ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 53

লেখক: মিশু

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

----

সবাই চলে যাওয়ার পর পুরো বাসাটাই যেন কেমন নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে সবার হাসি-আড্ডায় মুখর ছিল চারপাশ, এখন সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। তাসিফা আর আয়রা বেগমের মনটাও খারাপ হয়ে আছে। এতক্ষণ সবাইকে কাছে পেয়ে বেশ ভালোই কাটছিল সময়টা। হঠাৎ করে সবাই চলে যাওয়ায় বাসাটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

আলমগীর আলমও কাজে বেরিয়ে গেছেন। তাসিফা নিজের বেলকনিতে এসে বসে আছে। বাইরে হালকা বাতাস বইছে, কিন্তু তাতেও গরমের অস্বস্তি কমছে না। তাসিফা বেলকনির চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে দূরে তাকিয়ে আছে। তার মনটা আজ কেমন বিষণ্ন।

----

দুপুরের দিকে পিকআপে করে জুয়িনের লোকেরা ফুলগাছগুলো নিয়ে গেছে। গাছগুলো ঠিকঠাক পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে আলাদা করে চিন্তা করার প্রয়োজন পড়েনি।

এর মধ্যে আয়রা বেগমের সঙ্গে আফসানা শিকদারের ফোনে কথা হয়েছে। অন্যদিকে জিনিয়াও তাসিফার সঙ্গে কথা বলেছে।

দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর তাসিফার হঠাৎ জুয়িনের কথা মনে পড়ল। লোকটার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে তার। তাই আর দেরি না করে ভিডিও কল দিল।
কিন্তু জুয়িন কল ধরল না।

তাসিফা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার কল দিল। এবারও একই অবস্থা। দুই-তিনবার চেষ্টা করেও যখন কোনো সাড়া পেল না, তখন তার মুখটা মলিন হয়ে গেল।
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল তাসিফা।

"লোকটা এখন কী করছে? এত ব্যস্ত নাকি?"
মনে মনে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে ফোনটা নামিয়ে রাখল সে। জুয়িন ব্যস্ত থাকতেই পারে, তবু তার কলটা অন্তত একবার ধরলে কী এমন ক্ষতি হতো?

অভিমান হলো একটু। সেই অভিমান নিয়েই চুপচাপ বসে রইল তাসিফা।

----

অন্যদিকে, জুয়িন তখন শাওয়ার নিচ্ছে। ঠান্ডা পানির ধারা মাথা বেয়ে নেমে আসছে। দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করার অভ্যাস তার আছে। এদিকে তার রুমে বসে আছে তার সব কাজিনরা। কেউ বিছানায় বসে মোবাইল টিপছে, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে আছে। জুয়িনের রুমে একসঙ্গে এতজনের উপস্থিতিতে বেশ জমজমাট পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে জিনিয়া তাদের সঙ্গে তাসিফার কথা বলেছে। নতুন একজনকে নিজেদের দলে পাবে,এই ভেবেই সবাই বেশ খুশি। এতদিন নিজেদের মধ্যে আড্ডা, খুনসুটি আর দুষ্টুমি চলত। এবার সেই দলে আরেকজন যোগ হবে। তাসিফা কেমন, তার সঙ্গে কতটা সহজে মেশা যাবে, এসব নিয়েও তাদের মধ্যে কথা হলো। তবে পরিচয় না হওয়া পর্যন্ত তাসিফাকে নিয়ে কল্পনা করেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আগামীকালই তার সঙ্গে সবার পরিচয় হবে।

জিসা জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আচ্ছা, তাসিফা আপু কি আমাদের সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারবে?"

জিনিয়া হেসে বলল,
-"পারবে না কেন? ও খুব সহজেই সবার সঙ্গে মিশে যায়। তোরা একবার কথা বললেই বুঝতে পারবি।

-"তাহলে তো ভালোই হলো! আমাদের দলটা আরও বড় হবে।"

জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"কালকে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই কিন্তু ওকে আমাদের দলে নিয়ে নেব।"

কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল। জিনিয়াও তাদের সঙ্গে হাসল। তাসিফার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই তাকে নিয়ে সবার এত আগ্রহ দেখে তার ভালোই লাগছে।

এদিকে প্রায় এক ঘণ্টা পর জুয়িন ওয়াশরুম থেকে বের হলো। টাওয়াল দিয়ে মাথার চুল মুছতে মুছতে সে রুমে প্রবেশ করল। শরীরে বাদামি রঙের টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজার। ভেজা চুল থেকে তখনো টুপটুপ করে পানি পড়ছে। রুমে ঢুকেই বাকিদের দিকে একবার তাকাল, কিন্তু কিছু বলল না। সোজা বিছানার দিকে এগিয়ে গিয়ে মোবাইলটা হাতে তুলে নিল।

স্ক্রিন অন করতেই চোখে পড়ল তাসিফার একের পর এক ভিডিও কলের নোটিফিকেশন।

জুয়িনের হাত থেমে গেল। মুহূর্তেই নিজের জিভে কামড় দিল সে। এতবার কল দিয়েছে মেয়েটা, অথচ সে একবারও ধরেনি।

জুয়িনের মনে হলো, নিশ্চয়ই মেয়েটা এখন অভিমান করে বসে আছে। কল না ধরার জন্য হয়তো কত কিছুই ভেবেছে! তাসিফার অভিমানী মুখটা কল্পনা করতেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। তবে সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মেয়েটার অভিমান ভাঙানোও তো দরকার।

সে একবার রুমে উপস্থিত থাকা বাকিদের দিকে তাকাল। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ গল্প করছে, কেউ মোবাইল নিয়ে বসে আছে। জুয়িন এবার গম্ভীর গলায় বলল,
-"তোরা রুম থেকে এখন বের হ। বিকেলে তোদের সঙ্গে আড্ডা দেব।"

কথাটা শুনে সবাই তার দিকে তাকাল। আরাফ ভ্রু তুলে বলল,
-"কেন? এখন আবার কী করলাম আমরা?"

জুয়িন বিরক্ত চোখে তাকাল।
-"কিছু করিসনি। বলেছি বের হ।"

জিসা হেসে বলল,
-"বুঝেছি! আমাদের উপস্থিতি কারও সহ্য হচ্ছে না।"

-"বেশি কথা না বলে বের হ।"

জুয়িনের গলায় বিরক্তি থাকলেও বাকিরা বুঝতে পারল, এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে। তবে সেটা জানার জন্য এখন আর বেশি ঘাঁটাল না কেউ। একে একে সবাই রুম থেকে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় অবশ্য তাদের মুখে দুষ্টু হাসি লেগেই রইল। এখন জুয়িনকে আর জ্বালাবে না। বিকেলে সবাই একসঙ্গে বসলে ঠিকই জ্বালাবে।

সবাই বেরিয়ে যেতেই জুয়িন দরজাটা বন্ধ করে লক করে দিল। এরপর বিছানায় এসে বসল। এক হাতে টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছছে, অন্য হাতে মোবাইলটা ধরে আছে। স্ক্রিনে তাসিফার নামটা দেখে আর দেরি করল না। সঙ্গে সঙ্গে ভিডিও কল দিল।

অন্যদিকে, তাসিফা তখনো নিজের জায়গায় বসে ছিল। জুয়িনের কল না ধরার বিষয়টা নিয়ে তার মন খারাপ হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন এতবার কল দিয়েও লোকটার সাড়া না পেয়ে তার এত খারাপ লাগছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে জুয়িনের নাম ভেসে উঠতেই তাসিফার মুখে খুশির আভা ফুটে উঠল। এতক্ষণ যে মানুষটার কলের অপেক্ষায় ছিল, সেই মানুষটাই এখন তাকে কল করছে! কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখটা আবার মলিন হয়ে গেল।

এতবার কল দেওয়ার পরও লোকটা একবার ধরতে পারেনি? এখন আবার নিজেই কল করছে।

তাসিফা মনে মনে ঠিক করল, কল ধরলেও খুব একটা কথা বলবে না। একটু অভিমান তো দেখাতেই হবে। কিন্তু মোবাইলের স্ক্রিনে জুয়িনের নামটা দেখে বেশিক্ষণ আর নিজেকে শক্ত রাখতে পারল না। শেষ পর্যন্ত কলটা রিসিভ করল।

স্ক্রিনে জুয়িনকে দেখা গেল। তার চুল তখনো ভেজা। এক হাতে টাওয়াল দিয়ে মাথা মুছছে, আর অন্য হাতে মোবাইল ধরে আছে। তাসিফা কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন?"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
-"কই? তাকিয়ে আছি না তো!"

-"তাই নাকি?"

-"হুম।"

জুয়িন আর কথা বাড়াল না। বরং নিজের দেরির কারণটা জানিয়ে বলল,
-"সরি, শাওয়ার নিচ্ছিলাম। তাই তোর কল ধরতে পারিনি।"

তাসিফার মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা বদলে গেল। এতক্ষণ যে অভিমানটা মনে জমিয়ে রেখেছিল, জুয়িনের কথা শুনে সেটা অনেকটাই কমে এল। সে বুঝতে পারল, ইচ্ছে করে কল না ধরার কোনো ব্যাপার ছিল না।
তাসিফা স্বাভাবিক গলায় বলল,
-"আচ্ছা, ঠিক আছে। সমস্যা নেই।"

জুয়িন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাসিফা কথাটা স্বাভাবিকভাবে বললেও তার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ভেতরে অন্য কিছু চলছে। তবে সে আর সেই প্রসঙ্গে গেল না। বরং জানতে চাইল,
-"দুপুরে খেয়েছিস?"

তাসিফা মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। তারপর পাল্টা প্রশ্ন করল,
-"আপনি?"

-"এখনো খাইনি। একটু পর সবাই মিলে খাব।"

-"ওহ।"

তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কী বলবে, ভেবে পাচ্ছিল না। জুয়িনও তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল। শেষ পর্যন্ত তাসিফাই নীরবতা ভাঙল।
-"আচ্ছা, শুনুন।"

-"হুম, বল।"

-"একটা কথা জিজ্ঞেস করব?"

-"কর।"

তাসিফা এবার একটু গুছিয়ে নিয়ে বলল,
-"ছাদের ফ্ল্যাটটার কী হবে? খালি করবেন না?"

প্রশ্নটা শুনে জুয়িনের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে বলল,
-"না। ওটা খালি করার কোনো দরকার নেই।"

তাসিফা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-"কেন?"

জুয়িন বলল,
-"কেন,মানে?"

তাসিফা একটু থেমে বলল,
-"না, মানে..আপনি তো এখন নিজেদের বাড়িতে থাকবেন। তাই ভাবলাম, ফ্ল্যাটটা খালি করে দেবেন হয়তো।

জুয়িন এবার পরিষ্কার করে বলল,
-"ওই ফ্ল্যাটটা রেখে দেওয়াই ভালো। কারণ, তোদের বাসায় তো সবাই একসাথে থাকার মতো জায়গা হবে না।"

কথাটা শুনে তাসিফা বুঝতে পারল, জুয়িন ফ্ল্যাটটা রেখে দিতে চায়। ভবিষ্যতে তাদের বাসায় বেড়াতে গেলে সেটাই কাজে লাগবে। তার মনে আর কোনো প্রশ্ন রইল না।
-"ওহ, আচ্ছা।"

দুজনের মধ্যে টুকটাক কথা চলতে লাগল। কখনো তাসিফা কোনো প্রশ্ন করল, কখনো জুয়িন তার কথার উত্তর দিল। ভিডিও কলে কথা বলতে বলতে তাসিফার মন খারাপের রেশটাও ধীরে ধীরে কেটে গেল।

কিছুক্ষণ পর জুয়িন জানাল, তাকে নিচে গিয়ে সবার সঙ্গে খেতে হবে। তাসিফাও আর কথা বাড়াল না।
-"আচ্ছা, তাহলে রাখি।"

-"হুম। পরে কথা হবে।"

তাসিফা ছোট্ট করে হাসল।
-"আচ্ছা।"

এরপর দুজনেই কল কেটে দিল।

মোবাইলের স্ক্রিন নিভে যেতেই তাসিফা কিছুক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইল। একটু আগেও যে মনটা খারাপ ছিল, এখন সেখানে আর আগের মতো অভিমান নেই। অন্যদিকে, জুয়িনও মোবাইলটা বিছানায় রেখে টাওয়ালটা একপাশে সরিয়ে দিল। তারপর খেতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। বিকেলে কাজিনদের সঙ্গে আড্ডা তো আছেই, তার আগে দুপুরের খাবারটাও খেয়ে নিতে হবে।

----

সন্ধ্যায় ভণ্ডপার্টির সঙ্গে চ্যাটে মেতে ছিল তাসিফা। সারাদিনের নানা ঘটনা নিয়ে কথা বলছিল তারা। কখনো ইয়াশ কিছু বলছে, তো কখনো তাসনিম সেই কথার উত্তর দিচ্ছে। তাদের চ্যাটে বরাবরের মতোই হাসি-ঠাট্টার কমতি নেই।

কথায় কথায় তাসিফা সবাইকে জানাল, আগামীকাল তারা জুয়িনদের বাসায় বেড়াতে যাবে।

খবরটা শুনে সবাই একসঙ্গে ‘ওহ!’ বলে উঠল। নতুন জায়গায় যাওয়া আর একসঙ্গে সময় কাটানোর কথা ভেবে তাদেরও বেশ ভালো লাগল। তবে ইয়াশের মাথায় প্রথমেই অন্য একটা প্রশ্ন এল। সে তাসিফাকে জিজ্ঞেস করল,
-"তাহলে আগামীকাল ভার্সিটিতে আসবি না?"

তাসিফা মাথা নাড়িয়ে জানাল, না। আগামীকাল সে ভার্সিটিতে যাবে না।

তাসিফার উত্তর দেখে ইয়াশ আর কিছু বলার আগেই বাকিরা জানিয়ে দিল, তাহলে তারাও আগামীকাল ভার্সিটিতে যাবে না।

তাদের কথা শুনে তাসিফা অবাক হওয়ার বদলে হেসে ফেলল। এই দলটার স্বভাবই এমন। একজন না গেলে অন্যদেরও যাওয়ার আগ্রহ কমে যায়। ভার্সিটিতে ক্লাস থাকুক কিংবা না থাকুক, একসঙ্গে থাকলেই যেন তাদের সময় ভালো কাটে। আর সুযোগ পেলে ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার অজুহাত খুঁজতেও তাদের বেশি সময় লাগে না।

কিছুক্ষণ এ নিয়ে কথা বলার পর প্রসঙ্গ পাল্টে গেল। এবার শুরু হলো ভার্সিটির নানা ঘটনা নিয়ে আলোচনা। কে কী করেছে, কোন ক্লাসে কী হয়েছে, এমন সব বিষয় নিয়েই চলতে লাগল তাদের কথাবার্তা।

একপর্যায়ে ভার্সিটির কয়েকজন স্যারের কথা উঠতেই ইয়াশের বিরক্তি প্রকাশ পেতে শুরু করল। স্যারদের অতিরিক্ত স্ট্রিক্টনেস নিয়ে তার অভিযোগের শেষ নেই। সে একের পর এক মেসেজে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করতে লাগল। এমনকি বিরক্ত হয়ে কয়েকজন স্যারকে গালমন্দও করল।

ইয়াশের মেসেজগুলো পড়ে তাসিফা, তাসনিম আর সাদ হেসে উঠল। ইয়াশের এই স্বভাব তাদের অজানা নয়। কোনো কিছুতে বিরক্ত হলে সে চুপ করে থাকার মানুষ নয়। আর ভার্সিটির স্যারদের কড়া নিয়মকানুন তার বিরক্তির অন্যতম কারণ।

ইয়াশের অভিযোগের মাঝেই সাদও দু-একটা কথা যোগ করল। তাসনিম হাসির ইমোজি পাঠিয়ে তাদের কথায় সায় দিল।

-----

রাতের খাবার খাওয়া হয়নি তাসিফার। প্রথমে তেমন ক্ষুধা না লাগলেও এখন পেটের মধ্যে বেশ ক্ষুধা অনুভব করছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, রাত প্রায় ১২টা ৪৭ মিনিট। এত রাতে ক্ষুধা লাগায় সে কিছুক্ষণ বিছানায় শুয়ে শুয়েই ভাবল, কী খাওয়া যায়।

হঠাৎ বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছা জাগল তার মনে। বাইরে থেকে খাবার অর্ডার করার চেয়ে নিজেই রান্না করে খেলে কেমন হয়? ভাবনাটা মাথায় আসতেই আর দেরি করল না তাসিফা। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল।

এদিকে আয়রা বেগম ও আলমগীর আলম নিজেদের রুমে ঘুমাচ্ছেন। চারপাশে নীরবতা, শুধু তাসিফার ঘুম উধাও।

সে চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেল। তারপর বিরিয়ানি রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে একে একে কাজ করতে লাগল। রান্নার প্রতি তার খুব একটা অনীহা নেই, বরং মাঝেমধ্যে নিজের পছন্দের খাবার নিজেই বানিয়ে খেতে ভালো লাগে। আর এখন যেহেতু বিরিয়ানি খাওয়ার ইচ্ছা হয়েছে, তাই সেটা না বানানো পর্যন্ত তার শান্তি নেই।

অনেকক্ষণ ধরে রান্না করার পর বিরিয়ানির সুবাসে রান্নাঘর ভরে উঠল। তাসিফা মনোযোগ দিয়ে হাঁড়ির বিরিয়ানি নাড়ছিল। ঠিক তখনই পাশের টেবিলে রাখা তার মোবাইলটা বেজে উঠল।

এত রাতে আবার কে ফোন করল? তাসিফা কিছুটা অবাক হলো। এক হাতে খুন্তি দিয়ে বিরিয়ানি নাড়তে নাড়তেই অন্য হাতে মোবাইলটা তুলে নিল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই তার ভ্রু সামান্য উঁচু হয়ে গেল।

জুয়িন কল করেছে। এত রাতে হঠাৎ কী মনে করে ফোন দিল লোকটা? তাসিফা কলটা রিসিভ করে কানে ধরল। অন্য হাত দিয়ে বিরিয়ানি নাড়তে নাড়তেই বলল,
-"হ্যালো।"

ওপাশ থেকে জুয়িন কোনো ভূমিকা ছাড়াই জিজ্ঞেস করল,
-"বের হবি?"

তাসিফার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে চুলার আঁচের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলল,
-"এখন?"

-"হুম। গাড়ি নিয়ে বেরোবো। আজ বাইক নেব না।"

তাসিফা এবার একটু অবাক হলো। এত রাতে গাড়ি নিয়ে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করছে জুয়িন। কিন্তু কোথায় যাবে, সেটা তো এখনো বলেনি। সে জানতে চাইল,
-"কোথায় যাব আমরা?"

জুয়িনের উত্তর এল বেশ স্বাভাবিকভাবেই,
-"যেখানে দু চোখ যায়, সেখানে যাব।"

তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কথাটা শুনে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

ওপাশ থেকে জুয়িন আবার বলল,
-"আমি তোর বাসার নিচে গাড়ি নিয়ে দাঁড়াব। এরপর তোকে মেসেজ দিলে নিচে চলে আসিস।"

তাসিফা আর কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু বলল,
-"আচ্ছা।"

কথা শেষ করে কলটা কেটে দিল সে। তারপর মোবাইলটা পাশে রেখে হাঁড়ির দিকে তাকাল। বিরিয়ানির রান্না প্রায় শেষ। তাসিফার মুখে এবার হাসি ফুটে উঠল।

এত রাতে জুয়িনের সঙ্গে বের হবে, আর সঙ্গে কিছু খাওয়ার থাকবে না, তা কি হয়?

সে ভাবল, বিরিয়ানিটা এখনই খেয়ে নেওয়ার দরকার নেই। বরং দুজনে একসঙ্গে গাড়িতে বসে খাবে। ভাবনাটা ভালো লাগতেই তাড়াতাড়ি রান্নার বাকি কাজ শেষ করল তাসিফা।

এরপর চুলা বন্ধ করে বিরিয়ানিটা নামিয়ে কিছুটা ঠান্ডা হতে দিল। তারপর একটা খাবারের বক্সে বিরিয়ানি ভরে নিল। বক্সের ঢাকনা বন্ধ করে একপাশে রেখে দিল, যেন বের হওয়ার সময় সঙ্গে নিতে পারে।

-----

রাত তখন দেড়টা।

জুয়িনের মেসেজ পাওয়ার পর তাসিফা আর দেরি করল না। তাসিফা বাসায় পরে থাকা থ্রি-পিসটাই পরে রইল। শুধু হাত দিয়ে চুলগুলো একটু ঠিক করে নিল। তারপর বিরিয়ানির বক্সটা হাতে নিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

আয়রা বেগম আর আলমগীর আলম নিজেদের ঘরে ঘুমাচ্ছেন। এই গভীর রাতে মেয়ের ঘর থেকে বের হওয়ার খবর তাঁদের কানে গেলে যে কী হবে, সেটা তাসিফা বেশ ভালো করেই জানে। বিশেষ করে মা যদি জানতে পারেন, সে কাউকে কিছু না জানিয়েই বাইরে যাচ্ছে, তাহলে আর রক্ষা থাকবে না।

দরজাটা আস্তে করে খুলে বাইরে বেরিয়ে এল তাসিফা। তারপর যতটা সম্ভব শব্দ না করে দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিল। দরজার সামনে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে।

মনে মনে বলল,"আল্লাহ, মা যেন কিছুতেই টের না পায়।"

সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে বাইরে আসতেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটা চোখে পড়ল। জুয়িন গাড়ির ভেতরেই ছিল। তাসিফাকে দেখতে পেয়ে দরজা খুলে নেমে এল সে।

তাসিফা কাছে আসতেই জুয়িনের চোখ পড়ল তার হাতে থাকা বক্সটার দিকে।
-“হাতে এটা কিসের বক্স?”

তাসিফা মুচকি হেসে বক্সটা একটু উঁচু করে দেখাল।
-“আমার হাতের রান্না করা বিরিয়ানি।”

জুয়িনের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
-“বাহ! তাহলে তো আজকে ভালোই ব্যবস্থা করে এসেছিস।”

তাসিফা মাথা নাড়ল।

জুয়িন আর কথা না বাড়িয়ে তাসিফার হাত থেকে বক্সটা নিয়ে গাড়ির পেছনের সিটে রেখে দিল। তারপর তাসিফার হাত ধরে তাকে ফ্রন্ট সিটে বসিয়ে দিল। নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে তার দিকে ফিরল।

তাসিফা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জুয়িন তার সিটবেল্টটা টেনে লাগিয়ে দিল। কাজটা শেষ করে নিজের সিটবেল্টও লাগিয়ে নিল সে।

তাসিফা একবার সিটবেল্টের দিকে, আরেকবার জুয়িনের দিকে তাকাল।
  -“আপনি হঠাৎ আমাকে নিয়ে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?”

জুয়িন স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে তার দিকে তাকাল। মুখে হালকা হাসি।
-“একটু মন চাইল আমার বউটাকে নিয়ে ঘুরে আসি, তাই।”

কথাটা শুনে তাসিফার মুখে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল। এমন একটা সাধারণ কথাও জুয়িনের মুখে শুনলে তার কেন যেন ভীষণ ভালো লাগে। সে মুখে কিছু বলল না, শুধু মুচকি হেসে জানালার বাইরে তাকাল।

জুয়িন গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
-“বাসায় কাউকে বলে এসেছিস?”

প্রশ্নটা শুনেই তাসিফা চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকাল।
-“পাগল নাকি? মা আর বাবা ঘুমাচ্ছে। লুকিয়ে-চুরিয়ে এসেছি।”

জুয়িন একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার সামনের রাস্তার দিকে চোখ ফেরাল।
-“ওহ!”

তাসিফা পেছনের সিটে রাখা বিরিয়ানির বক্সটা ঠিকঠাক আছে কি না, একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিল। তারপর জানালার বাইরে চোখ রাখল। রাতের শহর দিনের চেয়ে একেবারেই আলাদা। দিনের সেই চেনা ব্যস্ততা নেই, নেই মানুষের ভিড় কিংবা গাড়ির অবিরাম হর্ন। রাস্তার দুপাশের দোকানপাট বন্ধ। কোথাও কোথাও রাস্তার বাতির আলোয় ফাঁকা ফুটপাতগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।

গাড়ির ভেতরটাও বেশ শান্ত। জুয়িন মনোযোগ দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। আর তাসিফা কখনো বাইরে তাকাচ্ছে, কখনো আড়চোখে তার দিকে দেখছে।

হঠাৎ তাসিফা নিজের সিট থেকে একটু এগিয়ে এসে জুয়িনের হাত জড়িয়ে ধরল। তারপর মাথাটা তার বাহুর কাছে হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখল।

জুয়িন একবার তার দিকে তাকাল। মেয়েটা এমনভাবে নিশ্চিন্তে তার পাশে বসে আছে, যেন পৃথিবীর আর কোনো চিন্তা তার নেই।

কিছুক্ষণ পর জুয়িন নিচু স্বরে বলল,
-“মিস করেছি তোকে।”

তাসিফা চোখ না খুলেই উত্তর দিল,
-“আমি কিন্তু করিনি।”

জুয়িন হেসে ফেলল।
-“তাই?”

-“হুম।”

-“একটুও না?”

-“একটুও না।”

-“আচ্ছা, ঠিক আছে।”

জুয়িন আর কিছু বলল না। কিন্তু তার হাসির শব্দ শুনতে পেয়ে তাসিফা চোখ খুলে ফেলল।
-“হাসছেন কেন?”

-“এমনিই।”

-“না, এমনি না। কী নিয়ে হাসছেন, বলেন।”

-“কিছু না।”

-“আপনি না একদম অসহ্য!”

কথাটা বলে তাসিফা আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তবে জুয়িনের হাতটা ছাড়ল না। বরং নিজের হাতের মুঠোটা আরও একটু শক্ত করল।

জুয়িন মনে মনে হাসল। মেয়েটা মুখে যতই অস্বীকার করুক, সে জানে তাসিফাও তাকে মিস করেছে। শুধু সেটা স্বীকার করতে নারাজ।

গাড়ি শহরের পরিচিত রাস্তাগুলো পেরিয়ে এগিয়ে চলল। কখনো প্রশস্ত রাস্তা, কখনো নিরিবিলি মোড়, আবার কখনো রাস্তার পাশে সারি সারি গাছ। দুজনের মধ্যে মাঝেমধ্যে ছোটখাটো কথা হচ্ছে, আবার কিছুক্ষণ চুপচাপও থাকছে। সেই নীরবতায় কোনো অস্বস্তি নেই। বরং এমন করে একসঙ্গে সময় কাটাতে পেরে দুজনেরই ভালো লাগছে।

প্রায় আধঘণ্টা পর জুয়িন গাড়িটা রাস্তার এক নিরিবিলি জায়গায় থামাল।

তাসিফা জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখল, আশপাশে তেমন লোকজন নেই। দূরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো জ্বলছে। মাঝেমধ্যে দুই-একটা গাড়ি শোঁ শোঁ শব্দ তুলে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতরে বসে সেই শব্দগুলো আরও স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।

গাড়ি থামতেই তাসিফা পেছনের সিট থেকে বিরিয়ানির বক্সটা নিয়ে এল। বক্সটা হাতে নিয়ে ঢাকনা খুলতে যাবে, এমন সময় হঠাৎ তার একটা কথা মনে পড়ল।
-"আয় হায়!"

জুয়িন তার দিকে তাকাল।
-"কী হয়েছে?"

তাসিফা হতাশ গলায় বলল,
-"চামচ আনতে একদম ভুলে গেছি!"

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। তারপর বেশ স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-"সমস্যা কোথায়? গাড়িতে মিনারেল ওয়াটার আছে। হাত ধুয়ে নে।"

তাসিফা তার কথায় সম্মতি জানাল।
-"আচ্ছা।"

জুয়িন পানির বোতলটা এগিয়ে দিল। তাসিফা বোতলটা নিয়ে গাড়ির জানালা নামাল। তারপর জানালার বাইরে হাত বাড়িয়ে পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিল। কাজ শেষ করে বোতলটা জুয়িনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-"আপনিও ধুয়ে নিন।"

জুয়িন বোতলটার দিকে একবার তাকাল, তারপর তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"না। তুই নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিবি।"

কথাটা শুনে তাসিফা প্রথমে অবাক হয়ে গেল। তারপর জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। লোকটার আবদারও আছে! তবে তার এই আবদার রাখতে তাসিফার আপত্তি নেই।

সে বক্সটা নিজের কোলে নিয়ে বিরিয়ানি থেকে এক লোকমা হাতে তুলে নিল। তারপর জুয়িনের মুখের সামনে ধরে বলল,
-"নিন।"

জুয়িন আর দেরি না করে মুখে তুলে নিল লোকমাটা। তাসিফা এবার নিজের জন্যও এক লোকমা নিল। এভাবেই দুজনে পালা করে খেতে লাগল।

কিছুক্ষণ খাওয়ার পর জুয়িন বলল,
-"খুব মজা হয়েছে।"

প্রশংসা শুনে তাসিফার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নিজের হাতে রান্না করা খাবার জুয়িনের ভালো লেগেছে, এতেই সে খুশি। মৃদু হেসে বলল,
-"থ্যাঙ্ক ইউ।"

তারপর আবার যত্ন করে জুয়িনকে খাওয়াতে লাগল। জুয়িনও বেশ আয়েশ করে খাচ্ছিল। তবে কিছুক্ষণ পরই দুষ্টুমি করার ইচ্ছা হলো তার।

তাসিফা যখন আরেক লোকমা বিরিয়ানি তুলে জুয়িনের মুখের সামনে ধরল, তখনই জুয়িন হঠাৎ তার আঙুলে কামড় দিয়ে বসল।

তাসিফা চমকে হাত সরিয়ে নিল।
-"উফ! কামড় দিলেন কেন?"

জুয়িন মুখে খাবার নিয়েই হেসে ফেলল। এমন ভাব করল, যেন কিছুই হয়নি।
-"আমি কোথায় কামড় দিলাম?"

তাসিফা চোখ রাঙিয়ে তার দিকে তাকাল।
-"মিথ্যা বলছেন কেন? হুহ!"

জুয়িনের হাসি আরও চওড়া হলো। তাসিফা রাগ দেখানোর চেষ্টা করলেও তার মুখের অভিব্যক্তি দেখে জুয়িনের হাসি থামছিল না।
-"কী হলো? রাগ করলি?"

-"আপনার সঙ্গে কথাই বলব না।"

তাসিফা মুখ ঘুরিয়ে নিল। কিন্তু বেশিক্ষণ সেই অভিমান ধরে রাখতে পারল না। জুয়িন আবারও তাকে খোঁচা দিতে শুরু করল। তাসিফাও পাল্টা জবাব দিতে ছাড়ল না।
কখনো জুয়িন ইচ্ছা করে তাকে রাগিয়ে দিচ্ছে, কখনো তাসিফা তার কথার উত্তর দিয়ে তাকে চুপ করানোর চেষ্টা করছে। দুজনের খুনসুটিতে গাড়ির ভেতরটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

রাতের নির্জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির ভেতরে তাদের হাসি আর দুষ্টুমি চলতেই থাকল।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 53 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন