ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 37

লেখক: মিশু

----

সন্ধ্যা নামতেই তৈরি হয়ে ছাদে চলে এলো তাসিফা। কয়েকদিন ধরে জুয়িনের আচরণ তার কাছে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। অকারণে তাকে এড়িয়ে চলা, কথাবার্তা না বলা, সব মিলিয়ে তাসিফার ভেতরেও একটা অস্বস্তি কাজ করছে।

আজ আর দূর থেকে এসব ভাবতে রাজি নয় সে। সরাসরি জুয়িনের সঙ্গে কথা বলবে। কী হয়েছে, কেন এমন করছে, সবকিছু জিজ্ঞেস করবে।

জুয়িনের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল তাসিফা। তারপর দরজায় হালকা করে নক করল।

ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলো না। তাসিফা আবারও নক করল। এবারও কোনো উত্তর নেই।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তৃতীয়বার দরজায় নক করতেই ভেতর থেকে নড়াচড়ার শব্দ পাওয়া গেল। কয়েক মুহূর্ত পর দরজাটা খুলে গেল।

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুয়িনকে দেখে তাসিফা একটু থমকে গেল।

বোঝাই যাচ্ছে, ছেলেটা সবে ঘুম থেকে উঠেছে। বিকেলে একটু চোখ লেগে গিয়েছিল তার, সেই ঘুম এখন ভেঙেছে। চোখ দুটো এখনও ঘুমে ভারী হয়ে আছে। এলোমেলো চুলগুলো কপালের ওপর এসে পড়েছে। পরনে সাদা টি-শার্ট আর গ্রে রঙের ট্রাউজার।
জুয়িনও তাসিফাকে দেখে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।

তারপর কোনো কথা না বলে দরজাটা আবার বন্ধ করে দিতে গেল।

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে হাত বাড়িয়ে দরজাটা আটকে দিল আর বলল,
-“এই! দরজা বন্ধ করছেন কেন?”

জুয়িন কিছু বলল না। বরং দরজাটা টেনে বন্ধ করার চেষ্টা করতেই তাসিফা তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ঢোকার সময় জুয়িনকে হালকা ধাক্কাও দিয়ে ফেলল।

জুয়িন এবার বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকাল। ঘুমঘুম চোখের সেই ভাবটা মুহূর্তেই কেটে গেল।
রাগী গলায় বলল,
-“ওয়াট'স ইউর প্রবলেম, মিসেস?”

তাসিফা কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য থতমত খেয়ে গেল। তারপর অবাক হয়ে বলল,
-“ফাহহ! আমি কবে থেকে মিসেস হলাম?”

জুয়িনের মুখের রাগ আরও গাঢ় হলো। সে তাসিফার হাত ধরে তাকে দেয়ালের কাছে থামিয়ে দিয়ে নিচু, গম্ভীর গলায় বলল,
-"বেয়াদব মেয়ে। আমার সঙ্গে নাটক করিস? একবারে একটা থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেব।”

জুয়িনের এমন রাগী আচরণে তাসিফা ভয় পেয়ে চোখ শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল। গলাতেও ভয় স্পষ্ট।
-“কী আজেবাজে কথাবার্তা বলছেন আপনি?!”

জুয়িন তৎক্ষণাৎ বলল,
-"কী আজেবাজে কথা বললাম? যা সত্যি, সেটাই তো বললাম। বেয়াদব কোথাকার!”

তাসিফা এবার চোখ না খুলেই বলল,
-"আপনি কী বলতে চাইছেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। পরিষ্কার করে বলুন।”

জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে তাসিফার হাত ছেড়ে দিল।

নিজেকে সামলে নিতে কয়েকবার গভীরভাবে শ্বাস নিল সে। ঘরের ভেতর হঠাৎ করেই একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো।

তাসিফাও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে চোখ মেলে জুয়িনের দিকে তাকাল। তারপর এক পা এগিয়ে গিয়ে জুয়িনের গালে হাত রাখল। আর নরম স্বরে বলল,
-"আপনি আমাকে ইগনোর করছেন কেন?”

জুয়িন এবার তার চোখের দিকে তাকাল। কণ্ঠটা আগের মতো রাগী নয়। বরং অনেকটা শান্ত করে বলল,
-“তুই বিয়ে করেছিস কেন?”

কথাটা শুনে তাসিফার হাতটা জুয়িনের গালেই থেমে গেল।

কয়েক মুহূর্ত সে শুধু জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন কথাটার অর্থই বুঝতে পারছে না।
তারপর ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে অবাক গলায় বলল,
-"কিসের বিয়ে?”

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
তাসিফা এবার আরও অবাক হয়ে বলল,
-“আমি কোনো বিয়ে-টিয়ে করিনি তো!”

জুয়িনের চোখে এবার বিস্ময় ফুটে উঠল আর বলল,
-“তাহলে ইয়াশ আমাকে কী বলল?”

তাসিফা চুপ করে রইল।
জুয়িন এবার বলল,
-“ও বলল, তুই নাকি তোর ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে করেছিস।”

তাসিফার মুখের বিস্ময় এবার যেন আরও বেড়ে গেল। সে বলল,
-“মানে?!”

কিছুক্ষণ জুয়িনের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ সবকিছু বুঝতে পেরে তাসিফা বলল,
-“ওটা প্র্যাঙ্ক ছিল।”

জুয়িন কিছু বলল না।

তাসিফা এবার ব্যাখ্যা করে বলল,
-“আমি ‘ভণ্ডপার্টির’ সঙ্গে মজা করেছিলাম। এমন কিছুই হয়নি। বিয়ে তো দূরের কথা, আমি কাউকে বিয়েই করিনি!”

জুয়িন যেন এখনও কথাটা হজম করার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পর অবিশ্বাসী গলায় বলল,
-“সিরিয়াসলি?”

তাসিফা এবার আর অবাক হলো না। বরং তার মুখের হাসিটুকুও মিলিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে বলল,
-“আপনি এতদিন আমাকে এই কারণে ইগনোর করেছেন?”

জুয়িন চুপ।

তাসিফার গলায় এবার অভিমান স্পষ্ট হয়ে উঠল।সে বলল,
-“আমার প্রতি আপনার এতটুকুও বিশ্বাস নেই?”

জুয়িন কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।

তাসিফা নিচু গলায় বলল,
-"আপনি একবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন। একবারও যদি জিজ্ঞেস করতেন, তাহলে তো আমি আপনাকে সবটা বলতাম।”

জুয়িন অসহায়ভাবে বলল,
-“আমি কীভাবে জানতাম এত কিছু?”

কথাটা শুনেই তাসিফার মুখটা মলিন হয়ে গেল।

সে আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখের কোণে জমে ওঠা পানিটুকু জুয়িন যেন দেখতে না পায়, সেজন্যই হয়তো মুখটা আড়াল করল।
কিন্তু চোখের পানি সবসময় ইচ্ছেমতো লুকিয়ে রাখা যায় না।
তাসিফা চুপচাপ চোখের পানি সামলানোর চেষ্টা করতে লাগল।

জুয়িনও এবার বুঝতে পারল, ব্যাপারটা শুধু রাগের নয়। তার একটা ভুল ধারণার কারণে তাসিফা সত্যিই কষ্ট পেয়েছে।
নিজের ভুলটা উপলব্ধি হতেই জুয়িনের গলার স্বর নরম হয়ে এলো।
-“আই’ম সরি, তাসিফা।”

তাসিফার কাছ থেকে উত্তর এলো না। সে আগের মতোই মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

জুয়িন আরও একটু কাছে গিয়ে ধীরে বলল,
-“সরি। আমার এমন করা উচিত হয়নি। তোর মুখ থেকে সত্যিটা শোনার পর সবকিছু বিবেচনা করা উচিত ছিল। তোকে না জিজ্ঞেস করে এভাবে দূরে সরে যাওয়া আমার ভুল হয়েছে।"

তাসিফা তবুও চুপ।

জুয়িন এবার আরও নরম গলায় বলল,
-“আই’ম রিয়েলি সরি, সোনা।”

তাসিফার চোখ থেকে এবার একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল।
সে দ্রুত হাতের পিঠ দিয়ে চোখটা মুছে নিল। তারপরও জুয়িনের দিকে তাকাল না।

কিছুক্ষণ পর জুয়িনের সামনে থেকে সরে গিয়ে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তাসিফা।

জুয়িন তাকে ডাকল না। শুধু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাসিফার যাওয়া দেখল। তাকে থামানোর সুযোগই যেন পেল না সে।

দরজার সামনে দাঁড়িয়ে জুয়িন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। নিজের কাছেই নিজেকে কেমন অপরাধী মনে হচ্ছে। একটা ভুল বোঝাবুঝির কারণে এতদিন তাসিফাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে সে। অথচ একবার যদি মেয়েটার কাছে সরাসরি জানতে চাইত, তাহলে এতকিছু হতো না।

জুয়িন ধীরে ধীরে নিজের চুলে হাত চালিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
-“কাল যেভাবেই হোক, তাসিফার রাগ ভাঙাতেই হবে।”

----

তাসিফা নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে সোজা নিজের ঘরে চলে গেল। ঘরে ঢুকেই দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল সে।
তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে না থেকে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।

মনের ভেতরটা তখন রাগ, অভিমান আর কষ্টে একাকার হয়ে আছে। জুয়িনের কথা মনে পড়তেই আবারও রাগে মুখটা গরম হয়ে উঠল তার।

মনে মনে জুয়িনকে হাজারটা গালি দিতে লাগল তাসিফা।

লোকটা যাচাই-বাছাই না করেই তাকে ভুল বুঝে বসে ছিল।একবারও তাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেনি। এতদিন ধরে অকারণে ইগনোর করেছে, দূরে দূরে থেকেছে, আর এখন এসে বলছে, ‘সরি’!

তাসিফার অভিমান যেন কিছুতেই কমছে না।

কিছুক্ষণ মেঝেতে বসেই রইল সে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা মোবাইলটা তুলে নিল।

স্ক্রিনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ তার মাথায় একটা কথা এলো।

ইয়াশই তো জুয়িনকে বলেছিল, সে নাকি তার ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে করেছে। অথচ সেই কথার ওপর ভিত্তি করেই জুয়িন এতদিন তাকে ভুল বুঝে বসে ছিল।

ভাবতেই তাসিফার আবারও রাগ উঠে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
-“সবকিছুর জন্য ওই ইয়াশ্শাই দায়ী!”
বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করতে করতে তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশের নাম্বার বের করল।

এক মুহূর্তও দেরি না করে ইয়াশকে কল দিয়ে দিল সে। মোবাইলটা কানে ধরে রাগী মুখে অপেক্ষা করতে লাগল তাসিফা।

আজ ইয়াশের কাছ থেকে পুরো হিসাব নেওয়া হবে।

কয়েকবার রিং হতেই ইয়াশ কলটা ধরল।
-“হ্যালো, বান্ধুবি ললিতা।"

তাসিফা রাগে গজগজ করে বলল,
-“কুত্তার বাচ্চা! তোর বান্ধুবি ললিতার গুষ্টি কিলাই!”

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে সাবধানী গলায় বলল,
-“কিতারে? চেইত্তা আছস ক্যান?”

-“চেত্তাম না? তুই জুয়িন ভাইয়াকে কী বলছিলি? আমার নাকি আমার ফুফাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে!”

ইয়াশ কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে হঠাৎ জিহ্বায় কামড় দিল। সে বলল,
-“যাহ শালা! ভুলেই গেছিলাম!”

তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-"কী ভুলে গেছিলি?”

-“পরের আপডেটটা জুয়িন ভাইকে জানাতে। তুই যখন আমাদের বললি তোর বিয়ে হয়ে গেছে, তখন আমি তো জুয়িন ভাইকে কল করে খবরটা দিয়ে দিয়েছিলাম। পরে তুই যে প্র্যাঙ্ক করছিলি, সেটা জানাতেই ভুলে গেছিলাম!”

তাসিফা রাগে চেঁচিয়ে উঠল, -“জানোয়ার! তোর জন্য জুয়িন এই দুই দিন আমাকে ইগনোর করেছে।”

ইয়াশের গলায় কোনো অপরাধবোধ তো এলই না, উল্টো ফিক করে হেসে বলল,
-“ওয়াও! তারপর?”

তাসিফা আর কিছু বলল না। ইয়াশকে আরও একটা গালি দিয়ে রাগ করে কলটা কেটে দিল।

এরপর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, কয়েকদিন জুয়িনের সঙ্গে সে নিজে থেকে কোনো কথা বলবে না।

----

পরের দিন ভার্সিটিতে এসে পৌঁছাল তাসিফা। এসেই ভণ্ডপার্টির সঙ্গে মাঠের নরম ঘাসের ওপর বসে পড়ল। তবে অন্যদিনের মতো আজ তার মুখে হাসি নেই। মুখটা ফুলিয়ে বসে আছে সে। চোখেমুখে স্পষ্ট অভিমানের ছাপ।

ভণ্ডপার্টিরা অবশ্য কারণটা জানে। তাই ইচ্ছে করেই কেউ তাসিফাকে জুয়িনের প্রসঙ্গ তুলে খোঁচাচ্ছে না।

এর মধ্যেই হঠাৎ কোথা থেকে একটা পিচ্চি ছেলে হাতে একটা গোলাপ নিয়ে তাদের সামনে এসে দাঁড়াল।

ছেলেটাকে দেখে সবাই একটু অবাক হলো।

পিচ্চিটা কোনো দিকে না তাকিয়ে সোজা তাসিফার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হাতে থাকা গোলাপটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"ভাবি, এইডা ভাইয়া দিছে।”

তাসিফা অবাক হয়ে ফুলটার দিকে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে ফুলটা হাতে নিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-“কোন ভাইয়া দিয়েছে?”

ছেলেটা ফোকলা দাঁতে মিটমিট করে হাসল।
-“এডা কইলে ভাইয়া আমারে বকবো।”

-“আরে বলো তো! কোন ভাইয়া?”

ছেলেটা এবার আর কিছু না বলে খিলখিল করে হেসে উঠল আর বলল,
-“কইতে পারুম না।”

বলেই এক দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল।

তাসিফা হতভম্ব হয়ে ছেলেটার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

ইয়াশ ভ্রু তুলে বলল,
-“এইটা আবার কী শুরু হইল?”

সাদ হেসে বলল,
-"মনে হয় কারও কপালে আজকে গোলাপ জুটছে।”

তাসনিম কিছু না বলে মুচকি হাসল।

তাসিফা অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। ফুলটার দিকে তাকিয়ে আবারও চোখ সরিয়ে নিল।

কিন্তু মিনিট দুয়েক পরেই সেই পিচ্চিটা আবার ফিরে এলো।
এবার তার হাতে আরও একটা গোলাপ। তাসিফার সামনে এসে ফুলটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"এইডাও আমনের লাইগা।”

তাসিফা এবার পুরোপুরি বেকুব হয়ে গেল। সে বলল,
-“আবার?”

পিচ্চি মাথা নাড়ল আর বলল,
-“হ।”

ফুলটা হাতে দিয়েই আবার দৌড় দেওয়ার চেষ্টা করতেই তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ধরে ফেলল আর বলল,
-"এই দাঁড়াও।"

পিচ্চি থেমে গেল।

তাসিফা চোখ সরু করে তাকিয়ে বলল,
-“সত্যি করে বলো তো, তোমাকে কে পাঠিয়েছে, বাচ্চু?”

পিচ্চি এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আশপাশে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করল, যেন ভীষণ গোপন কোনো তথ্য দিতে যাচ্ছে।

তারপর তাসিফাকে কাছে আসার ইশারা করল।
-“ভাবি, কাছে আহেন।”

তাসিফা একটু ঝুঁকে কাছে যেতেই পিচ্চিটা গলার স্বর একেবারে নামিয়ে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
-“ওইযে কিছুডা দূরে বাইকের উপ্রে বইয়া কালা জ্যাকেট পইরা যে ভাইয়াডা আছে, হেইডাই আমারে পাঠাইছে।”

পিচ্চির কথা শুনে তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে তার দেখানো দিকটায় চোখ ফেরাল। ভণ্ডপার্টির বাকিরাও আর কৌতূহল সামলাতে না পেরে একসঙ্গে সেদিকে তাকাল।

কিছুটা দূরে  বাইকের ওপর বসে আছে জুয়িন। পরনে কালো লেদার জ্যাকেট। এক হাত বাইকের হ্যান্ডেলে রাখা। পাশে দাঁড়িয়ে আছে রিদ আর সিয়াম।

আর সবচেয়ে বড় কথা, জুয়িনের দৃষ্টি একদম তাসিফার ওপর স্থির। ঠোঁটের কোণে লেগে আছে সেই চেনা মুচকি হাসি।

দৃশ্যটা দেখেই ইয়াশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। লাফ দিয়ে উঠে বলল,
-"শালা! ভার্সিটিতে পড়তে আইসা এখন মানুষের লুতুপুতু প্রেম কাহিনি দেখতে হয়!”

সাদ সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
-“ঢং দেখছস এদের? ভাইরে ভাই! সরাসরি ফুলের ব্যবসা শুরু করছে।”

তাসনিম হেসে ফেলল।

তাসিফা অবশ্য কারও কথার উত্তর দিল না। শুধু একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। জুয়িনও ঠিক তখনই তার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসল।

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।

মনে মনে বিড়বিড় করল,
-"ফুল দিলেই সব মাফ? একদম না।"

কয়েকদিন কথা বলবে না সে এই লোকটার সঙ্গে। এটা তার শাস্তি।

তবে হাতে ধরা গোলাপ দুটো সে ফেলে দিল না। বরং নিঃশব্দে নিজের কাছেই রেখে দিল।

অভিমান যতই থাকুক, ফুল দুটো কেন যেন হাতছাড়া করতে ইচ্ছে হলো না।

আর পিচ্চিটা ততক্ষণে নিজের দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করে ফেলেছে। মুখে ফোকলা দাঁতের হাসি নিয়ে দৌড়ে চলে গেছে অন্যদিকে।

তাসিফা ফুল দুটোর দিকে তাকিয়ে আবারও মুখ ফুলিয়ে বসল।

আর অন্যদিকে জুয়িন দূর থেকে তাসিফার দিকেই তাকিয়ে আছে। জিহ্বা দিয়ে মুখের ভেতরটা এপাশ-ওপাশ করছে সে, আর ঠোঁটের কোণে ফুটে আছে দুষ্টু এক মুচকি হাসি।

-----

তাসিফা তার বন্ধুদের সঙ্গে ক্লাসে চলে গেল। ততক্ষণে ক্লাস শুরু হয়ে গেছে। চারজন নিজেদের সিটে গিয়ে বসে পড়ল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই মনোযোগ দিয়ে ক্লাসে ব্যস্ত হয়ে গেল। কিন্তু তাসিফার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।

সে মাথা নিচু করে বেঞ্চের ওপর কনুই রেখে বসে রইল। চোখ দুটো বন্ধ। ক্লাসে স্যারের কথা কানে গেলেও সেদিকে মন দেওয়ার মতো মানসিকতা নেই তার।

কেমন যেন ভালো লাগছে না কিছুই। জুয়িনের ওপর অভিমানটা এখনো মনের ভেতর জমে আছে।

-----

দুইটা ক্লাস শেষ হতেই ভণ্ডপার্টির সবার পেটে ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিল। আর দেরি না করে চারজন মিলে ক্যানটিনে চলে এলো।

একটা টেবিল খালি পেয়ে সবাই সেখানে গিয়ে বসেছে মাত্র। তাসিফা চুপচাপ বসে আছে, মুখটা এখনো ভার করে রাখা।

এর মধ্যেই বাইরে থেকে কিনে আনা বিরিয়ানির একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে একটা ছেলে তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল।

কোনো কথা না বলে প্যাকেটটা তাসিফার সামনে রেখে দিল।

তাসিফা অবাক হয়ে প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল, -“এটা কার?”

ছেলেটা হেসে বলল, -"আসসালামু ভাবি। আমি রাসেল। এই বিরিয়ানিটা ভাইয়া আপনাকে দিতে বলেছে।”

তাসিফা কিছু বলার আগেই ইয়াশ চেয়ার থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
-“ভাইয়া কি শুধু তাসিফাকেই দিতেছে সব? আমাদেরও কিছু দেক!”

তাসনিম ফিক করে হেসে ফেলল আর বলল,
-“একদম!”

রাসেল একটু অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকে বলল,
-“আমাকে ভাইয়া শুধু এক প্যাকেট আনতে বলছে। তাই আরকি।"

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-“এক প্যাকেট আনতে বলছে, তাহলে আমাদের কথা একবারও বলল না?”

রাসেল কী বলবে বুঝতে না পেরে শুধু মুচকি হাসল।

ঠিক তখনই ক্যানটিনের দরজা দিয়ে জুয়িন তার দুই বন্ধু রিদ আর সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে ঢুকল।

ভেতরে ঢুকেই তার চোখ গিয়ে পড়ল তাসিফার ওপর।
তাসিফাও ঠিক তখনই সেদিকে তাকাল। ফলে মুহূর্তেই দুজনের চোখে চোখ পড়ে গেল। আর সেই সুযোগে জুয়িন ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তাসিফাকে এক চোখ টিপে দিল।

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ ভেংচিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।

জুয়িনের ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে আর কিছু না বলে সোজা তাসিফাদের টেবিলের কাছে এসে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ল। তার সঙ্গে রিদ আর সিয়ামও বসে গেল।

জুয়িনকে বসতে দেখে আশপাশের কয়েকজন স্টুডেন্টও কৌতূহলী চোখে তাদের টেবিলের দিকে তাকাতে শুরু করল।

জুয়িন সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে বলল,
-“তোমরা ক্যানটিন থেকে যা খেতে চাও অর্ডার করো। বিল আমি দেব।”

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে দাঁত কেলিয়ে বলল,
-“তা হবে না।”

জুয়িন ভ্রু তুলে তাকাল।

ইয়াশ তাসিফার সামনে রাখা বিরিয়ানির প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, -“আমরাও বাইর থেকে আনা বিরিয়ানি খাবো। ক্যানটিনের বিরিয়ানি মজা নাই।”

তাসনিম আবারও হেসে ফেলল।

জুয়িন ধীরে ধীরে ইয়াশের দিকে তাকাল। চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।

নিজের জীবনে ইয়াশের মতো এমন বাঁদর একটাও দেখেনি জুয়িন। তার ওপর এই বাঁদরটা আবার তার জুনিয়র। এই সত্যিটাই মাঝে মাঝে জুয়িনের কাছে জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য বলে মনে হয়।

জুয়িন ফোস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে রাসেলের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-“যা, আরও ছয় প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আয়। আর যে টাকা বাঁচবে, সেটা তুই নিয়ে যাস।”

রাসেলের চোখ মুহূর্তেই চকচক করে উঠল। এতক্ষণে যেন তার মুখে লটারি জেতার হাসি ফুটে উঠেছে। সে খুশিতে মাথা নেড়ে টাকা নিয়ে ছুটে গেল বিরিয়ানি আনতে।

তাসিফা এতক্ষণ চুপচাপ চোখ নামিয়ে বসে আছে। রাগ করে আছে ঠিকই, কিন্তু জুয়িনের এমন কাণ্ডে রাগের মাঝেও কেমন যেন লজ্জা লাগছে তার।

একসময় সাহস করে চোখ তুলে জুয়িনের দিকে তাকাতেই দেখল, জুয়িনও ঠিক তার দিকেই তাকিয়ে আছে।

চোখে চোখ পড়তেই তাসিফা
তড়িৎ গতিতে আবার চোখ নামিয়ে নিল।

অন্যদিকে ইয়াশ, সাদ আর তাসনিম ইতোমধ্যেই জুয়িনের বন্ধু রিদ আর সিয়ামের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে। সেই সুযোগটাই কাজে লাগাল জুয়িন।

সে তাসিফার চেয়ারটা আস্তে করে নিজের দিকে টানতে শুরু করল।

হঠাৎ চেয়ার নড়তে দেখে তাসিফা একটু চমকে গেল। কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর বুঝতে পারল, জুয়িনই তার চেয়ার টানছে। তাই আর কিছু বলল না।

জুয়িন চেয়ারটা টেনে একেবারে নিজের পাশের চেয়ারের সঙ্গে মিলিয়ে দিল। তারপর একটু ঝুঁকে তাসিফার কানে ফিসফিস করে বলল,
-“সরি, সোনা।”

তাসিফা কোনো উত্তর দিল না। শুধু চোখ নামিয়ে বসে রইল।

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে আবার বলল,
-“আমার জীবনে কাউকে সরি পর্যন্ত বলিনি। অথচ তোকে কতবার সরি বলছি, তবুও তোর রাগ কমছে না। মানছি, ভুল করেছি। তোর কথাটা আগে শুনে নেওয়া উচিত ছিল। একটা কথা শুনেই বিশ্বাস করে ফেলেছিলাম, সেটাই আমার ভুল। তবে একই ভুল দ্বিতীয়বার হবে না। ভবিষ্যতে তোকে নিয়ে কোনো কথা শুনলে আগে তোর কাছ থেকেই সত্যিটা জেনে নেব। আর এখনো যদি রাগ করে থাকিস, কর। তবে মনে রাখিস, আমি কিন্তু আমার ভুল স্বীকার করে সরি বলে দিয়েছি।”

তবুও তাসিফার কোনো উত্তর নেই।

তবে মুখ নিচু করে রাখলেও ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা মৃদু হাসিটা লুকাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার। ভেতরে ভেতরে যে তার ভীষণ হাসি পাচ্ছে, সেটা অবশ্য জুয়িনকে বুঝতে দিতে চায় না।

ঠিক তখনই রাসেল একসঙ্গে হাতে বিরিয়ানির কয়েকটা প্যাকেট নিয়ে ফিরে এলো আর বলল,
-“ভাইয়া, নিয়ে এসেছি।"

প্যাকেটগুলো টেবিলের ওপর রাখতেই মুহূর্তের মধ্যে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল।

সবাই নিজেদের প্যাকেট হাতে তুলে নিল।

কিছুক্ষণ আগেও তাসিফার মনটা রাগ আর অভিমানে ভার হয়ে ছিল। কিন্তু সবার সঙ্গে গল্প, হাসি-ঠাট্টা আর জুয়িনের এমন কাণ্ডে তার মনটাও ধীরে ধীরে একটু ভালো হয়ে গেল।

শেষ পর্যন্ত আর কিছু না ভেবে তাসিফাও নিজের সামনে রাখা বিরিয়ানির প্যাকেটটা খুলে সবার সঙ্গে খেতে বসে পড়ল। মুখে অভিমানটা এখনো পুরোপুরি কাটেনি, তবে আগের মতো মনটা আর খারাপ লাগছে না তার।

#চলবে

[ কেমন হয়েছে আজকের পর্বটা, অবশ্যই জানাবেন। আপনাদের মতামত কিন্তু আমার কাছে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী পর্বটা যত দ্রুত সম্ভব দেওয়ার চেষ্টা করব। তবে আগামীকাল হয়তো পর্ব দিতে পারব না। কারণ আজকে বাসায় মেহমান এসেছে, আর তাদের সঙ্গে একটু সময় স্পেন্ড করতে হবে। গল্পের জন্য আপনাদের অপেক্ষা করাতে আমারও ভালো লাগে না, কিন্তু কিছু করার নেই, মেহমান তো আর প্রতিদিন আসে না! তাই আগামীকালটা একটু পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়ে নিই। এরপর আবার গল্প নিয়ে হাজির হয়ে যাব। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন