-----
সকালে ঘুম ভাঙতেই জুয়িন নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করল। মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছে। চোখ মেলে তাকাতেও কেমন কষ্ট হচ্ছে। গতকালের বিয়ারের নেশার রেশটা এখনও বেশ ভালোভাবেই তাকে কাবু করে রেখেছে।
কিন্তু সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না কীভাবে নিজের রুমে এসে পৌঁছেছে।
শেষবারের কথা মনে করার চেষ্টা করেও তেমন কিছু মনে পড়ল না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে জুয়িন বিরবির করে বলল,
-"হয়তো নেশার ঘোরে নিজেই চলে এসেছি।”
কথাটা বলেই ধীরে ধীরে বিছানা থেকে উঠে বসল সে। সারা শরীর টনটন করছে। মাথার ভেতরটাও যেন ভার হয়ে আছে।
একটু পানি খেলে হয়তো ভালো লাগবে। তবে সাধারণ পানির বদলে লেবুর পানি খাওয়াই ভালো হবে।
জুয়িন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ধীরে ধীরে কিচেনের উদ্দেশ্যে পা বাড়াল।
----
অন্যদিকে, তাসিফারও ঘুম ভেঙে গেল।
ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থেকে অলসতা ঝেড়ে ফেলল সে। এরপর আর দেরি না করে ফ্রেশ হয়ে নিল।
ফ্রেশ হয়ে রুমে ফিরে এসে কাবার্ড খুলল তাসিফা। বেশ কিছুক্ষণ পোশাক দেখার পর শেষ পর্যন্ত টিয়া রঙের একটি চুড়িদার বের করে নিল। পোশাকটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল সে।
এরপর কপালে স্টোনের সাদা টিপ পরল। চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে সুন্দর করে আঁচড়ে নিল। তারপর সিঁথি করে নিল মাঝখানে।
খুব বেশি সাজগোজ না করেও নিজের মতো করে পরিপাটি হয়ে উঠল তাসিফা।
রেডি হয়ে মোবাইলটা হাতে নিল সে। ভার্সিটিতে যাওয়ার আগে ভণ্ডপার্টির সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। তাই সঙ্গে সঙ্গে ‘ভণ্ডপার্টি’ গ্রুপে অডিও কল দিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একে একে সবাই কলে জয়েন করল।
তাসিফা কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,
-“সবাই রেডি? বের হয়েছিস?”
ওপাশ থেকে ইয়াশের গলা ভেসে এলো,
-“তুই কই?”
তাসিফা একদম স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-“আমি এখনও বাসায়।”
কথাটা শুনে ইয়াশ যেন আরও বিরক্ত হয়ে গেল। বিরক্তি মেশানো গলায় বলল,
-“বাসায় বইসা ডিম পার। বা’ল, আমি রিকশায়।”
ইয়াশের কথা শুনে তাসিফা কিছু বলার আগেই তাসনিম বলে উঠল,
-“বের হ তুই।"
তাসিফা হালকা বিরক্ত হয়ে বলল,
-“আচ্ছা, বের হচ্ছি।”
এরপর আর কেউ কিছু বলার সুযোগ পেল না। সবাই কল কেটে দিল।
তাসিফা মোবাইলটা হাতে নিয়েই দ্রুত রুম থেকে বের হলো। সময় নষ্ট করার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। জুতাটা পরে নিল তাড়াহুড়ো করে। তারপর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে আছে কি না, একবার দেখে নিল। সব ঠিকঠাক বুঝে দরজা পেরিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল তাসিফা।
----
ভণ্ডপার্টির সবাই ভার্সিটিতে একত্রিত হয়েছে। সবাই ক্লাসে গিয়ে নিজেদের সিটে বসতেই কিছুক্ষণ পর স্যারও ক্লাসে এসে উপস্থিত হলেন।
স্যারকে দেখেই সবাই চুপচাপ হয়ে গেল। স্যার টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"হ্যালো, স্টুডেন্টস। আপনাদের একটা সুখবর দেওয়ার আছে। পরশু আপনাদের কক্সবাজার ট্যুরে নিয়ে যাওয়া হবে। আপনাদের সঙ্গে ফাইনাল ইয়ারের ম্যাথ ডিপার্টমেন্টের স্টুডেন্টরাও যাবে। তো যারা যারা যেতে আগ্রহী, তারা নিজেদের নাম দিয়ে যাবেন এবং টাকাটাও জমা দিয়ে দেবেন।”
স্যারের কথা শেষ হতে না হতেই পুরো ক্লাসে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। বিশেষ করে ভণ্ডপার্টির সদস্যদের আনন্দ দেখে কে।
তাসিফা আর তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাত মিলিয়ে হাই-ফাইভ করল।
ইয়াশ খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
-"ইয়েএএ! ট্যুরে যাবো!”
সাদও আর বসে থাকতে পারল না। উত্তেজিত গলায় বলল,
-“বাসায় গিয়ে আজকেই জামা-কাপড় প্যাক করব, গাইস!”
তাসিফা মুখে বিশাল হাসি ফুটিয়ে বলল,
-“আমার এত খুশি লাগছে, আহা!”
চারজনের মুখের আনন্দ দেখে মনে হচ্ছিল, কক্সবাজারে যাওয়ার খবর নয়, যেন তাদের হাতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখবরটা এসে ধরা দিয়েছে।
----
আজ ভার্সিটিতে জুয়িনকে দেখা গেল না।
তবে ক্লাসের ফাঁকে তাসিফার দেখা হয়ে গেল জুয়িনের দুই বন্ধু রিদ আর সিয়ামের সঙ্গে। সবাই মিলে কিছুক্ষণ স্বাভাবিক কথাবার্তা ও হাসি-ঠাট্টা করল। জুয়িন আজ ভার্সিটিতে আসেনি, এটা নিয়েও দু-একটা কথা হলো। কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর রিদ আর সিয়াম অন্যদিকে চলে গেল, আর তাসিফারাও নিজেদের ক্লাসের দিকে চলে এলো।
----
ক্লাস শেষ হওয়ার পর তাসিফা ব্যাগটা কাঁধে তুলে বলল,
-“দোস্ত, আমাকে নীলক্ষেত যেতে হবে।”
ইয়াশ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
-“কেন?”
তাসিফা নিজের ব্যাগের ভেতর হাত ঢুকিয়ে কিছু টাকা বের করে দেখিয়ে বলল,
-“গতকাল বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলাম উপন্যাসের বই কেনার জন্য।”
তাসনিম হাই তুলে বলল,
-"কোন লেখকের বই নিবি?”
তাসিফা মুচকি হেসে সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“অবশ্যই হুমায়ূন আহমেদের।”
সাদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“আচ্ছা, চল তাহলে।”
চারজন আর দেরি করল না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে নীলক্ষেতের উদ্দেশ্যে হাঁটা ধরল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত চত্বর পেরিয়ে তারা ধীরে ধীরে নীলক্ষেতের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। দুপুরের ব্যস্ততা তখনও পুরোপুরি কমেনি। রাস্তায় শিক্ষার্থী, পথচারী আর বিভিন্ন কাজে বের হওয়া মানুষের আনাগোনা। কেউ দ্রুত পায়ে নিজের গন্তব্যের দিকে ছুটছে, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে চারজনের মধ্যেও নানা কথা চলতে লাগল। কখনো তাসনিম আর তাসিফা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে, কখনো ইয়াশ মজা করে সাদকে খোঁচা দিচ্ছে। ব্যস্ত রাস্তার কোলাহল, গাড়ির শব্দ আর মানুষের কথাবার্তার মাঝেই একসময় তাদের সামনে নীলক্ষেতের পরিচিত ব্যস্ততা চোখে পড়ল।
নীলক্ষেতে ঢুকতেই চারপাশের দৃশ্যটাই যেন বদলে গেল।
দুই পাশজুড়ে সারি সারি বইয়ের দোকান। দোকানের সামনে এবং ফুটপাতজুড়ে থরে থরে সাজানো অসংখ্য বই। কোথাও নতুন বইয়ের ঝকঝকে প্রচ্ছদ, আবার কোথাও পুরোনো বইয়ের স্তূপ। উপন্যাস, গল্পের বই, কবিতার বই, একাডেমিক বই, কী নেই সেখানে।
কোনো দোকানের সামনে কয়েকজন শিক্ষার্থী বইয়ের স্তূপ ঘেঁটে পছন্দের বই খুঁজছে। কেউ দোকানদারের সঙ্গে বইয়ের দাম নিয়ে দরদাম করছে, আবার কেউ হাতে কয়েকটি বই নিয়ে দাঁড়িয়ে পৃষ্ঠা উল্টে দেখছে।
চারপাশে বইয়ের গন্ধ, মানুষের কোলাহল আর দোকানিদের ডাকাডাকিতে পুরো নীলক্ষেত যেন সবসময়ই ব্যস্ত ও প্রাণবন্ত।
তাসিফার চোখ অবশ্য ততক্ষণে চারপাশের বইয়ের দিকে আটকে গেছে। এক দোকান থেকে আরেক দোকানের দিকে তাকাতে তাকাতে তার মুখে ফুটে উঠল মুগ্ধতার হাসি।
তাসনিম সেটা দেখে হেসে বলল,
-“তোকে দেখে মনে হচ্ছে, আজ সব বই কিনে ফেলবি।”
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“সব গুলো কিনা সম্ভব না।"
এরপর তাসিফা আর দেরি না করে একটা বইয়ের দোকানে ঢুকে পড়ল।
দোকানের ভেতরে ঢুকেই চারপাশে সাজানো বইগুলোর দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকাতে লাগল সে। তারপর হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি বইয়ের নাম দোকানদারকে বলে সেগুলো দেখাতে বলল।
দোকানদার একে একে বইগুলো বের করে সামনে রাখতেই তাসিফা বইগুলোর প্রচ্ছদ দেখছিল, আবার কোনোটা হাতে নিয়ে কয়েক পৃষ্ঠা উল্টে দেখছিল। পছন্দ হওয়া বইগুলো আলাদা করে পাশে রাখতে লাগল সে।
অন্যদিকে তাসনিমের অবশ্য হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের প্রতি তেমন আগ্রহ নেই। তার পছন্দ ফেসবুকের লেখিকাদের লেখা উপন্যাস। তার মতে, হুমায়ূন আহমেদের লেখাগুলো একটু বেশি ম্যাচিওর পাঠকদের জন্য। তাই তাসিফা যখন হুমায়ূন আহমেদের বই নিয়ে ব্যস্ত, তাসনিম তখন দোকানের অন্য পাশে দাঁড়িয়ে ফেসবুক লেখিকাদের লেখা বইগুলো দেখছিল। পছন্দ হলে হয়তো একটা-দুটো কিনবে।
এদিকে তাসিফা আর তাসনিমের দুই ব্যাগই তখন সাদ আর ইয়াশের হাতে। দুজনও বেশ দায়িত্ব নিয়ে তাদের সঙ্গে ঘুরছে। ভিড়ের মধ্যে তাসিফা আর তাসনিম যেন কোনো ঝামেলায় না পড়ে, সেদিকেও খেয়াল রাখছে তারা।
বেশ কিছুক্ষণ বই দেখার পর শেষ পর্যন্ত তাসিফা ছয়-সাতটি হুমায়ূন আহমেদের বই পছন্দ করে ফেলল। একে একে বইগুলো দোকানদারের হাতে দিয়ে দাম জিজ্ঞেস করল।
নীলক্ষেতে তুলনামূলক কম দামে বই পাওয়া যায় বলে তাসিফার নেওয়া বইগুলোর মোট দামও তার বাজেটের মধ্যেই রয়ে গেল।
টাকা পরিশোধ করে বইগুলো হাতে নিতেই তাসিফার মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। নিজের পছন্দের এতগুলো বই একসঙ্গে কিনতে পেরে বেশ খুশি সে।
----
গরমের মধ্যে নীলক্ষেতে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করায় চারজনই তখন একেবারে ক্লান্ত। হাতে একগাদা বই, শরীরটাও ঘামে জবজবে। তাই আর বেশি ঘোরাঘুরি না করে সবাই পাশের একটি ক্যাফেতে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকে একটা টেবিলে চারজন পাশাপাশি বসে পড়ল। কিছুক্ষণ পর চার গ্লাস লেমন কোল্ড ড্রিংক অর্ডার করা হলো। ঠান্ডা পানীয় সামনে আসতেই সবাই যেন একটু স্বস্তি পেল।
সবাই যখন নিজেদের মতো করে কোল্ড ড্রিংক খাচ্ছিল, হঠাৎ ইয়াশ বেশ উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
-"গাইস, একটা টিউশন পেয়েছি। বাসার কাছেই।”
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“বাহ, দারুণ তো!”
ইয়াশ মাথা নাড়তে নাড়তে বলল,
-"কিন্তু আমি এখন থেকেই ভাবতেছি, প্রথম দিন নাশতায় কি খাওয়াবে? বিরিয়ানি নাকি কাচ্চি, মামা?"
ইয়াশের কথা শুনে বাকি তিনজনের চোয়াল একেবারে ঝুলে গেল।
তাসনিম বিরক্ত মুখে বলল,
-"খাসির মাংস দেবে তোকে, জানোয়ার!”
ইয়াশের চোখ চকচক করে উঠল আর বলল,
-"সত্যিই?”
তাসিফা মুখ কুঁচকে বলল,
-“ধুর শালা! খেতে যাবি নাকি পড়াতে?”
ইয়াশ দাঁত কেলিয়ে বলল,
-“দুটোই।”
সাদ হেসে মাথা নাড়ল আর বলল,
-"শেম অন ইউ, ব্রুহ!”
ইয়াশ হাত নেড়ে বলল,
-“যাহ, ফুট।"
ইয়াশের কথা শুনে তিনজনই হেসে ফেলল। ক্লান্তির মাঝেও চার বন্ধুর আড্ডায় মুহূর্তেই আবার হাসির আমেজ ফিরে এলো।
----
বাসায় ফিরেই তাসিফা ফ্রেশ হওয়ার কথাটাও ভুলে গেল। বাইরে প্রচণ্ড গরমে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করায় শরীরটা একেবারে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তাই বিছানায় বসে ব্যাগটা একপাশে রেখে ধীরে ধীরে শরীরটা এলিয়ে দিল।
কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকার পর হঠাৎ করেই জুয়িনের কথা মনে পড়ল তার।
লোকটার নেশা কেটেছে কিনা, সেটা নিয়ে একটু চিন্তা হলো তাসিফার। তার ওপর জুয়িন ইদানীং তাকে কেন এড়িয়ে চলছে, সেটাও কিছুতেই বুঝতে পারছে না সে।
বেশ কিছুক্ষণ ভাবার পর তাসিফা ঠিক করল, সন্ধ্যায় জুয়িনের সঙ্গে কথা বলবে। সরাসরি জিজ্ঞেস করবে, ব্যাপারটা আসলে কী।
আর জুয়িন যদি তার কথা শুনতেই না চায়, তাহলে? তাসিফা ভ্রু কুঁচকে ভাবল, দরকার হলে একটা ঘুষি দিয়েই আগে মনোযোগটা নিজের দিকে আনবে।
ভাবনাটা মনে আসতেই নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল সে।