#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
-----
পরের দিন সকালে তাসিফার ঘুম ভাঙল ভণ্ডপার্টির গ্রুপ কলে। ঘুমের ঘোর তখনো পুরোপুরি কাটেনি তার। বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে চোখ বন্ধ রেখেই হাতড়ে হাতড়ে মোবাইলটা খুঁজে বের করল। স্ক্রিনে একবার চোখ বুলিয়ে কলটা রিসিভ করে মোবাইল কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ইয়াশের আর্তনাদ ভেসে এল।
-“আহ্! মরে গেলাম রে!”
ইয়াশের এমন চিৎকারে তাসিফা কপাল কুঁচকে ফেলল। এত সকালে ঘুমের মধ্যে এমন চেঁচামেচি শুনে বিরক্ত হওয়ার কথা থাকলেও তার কণ্ঠে ব্যথার ছাপ স্পষ্ট ছিল। ফলে বিরক্তির বদলে কৌতূহল আর খানিকটা দুশ্চিন্তা নিয়ে চোখ মেলে তাকাল সে। এদিকে গ্রুপের অন্য প্রান্ত থেকেও সবার সাড়া পাওয়া গেল।
ইয়াশ ব্যথায় মুখ কুঁচকে কাতর কণ্ঠে বলল,
-“ভাই, তোরা তাড়াতাড়ি আমার বাসায় আয়। আমার ভীষণ পেটব্যথা করছে!”
তাসিফা এবার বিছানায় উঠে বসে পড়ল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠেই ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-“হঠাৎ পেটব্যথা? কাল রাতে কী খেয়েছিলি তুই?”
প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ কিছু বলার আগেই তাসনিম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইল,
-“আচ্ছা, তোর বাসা কোথায়? ঠিকানা বল। আমরা এক্ষুনি আসছি।”
সাদ এবার আর কাউকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বলে উঠল,
-“আমি ইয়াশের বাসা চিনি। তোরা ঠিকমতো রেডি হ। আমি বের হচ্ছি, তারপর একসঙ্গে যাব।”
তাসনিম সম্মতি জানাল। তাসিফাও মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল, যদিও ফোনের ওপাশ থেকে তার সেই সম্মতি দেখার উপায় ছিল না। ইয়াশের কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছিল, সে বেশ কষ্টেই আছে। তাই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে বিছানা থেকে নেমে পড়ল।
ঘুম থেকে ওঠার পর সাধারণত কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকা, তারপর ধীরে ধীরে ফ্রেশ হতে যাওয়ার অভ্যাস তার। কিন্তু আজ সেসবের কোনো সুযোগ নেই। বন্ধুর অসুস্থতার কথা শোনার পর নিজের আলসেমি ঝেড়ে ফেলে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল সে।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে আলমারির সামনে দাঁড়াল তাসিফা। কী পরবে, তা নিয়ে বেশি সময় নষ্ট করল না। হাতের কাছে থাকা আরামদায়ক একটা পোশাক বের করে পরে নিল। এরপর চুলগুলো আঁচড়ে গুছিয়ে নিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে রাখল। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল। যাওয়ার আগে মাকে জানিয়ে দেওয়া দরকার, তাই সোজা রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। আয়রা বেগম তখন সকালের নাশতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
মাকে দেখে তাসিফা বলল,
-“আম্মু, আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।”
আয়রা বেগম কাজের ফাঁকে মেয়ের দিকে তাকালেন। এত সকালে তাসিফাকে তৈরি হয়ে বের হতে দেখে একটু অবাক হলেন।
-“এত সকালে কোথায় যাচ্ছিস?”
তাসিফা ব্যাগের কাঁধের ফিতা ঠিক করতে করতে উত্তর দিল,
-“ইয়াশের শরীর নাকি খুব খারাপ। পেটব্যথা করছে বলল। আমরা সবাই ওর বাসায় যাচ্ছি। গিয়ে দেখি কী হয়েছে।”
আয়রা বেগমের মুখের ভাব বদলে গেল। মেয়ের বন্ধুর অসুস্থতার কথা শুনে তিনি আর মেয়েকে আটকানোর মতো কিছু বললেন না। শুধু সাবধানে যেতে বলে দিলেন।
তাসিফা মায়ের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
----
সাদ তাসিফা আর তাসনিমকে নিয়ে ইয়াশের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। বাড়িটার দিকে তাকাতেই দুজনের চোখ যেন কপালে উঠে গেল। এতক্ষণ তারা ভেবেছিল, ইয়াশের বাসা হয়তো তাদের বাসার মতোই হবে। কিন্তু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল ডুপ্লেক্স বাড়িটা দেখে তাদের সেই ধারণা মুহূর্তেই বদলে গেল।
বাড়ির বাইরের নকশাটাও বেশ দৃষ্টিনন্দন। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি দোতলা বাড়িটার সামনের অংশজুড়ে বড় বড় কাচের জানালা। দেয়ালের রং আর নকশার মধ্যে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। সামনে ছোট্ট বাগান, সেখানে যত্ন করে ছাঁটা সবুজ ঘাস আর সারি সারি শোভাবর্ধক গাছ। বাড়ির প্রবেশপথের দুপাশে লাগানো গাছগুলোও বেশ পরিপাটি। সব মিলিয়ে বাড়িটাকে বাইরে থেকেই বেশ অভিজাত দেখাচ্ছে।
তাসিফা কিছুক্ষণ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থেকে নিজের মাথায় হাত দিল। তারপর ইয়াশের কথা মনে পড়তেই মুখ বাঁকিয়ে বলে উঠল,
-“শালা, এত বড়লোক আগে তো জানতাম না!”
তার কথা শুনে সাদ আর তাসনিম হেসে উঠল।
সাদ হাসতে হাসতেই বলল,
-“কী ভেবেছিলি? তোদের মতো গরিবের ঘরে থাকে?”
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকাল।
-"এই, নিজের অবস্থান ভুলে যাস না। তুই আবার কোন রাজপ্রাসাদে থাকিস?”
সাদের মুখের হাসি আরও চওড়া হলো। তাসনিমও দুজনের কথার মাঝে হেসে উঠল। তবে বেশিক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ হলো না। ইয়াশের অসুস্থতার কথা মনে পড়তেই সাদ তাদের নিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
প্রধান দরজার সামনে পৌঁছে সাদ কলিং বেল চাপল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির একজন সার্ভেন্ট এসে দরজা খুলে দিলেন। সাদকে দেখে তিনি পরিচিত ভঙ্গিতে সরে দাঁড়ালেন, যাতে বাকিরাও সহজেই ভেতরে ঢুকতে পারে।
ভেতরে ঢুকেই তাসিফা আর তাসনিমের চোখ ঘরের সাজসজ্জায় আটকে গেল। বাইরে থেকে বাড়িটাকে যতটা সুন্দর দেখাচ্ছিল, ভেতরের পরিবেশ তার চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
প্রশস্ত ড্রয়িংরুমের মেঝেতে চকচকে মার্বেল পাথর বসানো। মাঝখানে রাখা বড়সড় সোফাসেটের রং ঘরের দেয়ালের সঙ্গে বেশ মানানসই। সোফার সামনে কাচের ওপর কাঠের নকশা করা একটি সেন্টার টেবিল। তার ওপর সাজিয়ে রাখা কয়েকটি শোপিস আর তাজা ফুলের ছোট্ট ফুলদানি ঘরের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। দেয়ালের একপাশে বড় একটি টেলিভিশন, তার নিচে কাঠের তৈরি লম্বা ক্যাবিনেট। অন্য পাশের দেয়ালে কয়েকটি সুন্দর পেইন্টিং, যেগুলোর রং আর নকশা ঘরের সাজসজ্জার সঙ্গে বেশ ভালোভাবে মিশে গেছে।
ছাদের সঙ্গে ঝুলছে আধুনিক নকশার ঝাড়বাতি। দিনের আলো বড় কাচের জানালা দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করায় ঘরটা বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। জানালার পাশে রাখা ইনডোর প্ল্যান্ট আর কোণায় সাজিয়ে রাখা দামি শোপিসগুলোও চোখে পড়ার মতো। প্রতিটি জিনিসই এমনভাবে সাজানো যে কোথাও বাড়তি জাঁকজমক নেই, আবার আভিজাত্যের অভাবও নেই।
তাসিফা চারদিকে তাকিয়ে মনে মনে হিসাব করতে লাগল, এই বাড়ির প্রতিটি জিনিসের দাম কত হতে পারে! অবশ্য তার সেই হিসাব বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। পেটব্যথায় কাতর বন্ধুকে দেখতে এসেছে তারা, এখানে দাঁড়িয়ে বাড়ির সৌন্দর্য উপভোগ করতে নয়।
সাদ তাদের নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরতলায় উঠে গেল। করিডোরের দুপাশে কয়েকটি ঘর। ইয়াশের ঘরের সামনে এসে সাদ দরজায় হাত রেখে সেটি খুলে ভেতরে ঢুকল। তাসিফা আর তাসনিমও তার পেছন পেছন প্রবেশ করল।
ঘরে ঢুকেই তাদের চোখ পড়ল বিছানার ওপর শুয়ে থাকা ইয়াশের দিকে। পেটের ওপর একটা বালিশ চেপে ধরে আছে সে। মুখের অভিব্যক্তি দেখে মনে হচ্ছে, সামান্য নড়াচড়া করতেও তার কষ্ট হচ্ছে।
ভণ্ডপার্টিকে একসঙ্গে দেখে ইয়াশের মুখটা যেন কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে কাতর মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ভাই, কী করমু? আমার পেটব্যথা!”
তাসিফা আর তাসনিম দ্রুত বিছানার কাছে গিয়ে বসল। সাদও তাদের পাশে জায়গা করে নিল। ইয়াশের এমন অবস্থা দেখে তাসিফা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।
-“পেটব্যথা কেন? হঠাৎ কী হলো তোর?”
ইয়াশ মুখ খুলে কিছু বলার আগেই ঘরের দরজার কাছে একজন নারীর কণ্ঠ শোনা গেল।
-“কী আর হবে? বাঁদরটা থ্রি এক্স স্পাইসি বুলডাক রামেন খেয়ে পেটব্যথা বাঁধিয়েছে!”
কথাটা বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করলেন আয়েশা বেগম। তাঁর মুখে বিরক্তির ছাপ থাকলেও চোখেমুখে ছেলের প্রতি মায়াও স্পষ্ট।
আয়েশা বেগমকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়াল।
-“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”
তাদের সালামের জবাব দিয়ে আয়েশা বেগম মৃদু হাসলেন।
-“ওয়ালাইকুমুস সালাম। আরে, তোমরা দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? বসো, বসো।”
তাঁর কথায় সবাই আবার বিছানার পাশে বসে পড়ল। আয়েশা বেগমও তাদের কাছাকাছি একটি চেয়ারে বসে সবার দিকে স্নেহভরা দৃষ্টিতে তাকালেন।
-“কেমন আছো তোমরা?”
তাসিফা, তাসনিম আর সাদ একসঙ্গেই উত্তর দিল,
-“জি, আন্টি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
আয়েশা বেগম হালকা হেসে বললেন,
-“এই তো আছি, কোনোরকম। ইয়াশের জন্য আর শান্তিতে থাকা যায়? ছেলেটা শুধু শরীরেই বড় হয়েছে, বুদ্ধিসুদ্ধি এখনো হয়নি! একদম ছোট বাচ্চাদের মতো দুষ্টুমি করে। কতবার বলেছি, ঝাল খাবার খাওয়ারও একটা সীমা আছে। কে শোনে কার কথা! নিজের ইচ্ছেমতো খেয়ে এখন পেটব্যথা নিয়ে বিছানায় পড়ে আছে।”
মায়ের কথা শুনে ইয়াশ মুখ কুঁচকে ফেলল। পেটের ওপর থেকে বালিশটা সরিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল,
-“উফ্, মা! তুমি শুরু কোরো না তো!”
ছেলের কথা শুনে আয়েশা বেগম ভ্রু উঁচু করলেন।
-“কী শুরু করব না? কাজটা কে করেছে, শুনি? এখন ব্যথা করছে বলে সবাইকে ডেকে মাথায় তুলেছিস!”
কথাটা শুনে সাদ আর তাসনিম মুখ টিপে হাসল। তাসিফা অবশ্য হাসি চেপে রাখতে পারল না। ইয়াশ এমনভাবে মুখ গোমড়া করে বসে আছে, যেন পেটব্যথার জন্যও তার মাকেই দায়ী করা যায়।
ইয়াশ সবার হাসি দেখে আরও বিরক্ত হয়ে বালিশটা বুকে জড়িয়ে ধরল।
-“বাহ্! বন্ধু বলে কথা! আমার কষ্ট দেখে তোদের হাসি পাচ্ছে?”
তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল,
-"কষ্ট তো নিজের হাতে ডেকে এনেছিস। এখন আবার আমাদের ওপর রাগ দেখাচ্ছিস কেন?”
ইয়াশ তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কারণ তাসিফার কথার উত্তর দেওয়ার মতো যুক্তি আপাতত তার হাতে নেই।
ঘরের পরিবেশটা হাসি-ঠাট্টায় হালকা হয়ে উঠতেই আয়েশা বেগম উঠে দাঁড়ালেন।
-“আচ্ছা, তোমরা বসো। নিশ্চয়ই বাসা থেকে নাশতা না করেই বের হয়েছ। নাশতা তৈরি হচ্ছে। আজ সবাই একসঙ্গে বসে নাশতা করবে।”
তাঁর কথায় তাসিফা আর তাসনিম একবার পরস্পরের দিকে তাকাল। সত্যি বলতে, সকালে তাড়াহুড়ো করে বের হওয়ার কারণে তাদের কারও নাশতা করা হয়নি। সাদও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
-"জি, আন্টি।”
আয়েশা বেগম হেসে বললেন,
-"তাহলে তোমরা গল্প করো। আমি আসছি।"
এই বলে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। দরজাটা বন্ধ হওয়ার পর তাসিফা আবার ইয়াশের দিকে তাকাল। বন্ধুর মুখে তখনো অসহায় ভাব লেগে আছে।
ইয়াশ এবার কাতর মুখে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আচ্ছা, একটা কথা শোন। আজকে ভার্সিটিতে যাবি না কেউ। আমি তো আজ যেতে পারব না। তোরা গেলে আমার একা একা থাকতে হবে!”
তাসিফা চোখ উল্টে বলল,
-“তুই বারণ না করলেও যেতাম না, হাবা!”
সাদ এবার ইয়াশের দিকে একটু ঝুঁকে ভান করা অভিমানের সুরে বলল,
-“ভাই, আমাদের ছাড়া কীভাবে একা একা রামেন খেতে পারলি?"
তাসনিম হেসে ফেলল। ইয়াশ প্রথমে সাদের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর নিজেই হেসে দিল। তবে রামেন খাওয়ার সময় বন্ধুদের কথা মনে পড়েছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো জবাব দিল না। মুখে হাসি নিয়েই চুপ করে রইল, যেন এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়াই তার জন্য বেশি নিরাপদ।
----
দুপুর বারোটার দিকে তাসিফা বাসায় ফিরে এল। সকালের নাশতা ভণ্ডপার্টির সবাই ইয়াশের পরিবারের সঙ্গে করেছে। নাশতা খাওয়ার পর আরও কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে তারপর যে যার মতো বাসায় ফিরেছে তারা। এর মধ্যে ইয়াশের পেটব্যথাটাও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ফলে তাকে নিয়ে সবার দুশ্চিন্তাও কিছুটা কমেছে।
বাসায় ফিরে তাসিফা নিজের রুমে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। এই মুহূর্তে তার আর কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে, সারাটা দিন বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিতে। কিন্তু চাইলেই তো আর তা সম্ভব নয়! ইচ্ছেমতো ঘুমিয়ে কাটানোর মতো অবসর তার নেই। তাই আপাতত বিছানায় একটু গড়াগড়ি খেয়েই সময় কাটাতে লাগল।
কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করার পর তাসিফা উঠে বসল। হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে নিল। এরপর ইনস্টাগ্রামে ঢুকে একের পর এক রিলস দেখতে শুরু করল। একটা দেখতে দেখতেই সামনে আরেকটা চলে আসছে, আর সেও অন্যমনস্কভাবে স্ক্রল করে যাচ্ছে। এভাবেই কখন যে বিছানা ছেড়ে উঠে হাঁটতে শুরু করেছে, সেদিকে তার খেয়ালই নেই। মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রেখেই ধীরে ধীরে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল সে।
রান্নাঘরে পৌঁছে ফ্রিজের দরজা খুলল তাসিফা। ভেতরে রাখা আইসক্রিমগুলোর দিকে চোখ পড়তেই তার মনে পড়ে গেল, এগুলো জুয়িন তাকে কিনে দিয়েছিল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। আর দেরি না করে সেখান থেকে একটা আইসক্রিম হাতে তুলে নিল সে। তারপর ফ্রিজের দরজাটা বন্ধ করে আবার নিজের রুমের দিকে পা বাড়াল।
---
দুপুর ২টার দিকে গোসল সেরে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এল তাসিফা। ভেজা চুলগুলো তোয়ালে দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল সে। ঘরে এসে তোয়ালেটা একপাশে রেখে আয়নার সামনে দাঁড়াল। এরপর আঙুলের ফাঁকে চুলগুলো আলতো করে ছাড়িয়ে নিল, যাতে ভেজা চুলগুলো একসঙ্গে জট পাকিয়ে না থাকে।
কিছুক্ষণ পর রুম থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল তাসিফা। রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে ভেতরে উঁকি দিতেই চোখে পড়ল, আয়রা বেগম রান্না নিয়ে ব্যস্ত। চুলার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি এক হাতে রান্নার খুন্তি নাড়ছেন, অন্যদিকে রান্নার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও গুছিয়ে রাখছেন।
তাসিফা দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে তাকাল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-“মা, আমি একটু আসছি। পাঁচ মিনিটের ভেতর চলে আসব।”
আয়রা বেগম মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নাড়লেন। রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকায় আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
মায়ের সম্মতি পেয়ে তাসিফার মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। সে আর কথা না বাড়িয়ে রান্নাঘর থেকে সরে এল। এরপর ধীর পায়ে মূল দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল সে।
জুয়িনের ফ্ল্যাটে যাবে তাসিফা। সেখানে যাওয়ার জন্য তার মনে কোনো তাড়া নেই, তবু পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই সেদিকেই এগিয়ে চলেছে।
----
জুয়িনের ফ্ল্যাটের সামনে এসে তাসিফা দেখল, দরজাটা ভেতর থেকে খোলা। সে আর দেরি না করে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করল। ফ্ল্যাটের ভেতরটা বেশ নিরিবিলি।
তাসিফা সোজা জুয়িনের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। রুমে ঢুকতেই ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির শব্দ কানে এল। শব্দটা শুনে বুঝতে বাকি রইল না, জুয়িন গোসল করছে।
তাসিফা আর কিছু না ভেবে বিছানার ওপর ধপ করে বসে পড়ল। রুমের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল সে। পরিচিত রুমটায় এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছে, তাই আশপাশের জিনিসপত্র তার কাছে একেবারেই অচেনা নয়। বসে বসে কী করবে ভাবছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ জুয়িনের মোবাইলটা বেজে উঠল।
শব্দটা কানে যেতেই তাসিফা মোবাইলটার দিকে তাকাল। ফোনটা বিছানার পাশেই রাখা ছিল। সে উঠে গিয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। কিন্তু কলদাতার নামটা ভালো করে দেখার আগেই কলটা কেটে গেল।
তাসিফা এবার স্ক্রিনের দিকে মনোযোগ দিল। সেখানে ‘মা’ নামে সেভ করা নম্বরটা দেখা যাচ্ছে। কললিস্টে চোখ বুলাতেই বুঝতে পারল, এই নম্বর থেকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হয়েছে।
তাসিফার বুঝতে বাকি রইল না, ইনি জুয়িনের মা। অর্থাৎ, তার শাশুড়ি আম্মা!
কথাটা মনে হতেই তাসিফার চোখেমুখে কেমন একটা পরিবর্তন এল। জুয়িনের মায়ের সঙ্গে এখনো সরাসরি পরিচয় না হলেও তাঁর কথা সে জানে। জুয়িনের পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কটা যে ভালো নয়, সেটাও অজানা নয় তাসিফার।
এসব ভাবতে ভাবতেই আবার মোবাইলটা বেজে উঠল।
তাসিফা একটু ইতস্তত করল। কলটা ধরবে কি ধরবে না, বুঝে উঠতে পারছিল না। জুয়িনের অনুমতি ছাড়া তার ফোন ধরা ঠিক হবে কি না, সেই চিন্তাটাও মাথায় এল। আবার কলটা কেটে দিলে ওপাশের মানুষটা হয়তো পুনরায় ফোন করবেন।
একবার ওয়াশরুমের বন্ধ দরজাটার দিকে তাকাল সে। জুয়িন এখন গোসল করছে। এই মুহূর্তে তাকে জিজ্ঞেস করারও উপায় নেই।
তাসিফা মনে মনে ভাবল,
"জুয়িন ভাইয়া জানলে আবার কথা শোনাবে না তো?"
পরক্ষণেই নিজের মনকে বোঝাল,
"আরে, এখানে তো আর কথা শোনানোর মতো কিছু হয়নি। শুধু ফোনটাই তো ধরব!"
নিজের মনেই এমন যুক্তি দাঁড় করিয়ে শেষ পর্যন্ত কলটা রিসিভ করল তাসিফা।
-“হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম।”
কণ্ঠটা যথাসম্ভব স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও তাসিফার গলায় কেমন একটা জড়তা রয়ে গেল।
ওপাশ থেকে সালামের উত্তর এল। তবে অপরিচিত একটি মেয়ের কণ্ঠ শুনে আফসানা শিকদার কিছুটা অবাক হলেন। কয়েক মুহূর্ত থেমে তিনি প্রশ্ন করলেন,
-“ওয়ালাইকুম আসসালাম। তবে তুমি কে, মা?”
প্রশ্নটা শুনে তাসিফা একটু ঘাবড়ে গেল। কী বলবে, মুহূর্তের জন্য ভেবে পেল না। তারপর দ্রুত একটা অজুহাত দাঁড় করিয়ে বলল,
-"আমি তাসিফা বলছি। জুয়িন ভাইয়া আর আমি একই বিল্ডিংয়ে থাকি। উনি ছাদে নিজের ফোনটা ভুলে রেখে চলে গেছেন। আমি ছাদে গিয়ে ফোনটা পেয়েছি, তাই আপনার কলটা রিসিভ করলাম।”
কথাটা বলে তাসিফা মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। অন্তত আপাতত মিথ্যেটা বিশ্বাসযোগ্যই মনে হচ্ছে!
অন্যদিকে, তাসিফার পরিচয় শুনে আফসানা শিকদারের কণ্ঠে যেন হঠাৎ আনন্দের আভাস ফুটে উঠল। ছেলের ফোনে একটি মেয়েকে পেয়ে প্রথমে অবাক হলেও, মেয়েটি যখন একই বিল্ডিংয়ে থাকার কথা জানাল, তখন তাঁর মনে নতুন একটা আশার সঞ্চার হলো।
তিনি স্নেহমাখা কণ্ঠে বললেন,
-"আচ্ছা মা, আমি আফসানা শিকদার বলছি, জুয়িনের মা। তুমি যেহেতু জুয়িনের সঙ্গে একই বিল্ডিংয়ে থাকো, তাই নিশ্চয়ই ওর বাসাটা চেনো। আচ্ছা মা, ওর বাসার ঠিকানাটা কি একটু দিতে পারবে?"
কথাটা শুনে তাসিফা থমকে গেল।
জুয়িনের মা তাঁর বাসার ঠিকানা চাইছেন! এখন সে কী বলবে?
মোবাইলটা কানে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল তাসিফা। একদিকে জুয়িনের অনুমতি ছাড়া তার ঠিকানা দেওয়া ঠিক হবে কি না, সেই দ্বিধা। অন্যদিকে, জুয়িনের সঙ্গে তার পরিবারের সম্পর্কটা আবার স্বাভাবিক হয়ে যাক, সেটাও সে চায়।
সে জানে, জুয়িন হয়তো বিষয়টা সহজভাবে নেবে না। তবু জুয়িনের সঙ্গে তার পরিবারের দূরত্বটা কমে গেলে ক্ষতি কী?
তাসিফা একবার ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকাল। ভেতর থেকে তখনো পানির শব্দ ভেসে আসছে। জুয়িনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ নেই বুঝতে পেরে শেষ পর্যন্ত সে আফসানা শিকদারকে ঠিকানাটা বলে দিল।
ঠিকানা শুনে আফসানা শিকদার খুশি হয়ে ধন্যবাদ জানালেন। তাসিফাও ছোট্ট করে উত্তর দিয়ে কলটা কেটে দিল।
মোবাইলটা আগের জায়গায় রেখে বিছানার পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল তাসিফা। এইমাত্র যা করল, তা জুয়িন জানলে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটা ভেবেই তার মনে একটু ভয় কাজ করল। তবে সেই ভয়কে পাত্তা না দিয়ে নিজেকেই বোঝাল, সে তো খারাপ কিছু চায়নি। বরং জুয়িনের ভালোই চেয়েছে।
এরপর ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাকাল তাসিফা। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে বসে অপেক্ষা করছিল, এবার সেখান থেকে উঠে ধীরে ধীরে দরজার কাছে এগিয়ে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে দুবার নক করল সে।
জুয়িন হঠাৎ থমকে গেল। মেইন দরজাটা কি সে বন্ধ করেনি? গোসলের মাঝখানে বিষয়টা মনে পড়তেই কিছুক্ষণের জন্য ভ্রু কুঁচকে গেল তার। অবশ্য পরক্ষণেই মনে হলো, হয়তো তাসিফাই এসেছে। আর সেই ভাবনা থেকেই মুখে স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। অযথা আর কিছু না ভেবে সে ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে তাসিফাকে দেখতে পেল জুয়িন। মেয়েটার মুখজুড়ে স্পষ্ট বিরক্তি। ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, যেন অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
তাসিফা মুখ ফুলিয়েই বলল,
-"আপনার আর কত সময় লাগবে? সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি! আপনার গোসল আর শেষই হয় না।”
জুয়িনের গোসল প্রায় শেষ। পরনে শুধু একটা তোয়ালে। তাসিফার অভিযোগ শুনে সে একবার নিজের দিকে, তারপর মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে দুষ্টুমিভরা হাসি ফুটে উঠল তার।
কোনো উত্তর না দিয়ে সে তাসিফার দিকে হাত বাড়াল। তাসিফা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জুয়িন আচমকা তার হাত ধরে নিজের দিকে টান দিল।
হঠাৎ এমন ঘটনায় তাসিফা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলাতে না পেরে সোজা জুয়িনের বুকের ওপর গিয়ে পড়ল সে। অনিচ্ছাকৃতভাবেই দুহাতে জড়িয়ে ধরল জুয়িনের গলা। কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন মাথাটাই কাজ করা বন্ধ করে দিল তার।
জুয়িন অবশ্য বেশ স্বাভাবিক। বরং তাসিফার এমন অবস্থা দেখে তার ঠোঁটের কোণের হাসিটা আরও একটু গভীর হলো।
-“জুয়িন ভাইয়া!”
তাসিফার বিস্মিত কণ্ঠস্বর কানে আসতেই সে মেয়েটার মুখের দিকে তাকাল। চোখেমুখে বিস্ময়, সঙ্গে একরাশ অভিযোগ। যেন এই মুহূর্তে জুয়িনকে বকাঝকা করার জন্য অনেকগুলো কথা মাথায় এসে জমা হয়েছে, অথচ কোনটা দিয়ে শুরু করবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না।
কিন্তু জুয়িনকে দেখে মনে হলো, এসব নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। বরং তাসিফাকে সঙ্গে নিয়ে ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে।
তাসিফা এবার বেশ অবাক হলো। এতক্ষণ পর্যন্ত ঘটনাটা আচমকা ঘটে যাওয়ায় কিছু বলার সুযোগ পায়নি। কিন্তু ওয়াশরুমের ভেতরে এসে দরজা বন্ধ হতে দেখেই তার হুঁশ ফিরল। সে ধীরে ধীরে জুয়িনের গলা থেকে হাত সরিয়ে নিল। তারপর সরু চোখে তার দিকে তাকাল।
-"ওয়াশরুমে কেন আনলেন?”
জুয়িন যেন এমন প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল। ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ধরে রেখে সে দুহাতে তাসিফার কোমর জড়িয়ে ধরল। তারপর তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
-"আমার ইচ্ছে হয়েছে, তাই এনেছি।”
তাসিফা কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে হেসে উঠল।
-“মগের মুল্লুক নাকি? যখন যা ইচ্ছে হবে, তখন তা-ই করবেন? আপনার ইচ্ছের কোনো সীমা নেই?”
জুয়িন বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। বরং এমনভাবে মাথা নাড়ল, যেন তাসিফার কথার সঙ্গে সে পুরোপুরি একমত।
-“অবশ্যই। আমার ইচ্ছের ওপর আবার সীমা থাকবে কেন?”
-“বাহ! খুব ভালো! তাহলে আপনার জন্য আলাদা একটা আইন বানাতে হবে দেখছি।"
তাসিফা মুখ বাঁকিয়ে বলল। তার কথায় জুয়িনের হাসি আরও চওড়া হলো।
তাসিফা এবার নিজের কোমরের দিকে তাকাল। জুয়িনের দুটো হাত তখনো শক্ত করে তাকে জড়িয়ে রেখেছে। সে হাত দুটো সরানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
-“আচ্ছা, হয়েছে! এবার ছাড়ুন তো। এভাবে ধরে রেখেছেন কেন?”
জুয়িনের মুখের হাসিটা এবার একটু ম্লান হলো। তাসিফার দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলল,
-"যখনই তোকে একটু কাছে টানতে চাই, তখনই ছটফট করে দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করিস। একদম নড়বি না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক।”
কথাটা শুনে তাসিফা থেমে গেল।
তারপর ধীরে ধীরে চোখ তুলে জুয়িনের দিকে তাকাল। পিটপিট করে কয়েকবার চোখের পাতা ফেলল সে। জুয়িনের মুখে বিরক্তির ছাপ দেখে তাসিফা আর কিছু বলল না। তবে তার চোখেমুখে এমন একটা ভাব ফুটে উঠল, যেন মনে মনে সে জুয়িনের এই অদ্ভুত স্বভাবের ব্যাখ্যা খুঁজছে। এই মানুষটাকে বোঝা সত্যিই কঠিন।
কখনো এমনভাবে কথা বলে যে তার সামনে দাঁড়াতেই ভয় লাগে, আবার কখনো এমন সব কাণ্ড করে বসে যে রাগ করবে, নাকি হেসে ফেলবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারে না তাসিফা।
জুয়িন এবার ধীরে ধীরে তাসিফাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তাসিফার পিঠ এসে ঠেকল তার বুকের সঙ্গে। এক হাত দিয়ে সাবধানে তাসিফার ঘাড়ে পড়ে থাকা চুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিল সে। আঙুলের আলতো স্পর্শে তাসিফা একটু কেঁপে উঠল। তবু নড়ল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। পেছন থেকে তাসিফাকে জড়িয়ে ধরে তার ঘাড়ের কাছে মুখ এগিয়ে নিল। তারপর ধীরে মুখ ডুবিয়ে দিল তাসিফার ঘাড়ে।
আচমকা এমন স্পর্শে তাসিফার শরীর শিউরে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল আপনা থেকেই। দুহাতে নিজের জামাটা শক্ত করে খামচে ধরল সে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। কী করবে, কী বলবে, কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না।
জুয়িন তাসিফার ঘাড়ে মুখ রেখেই কিছুক্ষণ নীরবে রইল। তারপর ধীরে নিজের থুতনি তার ঘাড়ের ওপর রাখল। পেছন থেকে তাসিফার কোমর দুহাতে জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল।
তাসিফা নিঃশব্দে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। জুয়িনের এমন নীরবতা তাকে আরও অপ্রস্তুত করে তুলছিল। মনে হচ্ছিল, মানুষটা বুঝি কিছু বলতে চায়, অথচ কথাগুলো মুখে আনতে পারছে না।
ঠিক তখনই জুয়িন নিচু, ভারী কণ্ঠে বলে উঠল,
-“ভালোবাসি।”
তাসিফা থমকে গেল। জুয়িনের মুখে কথাটা শুনে ঠোঁটের কোণে আচমকাই ফুটে উঠল এক লাজুক হাসি। বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে উঠল তার। অনুভূতিটা ঠিক কেমন, তা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না। শুধু মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ যেন এসে জমা হয়েছে তার ছোট্ট হৃদয়টায়। লজ্জায় চোখ দুটো বন্ধ করে রইল তাসিফা। অথচ ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা হাসিটুকু কিছুতেই আড়াল করতে পারল না।
#চলবে
(শরীরটা এখনো ভালো না, তবুও পর্বটা দিলাম। ভুল থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।)