#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
----
হোটেলের ভেতরে প্রবেশ করতেই জুয়িন আর তাসিফার চোখে পড়ল ভণ্ডপার্টি, রিদ আর সিয়ামকে। এতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে সবার মুখেই দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ভণ্ডপার্টির চোখেমুখে উৎকণ্ঠা, আর রিদ ও সিয়ামও বেশ চিন্তিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
হঠাৎ জুয়িন আর তাসিফাকে সামনে দেখতে পেয়েই ইয়াশ, তাসনিম আর সাদ যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ বুকের ভেতর জমে থাকা ভয়টা যেন এক মুহূর্তেই একটু হালকা হয়ে গেল।
কোনো কিছু না ভেবেই তিনজন একসঙ্গে তাসিফার দিকে ছুটে গেল।
তাসিফাকে দেখামাত্রই তিনজন মিলে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
ইয়াশ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তাসিফাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁপা গলায় বলল,
-“বেয়াদব! তুই কোথায় ছিলি? জানিস, আমরা কতটা ভয় পেয়েছিলাম?”
কথাটা বলতে বলতে ইয়াশের গলাটা ভারী হয়ে গেল। এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও তাসিফাকে চোখের সামনে সুস্থ অবস্থায় দেখার পর আর সেই চেষ্টা ধরে রাখতে পারল না।
তাসনিমও চোখের পানি মুছতে মুছতে তাসিফাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-“তুই তো আমাদের সাথেই গাড়িতে ছিলি! হঠাৎ গায়েব হলি কীভাবে? আমরা সবাই মিলে তোদের কত জায়গায় খুঁজেছি।"
সাদ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
-“তোরা দুজন কোথায় ছিলি? আমরা তো বুঝতেই পারছিলাম না কী করব। তোকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছিলাম না।”
তাসিফা এবার একেবারে মাইনকা চিপায় পড়ে গেল। একসঙ্গে তিনজনের এত প্রশ্নের উত্তর সে কীভাবে দেবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না।
কোনোমতে তিনজনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাসিফা ওদের দিকে তাকাল। বন্ধুদের চোখে পানি দেখে তার নিজের বুকটাও কেমন করে উঠল।
তাসিফা ক্লান্ত গলায় বলল,
-“আরে, আগে একটু ফ্রেশ হয়ে নিই? তারপর সব বলব। এখন কাঁদিস না তোরা। আমি ঠিক আছি।”
ইয়াশ চোখের পানি মুছে নাক টেনে বলল,
-“ঠিক আছিস বললেই হলো? আমরা তো ভাবছিলাম…”
কথাটা শেষ করতে পারল না সে। তাসনিম সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশের কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে তাসিফার কাঁধে হাত রাখল আর বলল,
-“আচ্ছা, আগে ওকে একটু ফ্রেশ হতে দে। তারপর ধীরে ধীরে সব শুনব।”
সাদও মাথা নেড়ে বলল,
-“হ্যাঁ। আগে ফ্রেশ হয়ে নে তুই। তারপর আমাদের সব খুলে বলবি।”
তাসিফা তিনজনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এই মানুষগুলোর এতটা ভয় পাওয়ার কারণটা সে বুঝতে পারছে। নিজের অজান্তেই ওদের কতটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল।
অন্যদিকে রিদ আর সিয়াম এগিয়ে এসে জুয়িনের সামনে দাঁড়াল। দুজনের চোখেমুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠেছে, তবে দুশ্চিন্তার রেশ তখনও পুরোপুরি কাটেনি।
রিদ জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"ভাই, তোদের নিয়ে আমরা তো শেষ পর্যন্ত চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম।”
সিয়ামও সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“হ্যাঁ রে! কোথায় গিয়েছিলি তোরা? কোনো খবরই পাচ্ছিলাম না।”
জুয়িন ক্লান্তভাবে নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
-“অনেক ঝামেলায় পড়েছিলাম। আগে ফ্রেশ হয়ে নিই। তারপর আমরা সব বলব।”
রিদ মাথা নেড়ে বলল,
-“আচ্ছা, ঠিক আছে। আগে ফ্রেশ হয়ে নে।”
এরপর তাসিফা ভণ্ডপার্টির সঙ্গে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। আর জুয়িনও রিদ ও সিয়ামের সঙ্গে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
----
হোটেলের রুমে ঢোকার পর তাসিফা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকার ক্লান্তি আর অস্বস্তি যেন পুরো শরীরজুড়ে জমে ছিল। তাই সোজা ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে প্রথমেই মুখে কয়েকবার ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে নিল তাসিফা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের দিকে একবার তাকাল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে, মুখেও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। হাত দিয়ে চুলগুলো একটু ঠিক করে আবারও মুখে পানি দিল। তারপর ভালোভাবে ফ্রেশ হয়ে নিল।
এদিকে, তাসিফা আর তাসনিমের রুমে তখন বিছানার ওপর পাশাপাশি বসে আছে তাসনিম, সাদ আর ইয়াশ।
তিনজনের মুখেই বেশ চিন্তার ছাপ। এতক্ষণ কোথায় ছিল তাসিফা আর জুয়িন,সেটা নিয়ে সবার মধ্যেই যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল। তাসিফা ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো। ফ্রেশ হওয়ার পর আগের তুলনায় তাকে অনেকটা স্বাভাবিক লাগছে। ভেজা মুখটা ওড়নার একপাশ দিয়ে আলতো করে মুছে নিল সে। তারপর চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে রুমের ভেতরে থাকা সাদ আর ইয়াশের দিকে তাকাল।
তাসিফা এসে বিছানায় বসল। তারপর ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“জুয়িন ভাইয়া আর রিদ-সিয়াম ভাইয়াদের ডেকে নিয়ে আয় এই রুমে, ইয়াশ।”
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। মাথা দুলিয়ে বলল,
-“আচ্ছা, যাচ্ছি।”
এই বলে সে জুয়িনদের রুমের দিকে চলে গেল।
কিছুক্ষণ পর জুয়িন, রিদ আর সিয়ামও ইয়াশের সঙ্গে তাসিফাদের রুমে এসে ঢুকল। সবাই মিলে বিছানার ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল। তাসিফা একপাশে, তার পাশে তাসনিম। অন্যদিকে সাদ, ইয়াশ, রিদ আর সিয়াম বসে আছে।
সবাই বসে যাওয়ার পর জুয়িন একবার তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফার মুখে তখনও ক্লান্তির ছাপ, তবে আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাভাবিক লাগছে তাকে।
জুয়িন গলা খাঁকারি দিয়ে আজকের পুরো ঘটনাটা সবাইকে খুলে বলল।
এগুলো শোনার পরই ভণ্ডপার্টির সবাই প্রায় একসঙ্গে লাফিয়ে উঠল।
ইয়াশ অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে একটা বালিশ তুলে নিজের মাথায় হালকা বাড়ি দিতে দিতে বলল,
-"ভাই, জীবনে কী করলাম! কেন গাড়ি মিস করলাম না? কেন ওই সময় আপনাদের সঙ্গে ছিলাম না? এমন একটা ঘটনা মিস করে ফেললাম।”
তার কাণ্ড দেখে সবাই হেসে ফেলল।
তাসনিম তখনও হা করে তাসিফা আর জুয়িনের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর অবাক গলায় বলল,
-"মানে,জুয়িন ভাই আর তাসিফা বিয়ে করে নিয়েছে?”
তাসনিমের সরাসরি প্রশ্নে জুয়িন খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে একবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল।
তাসিফা বিরক্ত মুখে বলল,
-“গ্রামের মানুষের ওপর আমার প্রচণ্ড রাগ উঠছে, ভাই। কী থেকে কী হয়ে গেল।”
রিদ আর সিয়াম একে অপরের দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসল। তারপর দুজনেই জুয়িনের দুই কাঁধে হাত রেখে তাকে হালকা দুলাতে দুলাতে বলল,
-“ওহো! জুয়িন আজ থেকে বিবাহিত।”
-“বাহ, অভিনন্দন জামাই সাহেব!”
জুয়িন বিরক্ত মুখে দুজনের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল,
-“তোরা দুজন একটু চুপ করবি?”
তাসিফা এবার চারপাশে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
-"একটা কথা। এটা শুধু আমরা যারা এখানে আছি, তারাই জানি। আর কেউ যেন এই ব্যাপারটা না জানতে পারে।”
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল আর বলল,
-“জানলে সমস্যা কী?”
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুখটা একটু ফুলিয়ে বলল,
-“প্লিজ, আমার কথাটা মানুন। কারণটা এখন বলতে পারব না।”
জুয়িন আর কিছু বলল না। তাসিফার কথাটা যে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বুঝে চুপ করে রইল।
তাসিফা আসলে চায় না এই বিয়ের খবরটা আপাতত ভার্সিটির কারও কানে যাক। এমনিতেই তাকে নিয়ে কম কথা হয় না। তার ওপর হঠাৎ করে এমন একটা খবর ছড়িয়ে পড়লে অযথা নানা ধরনের আলোচনা আর সমালোচনা শুরু হয়ে যেতে পারে। তাই বিষয়টা এখন নিজেদের মধ্যেই রাখতে চায় সে।
তাসনিম তাসিফার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
-“আল্লাহ যা করেন, ভালোর জন্যই করেন। এত চিন্তা করিস না, তাসিফা। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
ইয়াশ আবার দাঁত বের করে হাসল।
-“বিয়ে যখন হয়েই গেছে, তখন ট্রিট তো দিতেই হবে। কী বলেন, জুয়িন ভাই?”
তাসিফা আর জুয়িন দুজনেই একসঙ্গে ভ্রু কুঁচকে ইয়াশের দিকে তাকাল।
ইয়াশ অবশ্য তাতে দমল না।
তাসিফা উঠে গিয়ে ইয়াশের কাছে গেল। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় কিছু বলল।
কথাটা শুনে ইয়াশের মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। সে থতমত খেয়ে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“জুয়িন ভাই! আপনার বউ আমাকে বকাঝকা করছে!”
‘আপনার বউ’ কথাটা শুনেই তাসিফার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের জায়গায় গিয়ে বসে পড়ল।
রিদ, সিয়াম, সাদ আর তাসনিম হেসে উঠল। জুয়িনও ঠোঁটের কোণে হাসি লুকানোর চেষ্টা করল।
পরিস্থিতিটা একটু স্বাভাবিক হয়ে এলে তাসনিম হাততালি দিয়ে বলল,
-“আচ্ছা, এখন এসব বাদ দাও। সিরিয়াস কথা অনেক হয়েছে। চলো, সবাই ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি।"
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।
-“আমি খেলব না।”
কিন্তু ভণ্ডপার্টির বাকিরা ততক্ষণে তাকে ছাড়ার পাত্র নয়। সবাই মিলে জোরাজুরি শুরু করায় শেষ পর্যন্ত তাসিফাকেও রাজি হতে হলো।
ইয়াশ দ্রুত একটা বোতল নিয়ে এলো। সবাই বিছানার ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল। তাসিফা, তাসনিম, সাদ, ইয়াশ, রিদ, সিয়াম আর জুয়িন, সবাই মিলে খেলাটা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হলো।
তাসনিম বোতলটা মাঝখানে রেখে একবার জোরে ঘুরিয়ে দিল।
ঘুরতে ঘুরতে বোতলটা ধীরে ধীরে থেমে গিয়ে ঠিক ইয়াশের সামনে দাঁড়াল।
ইয়াশ প্রথমে কয়েক সেকেন্ড বোতলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হেসে বলল,
-“আমি ডেয়ার নেব।”
জুয়িন তখন থেকেই মুচকি হাসছিল। ইয়াশের দিকে তাকিয়ে সে বলল,
-"তাহলে ‘দুষ্টু কোকিল’ গানে নেচে দেখাও।”
কথাটা শুনে ইয়াশের মুখের হাসি মুহূর্তেই একটু ম্লান হয়ে গেল আর বলল,
-“এইটা?”
জুয়িন হেসে বলল,
-“হ্যাঁ, এইটাই।”
ইয়াশ নিজেকে সামলে নিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
-“এটা আমার জন্য কোনো ব্যাপারই না।”
জুয়িন নিজের মোবাইল বের করে গানটা চালু করে দিল।
গান শুরু হতেই ইয়াশ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। প্রথমে একটু ইতস্তত করলেও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিজের মতো করে নাচ শুরু করে দিল।
তার নাচের ভঙ্গি দেখে তাসিফা মুখ চেপে ফিক করে হেসে ফেলল। এরপর তাসনিম, সাদ, রিদ আর সিয়ামও নিজেদের হাসি ধরে রাখতে পারল না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো রুম অট্টহাসিতে ভরে গেল।
ইয়াশ অবশ্য সবার হাসিকে পাত্তা না দিয়ে নিজের নাচ চালিয়ে যেতে লাগল। বরং যত বেশি সবাই হাসছে, সে তত বেশি উৎসাহ নিয়ে নাচছে।
জুয়িনও বিছানায় বসে মুচকি হেসে তাকিয়ে রইল। আর তাসিফা হাসতে হাসতে একসময় মাথা নিচু করে ফেলল।
রুমের পরিবেশটাও মুহূর্তের মধ্যেই আগের সব দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দিয়ে একেবারে হালকা আর আনন্দময় হয়ে উঠল।
সবাই রাত দশটা পর্যন্ত হাসিঠাট্টা আর গল্পে মেতে রইল। জুয়িনও সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই হাসছে, মাঝেমধ্যে তাদের কথায় পাল্টা খোঁচাও দিচ্ছে।
তাসিফা একবার আনমনে জুয়িনের দিকে তাকাল।
ভাবতেই কেমন অদ্ভুত লাগে, এই মানুষটাই এখন তার স্বামী। আজ থেকে তারা দুজন স্বামী-স্ত্রী।
কথাটা মনে হতেই তাসিফার বুকের ভেতরটা কেমন এক অচেনা ভালো লাগায় ভরে উঠল।
অথচ এই মানুষটার সঙ্গে তার শুরুটা মোটেও এমন ছিল না। জুয়িন প্রথমদিকে তার সঙ্গে কতটা রূঢ় আচরণ করত! সামান্য কিছুতেই গম্ভীর হয়ে যেত, ধমক দিয়ে কথা বলত। তাসিফা তখন তাকে ভীষণ ভয় পেত। এমনকি জুয়িনের সঙ্গে প্রয়োজনের কথা বলতেও তার বুক ধড়ফড় করত।
আর এখন তো দুজন একে অপরের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে ঝগড়া করে। জুয়িন রাগ দেখালে তাসিফাও ছেড়ে কথা বলে না। সেই ভয় পাওয়া মেয়েটাই কখন যেন এই মানুষটার সামনে এতটা স্বচ্ছন্দ হয়ে গেছে।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই তাসিফার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশ সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এখন কি সমুদ্রের ওখানে যাওয়া যাবে?”
জুয়িন একটু ভেবে বলল,
-“হুম, যাওয়া যাবে। তোমরা যাবে?”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই সবাই এক পায়ে রাজি।
-“চলো।"
সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়াল। তারপর হাসিঠাট্টা করতে করতে নিচে নেমে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
রাতের ঠান্ডা বাতাস শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল। চারপাশ দিনের তুলনায় অনেক শান্ত। দূর থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের শব্দ আর অন্ধকার আকাশের নিচে বিশাল সমুদ্রটাকে যেন অন্যরকম সুন্দর লাগছিল।
একসময় সবাই সমুদ্রের পানির কাছে এসে দাঁড়াল।
তীরের কাছাকাছি গিয়ে সবাই জুতা খুলে পা ভিজিয়ে নিল। ঢেউ এসে পায়ের পাতায় আছড়ে পড়ছে, আবার ফিরে যাচ্ছে। এর মাঝেই কয়েকটা গ্রুপ ফটোও তুলে নিল সবাই।
রাতের সমুদ্র যেন দিনের সমুদ্রের চেয়েও আলাদা।
কিছুক্ষণ পর সবাই বালুর ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল। মাঝখানে আগুন জ্বলছে। ভণ্ডপার্টির কয়েকজন মিলে আশপাশ থেকে শুকনো ছোট ছোট কাঠি কুড়িয়ে এনেছে। রিদের কাছে দিয়াশলাই থাকায় শেষ পর্যন্ত আগুনটাও জ্বালানো সম্ভব হয়েছে।
আগুনের উষ্ণতা আর সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস, দুটো মিলে মুহূর্তটাকে আরও আরামদায়ক করে তুলেছে।
সাদ আর ইয়াশ পাশাপাশি বসে নিজেদের দিকে হেলান দিয়ে ছিল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎ ইয়াশ শান্ত গলায় বলল,
-“জানিস, আমার লাইফে আমি কখনো বার্থডে সেলিব্রেট করি নাই।”
কথাটা শুনে সবাই একসঙ্গে ইয়াশের দিকে তাকাল।
তাসিফা অবাক হয়ে বলল,
-“কেন?”
ইয়াশ কিছুক্ষণ আগুনের দিকে তাকিয়ে থেকে হালকা হেসে বলল,
-“এমনিই। শুধু এক-দুইজন মানুষ নিয়ে কি আর বার্থডে সেলিব্রেশন করা যায়? আম্মু-আব্বু নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে।”
কথাটা বললেও ইয়াশের হাসিটা এবার আগের মতো প্রাণবন্ত রইল না।
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“তোমার বার্থডে কবে?”
ইয়াশ এবার একটু হেসে বলল,
-“আর তিনদিন পর।”
সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
-“ওহ্।”
এরপর আর কেউ তেমন কিছু বলল না।
অদ্ভুতভাবে, এই নীরবতাটাও কারও খারাপ লাগল না।
সবাই গোল হয়ে বসে রইল। মাঝখানে আগুনটা ধীরে ধীরে জ্বলছে। সামনে বিশাল সমুদ্র, দূরে ঢেউয়ের একটানা শব্দ, আর মাথার ওপর নিস্তব্ধ রাতের আকাশ। ঠান্ডা বাতাসের মধ্যেও মুহূর্তটা যেন সবার কাছে ভীষণ আপন হয়ে উঠল।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে জুয়িন বলল,
-“সবার এখন ভেতরে যাওয়া উচিত। চলো, সবাই ভেতরে যাই।”
জুয়িনের কথায় সবাই সম্মতি জানাল। একে একে বালুর ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল সবাই। তারপর নিজেদের মধ্যে টুকটাক কথা বলতে বলতে সবাই হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
হোটেলের ভেতরে ঢোকার পরও কারও কথা থামল না। ইয়াশ আর সাদ নিজেদের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে তর্ক করতে করতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। রিদ আর সিয়ামও তাদের পেছন পেছন হাঁটতে লাগল।
অন্যদিকে, জুয়িন আর তাসিফা একটু পেছনে ছিল।
হাঁটার সময় তাসিফা একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই জুয়িনও তার দিকে তাকিয়ে ছিল। চোখাচোখি হতেই দুজনেই যেন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে অন্যদিকে তাকিয়ে নিল।
কিছুক্ষণ পর সবাই যে যার রুমে চলে গেল।
তাসিফা রুমে ঢুকেই বিছানার ওপর বসে পড়ল। চোখে তখন ঘুম ঘুম ভাব। কিছুক্ষণ আগেও এত মানুষের মাঝে বসে গল্প করছিল, অথচ রুমে আসতেই যেন ঘুমটা আরও বেশি করে চেপে বসল।
তাসনিম দরজা বন্ধ করে রুমের লাইটটা নিভিয়ে দিল। তারপর তাসিফার পাশে এসে শুয়ে পড়ল।
-“ঘুম পাচ্ছে?” তাসনিম নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল।
তাসিফা চোখ বন্ধ করেই বলল,
-“হুম। অনেক।”
তাসনিম আর কিছু বলল না। দুজন পাশাপাশি শুয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর তাসিফা পাশ ফিরে তাসনিমকে জড়িয়ে ধরল। তাসনিমও তাকে জড়িয়ে নিল।
কথাবার্তা আর এগোল না। কিছুক্ষণ পর দুজনেই ঘুমিয়ে পড়ল।
---
সকাল দশটা বাজতেই ভণ্ডপার্টির ঘুম ভেঙে গেল। আজ দুপুর বারোটার দিকে সবাই ইনানী বিচের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। তাই ঘুম থেকে উঠে সবাই নিজেদের মতো ফ্রেশ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তবে জুয়িন, রিদ আর সিয়ামের কোনো সাড়াশব্দ এখনও পাওয়া যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর ইয়াশ পেটের ওপর হাত রেখে কাতর গলায় বলল,
-“ভাই, ক্ষুধা লেগেছে অনেক।”
সাদ বলল,
-“জুয়িন ভাইয়ারা আসুক। একসঙ্গে নাশতা করব।”
ইয়াশ মুখ কুঁচকে বলল,
-“কী রে ভাই! জুয়িন ভাইরা কি মরার ঘুম দিছে যে এখনও উঠল না? বা*ল!”
তাসিফা এতক্ষণ চুপচাপই ছিল। তার কথায় তেমন কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখাল না।
তাসনিম এবার বলল,
-“চল, উনাদের ডেকে আসি।”
ইয়াশ সরু চোখে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল আর বলল,
-“প্রথমবার একটা ভালো আইডিয়া দিয়েছিস। চল, সবাই যাই।”
সবাই মিলে জুয়িনদের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পর তারা গিয়ে জুয়িনদের রুমের দরজার সামনে দাঁড়াল। ইয়াশ আর সাদ মিলে দুই-তিনবার দরজায় নক করল।
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না।
ইয়াশ বিরক্ত হয়ে বলল,
-“দেখি, সর সবাই। উনাদের উঠানোর দায়িত্ব এখন আমার।”
সবাই একটু দূরে সরে দাঁড়াতেই ইয়াশ নিজের শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল। মুখে ফুটে উঠল ভয়ংকর রকমের শয়তানি হাসি।
তারপর দরজায় হাত রেখে জোরে জোরে ধাক্কা দিতে শুরু করল।
-“ও জুয়িন ভাই! ও রিদ ভাই! ও সিয়াম ভাইয়েরা গো! দরজা খোলেন!”
তাসিফা, সাদ আর তাসনিম একসঙ্গে আশপাশে তাকাল।
হোটেলের করিডোরে কেউ তাদের দেখছে কি না, সেটাই যেন এখন সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। বাইরে থেকে কেউ দেখলে নিঃসন্দেহে ভাবত, এরা সবাই কোনো একটা দল বেঁধে পাগলামি করতে বেরিয়েছে।
ইয়াশ অবশ্য সেসবের তোয়াক্কা না করে আরও জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল।
-“দরজা খোলেন না কেন? খোলেন! সকাল হয়ে গেছে।”
অন্যদিকে, ইয়াশের চিৎকারে জুয়িন, রিদ আর সিয়াম তিনজনই একসঙ্গে আঁতকে ঘুম থেকে উঠে বসেছে
জুয়িন কয়েক সেকেন্ড চোখ কচলাতে কচলাতে চারপাশে তাকাল। তারপর বাইরে থেকে ইয়াশের চিৎকার শুনে বিরক্ত মুখে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
দরজার কাছে গিয়ে কোনো কথা না বলে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে ইয়াশকে দেখে জুয়িন ভ্রু কুচকে তাকালো।
ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে ভ্যাবলা হাসি দিয়ে বলল,
-“আমি ধাক্কা দিইনি। সাদ দিয়েছে।”
জুয়িন ধীরে ধীরে সাদের দিকে তাকাল।
সাদ সঙ্গে সঙ্গে দুই হাত জোড় করে কাঁদো-কাঁদো গলায় বলল,
-“মাফও চাই, দোয়াও চাই। আমি কিছু করি নাই, ভাই।”
ইয়াশ মুখ চেপে হাসতে লাগল।
তাসিফা এবার পরিস্থিতি সামলানোর জন্য বলল,
-“আপনারা ফ্রেশ হয়ে আসুন। একসঙ্গে নাশতা করব।”
জুয়িন তাসিফার দিকে একবার তাকাল আর বলল,
-"হুম।" তারপর আর কিছু না বলে মুখ ঘুরিয়ে ভেতরে চলে গেল।
রিদ আর সিয়ামও ঘুম জড়ানো মুখে একে অপরের দিকে তাকিয়ে উঠে পড়ল।
----
সবাই সকাল এগারোটার দিকে নাশতা করতে বসেছে। তাসিফা খেতে খেতেই আয়রা বেগমের সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
নাশতায় আজ তেহেরি ছিল। তেহেরি সবারই ভীষণ পছন্দের। তাই খাওয়ার পাশাপাশি টুকটাক কথাবার্তা আর হাসি-ঠাট্টাও চলছিল।
ইয়াশ খেতে খেতে বলল,
-“নীলক্ষেতের সেই হোটেলের তেহেরিটা অনেক মজা ছিল। এখনও মুখে লেগে আছে।”
সবাই হুম হা করে তার কথায় সায় দিল।
খেতে খেতে গল্প, টুকটাক কথাবার্তা আর হাসি-ঠাট্টায় কখন যে একটা ঘণ্টা কেটে গেল, কেউ খেয়ালই করল না। দেখতে দেখতে বারোটা বেজে গেল।
দুপুর বারোটার দিকে সবাই হোটেল থেকে বের হয়ে এল। হোটেলের সামনে তিনটি বাস আগে থেকেই দাঁড় করানো ছিল। সবাই যার যার বাসে উঠে নিজের পছন্দমতো জায়গায় বসতে শুরু করল।
জুয়িন, রিদ আর সিয়াম পেছনের দিকে গিয়ে বসতেই ভণ্ডপার্টিরাও একে একে সেদিকেই চলে গেল। পেছনের কয়েকটা সিটে সবাই মিলে জায়গা করে নিল। জুয়িন জানালার পাশের একটি সিটে বসেছিল। তাসিফা এসে তার পাশের সিটটায় বসে পড়ল। তাসনিম, ইয়াশ আর সাদও তাদের আশপাশের সিটগুলোতে বসে গেল।
সবাই উঠে বসার পর একটু সময় নিয়ে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে নিল। তারপর তিনটি বাস একে একে হোটেল থেকে বের হয়ে কলাতলী পেরিয়ে মেরিন ড্রাইভ ধরে ইনানীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
বাস কিছুটা এগিয়ে যেতেই ভেতরে গান ছেড়ে দেওয়া হলো।
গান বাজতেই মুহূর্তের মধ্যে সবাই হৈ-হৈ করে উঠল। ইয়াশ আর সাদ নিজেদের সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গানের তালে নাচতে শুরু করল। তাদের দেখে তাসনিম আর তাসিফাও আর বসে থাকতে পারল না। তারাও উঠে দাঁড়িয়ে দুজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচতে লাগল।
পেছনের সিটগুলোতে তখন বেশ জমে উঠেছে। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ গানের সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে, আবার কেউ সিটে বসেই মাথা দুলিয়ে তাল দিচ্ছে।
ইয়াশ আর সাদের নাচ দেখে জুয়িন, রিদ আর সিয়ামও আর চুপচাপ বসে থাকতে পারল না। তারাও উঠে দাঁড়িয়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু করে দিল। সবাই নিজেদের সিটের কাছাকাছি থেকেই নাচানাচি আর মজা করছিল।
গান, হাসি আর হৈ-হুল্লোড়ে পুরো বাসের পরিবেশটাই তখন বেশ জমে উঠল। ইনানীর পথে এভাবেই সবার আনন্দ-হৈচৈ চলতে লাগল।
#চলবে
( আজকের পর্বে জুয়িন আর তাসিফার অংশটুকু একটু কম ছিল। আর সেটা আমি ইচ্ছা করেই রেখেছি। ইন শা আল্লাহ, আগামী পর্বে ওদের দুজনের মুহূর্তগুলো আরও বেশি করে তুলে ধরব।)