----
ভার্সিটির ক্লাস শেষ হতেই সবাই একে একে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এলো।
চারজনও একসঙ্গে বের হলো। বের হওয়ার সময় ইয়াশ নিজের ব্যাগটা তাসিফার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-"তাসু, এটা একটু ধর।”
তাসিফাও কোনো কথা না বলে ব্যাগটা নিয়ে নিল।
ইয়াশ তখন দুই হাতের মুঠো ফুটাতে ফুটাতে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
-"আচ্ছা গাইস! ভার্সিটিতে কি ব্যাগ ছাড়া আসা যায় না?”
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“যায় তো। যদি তুই বই-খাতাগুলো তোর পাছায় করে আনিস।”
কথাটা শুনেই ইয়াশ থমকে গেল। তারপর দ্রুত আশেপাশে তাকাতে লাগল। কেউ তাসনিমের কথাটা শুনে ফেলেছে কি না, সেটাই দেখছে। শুনে ফেললে তো মান-ইজ্জত শেষ।
তাসনিমকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল,
-“এই! আস্তে কথা বল। কেউ শুনে ফেললে আমার মান-ইজ্জত কিছু থাকবে?"
তাসনিম মুচকি হেসে বলল,
-“তোর আবার মান-ইজ্জত আছে?”
সাদ আর তাসিফা হেসে ফেলল।
ইয়াশ বিরক্ত মুখে বলল,
-“তোদের জন্যই একদিন ভার্সিটিতে আসা বন্ধ করে দিতে হবে।”
সাদ হঠাৎ বলল,
-“অই, চল সবাই বেলপুরি খাই?”
তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“টাকা নাই। শুধু রিকশা ভাড়ার টাকা আছে।”
ইয়াশ বলল,
-“আচ্ছা, তাসনিমের দিতে হবে না টাকা। তাসু, সাদ আর আমি মিলে টাকা দিব।”
তাসিফা বলল,
-“তাহলে চল।”
চারজনই হাঁটা ধরল। কিছুদূর যেতেই তাসিফা ইয়াশের ব্যাগটা তার দিকে ছুড়ে মারল। ইয়াশ তাড়াতাড়ি সেটা ধরে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল।
এরপর চারজন বেলপুরির দোকানের দিকে এগিয়ে গেল।
দোকানে পৌঁছে চারজন চার প্লেট নাগা বেলপুরি অর্ডার দিল।
ইয়াশ কুটিল হাসি দিয়ে বলল,
-“আজকে নাগা বেলপুরি খাবো, আহা।"
সাদ সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-"ভাই, বেশি খাস না। পরে কিন্তু পাছা জ্বলবে।”
ইয়াশ গরম চোখে সাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“মাদারবোর্ড, চুপ থাক তুই। এমনেও তুই একটা কুফা।”
সাদ মুখ চেপে হাসল আর বলল,
-“আমি তো সাবধান করলাম।”
-“তোর সাবধান করার দরকার নাই। নিজেরটা সামলা।”
এদের কথার মাঝেই বেলপুরি চলে এলো।
ইয়াশ আর দেরি না করে নিজের প্লেট থেকে একটা বেলপুরি তুলে মুখে পুরে দিল। কয়েক সেকেন্ড চিবানোর পরই তার মুখের ভাব বদলে গেল।
সে চোখ বড় বড় করে বলল,
-“উফ! ভাইরে ভাই! কী ঝাল রে, শালা।"
সাদও নিজের প্লেট থেকে খেতে শুরু করেছে। কিন্তু ঝালের কারণে তার চোখমুখ ইতোমধ্যে লাল হয়ে গেছে। কপালে ঘাম জমেছে, চোখ দিয়েও পানি আসছে। তবুও সে থামছে না।
ইয়াশ সাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"কী হইছে তোর? মুখ এমন লাল কেন?”
সাদ কষ্ট করে বলল,
-“কিছু হয় নাই। ঝাল একটু বেশি।”
-"একটু বেশি? তোর তো মনে হয় এখনই পানি খেয়ে দোকানদারের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।"
সাদ কিছু বলতে গিয়েও চুপ করে গেল। মুখে তখনও বেলপুরি।
অন্যদিকে তাসনিম আর তাসিফা বেশ মজা নিয়েই বেলপুরি খাচ্ছে। নাগার ঝাল যেন তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না। বরং দুজনেই আরাম করে খেতে খেতে ইয়াশ আর সাদের অবস্থা দেখে হাসছে।
তাসিফা এক চামচ বেলপুরি মুখে দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলল, -“মজাই তো হয়েছে!”
ইয়াশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল আর বলল,
-“মজা? এটা তোর কাছে মজা লাগছে?”
তাসিফা মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“হ্যাঁ। তোরা দুইজনই শুধু নাটক করছিস।”
তাসনিমও হেসে বলল,
-“সত্যি। এত ঝাল খেতে পারিস না, তাহলে নাগা দিতে বলিস কেন?”
ইয়াশ চোখেমুখে অসহায় ভাব এনে বলল,
-“একটু ভাব দেখানোর জন্য অর্ডার করেছিলাম ভাই।"
কথাটা শুনে তাসিফা আর তাসনিম দুজনেই হেসে উঠল।
----
সবাই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যে যার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। আজ ঢাকা শহরে প্রচণ্ড গরম পড়েছে। তার ওপর রাস্তাজুড়ে জ্যাম তো আছেই। সারাদিনের ব্যস্ততার পর এই গরম আর যানজট যেন ক্লান্তিটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তাসিফা বাসায় ফিরে আর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা নিজের রুমে চলে গেল। কাবার্ড খুলে একটা পাতলা গেঞ্জি আর কালো ট্রাউজার হাতে নিয়ে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।
আজকে বেশ লম্বা একটা গোসল দিতে হবে। সারাদিনের গরমে শরীরটা কেমন আঠালো হয়ে আছে। ঠান্ডা পানিতে গোসল করলে হয়তো শরীর আর মন, দুটোই একটু শান্ত হবে।
কিছুক্ষণ পর গোসল সেরে বের হলো তাসিফা। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে আবার নিজের রুমে চলে এলো।
বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই সারাদিনের ক্লান্তি যেন একসঙ্গে এসে ভর করল। আজকে কম ধকল যায়নি তার ওপর। সকাল থেকে ভার্সিটির ক্লাস, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, সব মিলিয়ে শরীরটা বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
বিছানায় মাথা রাখার কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুম নেমে এলো তাসিফার চোখে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল সে।
----
সন্ধ্যা হতেই তাসিফার ঘুম ভেঙে গেল। তবে ঘুমের রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি। চোখেমুখে ঘুমঘুম ভাব নিয়ে বিছানায় বসে কয়েকবার হাই তুলল সে।
কিছুক্ষণ এভাবেই বসে থাকার পর তাসিফা বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে ‘ভণ্ডপার্টি’ গ্রুপে ঢুকল। বন্ধুদের সঙ্গে টুকটাক চ্যাট করতে করতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল।
এর মাঝেই আয়রা বেগমের ডাক ভেসে এলো,
-“তাসিফা, নাশতা করতে আয় মা।”
তাসিফা মোবাইলটা বিছানার ওপর রেখে রুম থেকে বেরিয়ে এলো।
আজ নাশতায় আয়রা বেগম গরম গরম সবজির পকোড়া আর পেয়াজু বানিয়েছেন। রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা ভাজা খাবারের সুন্দর গন্ধে তাসিফার ক্ষুধাটাও যেন আরও বেড়ে গেল।
ড্রইংরুমে এসে মায়ের পাশে বসে পড়ল তাসিফা। সামনে রাখা প্লেট থেকে একটা পকোড়া তুলে নিয়ে খেতে শুরু করল।
আয়রা বেগম মেয়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
-“ঘুম থেকে উঠেই খিদে পেয়েছে?”
তাসিফা মুখভর্তি পকোড়া নিয়েই মাথা নাড়ল।
ঘুম থেকে ওঠার পর তাসিফার এমনিতেই বেশ ভালো ক্ষুধা লাগে। আর আজকে সামনে গরম গরম পকোড়া আর পেয়াজু দেখে নিজেকে সামলানোর কোনো ইচ্ছাই তার হলো না। মায়ের পাশে বসে আয়েশ করে নাশতা খেতে লাগল সে।
-----
অন্যদিকে জুয়িন ছাদে একা বসে আছে। হাতে বিয়ারের বোতল। ছাদের সবগুলো লাইট নিভিয়ে রেখেছে সে। চারপাশে হালকা বাতাস বইছে। রেলিঙের ওপর ছোট একটা স্পিকার রাখা, তবে এখনও সেটায় কোনো গান চালানো হয়নি।
জুয়িন আর কিছু না ভেবেই বোতলের মুখ খুলে একের পর এক চুমুক দিতে শুরু করল। কেন জানি কিছুই ভালো লাগছে না তার। বুকের ভেতরটা কেমন ভার হয়ে আছে।
দেখতে দেখতে অর্ধেক বোতল শেষ করে ফেলল সে। মাথায় ধীরে ধীরে নেশার প্রভাবও অনুভূত হতে শুরু করেছে।
জুয়িনের চোখে পানি টলমল করছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর অস্পষ্ট গলায় বিরবির করে বলল,
-"তাসিফা কেন বিয়ে করল?”
কথাটা বলেই আবার বোতলটা মুখে তুলল। কয়েক মুহূর্ত পর বোতল নামিয়ে ফাঁকা দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"সে কি আমার অনুভূতি বুঝে না? হ্যাঁ? বুঝে না?”
এবার আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না জুয়িন। গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা নোনা পানি নেমে এলো।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নেশাটাও যেন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলল। নাক আর গাল লাল হয়ে গেছে। চোখেমুখে স্পষ্ট নেশার ছাপ।
হঠাৎ জুয়িন হেসে উঠল। তারপর রেলিঙের ওপর রাখা স্পিকারটা হাতে নিয়ে "প্যারেলাল" গানটা চালিয়ে দিল। গান বাজতে শুরু করতেই সে আবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পড়ল।
হাতে থাকা বিয়ারটুকুও শেষ করে ফেলল সে। এরপর কোনো কারণ ছাড়াই নিজে নিজেই হাসতে লাগল। কখনো গানের তালে মাথা দোলাচ্ছে, আবার কখনো নিজের মনেই কিছু একটা বলছে।
অন্যদিকে তাসিফা জুয়িনের সঙ্গে দেখা করার জন্য তার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গেঞ্জি আর প্যান্ট বদলে দ্রুত একটা জামা পরে নিল সে। এরপর বাসার কাউকে কিছু না জানিয়েই নিঃশব্দে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
ছাদে পা রাখতেই জুয়িনকে দেখে তাসিফা থমকে দাঁড়াল।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল তার।
জুয়িন চেয়ারে আরাম করে বসে আছে। চোখ দুটো প্রায় বন্ধ। এক হাতে খালি বিয়ারের বোতল ধরা।
আর পাশের স্পিকারে জোরে গান বাজছে।
পুরো দৃশ্যটা দেখে তাসিফার ভ্রু কুঁচকে গেল।
-"এ কী অবস্থা!”
কথাটা বলেই সে দ্রুত জুয়িনের কাছে এগিয়ে গেল।
জুয়িনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল তাসিফা। তারপর তার কাঁধ ধরে ঝাঁকিয়ে বলল,
-“এই! আপনার কী হয়েছে?”
জুয়িন ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তাসিফাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে হঠাৎ ফিক করে হেসে উঠল।
-“প্রেমে উষ্টা খেয়ে পড়েছি।”
জুয়িনের কথা শুনে তাসিফা পুরোপুরি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল আর বলল,
-“কার প্রেমে?”
হঠাৎ জুয়িনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে বিরক্ত হয়ে ধমকের সুরে বলল,
-“তোর কী? তোকে কেন বলব?”
জুয়িনের এমন ধমকে প্রথমে একটু আঁতকে উঠল তাসিফা। তবে পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।
তারপর সন্দেহভরা চোখে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আপনি নেশা করেছেন?”
জুয়িন কোনো উত্তর দিল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে আবার হাসতে শুরু করল।
তাসিফার এবার সত্যিই মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
-“আরে ভাই, আপনি নেশা করেছেন, তাই না? এসব কেন খেলেন?”
জুয়িন যেন তার কোনো কথাই শুনছে না। সে নেশাগ্রস্ত গলায় গুনগুন করল,
-"নেশা লেগেছে প্রেমের নেশা।"
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত জুয়িনের এক হাত নিজের কাঁধের ওপর তুলে নিল।
-"চলুন। এখানে আর বসে থাকবেন না।”
জুয়িন ঠিকমতো হাঁটতেও পারছে না। তবু তাসিফার ভরসায় ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তাসিফা এক হাতে জুয়িনকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে তার ফ্ল্যাটের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
আর জুয়িন তখনও নেশার ঘোরে নিজের মনে গুনগুন করতে করতে মুচকি মুচকি হাসছে।
----
তাসিফা অনেক কষ্টে জুয়িনকে তার রুমের বিছানায় শুইয়ে দিল। কিন্তু শোয়াতে গিয়ে ঘটল আরেক বিপত্তি।
জুয়িন হঠাৎ তাসিফার হাতটা টেনে ধরল। ভারসাম্য হারিয়ে তাসিফা গিয়ে জুয়িনের বুকের ওপর পড়ে গেল।
হঠাৎ এমন হওয়ায় তাসিফা কিছুক্ষণ নড়তেই পারল না। অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জুয়িনের দিকে।
জুয়িনও নেশাভরা চোখে চুপচাপ তাসিফার দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর ধীরে ধীরে এক হাত তুলে তাসিফার গালে হাত রাখল।
তাসিফা স্থির হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত দুজনেই কোনো কথা বলল না। ঘরের নীরবতার মাঝে শুধু দুজনের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
জুয়িন ধীরে ধীরে তাসিফার দিকে এগিয়ে এলো। তাসিফাও কিছু না বলে চোখ বন্ধ করে নিল।
কয়েক মুহূর্ত কেটে গেল। কিন্তু কিছুই অনুভব না হওয়ায় তাসিফা ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকাল।
দেখল, জুয়িন চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে আছে। নেশার ঘোরে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও বুঝতে পারেনি।
তাসিফা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল আর বলল,
-“নেশা করে একেবারে বেহুঁশ।”
খুব সাবধানে জুয়িনের বুকের ওপর থেকে সরে গেল তাসিফা।
তারপর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আরও কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। নিশ্চিত হলো, জুয়িন সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে।
এরপর ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো তাসিফা। দরজাটা বাইরে থেকে আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে সেখান থেকে চলে গেল।