#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
----
আরও কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর সবাই ধীরে ধীরে মাঠ থেকে উঠে দাঁড়াল। ইয়াশ ঘাসের ওপর থেকে নিজের হাতের ধুলো ঝেড়ে তাসিফার দিকে তাকাল। হঠাৎ তার মনে পড়ল, আজ এতক্ষণ ধরে জুয়িন ভাইকে তো একবারও দেখা যায়নি।
ইয়াশ ভ্রু কুঁচকে চারপাশে একবার তাকাল। তারপর তাসিফার দিকে ফিরে কৌতূহলী কণ্ঠে বলল,
-"কিরে তাসিফা, জুয়িন ভাই আজ আসে নাই?"
জুয়িনের কথা শুনতেই তাসিফারও হঠাৎ তার কথা মনে পড়ল। এতক্ষণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতে থাকায় জুয়িনের কথা একবারও মাথায় আসেনি তার। সে কিছুটা অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। মাঠের আশপাশে কোথাও জুয়িনকে দেখতে না পেয়ে এবার বিল্ডিংয়ের দিকে তাকাল সে।
আর তাকাতেই হঠাৎ থমকে গেল তাসিফা।
বিল্ডিংয়ের তিনতলায় রেলিংয়ের ওপর দুই হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে জুয়িন। তার দুই পাশে রিদ আর সিয়াম। তিনজন নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিচ্ছে। তবে জুয়িনের দৃষ্টি যে নিচের মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের দলের দিকেই নিবদ্ধ, সেটা বুঝতে তাসিফার এক মুহূর্তও লাগল না।
দূর থেকে জুয়িনের মুখের অভিব্যক্তি স্পষ্ট বোঝা না গেলেও তার দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গিতে বেশ স্বাভাবিক একটা ভাব রয়েছে। মনে হচ্ছে, বেশ কিছুক্ষণ ধরেই নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
তাসিফা কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। জুয়িন যে সেখানে আছে, সেটা আগে খেয়াল না করায় নিজের ওপরই যেন একটু বিরক্ত হলো সে। এতক্ষণ মাঠে বসে আড্ডা দিচ্ছিল, অথচ একবারও ওপরের দিকে তাকানোর কথা মনে হয়নি।
তাসিফার দৃষ্টি অনুসরণ করে ভণ্ডপার্টির বাকিরাও এবার তিনতলার দিকে তাকাল। জুয়িন, রিদ আর সিয়ামকে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইয়াশের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
-"ওই যে! জুয়িন ভাই তো ওপরেই আছে।"
ইয়াশের কথা শুনে সাদও সেদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তাসনিম আর বাকিরাও হাত তুলে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করল। নিচ থেকে সবাইকে একসঙ্গে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুয়িনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
সে রেলিংয়ের ওপর রাখা এক হাত সরিয়ে হাত তুলে তাদের উদ্দেশে ‘হেই’ জানাল।
ব্যস, এতটুকুই যথেষ্ট ছিল, নিচে দাঁড়িয়ে থাকা ভণ্ডপার্টির সদস্যরা যেন একসঙ্গে আরও সরব হয়ে উঠল। সবাই হৈহৈ করে হাত নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে ‘হেই’ জানাল। ইয়াশ তো অন্যদের চেয়ে একটু বেশিই উৎসাহ দেখাল। সে হাত উঁচিয়ে এমনভাবে নাড়তে লাগল, যেন বহুদিন পর কোনো পরিচিত মানুষের দেখা পেয়েছে। অথচ জুয়িন তো তাদেরই পরিচিত।
ওপর থেকে তাদের কাণ্ড দেখে রিদ হেসে ফেলল। সিয়ামও হাসিমুখে রেলিংয়ের কাছে একটু এগিয়ে এসে নিচের দিকে তাকাল। তারপর গলা উঁচিয়ে বলল,
-"তোমরা সবাই উপরে চলে এসো, আড্ডা দেব।"
সিয়ামের কথা শুনে ইয়াশ আর এক মুহূর্তও মাঠে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন বোধ করল না।
-"চল, চল! ওপরেই যাই।" বলে সে বাকিদের দিকে তাকাল।
সাদ হালকা হেসে মাথা নাড়ল। তাসনিমও আর আপত্তি করল না। তাসিফা একবার তিনতলার দিকে তাকাল। জুয়িন তখনও রেলিংয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা তার চোখের সঙ্গে তাসিফার চোখাচোখি হতেই তাসিফা কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বাকিদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।
ভণ্ডপার্টির কেউ আর দেরি করল না। সবাই একে একে বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢুকে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
অন্যদিকে তিনতলায় দাঁড়িয়ে রিদ আর সিয়ামও নিচের দিকে তাকিয়ে হাসছিল। জুয়িন রেলিং থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঁড়ি বেয়ে ভণ্ডপার্টির সবাই তিনতলায় পৌঁছে গেল। আর তাদের আসার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো জায়গাটা যেন গরম হয়ে উঠল। এক মুহূর্ত আগেও যেখানে শান্ত পরিবেশ ছিল, সেখানে এখন একদল পাগলাটে মানুষের আগমনে চারপাশ সরগরম হয়ে উঠেছে।
তিনতলায় পৌঁছানোর পর ইয়াশ আর সাদ প্রথমে জুয়িনের সঙ্গে হাত মেলাল। এরপর রিদ আর সিয়ামের সঙ্গে কুশল বিনিময় করল।
সিয়াম সবার দিকে একবার তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
-"আচ্ছা, তোমাদের ক্লাস শুরু হবে কখন?"
প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল। এমনভাবে তাকাল, যেন ক্লাসের কথা শুনেই তার সব আনন্দ মাটি হয়ে গেছে।
-"দূর! আজকের ক্লাস জাহান্নামে যাক, করব না। শুধু শুধু প্যারা দেয় স্যাররা।"
ইয়াশের কথা শুনে রিদ হেসে মাথা নাড়ল। তারপর বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলল,
-"প্যারা দেওয়া স্যারদের অভ্যাস, ব্রো!"
রিদের এমন ভাবগম্ভীর উত্তর শুনে বাকিরা হেসে উঠল। ইয়াশও ঠোঁট বাঁকিয়ে রিদের দিকে তাকাল, যেন তার কথার সঙ্গে পুরোপুরি একমত। সিয়াম হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল।
জুয়িনও হালকা হাসল। একসময় তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তাসিফার ওপর। তাসিফা তখন বাকিদের সঙ্গে হেসে কথা বলছে। হাসির কারণে তার চোখেমুখে একটা উচ্ছ্বসিত ভাব ফুটে উঠেছে। জুয়িন কয়েক মুহূর্ত সেদিকে তাকিয়ে থেকে আবার বন্ধুদের কথায় মন দিল।
এমন সময় ইয়াশ হঠাৎ গতকালের কথা মনে করে বলে উঠল,
-"ভাই, গতকাল আমরা রিকশায় ওঠার পর কী যে বৃষ্টি! একদম ভিজে গেছিলাম।"
কথাটা শুনে তাসিফার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে আগের রাতের ঘটনা মনে পড়ে গেল। ভাবনাটা মুখে আটকে রাখতে না পেরে সে অসাবধানেই বলে ফেলল,
-"আমি আর জুয়িন ভাইয়া.."
কথাটা মুখ থেকে বের হতেই তাসিফার খেয়াল হলো, সে কী বলে ফেলেছে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে মুখের ওপর হাত চাপা দিল সে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
চারপাশের হাসি-ঠাট্টা মুহূর্তেই থেমে গেল।
ইয়াশ, সাদ আর তাসনিম প্রথমে তাসিফার দিকে তাকাল। তারপর তিনজনেই ধীরে ধীরে জুয়িনের দিকে চোখ ফেরাল। রিদ আর সিয়ামও কৌতূহলী দৃষ্টিতে একবার তাসিফা, আরেকবার জুয়িনের মুখের দিকে তাকাতে লাগল।
হঠাৎ এমন নীরবতা নেমে আসায় তাসিফা বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। মুখের ওপর হাত রেখেই সে মনে মনে নিজেকে বকতে লাগল। এত কথা থাকতে এই কথাটাই কেন যে তার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।
জুয়িনও মুহূর্তের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। তবে সেটা তার মুখে খুব একটা প্রকাশ পেল না। বরং সে আশপাশে তাকাতে লাগল, যেন হঠাৎ করেই চারপাশের অন্য কিছু তার মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে। পরিস্থিতিটা যে বাকিদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেটা বুঝতে তার অসুবিধা হলো না।
ইয়াশ আর তাসনিম এবার চোখ সরু করে তাসিফার দিকে তাকাল। দুজনের মুখেই কৌতূহলী হাসি।
ইয়াশ একটু সামনে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
-"কী বললি?"
তাসনিমও চোখ ছোট করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল। যেন তার মুখ থেকে পুরো কথাটা বের না করা পর্যন্ত তারা শান্ত হবে না।
তাসিফা দ্রুত মাথা নাড়ল।
-"কই? কিছু না!"
কিন্তু তার তাড়াহুড়ো করে দেওয়া উত্তর শুনে ইয়াশের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে এমন একটা ভাব করল, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো রহস্যের সন্ধান পেয়েছে।
-"তোর জুয়িন ভাইয়ের কসম, সব সত্য বল!"
ইয়াশের কথা শুনে তাসিফা এবার আরও বিপদে পড়ে গেল। সে একবার ইয়াশের দিকে, আরেকবার তাসনিমের দিকে তাকাল। কী বলবে বুঝতে না পেরে মুখ খুলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই জুয়িন বলে উঠল,
-"আরে, তেমন কিছু না। গতকাল রাতে আমরা দুজন বৃষ্টির মধ্যেই বাইক রাইডে গিয়েছিলাম।"
জুয়িনের কথা শুনে সবাই কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ করে রইল।
ইয়াশ চোখ বড় বড় করে জুয়িনের দিকে তাকাল। পরমুহূর্তেই নাটকীয় ভঙ্গিতে মেঝেতে বসে পড়ল। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে তাসিফার দিকে তাকিয়ে এমন একটা মুখ করল, যেন জীবনের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে সে।
-"আমাদের একবারও বললি না? এই ছিল তোর মনে?"
ইয়াশের এমন নাটকীয় আচরণ দেখে তাসনিম হেসে ফেলল। রিদ আর সিয়ামও হাসি চাপতে পারল না।
তাসিফা অবশ্য হাসতে পারল না। সে অসহায় চোখে জুয়িনের দিকে তাকাল।
কিন্তু জুয়িনের মুখে তখন মৃদু হাসি। তাসিফার অসহায় দৃষ্টি দেখে সে আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। এরপর ইয়াশের কাছে গিয়ে তার হাত ধরে মেঝে থেকে দাঁড় করিয়ে দিল। তারপর ইয়াশের কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল,
-"কষ্ট পেয়ো না। তোমাকেও রাইডে নিয়ে যাব।"
কথাটা শুনে বাকিরা আবারও হেসে উঠল। তাসনিম তো হাসতে হাসতে ইয়াশের দিকে তাকাল, আর রিদ মাথা নাড়িয়ে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ইয়াশ প্রথমে মুখ গম্ভীর করে রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু জুয়িনের কথাটা শুনে তারও হাসি পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত সেও হেসে উঠল।
তাসিফা এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবে মনে মনে ঠিক করে নিল, পরেরবার বন্ধুদের সামনে জুয়িনের কথা বলতে হলে আগে অন্তত দুবার ভাববে। কারণ এই ভণ্ডপার্টির হাতে একবার কোনো বিষয় পড়ে গেলে, সেটা নিয়ে যে কতক্ষণ টানাটানি চলতে পারে, তা তার ভালো করেই জানা আছে।
----
প্রথমে ক্লাস করবে না বলে যতই আপত্তি করুক, শেষ পর্যন্ত প্রথম ক্লাসটা মিস করে বাকি ক্লাসগুলো করতে চলে গেল ভণ্ডপার্টির সবাই। আড্ডা দিতে দিতে সময় কীভাবে কেটে গেল, তা যেন টেরই পায়নি তারা। তবে বাকি ক্লাসগুলো আর মিস করার ইচ্ছা ছিল না কারও। তাই একে একে সবাই নিজেদের ক্লাসের দিকে রওনা দিল।
ভণ্ডপার্টির সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে জুয়িনরাও আর দেরি করল না। তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস থাকায় নিজেদের ক্লাসে চলে গেল।
----
তবে ক্লাসে এসে মাইনকা চিপায় পড়ল তাসিফা। ভণ্ডপার্টির সবাই যেন তার পেছনে লেগেছে। গতকাল রাতে জুয়িনের সঙ্গে কী কী হয়েছে, তা জানার জন্য সবাই মরিয়া। স্যারের সামনে সরাসরি কিছু জিজ্ঞেস করার উপায় নেই বলে তারা আড়ালেই তাসিফাকে প্রশ্ন করতে শুরু করল।
ইয়াশ একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
-"গতকাল আর কী কী হয়েছে?"
স্যার যেন শুনতে না পান, সেদিকে খেয়াল রেখেই তাসিফাকে জেরা করছে সে। কিন্তু তাসিফা চুপ করে রইল। কোনো উত্তর না পেয়ে ইয়াশের পাশে বসা তাসনিম আর সাদও বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
-"বলবি না?"
তাসিফা এবার অসহায় চোখে তাদের দিকে তাকাল। তিনজনের চোখেমুখে একই রকম আগ্রহ দেখে সে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যে সহজ হবে না, তা সে বেশ বুঝতে পারছে।
সে একবার স্যারের দিকে তাকাল। স্যার তখন বোর্ডে কিছু একটা লিখছেন। ক্লাসের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই খাতায় লিখতে ব্যস্ত। সেই সুযোগে তাসিফা একটু ঝুঁকে নিচু স্বরে বলল,
-"তেমন কিছু হয়নি। প্রথমে দুজনে বসে চা খেয়েছি। তারপর একটা আইসক্রিমের দোকানে গিয়েছিলাম। উনি জোর করে দোকানের সব আইসক্রিম কিনে দিয়েছেন।"
কথাটা শুনে ইয়াশের চোখ বড় হয়ে গেল। সে অবাক হয়ে তাসিফার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল,
-"দোকানের সব আইসক্রিম কিনে দিল কেন?"
তাসিফা নিচু স্বরেই উত্তর দিল,
-"উনি আমার আইসক্রিমটা খেয়ে ফেলেছিলেন। তাই দোকানের সব আইসক্রিম কিনে দিয়েছেন। আমি তো বারণ করেছিলাম, কিন্তু আমার কথা শুনলেনই না।"
তাসিফার কথা শুনে ইয়াশের মুখে ধীরে ধীরে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"মামা, তলে তলে এত কিছু! আমাদের তো দেখছি নিজে থেকে কিছুই বলিস না।"
ইয়াশের কথা শুনে তাসিফা আর হাসি ধরে রাখতে পারল না। তাসনিম আর সাদও মুচকি হেসে উঠল।
তাসনিম এবার তাসিফার হাতটা ধরে একটু কাছে টেনে নিল। তার মুখের দুষ্টু হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল আন্তরিকতা। নিচু স্বরে বলল,
-"তুই সত্যিই অনেক লাকি, তাসিফা। দোয়া করি, সারাজীবন যেন এভাবেই সুখে থাকিস।"
তাসিফা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। বন্ধুর কথায় তার মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
এরপর আর কেউ তাসিফাকে ঘাঁটাল না। স্যারের নজর এড়িয়ে এতক্ষণ ফিসফিস করে কথা বলেছে তারা। এবার সবাই মিলে ক্লাসে মনোযোগ দিল।
----
বিকেল পাঁচটার দিকে তাসিফার ঘুম ভাঙল। ভার্সিটি থেকে ফেরার পর বেশ ক্লান্ত লাগছিল তার। বাসায় ফিরে গোসল আর খাওয়াদাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য বিছানায় শুয়েছিল। শুতে না শুতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তা নিজেও টের পায়নি। ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে কয়েক মুহূর্ত চারপাশে তাকিয়ে রইল তাসিফা। শরীরের ক্লান্তিটা এখন অনেকটাই কেটে গেছে।
কিছুক্ষণ পর বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল সে। বাসায় বসে থাকতে আর ভালো লাগছিল না তাসিফার। হঠাৎ করেই জুয়িনের কথা মনে পড়ল। মনে হলো, একবার তার ফ্ল্যাট থেকে ঘুরে এলে মন্দ হয় না।
যেই ভাবা, সেই কাজ। মাথায় ওড়না জড়িয়ে আর দেরি করল না তাসিফা। রুম থেকে বেরিয়ে বাসার দরজা খুলে বাইরে এল। এরপর দরজাটা বন্ধ করে ছাদের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।
আয়রা বেগম তখন নিজের রুমে বসে মোবাইল দেখায় ব্যস্ত ছিলেন। তাসিফা যে নিঃশব্দে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে, সেদিকে তাঁর কোনো খেয়ালই ছিল না।
----
তাসিফা এসে জুয়িনের দরজায় নক করল। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করার পর ভেতর থেকে দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে তাসিফাকে দেখে জুয়িন একটু অবাক হলেও তা প্রকাশ করল না। স্বাভাবিকভাবেই দরজার পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়ে তাকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিল।
কিন্তু তাসিফা দরজার সামনে দাঁড়িয়েই রইল। ভেতরে ঢোকার কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার। বরং পিটপিট করে জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।
জুয়িন প্রথমে কিছু বলল না। কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে যখন দেখল তাসিফা একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তখন ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
-"ভেতরে আয়। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"
তাসিফা ঠোঁট দুটো সামান্য বাঁকিয়ে মাথা নাড়ল।
-"ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছে না।"
-"কেন?"
-"এমনি।"
তাসিফা এমনভাবে উত্তর দিল, যেন এর চেয়ে যুক্তিসংগত কারণ আর হতেই পারে না। জুয়িন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার এমন অদ্ভুত আচরণে সে অভ্যস্ত।
তাসিফা এবার একটু এগিয়ে এসে বলল,
-"আপনি একটু আপনার গিটারটা নিয়ে আসুন ছাদে।"
জুয়িনের ভ্রু সামান্য ওপরে উঠে গেল।
-"গিটার দিয়ে কী করবি?"
-"আহা, আগে নিয়ে আসুন না! এত প্রশ্ন করেন কেন?"
তাসিফার কথায় জুয়িনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে মনে মনে ভাবল, মেয়েটা নিশ্চয়ই আজ তার গলায় গান শুনতে চায়। হয়তো কোনো নতুন গান শোনার আবদার করবে। জুয়িন আর কথা বাড়ালো না। শুধু বলল,
-"আচ্ছা, দাঁড়া। নিয়ে আসছি।"
কথাটা বলে জুয়িন ঘরের ভেতরে চলে গেল। তাসিফা দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জুয়িন গিটার হাতে ফিরে এল। দরজা বন্ধ করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"চল, যাই।"
তাসিফা আর কিছু না বলে তার সঙ্গে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল।
তাসিফার ছাদে এসে চোখ পড়ল একপাশে রাখা চেয়ারটার দিকে। কয়েক দিন হলো জুয়িন চেয়ারটা সেখানে রেখেছে। তাসিফাকে ছাদের রেলিংয়ের ওপর বসতে দেয় না সে। জায়গাটা বেশ উঁচু, অসাবধানতাবশত কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। তাই তাসিফা ছাদে এলে রেলিংয়ের ওপর বসার বদলে যেন চেয়ারে বসতে পারে, সেই ব্যবস্থা করেছে জুয়িন।
তাসিফা চেয়ারের কাছে গিয়ে ধীরে করে বসে পড়ল। তারপর জুয়িনের দিকে তাকাল।
জুয়িন গিটারটা হাতে নিয়ে রেলিংয়ের কাছে চলে গেল। রেলিংয়ের ওপর বসে গিটারটা কোলে রাখল সে। এক হাত দিয়ে গিটারের গলা ধরে অন্য হাতের আঙুল তারগুলোর ওপর আলতো করে ছোঁয়াল। টুং করে একটা শব্দ হলো। সে সুর ঠিক আছে কি না, তা বোঝার জন্য আরও একবার তারে আঙুল বুলিয়ে দিল।
তাসিফা হঠাৎ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল। তাসিফাকে নিজের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে জুয়িন মুখ তুলে তাকাল। মেয়েটা তার সামনে এসে দাঁড়াতেই কোনো কথা না বলে হাত বাড়িয়ে গিটারটা নিয়ে নিল।
জুয়িন ভ্রু সামান্য উঁচু করে তাকাল তার দিকে। তাসিফার মুখে তখন মিষ্টি একটা হাসি। গিটারটা হাতে নিয়ে সে বলল,
-“সব সময় তো আপনি আমাকে গান শুনিয়ে থাকেন। আজ নাহয় আমিই আপনাকে একটা গান শুনাই?”
কথাটা শুনে জুয়িন হেসে ফেলল। তাসিফার গলায় গান শোনার সুযোগ সে আগে কখনো পায়নি। মেয়েটা নিজে থেকে তাকে গান শোনাতে চাইছে, ব্যাপারটা তার কাছে বেশ আনন্দেরই লাগল। তবে তাসিফা যে সত্যিই গান গাইতে পারে, সেটা নিয়ে তার মনে একটু কৌতূহল জাগল।
সে হালকা হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-"তুই গান গাইতে পারিস?"
তাসিফা গিটারটা সামলে নিয়ে মাথা নাড়ল।
-"কিছুটা।"
জুয়িন এবার গিটারটার দিকে তাকাল। তারপর আবার তাসিফার মুখের দিকে চোখ তুলে প্রশ্ন করল,
-"গিটার বাজাতে পারিস তো?"
তাসিফা হেসে ফেলল। তার হাসিতে একটু লজ্জা, একটু আত্মবিশ্বাসের অভাব। সে গিটারটা হাতে ঠিকঠাক করে ধরে বলল,
-"আধটু পারি আরকি।"
তাসিফার উত্তর শুনে জুয়িনের ঠোঁটের কোণে হাসি আরও গাঢ় হলো। সে আর কোনো প্রশ্ন করল না। বরং রেলিংয়ের ওপর বসে আরাম করে তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল।
এদিকে তাসিফা গিটারটা নিয়ে আবার নিজের চেয়ারের কাছে ফিরে গেল। ধীরে করে বসে গিটারটা কোলে রাখল। তারপর একটু নড়েচড়ে নিজের বসার ভঙ্গি ঠিক করে নিল। আঙুলগুলো তারের ওপর রাখতেই মৃদু টুংটাং শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
প্রথমে কয়েকবার আলতো করে তারে আঙুল ছুঁইয়ে সুর মেলানোর চেষ্টা করল সে। কখনো একটা তারে টোকা দিচ্ছে, কখনো আবার অন্যটায় আঙুল বুলিয়ে নিচ্ছে। জুয়িন চুপচাপ বসে তার কাণ্ড দেখছিল। তাসিফার মুখের একাগ্রতা দেখে তার হাসি পাচ্ছিল, তবে সেটা প্রকাশ করল না।
কিছুক্ষণ পর তাসিফা মুখ তুলে জুয়িনের দিকে তাকাল। ছেলেটা যে মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে, তা বুঝতে পেরে সে একটু হেসে নিল। তারপর গিটারের দিকে চোখ নামিয়ে আবার সুর তুলল।
টুংটাং শব্দের সঙ্গে ধীরে ধীরে তার কণ্ঠ মিশে গেল,
-"এ প্রণয়ে অন্ধ হলাম,
প্রাণের আলো তুমি।
দুঃখ এলে ভুলে যেও না,
বাঁচব না তো আমি..."
তাসিফার কণ্ঠ শুনে জুয়িনের মুখের হাসিটা একটু থমকে গেল। সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগল। তাসিফার গলায় এমন কোমল সুর সে আগে শোনেনি। মেয়েটা খুব জোরে গাইছে না, বরং মৃদু স্বরে নিজের মতো করে গান গেয়ে চলেছে। গিটারের সুরের সঙ্গে তার কণ্ঠ মিশে ছাদের শান্ত পরিবেশে অন্য রকম একটা আবহ তৈরি করল।
তাসিফা গাইতে গাইতে একবার জুয়িনের দিকে তাকাল। জুয়িনের চোখ তখনও তার দিকেই স্থির। চোখাচোখি হতেই তাসিফার ঠোঁটে ছোট্ট হাসি ফুটে উঠল। সে আবার গিটারের দিকে তাকিয়ে পরের অংশে এগিয়ে গেল।
গানটা জুয়িনেরও পরিচিত। তাই তাসিফার গানের মাঝেই সে গলা মেলাল।
-"এ প্রণয়ে কথা দিলাম,
সূর্য, চন্দ্র, তারা সাক্ষী থেকো,
মরণ যেনো হয়, হয়না তোমায় ছাড়া।"
জুয়িনের কণ্ঠ শুনে তাসিফা একটু অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকাল। এরপর হেসে পরের অংশটুকু সে নিজেই গাইল। এবার তার কণ্ঠে আগের চেয়ে একটু বেশি উচ্ছ্বাস।
-"আমি তোমার মনের ভেতর,
একবার ঘুরে আসতে চাই।
আমায় কতটা ভালোবাসো,
সেই কথাটা জানতে চাই..."
গান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জুয়িন আর কোনো কথা বলল না। সে চুপচাপ বসে তাসিফার গান শুনল। শেষ লাইনটুকু গেয়ে তাসিফা ধীরে ধীরে আঙুল সরিয়ে নিল গিটারের তার থেকে। সুর থেমে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য ছাদে নীরবতা নেমে এল।
তাসিফা গিটারটা কোলে রেখেই মুখ তুলে তাকাল জুয়িনের দিকে। ছেলেটা তখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখে এমন এক মুগ্ধতা যে তাসিফার নিজেরই একটু লজ্জা লাগল।
তবু সেটা আড়াল করে সে হেসে জিজ্ঞেস করল,
-"কেমন গাইলাম?"
জুয়িন কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে বলল,
-"খুন করে দেওয়ার মতো গেয়েছিস!"
কথাটা শুনে তাসিফার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। সে চোখ বড় বড় করে জুয়িনের দিকে তাকাল।
-"মানে? এত খারাপ গেয়েছি?"
তার কণ্ঠে অভিমানের আভাস পেয়ে জুয়িন আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে হেসে মাথা নাড়ল।
-"আরে, না! এত সুন্দর গেয়েছিস যে একেবারে খুন করে দেওয়ার মতো।"
তাসিফা কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জুয়িনের দুষ্টু হাসি দেখে বুঝতে পারল, সে ইচ্ছে করেই তাকে বোকা বানাচ্ছে।
তাসিফা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
-"আপনি না একদম অসহ্য!"
জুয়িনের হাসি আরও চওড়া হলো। তাসিফার মুখে অভিমানের ভান দেখে তার বেশ মজা লাগছিল।
তাসিফা মুখ ঘুরিয়ে নিলেও নিজের হাসিটা বেশিক্ষণ লুকিয়ে রাখতে পারল না। কিছুক্ষণ পর আবার জুয়িনের দিকে তাকাল। জুয়িনও তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
প্রথমবার তাসিফার গলায় গান শুনে জুয়িন যে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছে, সেটা তার চোখেমুখেই স্পষ্ট। আর তাসিফা তো মনে মনে খুশি হলো, কারণ জুয়িনের মুখে প্রশংসা শোনার জন্যই তো এত কষ্ট করে গানটা গাওয়া তার।
তাসিফা এবার গিটারটা জুয়িনের দিকে এগিয়ে দিল। জুয়িন গিটারটা হাতে নিয়ে পাশে রেখে দিল। এরপর আবার আগের মতো বসে রইল দুজন। বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। ছাদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসে তাসিফার ওড়নার একাংশ বারবার উড়ে এসে গায়ে লাগছিল। অথচ তার সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। কিছু একটা নিয়ে ভাবছিল সে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তাসিফা জুয়িনের দিকে ফিরে তাকাল। মনে মনে কথাটা কয়েকবার গুছিয়ে নিয়েও কীভাবে শুরু করবে, বুঝতে পারছিল না। শেষ পর্যন্ত একটু ইতস্তত করে বলল,
-“আচ্ছা, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি?”
জুয়িন তার দিকে তাকাল। তাসিফার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে সামান্য ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"আমার কাছে কিছু জানতে চাইলে এভাবে ভণিতা করার কী আছে? যা জানতে ইচ্ছে করছে, সরাসরি জিজ্ঞেস কর। এত ফরমালিটি করার প্রয়োজন নেই।”
তাসিফা ঠোঁট দুটো একবার চেপে ধরল। কথাটা কীভাবে বলবে, তা নিয়ে যেন আবারও একটু দ্বিধায় পড়ে গেল। তারপর আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল,
-"আপনার বাবা-মা আছেন?”
কথাটা শুনে জুয়িনের মুখে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেল। তাসিফার দিকে একবার তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। নিজের নখ খুঁটতে খুঁটতে সংক্ষিপ্তভাবে বলল,
-“আছেন।”
তাসিফা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িনের এমন ছোট্ট উত্তরে তার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল।
-"কোথায়?”
জুয়িন নির্বিকার কণ্ঠে বলল,
-“নিজেদের বাড়িতে।”
তাসিফা ভ্রু কুঁচকে ফেলল। কথাটার অর্থ বুঝতে তার কয়েক মুহূর্ত সময় লাগল। তারপর জুয়িনের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
-“নিজেদের বাড়িতে মানে? তাহলে আপনি এখানে কেন?”
জুয়িন এবার তার দিকে তাকাল। মুখের স্বাভাবিক ভাবটা বজায় রেখেই বলল,
-“বিশাল কাহিনি আছে।”
কথাটা বলে সে থেমে গেল। তাসিফাও সঙ্গে সঙ্গে আর কিছু বলল না। তবে তার মনে জমে থাকা প্রশ্নগুলো যেন একটার পর একটা সামনে চলে আসছিল। এত দিন একই বিল্ডিংয়ে থেকেও জুয়িনের পরিবার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা হয়নি তার। আজ সুযোগ পেয়ে বিষয়টা জানতে ইচ্ছে করছে।
কিছুক্ষণ পর তাসিফা একটু গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-“আপনি কি আপনার পরিবারের সঙ্গে থাকেন না?”
-“না।”
জুয়িনের সংক্ষিপ্ত উত্তরটা শুনে তাসিফা থমকে গেল। তার ধারণা ছিল, হয়তো পরিবারের সঙ্গে কোনো কারণে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। কিন্তু জুয়িন যেভাবে কথাটা বলল, তাতে মনে হলো বিষয়টা তার ধারণার চেয়েও জটিল।
তাসিফা এবার আরেকটু সতর্ক হয়ে প্রশ্ন করল,
-“কেন? কিছু হয়েছিল?”
জুয়িন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না। সামনের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল সে। এত দিন পরেও বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তার ভেতরে জমে থাকা অস্বস্তিটা পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে পারল না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে শেষ পর্যন্ত বলতে শুরু করল,
-"আমি যখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়তাম, তখন বাবা তাঁর বিজনেস পার্টনারের একমাত্র মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন। অথচ এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবারও আমার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।”
তাসিফা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। জুয়িন একটু থামতেই সে জানতে চাইল,
-“কেন বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন?"
জুয়িন ঠোঁটের কোণে তিক্ত হাসির আভাস ফুটিয়ে বলল,
-“বাবা চেয়েছিলেন, তাঁর বিজনেস পার্টনারের মেয়ের সঙ্গে আমার বিয়ে হলে তাঁদের ব্যবসায়িক সম্পর্কটা আরও মজবুত হবে। এতে ব্যবসার দিক থেকেও তাঁর লাভ ছিল। সবদিক বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন, শুধু একবারও ভাবেননি, এই বিয়েতে আমার মতামত আছে কি না, কিংবা আমি আদৌ রাজি কি না।”
শেষ কথাটা বলার সময় জুয়িনের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠল। তাসিফা চুপ করে তার কথা শুনছিল। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এমন একটা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টা তার মোটেও ভালো লাগল না। তবু জুয়িনকে মাঝপথে থামাল না সে।
জুয়িন আবার বলতে শুরু করল,
-“আমি ওই বিয়েতে রাজি ছিলাম না। বাবাকে স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলাম, এই বিয়ে আমি করব না। কিন্তু তিনি আমার কথায় গুরুত্ব দেননি। এ নিয়ে বাড়িতে অনেকবার কথা-কাটাকাটি হয়েছে। আমি যতবার নিজের অসম্মতির কথা জানিয়েছি, তিনি ততবারই নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।”
তাসিফা একটু শক্ত হয়ে বসে রইল। জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল, সেই সময়টায় ঠিক কতটা অসহায় বোধ করেছিল সে।
-“এরপর কী হয়েছিল?”
জুয়িন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“একপর্যায়ে আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। বারবার একই কথা বুঝিয়ে বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্তে আমার মতামতের কোনো মূল্যই থাকবে না, এটা মেনে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এ নিয়ে বাড়িতে প্রচণ্ড ঝামেলা হয়েছিল। আমার এমন আচরণ বাবা একদম সহ্য করতে পারেননি। একসময় রাগের মাথায় আমাকে একটা চড় মেরে বসেন। তারপর স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁর বিজনেস পার্টনারের মেয়ে ইরাকে বিয়ে করতে না চাইলে যেন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই। কথাগুলো শোনার পর আমি আর কিছু বলিনি। শুধু মনে হয়েছিল, নিজের ইচ্ছার কথা বলার জন্যও যদি আমাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেখানে থেকে লাভ কী?”
কথাগুলো বলতে বলতে জুয়িনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। পুরোনো ঘটনাটা মনে পড়তেই তার মুখের স্বাভাবিক ভাবটা কিছুটা বদলে গেল।
-“পরিবারের অন্যরা আমাদের থামানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি অনেকটাই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আমিও প্রচণ্ড রেগে ছিলাম। বাবার মুখে কথাগুলো শোনার পর আর ওই বাড়িতে এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করেনি। তাই আর কারও সঙ্গে কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে চলে যাই। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হয়েছিল, যেখানে নিজের জীবনের এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকুও নেই, সেখানে জোর করে পড়ে থাকার কোনো মানে হয় না।”
তাসিফা নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িনের মুখে ঘটনাটা শুনে তার ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে এল। যে মানুষটাকে সে এত দিন ধরে চেনে, তার জীবনের এই দিকটা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তার। জুয়িনের স্বভাবের মধ্যে যে জেদ আছে, তা তাসিফা জানে। কিন্তু সেই জেদের পেছনে এমন একটা ঘটনা জড়িয়ে আছে, সেটা ভাবেনি।
কিছুক্ষণ পর সে জানতে চাইল,
-“আপনার পরিবারের বাকিদের সঙ্গে কি আপনার কোনো যোগাযোগ নেই?”
জুয়িন মাথা নাড়ল।
-“মা, জিনিয়া আপু আর কাজিনদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। জিনিয়া আপুর সঙ্গে মাঝে মাঝে বাইরে দেখা করি। আর মা ও কাজিনদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়। তবে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই।”
তাসিফা এবার একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করল,
-"পরিবারের কেউ এই বাসার ঠিকানা জানে না?"
-“না।”
উত্তরটা শুনে তাসিফার বিস্ময় আরও বাড়ল। এতটা দূরত্ব বজায় রেখে যে কেউ নিজের পরিবার থেকে আলাদা থাকতে পারে, সেটা তার কল্পনার বাইরে ছিল। এবার তার মনে আরেকটা প্রশ্ন এল।
-“আপনার হাতখরচ? মানে, নিজের চলাফেরা আর অন্যান্য খরচের টাকা কীভাবে সামলান?”
জুয়িন এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“নিজের খরচ চালানোর জন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না আমাকে। আমি নিজেই উপার্জন করি। ফ্রিল্যান্সিং করি, আর সেখান থেকেই নিজের যাবতীয় খরচ চালাই।”
তাসিফার চোখ বড় হয়ে গেল।
-“মানে, নিজের সব খরচ আপনি নিজেই চালান?”
জুয়িন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তাসিফা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িনের নিজের উপার্জনে চলার বিষয়টা তার কাছে নতুন। সে জানত, জুয়িন নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে যথেষ্ট দৃঢ়। কিন্তু পরিবার থেকে আলাদা হয়ে নিজের সব দায়িত্ব নিজে সামলানোর বিষয়টা তার কাছে অন্য রকম মনে হলো।
তবে এত কিছু জানার পরও তাসিফার মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। সে একটু দ্বিধা নিয়ে বলল,
-“আচ্ছা, এখন আপনার বাবা কি আপনার সঙ্গে সব মিটমাট করতে চান ?”
জুয়িন এবার আগের চেয়ে একটু ধীরে উত্তর দিল,
-"চেয়েছেন। বাবা পরে আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন। কিন্তু আমারও তো আত্মসম্মান আছে, তাসিফা। যেদিন তিনি নিজেই আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিলেন, সেদিনের কথাগুলো চাইলেই ভুলে যেতে পারি না। কথাটা হয়তো রাগের মাথায় বলেছিলেন, কিন্তু আমার কাছে তো সেটা মিথ্যে ছিল না। এখন তিনি ফিরে যেতে বললেই কি সব ভুলে বাড়ি ফিরে যাওয়া সম্ভব? আমার পক্ষে এত সহজ নয়।”
কথাগুলো বলার পর জুয়িনের মুখটা ধীরে ধীরে মলিন হয়ে এল। এতক্ষণ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলেও এবার তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। সে দ্রুত হাত তুলে চোখের কোণ মুছে নিল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে অন্যদিকে তাকাল, যেন তাসিফা তার চোখের সেই পরিবর্তনটা খেয়াল না করে।
কিন্তু তাসিফার চোখ এড়াল না কিছুই।
জুয়িনের এমন অভিব্যক্তি দেখে তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল। মানুষটা যতই নিজেকে শক্ত করে রাখুক, পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া কষ্টটা যে এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সেটা বুঝতে তাসিফার অসুবিধা হলো না। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে নরম স্বরে বলল,
-“আপনি একবার অন্তত উনার সঙ্গে কথা বলে দেখুন। জানি, উনার কথায় আপনি অনেক কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু মানুষ তো রাগের মাথায় অনেক কিছুই বলে ফেলে। এখন যখন তিনি নিজেই আপনাকে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছেন, তখন একবার ভেবে দেখুন না। এভাবে দূরে সরে থেকে কি সত্যিই নিজের মানুষগুলোর কাছ থেকে দূরে থাকা যায়?”
জুয়িন কোনো উত্তর দিল না। সামনের দিকে তাকিয়ে শুধু ছোট্ট করে বলল,
-“উঁহু।”
তাসিফা বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে তাকে বোঝানো সহজ হবে না। জুয়িনের আত্মসম্মানবোধ প্রবল। কোনো বিষয়ে একবার সিদ্ধান্ত নিলে সহজে সেখান থেকে সরে আসার মানুষ সে নয়। তার ওপর জুয়িনের জেদ সম্পর্কে তাসিফার বেশ ভালোই ধারণা আছে। তাই আর কথা বাড়াল না সে।
কিছুক্ষণ পর প্রসঙ্গ বদলানোর জন্য তাসিফা জিজ্ঞেস করল,
-"আপনারা কি যৌথ পরিবারে থাকেন?”
জুয়িন এবার তার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বলল,
-“হুম।”
-“তাহলে তো আপনার অনেক কাজিন আছে!”
-“হুম।”
জুয়িনের ছোট ছোট উত্তর শুনে তাসিফা আর কথা বাড়াল না। পুরোনো ঘটনাটা মনে পড়ে হয়তো তার মন খারাপ হয়ে আছে। তাই একই বিষয় নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে তাকে আর অস্বস্তিতে ফেলতে চাইল না।
ছাদের ওপর আবার নীরবতা নেমে এল। তাসিফা চারপাশে তাকাল। বিকেলের আলো অনেকটাই ম্লান হয়ে এসেছে। পশ্চিম আকাশের রং বদলে যাচ্ছে, বাতাসেও সন্ধ্যা নামার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
সময়টা খেয়াল করতেই তাসিফা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওড়নাটা ঠিক করে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“এখন তো মাগরিবের আজান দেবে। আমি তাহলে বাসায় যাই।”
জুয়িন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
তাসিফা আর কিছু না বলে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ছাদ থেকে নামতে নামতে তার মনে বারবার জুয়িনের কথাগুলোই ফিরে আসছিল। এত দিন পাশাপাশি থেকেও মানুষটার জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায় তার অজানা ছিল।
অন্যদিকে জুয়িন আগের জায়গাতেই বসে রইল। পাশে রাখা গিটারটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
#চলবে
( প্রচণ্ড জ্বরে ভুগছি, শরীরও ভীষণ দুর্বল। অসুস্থতার মধ্যেও আজ যতটুকু পেরেছি, লেখার চেষ্টা করেছি। তাই আজকের পর্বটি কিছুটা অগোছালো মনে হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
শরীরটা ভালো না থাকায় আগামী কয়েক দিন গল্প দিতে পারব না। আশা করি, আপনারা বিষয়টি বুঝবেন এবং পাশে থাকবেন। সুস্থ হয়ে আবারও আপনাদের মাঝে ফিরে আসব, ইনশাআল্লাহ। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন। )