খুশির হাসি ফুটে উঠল।
তাসিফা খুশি মনে কল রিসিভ করে কানে ধরল।
-"হ্যালো?"
অপর প্রান্ত থেকে জুয়িনের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো,
-"কোথায় তুই?"
তাসিফা একটু থতমত খেয়ে বলল,
-"আমি কুমিল্লায়।"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
-"কুমিল্লায় কী করিস?"
-"বেড়াতে এসেছি। ফুপ্পির বাসায়।"
জুয়িন কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার জিজ্ঞেস করল,
-"সেখানে কোনো ছেলে আছে?"
প্রশ্নটা শুনে তাসিফা লজ্জায় হালকা হেসে হিয়ার দিকে তাকাল। হিয়াও তখন কৌতূহলী চোখে তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তাসিফা একটু ইতস্তত করে বলল,
-"এখন নেই আপাতত। তবে আগামীকাল থাকবে।"
জুয়িনের কপাল আরও কুঁচকে গেল আর বলল,
-"মানে?"
তাসিফা আস্তে করে বলল,
-"মানে হলো, আগামীকাল আমার ফুপাতো ভাই হাসিব ভাই দেশে ফিরবেন।"
হাসিবের নাম শুনতেই জুয়িনের মুখের ভাব মুহূর্তেই বদলে গেল। চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠল। গলায়ও এবার আগের চেয়ে কঠোরতা চলে এলো।
-"হাসিব?"
তাসিফা ছোট্ট করে বলল,
-"হুম।"
জুয়িন দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বিরক্তি মেশানো গম্ভীর স্বরে বলল,
-"একবারও তার সঙ্গে বেশি কথা বলবি না। আর অযথা মিশবিও না। বুঝেছিস?"
তাসিফা একটু আঁতকে উঠে বলল,
-"আচ্ছা, ঠিক আছে।"
জুয়িনের ভ্রু তখনও কুঁচকে আছে। সে আবারও কঠিন গলায় বলল,
-"মনে থাকবে?"
তাসিফা দ্রুত বলল,
-"হ্যাঁ, মনে থাকবে।"
জুয়িন এবার ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিরক্তিটা যেন এখনও কাটেনি। তবে কণ্ঠটা কিছুটা নরম করে বলল,
-"ঠিক আছে। রাখছি। সাবধানে থাকবি।"
তাসিফা মৃদু হেসে বলল,
-"হুম। আপনিও সাবধানে থাকবেন।"
জুয়িন আর কিছু না বলে কল কেটে দিল।
অন্যদিকে, পুরো ফোনালাপের সময় হিয়া তাসিফার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তাসিফা ফোনটা নামিয়ে হিয়ার দিকে তাকাতেই লজ্জায় তার গাল লাল হয়ে গেল।
হিয়া মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-"কে ছিল?"
তাসিফা নিচের দিকে তাকিয়ে লাজুক গলায় বলল,
-"জুয়িন ভাইয়া।"
হিয়া বলল,
-"অহ।"
তাসিফা আর কিছু বলল না। হিয়া এবার তার হাত ধরে বলল,
-"চল, দোলনায় গিয়ে বসি।"
-"চল।"
বলেই দুজন দোলনার কাছে গিয়ে পাশাপাশি বসে পড়ল। ধীরে ধীরে দোল খেতে খেতে আবারও নিজেদের নানা গল্প আর আড্ডায় মেতে উঠল।
---
রাতে তাসিফা হাফসার রুমে গিয়ে হাজির হলো। কিছুক্ষণ পর আদুরে গলায় বলল,
-"ফুপ্পি, তোমার কাছে নীল শাড়ি হবে? আমি আর হিয়া আপুই নীল রঙের শাড়ি পড়ে ছাদে গিয়ে ছবি তুলব।"
হাফসা মুচকি হেসে আলমারি খুলে একটা সুন্দর নীল শাড়ি বের করে তাসিফার হাতে দিলেন।
শাড়িটা হাতে পেয়েই তাসিফার মুখটা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। সে সঙ্গে সঙ্গে ফুপ্পিকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-"থ্যাঙ্ক ইউ, ফুপ্পি!"
হাফসাও হেসে তাসিফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
----
রাতে হিয়া আর তাসিফা একই রুমে শুয়ে পড়ল। ঘুমানোর আগে দুজনের মাথায় হঠাৎ একটা প্ল্যান এলো, আজ রাতে ল্যাপটপে "Train to Busan'' দেখবে।
রুমের লাইট নিভিয়ে ব্ল্যাঙ্কেটের ওপর ল্যাপটপটা রেখে নেটফ্লিক্সে মুভিটা চালু করল দুজন।
শুরুতে অবশ্য দুজনের বেশ সাহসই ছিল।
হিয়া মুচকি হেসে বলল,
-"জম্বি মুভি দেখে ভয় পাওয়ার মতো কিছু আছে নাকি?"
তাসিফাও বলল,
-"হ্যা তাই তো। ঠিক বলেছিস।"
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তাদের সেই সাহস কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল।
স্ক্রিনজুড়ে একের পর এক জম্বি আসতে শুরু করতেই দুজনের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। কোনো জম্বি হঠাৎ সামনে চলে এলে দুজনই একসাথে চমকে উঠছিল।
একসময় হিয়া ভয় পেয়ে তাসিফার হাত চেপে ধরে ফিসফিস করে বলল,
-"তাসিফা, আর ভালো লাগছে না।"
তাসিফাও ভয়ে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"চুপ কর, আমিও ভয় পাচ্ছি। কিন্তু এখন বন্ধ করলে তো আর মজা পাবো না।"
শেষ পর্যন্ত দুজন একে অপরকে সাহস দিতে দিতে মুভিটা শেষ করল। ল্যাপটপ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুজন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু রুমের চারপাশটা অন্ধকার হয়ে যেতেই আবার মনে হলো, এই বুঝি কোথা থেকে কোনো জম্বি এসে হাজির হবে।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে দুজন ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর মুখ লুকিয়ে একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
শেষ পর্যন্ত একে অপরকে জড়িয়ে ধরেই কোনোমতে রাতটা পার করল হিয়া আর তাসিফা।