ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 54

লেখক: মিশু

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

-----

জুয়িন তাসিফাকে আরও কিছুক্ষণ জ্বালাল। তবে তাসিফা সেসব কথায় তেমন একটা পাত্তা দিল না। বরং হেসে হেসে জুয়িনকেও পালটা খোঁচা দিতে লাগল। কথার লড়াইয়ে দুজনের কেউই কাউকে একটুও ছাড় দিতে রাজি নয়। তাদের খুনসুটিতে কখন যে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে দুজনের কারও খেয়াল নেই।

কিছুক্ষণ পর দুজনের বিরিয়ানি খাওয়া শেষ হলো। তাসিফা বক্সের ঢাকনা লাগিয়ে পেছনের সিটে রেখে দিল। তারপর জানালার কাচ নামিয়ে হাত বাইরে বের করে পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিল।

হাত ধোয়া শেষ করে তাসিফা নিজের সিটে হেলান দিয়ে বসল। জুয়িন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-“আগামীকাল তাহলে আমাদের বাড়িতে আসছিস?”

তাসিফা দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে উত্তর দিল,
-“হ্যাঁ, আগামীকাল যাচ্ছি শ্বশুরবাড়িতে।”

কথাটা শুনে জুয়িন হেসে ফেলল।
-“বেশি পাকনা হয়ে গেছিস।”

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-“আগে থেকেই ছিলাম। আপনার সামনে একটু আদুরে বোকা সেজে থাকতাম।"

জুয়িন ভ্রু উঁচু করে তার দিকে তাকাল।
-“আমার সামনে কেন?”

তাসিফা হেসে জুয়িনের বাহু জড়িয়ে ধরল। তারপর নিজের মুখটা তার বাহুর কাছে রেখে বলল,
-“কারণ, মেয়েরা তাদের ভালোবাসার মানুষের কাছে একটু আদুরে, আহ্লাদী হয়ে থাকতে পছন্দ করে। আর ভালোবাসার মানুষটাও তো তার এই রূপটা দেখতে ভালোবাসে।”

কথাটা বলে তাসিফা জুয়িনের দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে হাসি।

জুয়িন মৃদু হাসল। তাসিফার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
-“তুই যেমন, আমার কাছে তেমনই ঠিক আছিস। আর তোকে তো আমার সব সময়ই ভীষণ আদুরে লাগে।”

তাসিফা হেসে জুয়িনের বাহুতে নিজের মুখ ঘষল। এমন কথা শুনলে তার আর কী বলার থাকে।  মুখে যতই পাকনামি করুক, জুয়িনের কাছে সে যে বরাবরই আদুরে হয়ে থাকতে চায়, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

জুয়িন তার দিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল,
-“কখন আসবি কাল?”

-“হয়তো বিকেলে।”

-“থাকবি না?”

তাসিফা একটু ভেবে বলল,
-“হয়তো থেকে যেতেও পারি। মা তো খালামণিকে পেলে পুরো পৃথিবী ভুলে যাবে আবার। তখন আমার কথা মনেও থাকবে না।”

জুয়িন হেসে উঠল। তাসিফার কথায় যে একটুও বাড়াবাড়ি নেই, সেটা সে জানে। আয়রা বেগম তাঁর বড় বোনকে কাছে পেলে যে গল্পে মেতে উঠবেন, তা সহজেই অনুমেয়।

কথা শেষ করে জুয়িন গাড়ি স্টার্ট দিল। তাসিফা আগের মতোই তার বাহুতে মাথা রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ি ধীরে ধীরে সেই নিরিবিলি জায়গা ছেড়ে মূল সড়কের দিকে এগিয়ে গেল।

রাতের শহর তখন প্রায় নিস্তব্ধ। রাস্তার দুই পাশের ল্যাম্পপোস্টের আলো গাড়ির কাচ ভেদ করে ভেতরে এসে পড়ছে। মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। চারপাশের নীরবতার মধ্যে গাড়ির মৃদু শব্দ ছাড়া আর তেমন কিছু শোনা যাচ্ছে না।

কিছুক্ষণ পর জুয়িন গাড়ির অডিও সিস্টেমে “Zara Sa” গানটা চালু করল।

গানটা কানে আসতেই তাসিফা চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার ঠোঁটে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল। গানটা তার বেশ পছন্দের। এমন নিরিবিলি রাত, পাশে জুয়িন, সব মিলিয়ে মুহূর্তটা তার ভীষণ ভালো লাগছিল।

জুয়িন এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালাচ্ছিল। তাসিফা তার বাহু জড়িয়ে মাথা রেখে বসে রইল। দুজনের কেউই আর কথা বলল না। গাড়ির ভেতর শুধু গানটা বাজতে থাকল।

জুয়িন একবার তাসিফার দিকে তাকাল। চোখ বন্ধ করে থাকা মেয়েটার মুখে প্রশান্তির ছাপ দেখে তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে আবার সামনের রাস্তায় মনোযোগ দিল।

তাসিফা চোখ বন্ধ রেখেই গানটা উপভোগ করছিল। জুয়িনের বাহুতে মাথা রেখে এভাবে কিছুটা সময় কাটাতে তার ভীষণ ভালো লাগছিল। এই মুহূর্তে তার কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই, কিছু চাওয়ারও নেই। শুধু জুয়িনের পাশে এভাবেই আরও কিছুক্ষণ থাকতে চায় সে।

জুয়িনও আর তাকে বিরক্ত করল না। নীরবে গাড়ি চালিয়ে যেতে লাগল তাসিফাদের বাসার দিকে।

-----

রাত তখন প্রায় তিনটা। শহরের রাস্তাঘাট প্রায় নিস্তব্ধ। মাঝেমধ্যে দু-একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে, তবে দিনের ব্যস্ততার কোনো চিহ্নই নেই। সেই নিরিবিলি রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে তাসিফাদের বিল্ডিংয়ের সামনে এসে থামল জুয়িন।

গাড়ি থামতেই তাসিফা সিটে রাখা বিরিয়ানির বক্সটা হাতে তুলে নিল। এত রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে জুয়িনের সঙ্গে এভাবে কিছুটা সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাটা তার কাছে বেশ অন্য রকম লাগছিল। রাতটা যে এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে, তা যেন মন মানতে চাইছিল না। তবু এখন তো বাসায় ফিরতেই হবে।

জুয়িন প্রথমে গাড়ি থেকে নেমে তাসিফার পাশের দরজাটা খুলে দিল।
-"নাম।"

তাসিফা কথা না বাড়িয়ে গাড়ি থেকে নেমে এল। হাতে বিরিয়ানির বক্সটা সামলে নিয়ে দরজাটা বন্ধ করতে যাচ্ছিল, তার আগেই জুয়িন জিজ্ঞেস করল,
-"বিল্ডিংয়ের ভেতর দিয়ে আসব?"

তাসিফা দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
-"না, না! আমি যেতে পারব।"

জুয়িন তার মুখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। এত রাতে মেয়েটাকে একা ভেতরে যেতে দিতে তার আপত্তি নেই, কিন্তু তাসিফাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসার প্রস্তাবটা সে এমনিই দিয়েছিল। তাসিফা যখন নিজেই বলছে যে সে যেতে পারবে, তখন আর জোর করল না।

গাড়ির দরজার পাশে দাঁড়িয়ে জুয়িন গাড়ির গায়ে হেলান দিল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"ওকে, তাহলে যা। আমি দাঁড়িয়ে আছি।"

তাসিফা মাথা নাড়ল। ঠোঁটে মিষ্টি হাসি নিয়ে জুয়িনকে হাত নেড়ে টাটা জানাল। তারপর বিল্ডিংয়ের দিকে পা বাড়াল।

কিন্তু কয়েক পা যেতেই তার কিছু একটা মনে পড়ে গেল।
সে আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। হাতে বক্সটা নিয়েই ঘুরে দাঁড়াল, তারপর প্রায় দৌড়ে আবার জুয়িনের কাছে ফিরে এল।

জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল।

তাসিফা কাছে এসে থামল। একবার জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটিয়ে তুলল। জুয়িন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে একটু পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে উঁচু হলো। তারপর আচমকাই জুয়িনের গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।

পুরো ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে জুয়িনের কিছু বলার সুযোগই হলো না।

তাসিফা সরে দাঁড়াতেই জুয়িন নিজের গালে হাত রাখল। তার মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠল।মেয়েটা যে এমন কিছু করতে আবার ফিরে আসবে, তা সে কল্পনাও করেনি। তাসিফার এই আকস্মিক কাণ্ডে অবাক হওয়ার পাশাপাশি তার বেশ ভালোও লাগল।

তাসিফা তখন জুয়িনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে।

জুয়িন গালে হাত রেখেই কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি টেনে বলল,
-"দিন দিন ইমরান হাশমির ফিমেল ভার্সন হয়ে যাচ্ছিস।"

কথাটা শুনে তাসিফা হেসে ফেলল। লজ্জা পাওয়ার বদলে সে বরং বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে জবাব দিল,
-"আপনার থেকেই সব শেখা।"

কথাটা বলেই সে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারল। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। হাতে বিরিয়ানির বক্স নিয়ে দ্রুত বিল্ডিংয়ের ভেতরে ঢোকার জন্য ছুটল।

তাসিফার এমন কাণ্ড দেখে জুয়িন হেসে ফেলল। মেয়েটার দুষ্টুমির যেন শেষ নেই।

জুয়িন গালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল।

অন্যদিকে, তাসিফা ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে একবার পেছনে তাকাল। জুয়িন তখনো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। দূর থেকে সেটা দেখেই তাসিফার হাসি আরও চওড়া হলো। সে মনে মনে খুশি হয়ে দ্রুত ভেতরে ঢুকে গেল।

তাসিফাকে ভেতরে ঢুকতে দেখে জুয়িন এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে বসে দরজাটা বন্ধ করল। তারপর একবার তাসিফাদের বিল্ডিংয়ের দিকে তাকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিল।

রাতের নিরিবিলি রাস্তা ধরে এবার তার নিজের বাড়ির দিকে রওনা হলো জুয়িন। মুখে তখনো লেগে আছে মৃদু হাসি।

-----

তাসিফা বাসার দরজা খুলে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল। রাত অনেক হয়েছে। পুরো বাসা নিস্তব্ধ, চারদিকে অন্ধকার।

দরজা বন্ধ করে তাসিফা হাতে থাকা বিরিয়ানির বক্সটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এত রাতে তার চলাফেরার শব্দে যেন কারও ঘুম না ভাঙে, সেদিকে খেয়াল রাখল। রান্নাঘরে পৌঁছে বক্সটা ভালো করে ধুয়ে নিল। তারপর পানি ঝরিয়ে যথাস্থানে রেখে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।

নিজের রুমে যাওয়ার আগে বাবা-মায়ের ঘরের সামনে এসে থামল তাসিফা। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখল, দুজনই নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন। তাঁদের ঘুম ভাঙেনি দেখে মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল সে। তারপর নিঃশব্দে সেখান থেকে সরে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

রুমে ঢুকে দরজাটা আলতো করে বন্ধ করে দিল তাসিফা। এরপর আর দেরি না করে বিছানার কাছে গিয়ে ধপ করে শুয়ে পড়ল। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকা আর বাইরে ঘোরাঘুরির পর শরীরটা বেশ ক্লান্ত লাগছে। চোখের পাতাও ভারী হয়ে এসেছে।

বালিশে মাথা রাখতেই জুয়িনের সঙ্গে কাটানো রাতের সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে পড়ে গেল তাসিফার। ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি হাসি ফুটে উঠল। তবে ক্লান্তির কারণে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারল না সে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল তাসিফা।

-----

পরদিন তাসিফার ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল, দুপুর সাড়ে বারোটা বেজে গেছে।

অন্যদিকে, আয়রা বেগমের আনন্দ যেন আর ধরছিল না। নিজের জন্য প্রয়োজনীয় জামাকাপড় গুছিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। আজ প্রথমবারের মতো বোনের বাড়িতে যাবেন। আপার বাড়িতে যাওয়ার কথা ভেবেই তাঁর মনটা ভালো হয়ে উঠছিল।

আলমগীর আলমও কাজ শেষ করে ফিরে আসবেন। এরপর বিকেলের মধ্যেই সবাই একসঙ্গে জুয়িনদের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হবেন।

তাসিফাও নিজের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস গুছিয়ে নিল। জুয়িনদের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই। আফসানা শিকদার আগেই ফোন করে আয়রা বেগমকে ঠিকানাটা জানিয়ে দিয়েছেন।

------

অন্যদিকে, শিকদার বাড়িতে বেশ ধুমধাম করে আয়োজন চলছে। বাড়ির বউরা সবাই নানা কাজে ব্যস্ত। আজ আয়রা বেগম তাঁর মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে আসবেন। তার ওপর জুয়িনও দীর্ঘ দুই বছর পর বাড়িতে ফিরেছে। সব মিলিয়ে বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। তাই আয়োজনেও কোনো কমতি রাখতে চাইছেন না কেউ।

রান্নাঘরে তিন জা মিলে গল্প করতে করতে রান্না করছেন। তাঁদের কথার ফাঁকে ফাঁকে হাসির শব্দও ভেসে আসছে। বাড়ির সার্ভেন্টরাও রান্নাবান্না ও ঘর গোছানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এদিকে, জুয়িন এখনো নিজের ঘরে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে অবশ্য কেউ বিরক্ত করলেন না। দীর্ঘ দুই বছর পর বাড়িতে ফিরেছে, তাই সবাই তাকে নিজের মতো ঘুমানোর সুযোগ দিলেন।

বাড়ির ছোটরা বসার ঘরের সোফায় বসে গল্প করছে। কখনো হাসাহাসি, আবার কখনো নিজেদের মধ্যে খুনসুটি, সব মিলিয়ে শিকদার বাড়িতে বেশ প্রাণচঞ্চল পরিবেশ বিরাজ করছে।

-----

বিকেলের দিকে তাসিফারা এসে জুয়িনদের বাড়ির সামনে দাঁড়াল। বাড়িটা দেখতে বেশ সুন্দর। দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়িটির বাইরের অংশে সাদা ও অফ-হোয়াইট রঙের মিশ্রণ। সব মিলিয়ে বাড়িটির নকশা ও রঙের সমন্বয় বেশ আকর্ষণীয়।

বাড়িটা দেখে তাসিফার চোখেমুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। তার মুখ প্রায় হাঁ হয়ে যাওয়ার জোগাড়। জুয়িনরা যে এতটা সম্পদশালী, তা তাসিফার ধারণাতেই ছিল না।

তারা গাড়ি থেকে নামতেই একজন সিকিউরিটি গার্ড এগিয়ে এসে মূল গেট খুলে দিলেন। এরপর সবাইকে দেখে হাসিমুখে সালাম জানালেন।

-----

বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই সবাই এগিয়ে এসে তাদের ঘিরে ধরল। আয়রা বেগমকে কাছে পেয়ে আফসানা শিকদারের মুখে আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। তিনি প্রথমে আয়রা বেগমকে জড়িয়ে ধরলেন। এরপর আদর করে বুকে টেনে নিলেন তাসিফাকে।

জুয়িনের চাচা-চাচিদের সঙ্গেও তাসিফা হাসিমুখে কুশল বিনিময় করল। সবাইকে একসঙ্গে দেখে আয়রা বেগমও বেশ খুশি হলেন। চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে তিনি সবার উদ্দেশে বললেন,
-"কেমন আছো সবাই?"

জবাবে সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
-"আলহামদুলিল্লাহ, ভালো। তোমরা কেমন আছো?"

আয়রা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
-"আমরাও ভালো আছি।"

এদিকে জিনিয়া তখন নিজের রুমে ছিল। তাসিফাদের আসার খবর পেয়ে আর দেরি করল না। দ্রুত নিচে নেমে এসে প্রথমেই তাসিফাকে জড়িয়ে ধরল। এরপর ছোট খালামণিকেও জড়িয়ে ধরল।

অন্যদিকে, আলমগীর আলম জুয়িনের চাচাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। এরপর জিসান শিকদারের সঙ্গে আলিঙ্গন করে শুভেচ্ছা জানালেন। বাড়ির সবাইকে একসঙ্গে দেখে মনে হচ্ছিল, অনেক দিনের চেনা কোনো আনন্দঘন পারিবারিক আয়োজন।

আফসানা শিকদার এবার হাসিমুখে বললেন,
-"আয় আয়, ভেতরে এসে বস তোরা। দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

তাঁর কথায় সবাই বসার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। এরপর যে যার মতো সোফায় বসে পড়ল।

এদিকে, সিঁড়ির ওপর থেকে পুরো সময়টাই সবাইকে লক্ষ করছিল জুয়িন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাসিফাকে বেশ স্বচ্ছন্দ দেখাচ্ছিল। তবে এত মানুষের ভিড়ে তাসিফার চোখ একবারও ওপরের দিকে পড়েনি। তাই সে জুয়িনকে দেখতে পেল না।

তাসিফা সোফায় বসতেই জিনিয়া তার পাশে জায়গা করে নিল। অন্যদিকে বসেছিল জিনিয়ার কাজিনরা। নতুন একজনকে পেয়ে তাদের মধ্যেও বেশ কৌতূহল দেখা গেল। কয়েকজন তো বেশ আগ্রহ নিয়েই তাসিফার দিকে তাকিয়ে ছিল।

জিনিয়া বিষয়টা খেয়াল করে হেসে বলল,
-"তাসিফা, এরা তোর সঙ্গে পরিচিত হতে চায়।"

তাসিফা এবার তাদের দিকে ঘুরে বসল। মুখে হাসি ফুটিয়ে হাত নেড়ে বলল,
-"হাই।"

তার অভিবাদনের জবাবে বাকিরাও হেসে হাত নাড়ল। শুরুতেই এমন আন্তরিকতা পেয়ে তাসিফাও বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করল।

সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে তাসিফা বলল,
-"বাহ, তোমরা তো দেখছি অনেকজন।"

তার কথা শুনে সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। জিসা হেসে বলল,
-"একদম! পুরো বাড়ি আমরাই গরম করে রাখি।"

পাশ থেকে জাহিদ বলে উঠল,
-"আরে, অনেকজন হলে কী হয়েছে? এতে তো আরও বেশি মজা।"

কথাটা বলেই হেসে উঠল সে। তার কথায় বাকিরাও মুচকি হাসল।

এরই মধ্যে জুয়িনের চাচিরা আয়রা বেগমের সঙ্গে নিজেদের সন্তানদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন।

জুয়িনের মেজো চাচি জাকিয়া শিকদারের দুই সন্তান, এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলের নাম জাহিদ শিকদার। বয়সে সে জুয়িনের প্রায় সমান হলেও পড়াশোনায় এক ব্যাচ জুনিয়র। আর মেয়ের নাম জিসা শিকদার। সে ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে।

অন্যদিকে, জুয়িনের ছোট চাচি আতকিয়া শিকদারেরও দুই সন্তান। বড় ছেলের নাম আরাফ শিকদার , আর মেয়ের নাম আকসা শিকদার। আরাফ ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে, আর আকসা নবম শ্রেণির ছাত্রী।

এই পরিবারের বড় সন্তান জিনিয়া শিকদার। জুয়িনের বড় বোন জিনিয়া মাস্টার্স সম্পন্ন করেছে। আর জুয়িন পরিবারের বড় ছেলে।

এতক্ষণে তাসিফার সঙ্গেও সবার বেশ ভালো পরিচয় হয়ে গেছে। প্রথমে যে একটু জড়তা ছিল, সেটুকুও আর রইল না। বরং অল্প সময়ের মধ্যেই সবার সঙ্গে বেশ সহজ হয়ে গেল সে। তাদের কথাবার্তা আর হাসিঠাট্টায় নিজেও যোগ দিতে লাগল।

হঠাৎ জাহিদ হেসে তাসিফাকে বলল,
-"তাসিফা, তুমি আরাফের সঙ্গে বেশি মিশো না। পরে ওর মতো ক্যাসেট হয়ে যাবে।"

কথাটা শুনে আরাফ আর চুপ করে থাকতে পারল না। সে উঠে জাহিদের পিঠে একটা চাপড় মেরে বলল,
-"জাহিদ ভাই, আমি ক্যাসেট? নাকি তুই।"

জাহিদও কম যায় না। কিছু বলার আগেই তাসিফা হেসে বলে উঠল,
-"সমস্যা নেই। আমিও ক্যাসেটই।"

তাসিফার এমন উত্তরে বাকিরা হেসে উঠল। মুহূর্তেই বসার ঘরের পরিবেশটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে গেল।

জিনিয়া সবার হাসাহাসি দেখে তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"শোন, এখানে আমরা সবাই এক পরিবারের। তাই তুই সবাইকে তুই করেই ডাকবি। আর বাকিরাও তোকে তুই করে ডাকবে। এত তুমি-তুমি করার দরকার নেই।"

তাসিফা হেসে মাথা নাড়ল। এরপর আর কোনো সংকোচ না রেখে সবার সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল।

কিছুক্ষণ এভাবেই কেটে গেল। গল্পের ফাঁকে একসময় তাসিফা অজান্তেই আশপাশে চোখ বুলাল। যেন কাউকে খুঁজছে সে। তবে যাকে খুঁজছিল, সে যে ওপর থেকে এতক্ষণ তাকে লক্ষ করছিল, তা তাসিফার জানা ছিল না।

জুয়িন তখনো সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। তাসিফার চোখে তাকে খুঁজতে দেখে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল তার। আর দেরি না করে পকেট থেকে ফোন বের করে তাসিফাকে একটি মেসেজ পাঠাল।
-"উপরে আয়। আমি সেখানে আছি।"

মেসেজ আসতেই তাসিফার চোখ ফোনের স্ক্রিনে আটকে গেল। জুয়িনের নাম দেখে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল তার। একবার ওপরের দিকে তাকিয়ে আবার বাকিদের দিকে ফিরল। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"আমি একটু ওয়াশরুমে যাব। উপরে যাই তাহলে?"

আরাফ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"চিনবি তো, আপু? নাকি দিয়ে আসব?"

তাসিফা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে বলল,
-"না না, আমি যেতে পারব। তোরা থাক।"

কথাটা বলে সবার দিকে একবার হেসে তাকাল সে। তারপর আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

ওপর থেকে জুয়িনও সব লক্ষ করছিল। তাসিফা সিঁড়ির দিকে এগিয়ে আসতেই সে সেখান থেকে সরে গেল।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 54 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন