ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 55

লেখক: মিশু

#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

----

তাসিফা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল। শেষ ধাপে পা রাখতেই একবার চারদিকে তাকাল। তবে জুয়িনকে কোথাও দেখতে পেল না। সিঁড়ির পাশের করিডরটাও বেশ নিরিবিলি। সে একটু এগিয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। মনে মনে ভাবল, জুয়িন হয়তো অন্য কোথাও দাঁড়িয়ে আছে।

ঠিক তখনই আচমকা পাশ থেকে কেউ তার হাত টেনে ধরল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাসিফা সেই ব্যক্তির সঙ্গে পাশের একটি রুমে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তের মধ্যেই পেছনে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।

ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে তাসিফা প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না। কয়েক সেকেন্ড পর নিজেকে সামলে পাশে তাকাতেই জুয়িনের পরিচিত মুখটা চোখে পড়ল।

তাসিফা অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। অন্যদিকে, তাকে এভাবে অবাক হতে দেখে জুয়িনের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু  হাসি ফুটে উঠল। যেন পুরো ব্যাপারটাই তার আগে থেকে সাজানো ছিল।

তাসিফা ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"হঠাৎ এভাবে রুমে টেনে আনলেন কেন?"

জুয়িন নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
-"এনেছি তো কী হয়েছে?"

-"কী হয়েছে মানে? কেউ এভাবে কাউকে টেনে আনে?"

-"আমি এনেছি। তাতে সমস্যা কোথায়?"

তাসিফা তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। জুয়িনের মুখে এমন নির্লিপ্ত ভাব দেখে আর কিছু বলার ইচ্ছা হলো না। বরং রুমের চারদিকে চোখ বুলাতে লাগল। বেশ পরিপাটি রুম। মাঝখানে বড় বিছানা, পাশে ছোট টেবিল। রুমের আসবাবপত্রও বেশ গোছানো।

একসময় সে জুয়িনের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
-"এটা আপনার রুম?"

জুয়িন মাথা নেড়ে বলল,
-"না।"

তাসিফা অবাক হয়ে আবার প্রশ্ন করল,
-"তাহলে কার রুম?"

জুয়িন এবার মুচকি হেসে বলল,
-"আমাদের।"

কথাটা শুনে তাসিফা কয়েক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জুয়িনের কথার অর্থ বুঝতে পেরে লজ্জা মেশানো হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। সে জুয়িনের বাহুতে আলতো করে চাপড় দিয়ে বলল,
-"আপনিও না! মাঝে মাঝে এমন কথা বলেন যে আমি লজ্জায় পড়ে যাই।"

জুয়িন ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
-"আমি লজ্জায় পড়ে যাওয়ার মতো কী বললাম?"

-"আপনি জানেন না?"

-"না তো। একটু বুঝিয়ে বলবি?"

তাসিফা চোখ সরু করে তার দিকে তাকাল।
-"বুঝিয়ে বলতে হবে না। আপনি সবই বোঝেন।"

জুয়িন হেসে ফেলল। তাসিফার এমন অভিমানী মুখ দেখতে তার বেশ ভালোই লাগছিল।

তাসিফা আর দাঁড়িয়ে না থেকে বিছানার একপাশে গিয়ে বসল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জানেন, আপনার কাজিনদের ওয়াশরুমে যাওয়ার মিথ্যে বাহানা দিয়ে এখানে এসেছি।"

জুয়িনও এগিয়ে এসে তার পাশে বসল। তারপর দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"বাহানা দেওয়ার দরকার ছিল না। সরাসরি বলে দিতি, আমি আমার হাজবেন্ডের কাছে যাচ্ছি।"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তার দিকে তাকাল।
-"আমাকে দেখে আপনার পাগল মনে হয়? এসব বললে আমি একদম শেষ।"

তাসিফার কথা শুনে জুয়িন মুচকি হাসল। এরপর আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।তার দৃষ্টি লক্ষ করে তাসিফা একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে জুয়িনের দিকে আঙুল তুলে সতর্ক করার ভঙ্গিতে বলল,
-"যেসব চিন্তা করছেন, সেসব ভুলে যান একদম।"

জুয়িন শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
-"উফ! আমার মনের সঙ্গে তোর মনের কত বড় কানেকশন! আমি কিছু বলার আগেই সব বুঝে ফেলিস।"

তাসিফা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-"আপনার মতো মানুষকে বুঝতে খুব বেশি সময় লাগে না।"

-"তাই নাকি?"

-"জ্বি।"

জুয়িন এবার একটু ঝুঁকে তার দিকে এগিয়ে এল। মৃদু হেসে বলল,
-"বাট সরি, আমার এখন চুমুর ক্রেভিং উঠেছে। তাই চুপচাপ চুমু দিতে দে।"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে হেসে সরে গেল।
-"না, হবে না।"

কথাটা বলেই সে বিছানা থেকে উঠে রুমের অন্যদিকে চলে গেল। জুয়িনও হেসে তার পিছু নিল।

তাসিফা তাকে এভাবে এগিয়ে আসতে দেখে আরও জোরে হেসে উঠল। রুমের একপাশ থেকে অন্যপাশে যেতে যেতে বলল,
-"ধরতে পারবেন না আমাকে।"

জুয়িনও তার পিছু ছাড়ল না। বরং সুযোগ বুঝে তাসিফার হাত ধরে কাছে টেনে নিল। মুহূর্তের মধ্যেই তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-"ধরে ফেলেছি, জান।"

তাসিফা হাসতে হাসতে তার হাতের বাঁধন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু জুয়িনের এমন দুষ্টুমির কাছে তার চেষ্টা খুব একটা কাজে এল না।
-"ছাড়ুন তো।"

-"কেন? একটু আগেই তো বললি ধরতে পারব না।"

-"এখন ধরেছেন তো! এবার ছাড়ুন।"

জুয়িন হেসে বলল,
-"এত সহজে ছাড়ব কেন?"

তাসিফা এবার আর কিছু বলল না। শুধু হেসে মাথাটা একটু পেছনে হেলিয়ে দিল। জুয়িনও কিছুক্ষণ তাকে এভাবেই জড়িয়ে ধরে রাখল। তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়াল।

তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে জুয়িনের হাসিটা আরও নরম হয়ে এল। সে মৃদু স্বরে বলল,
-"শুধু একটু চুমু দেব।"

তাসিফা এবার আর দুষ্টুমি করল না। বরং লাজুকভাবে চোখ নামিয়ে ফেলল। জুয়িন তার অনুমতি বুঝে ধীরে এগিয়ে এসে আলতো করে তার ঠোঁটে চুমু দিল।

কিছুক্ষণ পর সরে এসে তাসিফার কোমর জড়িয়ে ধরল সে। তারপর তার নাকের সঙ্গে নিজের নাক আলতো করে ঘষল।

তাসিফা তখনো জুয়িনের গলা জড়িয়ে রেখেছে। ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
-"আপনি যে এত অসভ্য, সেটা কেউ জানে?"

জুয়িন হেসে উত্তর দিল,
-"না। সেটা জানার সুযোগ শুধু তোকে দিয়েছি। বাকিদের না।"

তাসিফা হেসে ফেলল। তারপর জুয়িনের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
-"আপনার আসল রূপটা যদি সবাই জানত!"

-"জানলে কী হতো?"

-"তাহলে কেউ আপনাকে এত ভদ্র ভাবত না।"

জুয়িন মুচকি হেসে বলল,
-"তোর কাছে ভদ্র হওয়ার কোনো ইচ্ছাই নেই আমার।"

তাসিফা আর জুয়িন তখনো নিজেদের খুনসুটিতে মেতে ছিল। হঠাৎ দরজায় কয়েকবার ধাক্কার শব্দ ভেসে এল। দুজনেই থমকে গেল।

বাইরে থেকে জাহিদের গলা শোনা গেল,
-"কিরে জুয়িন, দরজা লাগিয়ে রেখেছিস কেন? খোল বেডা।"

তারপর জিসা, আরাফ, জিনিয়া আর আকসার কণ্ঠও শোনা গেল। বোঝাই যাচ্ছে, সবাই একসঙ্গে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজায় আবারও ধাক্কা পড়তেই জুয়িন ও তাসিফা দুজনেই চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে একে অপরের কাছ থেকে সরে গেল তারা। তাসিফা রুমের একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার মুখে তখন স্পষ্ট অস্থিরতা। ভীতু স্বরে সে জুয়িনকে বলল,
-"এখন আমি কোথায় লুকাব?"

জুয়িন একবার দরজার দিকে, আরেকবার রুমের চারদিকে তাকাল। তারপর দ্রুত নিচু স্বরে বলল,
-"শোন, তুই দরজার পেছনে গিয়ে দাঁড়া। ওরা ভেতরে ঢুকলেই সুযোগ বুঝে চুপচাপ বের হয়ে যাবি।"

তাসিফা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর চোখ সরু করে বলল,
-"এই দাঁড়ান! আপনিও কি ভয় পাচ্ছেন, ওরা আমাদের একসঙ্গে দেখে ফেললে?"

জুয়িন চোখ উল্টে বলল,
-"আমার কোনো সমস্যা নেই। তোর অস্বস্তির কথা ভেবেই বলেছি। নাহলে ওদের ভয় পাওয়ার তো কোনো কারণ নেই আমার।"

তাসিফা এবার একটু থমকে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল,
-"আচ্ছা।"

বাইরে থেকে আবারও জাহিদের ডাক শোনা গেল,
-"কী হলো রে? ঘুমিয়ে পড়েছিস নাকি? দরজা খোল!"

জুয়িন আর সময় নষ্ট করল না। তাসিফাকে দরজার পেছনে দাঁড়ানোর ইশারা করল। তাসিফাও দ্রুত সেখানে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে পড়ল।

একবার রুমে চারদিকে চোখ বুলিয়ে নিয়ে জুয়িন দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই জাহিদ, জিসা, আরাফ, জিনিয়া আর আকসা প্রায় হুড়মুড় করে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

জুয়িনকে দেখে জাহিদ বলল,
-"এত সময় লাগে দরজা খুলতে? কী করছিলি?"

জুয়িন স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বলল,
-"তোদের জন্যই তো বসে ছিলাম। এবার বল, কী হয়েছে?"

ওদিকে সবাই জুয়িনের সঙ্গে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সেই সুযোগে দরজার আড়াল থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল তাসিফা। কারও দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে।

এদিকে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়া পাঁচজনের কেউই টের পেল না, তাদের চোখের সামনেই কেউ একজন চুপিচুপি বেরিয়ে গেছে।

-----

সন্ধ্যা নামতেই শিকদার বাড়ির পরিবেশটা বেশ জমজমাট হয়ে উঠল। বাড়ির বড়রা সবাই ড্রয়িংরুমে বসে গল্প-আড্ডায় মেতে আছেন। কেউ পুরোনো দিনের কথা বলছেন, কেউ আবার একে অপরের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় ব্যস্ত। অন্যদিকে, বাড়ির ছোটরা জড়ো হয়েছে জুয়িনের রুমে। তাদের সঙ্গে তাসিফাও আছে।

তবে রুমে ঢোকার কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজিনদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে জুয়িনকে আপাতত নিজের রুম থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে সে বিষয়টা নিয়ে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের কথামতো বেরিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।

জুয়িন বেরিয়ে যেতেই একজন দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিল। এরপর সবাই বিছানার চারপাশে বসে পড়ল। রুমে বেশ গরম লাগছিল বলে তাদের একজন এসির তাপমাত্রা কমিয়ে দিল। তারপর সবাইকে একবার দেখে নিয়ে জিনিয়া আলোচনার বিষয়বস্তুতে ফিরে এল।

তাসিফা এতক্ষণ সবার কাণ্ডকারখানা দেখছিল। এবার কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জুয়িন ভাইয়াকে রুম থেকে বের করেছিস কেন রে? কী এমন গোপন আলোচনা আছে, যেখানে উনাকে রাখা যাবে না?"

তাসিফার কথা শুনে জিনিয়া হেসে ফেলল। তারপর একটু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
-"গোপন আলোচনা তো বটেই। তবে সেটা জুয়িনের বিরুদ্ধেই।"

তাসিফা আরও অবাক হলো।
-"মানে?"

জিনিয়া হেসে বলল,
-"জুয়িনের বার্থডে প্ল্যান করার জন্যই তো ওকে বের করেছি।"

কথাটা শুনে তাসিফার চোখ বড় হয়ে গেল।
-"উনার বার্থডে?"

জাহিদ এবার উত্তর দিল,
-"হ্যা। আগামীকাল। তবে আমরা আজ রাত বারোটা বাজতেই সবাই মিলে ওকে সারপ্রাইজ দেব। তাই আগে থেকেই সবকিছু ঠিক করে নিচ্ছি।"

আরাফও আলোচনায় যোগ দিল।
-"আমি অলরেডি কেক অর্ডার করে দিয়েছি। রাত বারোটার আগেই চলে আসবে।"

তাসিফা কথাগুলো শুনে কিছুটা চমকে গেল। জুয়িনের জন্মদিন অথচ সে নিজেই জানে না। তার ওপর জুয়িন তাকে এ বিষয়ে কিছুই বলেনি। বিষয়টা মনে হতেই তাসিফার মনে একটু অভিমানও হলো। তবে সে তা প্রকাশ করল না। বরং বাকিদের পরিকল্পনা শোনায় মনোযোগ দিল।

জিসা বলল,
-"আজ রাতে শুধু কেক দিয়ে জুয়িন ভাইকে সারপ্রাইজ দেব। আর কাল ছাদে ছোটখাটো সেলিব্রেশন করব। সবাই মিলে সময় কাটাব, মজাও হবে।"

তাসিফা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। জন্মদিনের আয়োজনটা তার বেশ ভালো লাগছে। এতদিন পর পরিবারের সবার সঙ্গে জুয়িনের জন্মদিন কাটবে, সেটাও নিশ্চয়ই তার জন্য বিশেষ কিছু হবে।

এদিকে আকসা আনন্দে বলে উঠল,
-"ইয়াহু! অনেক মজা হবে তাহলে।"

তার উচ্ছ্বাস দেখে বাকিরাও হেসে উঠল।

কিছুক্ষণ পর তাসিফার মাথায় একটা ভাবনা এল। সে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এই! আমি কি আমার বন্ধুদেরও এখানে নিয়ে আসতে পারি?"

জিনিয়া সঙ্গে সঙ্গেই বলল,
-"অবশ্যই পারবি। তোর বন্ধুদেরও নিয়ে আয়। সবাই মিলে থাকলে আরও ভালো লাগবে।"

বাকিরাও মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

তাসিফা খুশি হয়ে মাথা নাড়ল। এরপর মোবাইলটা হাতে নিয়ে ভণ্ডপার্টি গ্রুপে ঢুকল। সেখানে জুয়িনের বাড়ির ঠিকানা পাঠিয়ে দিল। পাশাপাশি জানিয়ে দিল, রাত বারোটায় জুয়িনকে জন্মদিনের সারপ্রাইজ দেওয়া হবে। তাই সবাই যেন সময়মতো চলে আসে।

মেসেজ পাঠিয়ে সে ফোনটা পাশে রাখল। মনে মনে ভাবল, জুয়িনের জন্মদিনে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে এভাবে সারপ্রাইজ দিতে পারলে বেশ মজাই হবে। তবে জুয়িন যে কিছুই জানে না, সেটা ভেবেই তার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

অন্যদিকে, নিজের রুমে জায়গা না পেয়ে জুয়িন নিচে চলে এসেছে। ড্রয়িংরুমে বড়দের আড্ডার মাঝে গিয়ে বসেছে সে। প্রথমে সবার কথাবার্তা শুনছিল চুপচাপ। পরে একসময় নিজেও আলোচনায় যোগ দিল। দুই বছর পর পরিবারের সবার সঙ্গে এভাবে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছে সে। তাই বড়দের গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তাদের সঙ্গে কথা বলতেই সময় কাটাতে লাগল।

এদিকে ওপরতলার রুমে বসে ছোটদের পরিকল্পনা এগিয়ে চলেছে। দরজা বন্ধ করে তারা জন্মদিনের আয়োজন নিয়ে আলোচনা করছে, আর যার জন্য এত আয়োজন, সেই জুয়িনই নিচে নিশ্চিন্তে বড়দের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে।

-----

রাত এগারোটার মধ্যেই ভণ্ডপার্টির সদস্যরা জুয়িনদের বাড়িতে এসে হাজির হলো। তবে তারা কেউ সামনের গেট দিয়ে আসেনি। বাড়ির অন্য কেউ দেখে ফেলতে পারে, সেই আশঙ্কায় সবাই পেছনের গেট ব্যবহার করেছে।

এরই মধ্যে বাড়ির সবাই রাতের খাবার খাওয়া শেষ করেছেন। বড়রা নিজেদের মতো সময় কাটাচ্ছেন। আর বাড়ির ছোটরা জড়ো হয়েছে জিনিয়ার রুমে। তাদের সঙ্গে আছে তাসিফাও। জুয়িন অবশ্য নিজের রুমেই রয়েছে। জন্মদিনের সারপ্রাইজের ব্যাপারে সে এখনো কিছুই জানে না।

জিনিয়ার রুমে ভণ্ডপার্টির সদস্যরাও যোগ দিয়েছে। নতুন পরিবেশে প্রথমে সবার মধ্যে কিছুটা সংকোচ থাকলেও ইয়াশের স্বভাবসুলভ হাসিখুশি আচরণে মুহূর্তেই পরিবেশটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

ইয়াশ হেসে সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"হ্যালো গাইজ! আমি ইয়াশ।"

এরপর একে একে বাকিরাও নিজেদের পরিচয় দিল। পরিচয়পর্ব শেষ হতে না হতেই শুরু হয়ে গেল গল্প আর হাসি-ঠাট্টা। এত অল্প সময়ের মধ্যেই সবাই বেশ সহজভাবে একে অপরের সঙ্গে মিশে গেল।

একপর্যায়ে তাসনিম তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তার মানে জুয়িন ভাইয়ের বার্থডে ৩রা আগস্ট?"

সবাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়ল।

এরই মধ্যে অর্ডার করা কেকটাও এসে পৌঁছাল। আরাফ কেকটা নিয়ে জিনিয়ার রুমে রেখে দিল। সবাই মিলে সেটি দেখে নিলেও এখনই খোলার সুযোগ নেই। কারণ, সারপ্রাইজের মূল আয়োজন তো রাত বারোটায়।

তাই বাকি সময়টুকু গল্প-আড্ডা আর হাসি-ঠাট্টায় কাটতে লাগল। মাঝে মাঝে কেউ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছে। বারোটা বাজতে আর কতক্ষণ বাকি, সেই অপেক্ষাতেই যেন সবার মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা কাজ করছে।

----

রাত বারোটা বাজতে তখন আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। ছোটদের পরিকল্পনা অনুযায়ী এবার বাড়ির বড়দেরও ডেকে আনা হলো। সবাই মিলে তাঁদের নিয়ে জিনিয়ার রুমের দিকে এগিয়ে গেল।

আয়রা বেগম সেখানে তাসিফার বন্ধুদের দেখে কিছুটা অবাক হলেন। পরে তিনি হেসে সবাইকে জানালেন, ওরা তাসিফার বন্ধু। এরপর একে একে সবার সঙ্গে তাঁদের পরিচয় করিয়ে দিলেন।

কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে জুয়িনের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজায় ভেতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া নেই। ভেতরে জুয়িন নিজের মতো সময় কাটাচ্ছে। এদিকে বারোটা বাজতে আর বেশি দেরি নেই। সবাই অধীর আগ্রহে সময়ের অপেক্ষা করতে লাগল।

ঘড়ির কাঁটা বারোটা ছোঁয়ামাত্রই সবাই দ্রুত দরজা খুলে রুমে ঢুকে পড়ল। একসঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল,
-"হ্যাপি বার্থডে, জুয়িন ভাই।"

সঙ্গে সঙ্গে ইয়াশ একটি পপার ফাটাল। হঠাৎ সবাইকে এভাবে নিজের রুমে ঢুকতে দেখে জুয়িন প্রথমে বেশ অবাক হয়ে গেল। তার ওপর জন্মদিনের কথাটাও নিজের খেয়াল ছিল না। তাই মুহূর্তের জন্য কী ঘটছে, সেটাই বুঝে উঠতে পারল না।

এরপর সবাই একে একে এগিয়ে এসে তাকে শুভেচ্ছা জানিয়ে জড়িয়ে ধরল। এত মানুষের ভালোবাসা আর আয়োজন দেখে জুয়িনের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। তাসিফাও বেশ খুশি হলো।

জুয়িন হেসে বলল,
-"থ্যাংক ইউ সো মাচ, গাইজ!"

জিসান শিকদার ছেলের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
-"আরও বড় হও, বাবা। জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাও।"

আফসানা শিকদার হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
-"আমার ছেলেটা বড় হয়ে যাচ্ছে।"

এরপর একে একে অন্যরাও জুয়িনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। কাজিনদের পাশাপাশি ভণ্ডপার্টির সদস্যরাও তাকে শুভেচ্ছা জানাল। সবার শুভেচ্ছা আর ভালোবাসায় মুহূর্তটা বেশ আনন্দময় হয়ে উঠল।

কিছুক্ষণ পর জুয়িন কেক কাটল। প্রথমে পরিবারের বড়দের কেক খাইয়ে দিল। এরপর সবাইকে একে একে কেক খাওয়াল। কেক কাটার পর বেশ কিছুক্ষণ গল্প-আড্ডাও চলল।

একসময় বড়রা জুয়িনের রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তবে ছোটরা তখনো সেখানেই রয়ে গেছে।

সবাইকে নিয়ে আনন্দে মেতে থাকলেও তাসিফার মনটা ভালো নেই। জুয়িন সবাইকে কেক খাওয়ালেও তাকে একবারও খাওয়ায়নি। বিষয়টা তার মনে বেশ অভিমান জমিয়েছে। চোখের কোণে পানি জমে উঠলেও কাউকে বুঝতে দিল না সে। সবার আড়ালে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিল।

এদিকে জুয়িন সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এখন তোরা সবাই ঘুমাতে যা। আমিও ঘুমাব।"

ইয়াশ সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"না, আমরা মানে আমি, সাদ আর তাসনিম নিজেদের বাসায় চলে যাব।"

জাহিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-"এত রাতে যাবে?"

সাদ মাথা নেড়ে বলল,
-"হুম। সমস্যা নেই।"

বাকিরাও তাদের কথায় সম্মতি জানাল। এরপর সবাই একে একে রুম থেকে বের হতে শুরু করল।

ঠিক তখনই জুয়িন তাসিফাকে ডাকল,
-"তাসিফা।"

হঠাৎ নিজের নাম শুনে তাসিফা থমকে গেল। অন্যরাও দরজার কাছ থেকে ফিরে তাকাল। তাসিফা কিছুটা হতভম্ব হয়ে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল।

আরাফ মুখে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে বলল,
-"তাসিফা আপুকে দিয়ে কী করবি, জুয়িন ভাই?"

জুয়িন চোখ গরম করে তার দিকে তাকাল। তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-"আমার প্রয়োজন আছে। তোরা সবাই বের হ। তাসিফার সঙ্গে কাজ আছে।"

কথাটা শুনে বাকিরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি হাসল। তারপর একসঙ্গে বলে উঠল,
-"প্লিজ, কন্টিনিউ।"

বলেই সবাই হইহই করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

তাসিফা তখনো আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 55 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন