ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি কারো নও

পর্ব 57

লেখক: মিশু

অন্তিম পর্ব
#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু

----

ইয়াশ গান শেষ করতেই নিজেই হো হো করে হেসে উঠল। তার এমন কাণ্ড দেখে বাকিরা কিছুটা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সবাই ভেবেছিল, গান শেষ করে সে হয়তো একটু লজ্জা পাবে। কিন্তু ইয়াশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, নিজের গান শুনে সে নিজেই বেশ বিনোদিত হয়েছে।

হাসতে হাসতেই ইয়াশ বলল,
-"জীবনে প্রথমবার এত মানুষের সামনে নিজের ফাটা বাঁশের মতো গলায় গান গাইলাম।"

কথাটা শুনে তাসিফা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও হেসে বলল,
-"তুই আর ভালো হবি না। নিজে গান গেয়ে নিজেই হাসছিস।"

ইয়াশ এবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করল। যেন তার কথায় বেশ অপমানিত হয়েছে। তবে কিছু বলার আগেই জুয়িন মৃদু হেসে বলে উঠল,
-"কিন্তু ইয়াশ, তুমি খুব ভালো গেয়েছ।"

জুয়িনের কথা শুনে ইয়াশ আবারও হেসে ফেলল। সে জানে, জুয়িন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। তাই আর কিছু না বলে গিটারটা পাশে রেখে বলল,
-"এই একটা গানই শুধু মুখস্থ পারি। এর বাইরে আর কোনো গান পারি না।"

তার কথায় সবাই আবার হেসে উঠল। এরপর বাকিরা একে একে ইয়াশের গানের প্রশংসা করতে লাগল। আরাফ, জাহিদ, সিয়াম ও রিদও তাকে বাহবা দিল। এত মানুষের সামনে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা ইয়াশের জন্য নতুন হলেও সে যে বেশ সাহস করে কাজটা করেছে, সেটাও সবাই স্বীকার করল।

কিছুক্ষণ এভাবেই হাসি-ঠাট্টা চলল। এরপর জিনিয়া সবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"শোন, আগে কেক কেটে নিই। এরপর সবাই মিলে ট্রুথ অর ডেয়ার খেলব।"

কথাটা শুনে সবাই বেশ উৎসাহিত হয়ে উঠল। বিশেষ করে ছোটরা খেলার কথা শুনে যেন আরও বেশি আনন্দ পেল। সাদ দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"এই খেলায় সবাই ট্রুথ নিলেও সত্যি কথাটা আর কেউ বলে না।"

তার কথা শুনে বাকিরা হেসে উঠল। ইয়াশও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"আগে নিজের দিকে তাকিয়ে কথা বল। তোর সত্যি বলার রেকর্ড তো আমাদের জানা আছে।"

সাদ কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। বাকিদের হাসি দেখে সেও হেসে ফেলল।

এবার জুয়িন উঠে দাঁড়াল। কেকের পাশে রাখা ছুরিটা হাতে নিয়ে সবাইকে একটু কাছে আসতে বলল। সবাই নিজেদের জায়গা থেকে উঠে কেকের চারপাশে জড়ো হলো। কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলতে প্রস্তুত হলো, কেউ আবার ভিডিও করার জন্য ক্যামেরা চালু করল।

জুয়িন কেকের ওপর ছুরিটা বসিয়ে কাটতে শুরু করল। ঠিক সেই মুহূর্তে সবাই একসঙ্গে জন্মদিনের গান গেয়ে উঠল,
-"হ্যাপি বার্থডে টু ইউ, হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার জুয়িন ভাই, হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।"

গান শেষ হতেই সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। রিদ আর সিয়াম আবার জুয়িনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। জুয়িনও হাসিমুখে দুজনের দিকে তাকিয়ে ধন্যবাদ জানাল।

কেকের একটি টুকরো কেটে নিল জুয়িন। এরপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে সবার আগে তাসিফার মুখের সামনে কেকের টুকরোটা এগিয়ে ধরল সে।

তাসিফা প্রথমে একটু থমকে গেল। তারপর একবার আড়চোখে সবার দিকে তাকাল। বাকিরা যে এই মুহূর্তটাও বেশ উপভোগ করছে, তা তাদের মুখের হাসি দেখেই বোঝা যাচ্ছে। তাসিফার এমন অবস্থা দেখে সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
-"ওওওওওও!"

তাসিফা লজ্জায় হেসে ফেলল। তবে এবার আর আপত্তি করল না। চুপচাপ জুয়িনের হাত থেকে কেকের টুকরোটা খেয়ে নিল। জুয়িনের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে যেন বাকিদের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে তাসিফার এই ছোট্ট মুহূর্তটাকেই বেশি উপভোগ করছে।

এদিকে জাহিদ আর ইয়াশের মুখে দুষ্টু হাসি। তারা দুজন কিছু বলতে যাবে, তার আগেই জিনিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে চোখ রাঙাল। ফলে আপাতত তাদের মন্তব্যগুলো নিজেদের মধ্যেই আটকে রাখতে হলো।

এরপর জুয়িন একে একে বাকিদেরও কেক খাইয়ে দিল। রিদ, সিয়াম, ইয়াশ, সাদসহ সবাই নিজেদের পালা অনুযায়ী কেক নিল। কাজিনদেরও বাদ দিল না সে। কেক খাওয়ানো শেষ হলে সবাই আবার নিজেদের জায়গায় ফিরে এল।

কেকের পর্ব শেষ হতেই খাবারগুলো নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কেউ পছন্দমতো সমুচা তুলে নিচ্ছে, কেউ আবার নাগেটস আর সস নিয়ে বসেছে। ইয়াশ তো খাবার দেখেই বেশ উৎসাহী হয়ে উঠল। সাদ তার পাশ থেকে খাবার নিতে গিয়ে দুজনের মধ্যে ছোটখাটো খুনসুটিও শুরু হয়ে গেল।

সবাই কিছুটা খাওয়া-দাওয়া করে নিতেই জিনিয়া আবার খেলার প্রসঙ্গ তুলল। সে বলল,
-"এবার আর দেরি না করে খেলা শুরু করা যাক। অনেক রাত হয়ে যাবে কিন্তু।"

ট্রুথ অর ডেয়ারের নিয়ম সবারই আগে থেকে জানা। তাই নতুন করে কাউকে কিছু বুঝিয়ে বলতে হলো না। মাঝখানে একটি খালি বোতল রাখা হলো। সবাই গোল হয়ে বসে পড়ল। ঠিক হলো, বোতল ঘুরিয়ে যার দিকে মুখ থামবে, তাকে ট্রুথ অথবা ডেয়ার বেছে নিতে হবে। এরপর অন্যরা তাকে প্রশ্ন করবে কিংবা কোনো কাজ করতে বলবে।

খেলা শুরু করার জন্য প্রথমে বোতল ঘোরানোর দায়িত্ব নিল জাহিদ। সে বোতলটা মাঝখানে রেখে ঘুরিয়ে দিল। বোতলটি কয়েকবার ঘুরে ধীরে ধীরে থেমে গেল। সেটি গিয়ে থামল তাসনিমের দিকে।

জিনিয়া তাসনিমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল,
-"ট্রুথ অর ডেয়ার?"

তাসনিম এক মুহূর্তও না ভেবে উত্তর দিল,
-"ট্রুথ।"

জিনিয়া একটু ভেবে প্রশ্ন করল,
-"তুমি কাদের সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো?"

প্রশ্নটা শুনে তাসিফা একবার ভণ্ডপার্টির বাকিদের দিকে তাকাল। ইয়াশ আর সাদও কৌতূহল নিয়ে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে আছে। সবাই তার উত্তর শোনার অপেক্ষায়।

তাসনিম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
-"আমার বন্ধুদের।"

কথাটা শুনে তাসিফা, ইয়াশ আর সাদ একসঙ্গে এগিয়ে এসে তাসনিমকে জড়িয়ে ধরল। তাদের এমন কাণ্ড দেখে বাকিরাও হেসে উঠল। ভন্ডপার্টি একসঙ্গে বলে উঠল,
-"আমরাও।"

তাসনিমও হেসে তাদের জড়িয়ে ধরল। চার বন্ধুর এমন ভালোবাসা দেখে বাকিদের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। মুহূর্তটা বেশ সুন্দর হয়ে উঠল। একটু আগেও যেখানে সবাই মজা করছিল, সেখানে এই ছোট্ট উত্তরটিই যেন তাদের বন্ধুত্বের গভীরতা মনে করিয়ে দিল।

এবার বোতল ঘোরানোর পালা সিয়ামের। সে বোতলটা মাঝখানে রেখে জোরে ঘুরিয়ে দিল। বোতলটি বেশ কয়েকবার ঘুরে ধীরে ধীরে থামল। এবার সেটি গিয়ে থামল সরাসরি ইয়াশের দিকে।

বাকিরা আবার হৈহৈ করে উঠল। ইয়াশ নিজের শার্টটা একটু ঠিক করে বেশ ভাব নিয়ে সোজা হয়ে বসল। তারপর বলল,
-"আমি ট্রুথ নেব।"

আরাফ সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করে বসল,
-"কখনো রিলেশন করেছ?"

প্রশ্নটা শুনে ইয়াশ নিজের কান ধরে ফেলল। তারপর বেশ গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
-"জীবনে অনেক ভণ্ডামি করেছি। কিন্তু রিলেশন নামক ঝামেলায় কখনো জড়াইনি।"

তার উত্তর শুনে সবাই হেসে উঠল। সিয়াম আর রিদ তো বাহবা দিতে শুরু করল। সাদ আবার মজা করে বলল,
-"বাহ! আমাদের ইয়াশ তাহলে এখনো নিষ্পাপ।"

কথাটা শুনে ইয়াশ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"বেশি কথা বলিস না। তোর চেয়ে হাজার গুণ ভালো আমি।"

এবার আবারও হাসির রোল পড়ে গেল। ইয়াশ নিজের উত্তর নিয়ে বেশ গর্বিত ভঙ্গিতে বসে রইল।

এরপর একে একে সবার পালা আসতে লাগল। কেউ ট্রুথ নিচ্ছে, কেউ আবার ডেয়ার নিতে গিয়ে নতুন ঝামেলায় পড়ছে। মজার সব প্রশ্ন আর উত্তর নিয়ে জমে উঠল আড্ডা। মাঝেমধ্যে কেউ এমন উত্তর দিচ্ছে যে বাকিরা হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে। আবার কারও অপ্রস্তুত মুখ দেখে অন্যরা আরও বেশি মজা পাচ্ছে।

তাসিফাও সবার সঙ্গে বেশ আনন্দ করছে। কখনো ইয়াশের কথায় হেসে উঠছে, কখনো তাসনিমের সঙ্গে মজা করছে। জুয়িনও বন্ধু ও কাজিনদের সঙ্গে বসে সময়টা উপভোগ করছে। জন্মদিনের এই ছোট্ট আয়োজন যেন ধীরে ধীরে আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।

এভাবেই হাসি-ঠাট্টা, গল্প আর খেলার মধ্য দিয়ে সময় গড়িয়ে যেতে লাগল। কারও ঘড়ির দিকে তাকানোর কথা মনে নেই। রাত যত বাড়ছে , ছাদের আড্ডা ততই জমে উঠছে।

-----

রাত প্রায় এগারোটা। ছাদে মশার উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় আর কারও সেখানে বসে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সবাই মিলে নিচে নেমে এল। তাছাড়া ছাদের খাবার খেয়ে কারও পেটই তেমন ভরেনি। এখন সবার জন্য রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে।

সবাই নিচে এসে দেখল, আফসানা শিকদার, জাকিয়া শিকদার, আতকিয়া শিকদার ও আয়রা বেগম মিলে খাবার পরিবেশন করছেন। তাঁদের পাশে বাড়ির  সার্ভেন্টও কাজে সাহায্য করছেন। আজকের রাতের খাবারের আয়োজনে কোনো কমতি রাখা হয়নি। হরেক রকমের খাবার রান্না করা হয়েছে। সবকিছুই তৈরি করেছেন আয়রা বেগম, আফসানা শিকদার ও জুয়িনের চাচিরা মিলে।

অন্যদিকে, ডাইনিংয়ের পাশের বসার জায়গায় জুয়িনের চাচারা, জিসান শিকদার ও আলমগীর আলম বসে নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন। তাঁদের কথাবার্তার মাঝেই ছোটদের নিচে দেখে আফসানা শিকদার বলে উঠলেন,
-"এই তোরা, এবার খেতে বসে পড়।"

সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে খাবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। ভণ্ডপার্টির সদস্যদের বাসায় ফিরতে হবে। অন্যদিকে রিদ ও সিয়ামকেও নিজেদের হোস্টেলে ফিরতে হবে। তাই তাদের মধ্যে একটু তাড়াহুড়ো দেখা গেল।

সবাই যার যার জায়গায় বসে পড়ল। একে একে সবার প্লেটে ভাত তুলে দেওয়া হলো। সেই সময় জাকিয়া শিকদার তাসিফার প্লেটে ইলিশ মাছের বড় একটি টুকরো তুলে দিলেন। তারপর স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
-"সাবধানে কাঁটা বেছে খেয়ো, মা।"

তাসিফা হেসে মাথা নাড়ল। তবে বিষয়টা জুয়িনের চোখ এড়াল না। সে একবার জাকিয়া শিকদারের দিকে তাকাল। একটু আগের কথাবার্তার সঙ্গে এই অতিরিক্ত যত্নের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা ভাবতে লাগল। তবে মুখে কিছু বলল না। আপাতত বিষয়টা নিজের মধ্যেই রাখল।

সবাই একসঙ্গে খেতে শুরু করল। বড়রা নিজেদের মধ্যে গল্প করছেন, আর ছোটদের মধ্যেও টুকটাক কথাবার্তা চলছে। এরই মধ্যে হঠাৎ জাকিয়া শিকদার আয়রা বেগমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
-"আপা, তাসিফার বিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে কোনো চিন্তাভাবনা করেছেন?"

প্রশ্নটা শুনে তাসিফার হাত থেমে গেল। সে একবার মায়ের দিকে তাকাল। অন্যদিকে জুয়িনের ভ্রু কুঁচকে উঠল। মনে মনে সে যেটা আশঙ্কা করছিল, শেষ পর্যন্ত সেটাই হলো।

আয়রা বেগম হেসে উত্তর দিলেন,
-"সেটা তো তাসিফার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।"

জাকিয়া শিকদার এবার একটু ইতস্তত করে বললেন,
-"আসলে, আপনাকে একটা প্রস্তাব দেওয়ার কথা ভাবছিলাম।"

আলমগীর আলম কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন,
-"কীসের প্রস্তাব?"

এবার জাওয়াদ শিকদার কথা বলে উঠলেন,
-"আসলে, আমার ছেলে জাহিদের জন্য তাসিফাকে পছন্দ হয়েছে। তাই ওর সঙ্গে তাসিফার বিয়ের প্রস্তাবটা দিতে চাচ্ছিলাম।"

কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
-"কিইইই!"

হঠাৎ এতগুলো মানুষের এমন প্রতিক্রিয়ায় বড়রা থমকে গেলেন। সবাই অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকালেন। অন্যদিকে যারা এতক্ষণ স্বাভাবিকভাবে খাচ্ছিল, তারাও এবার বুঝতে পারল না, এমন চমকে ওঠার কারণ কী।

আফসানা শিকদার এবার হেসে জাকিয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"আরে, কী বলছ জাকিয়া! আমি তো মনে মনে ঠিক করেই রেখেছিলাম, তাসিফাকে আমার জুয়িনের বউ করে ঘরে আনব।"

এবার জুয়িন ও তাসিফা দুজনেই একসঙ্গে কাশতে শুরু করল। হঠাৎ এমন কথা শুনে দুজনেরই খাবার গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হলো। সামলাতে না পেরে কাশতে কাশতে একসময় দুজনের চোখেই পানি চলে এল।

জাহিদ দ্রুত এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল জুয়িনের দিকে। অন্যদিকে ইয়াশও হাসতে হাসতে তাসিফার দিকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিল। দুজনই তাড়াতাড়ি পানি খেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হলো। তবে হঠাৎ তাদের এমন অবস্থা দেখে বাকিরা বেশ চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

জিসান শিকদারও স্ত্রীর কথায় সম্মতি জানিয়ে বললেন,
-"হ্যাঁ, আমিও চাই তাসিফা আমাদের ঘরের বউ হয়ে আসুক।"

জাহিদ আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হেসে জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"জুয়িনের সঙ্গে তাসিফাকে বেশ মানাবে কিন্তু!"

জাকিয়া শিকদার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই জাহিদ আবার বলে উঠল,
-"তাছাড়া, আমি তো তাসিফাকে ছোট বোনের মতোই দেখি। ওকে আমি বোন ছাড়া আর কিছু ভাবতেই পারি না।"

কথাটা শুনে সবাই কিছুক্ষণের জন্য চুপ হয়ে গেল। জাহিদের এমন উত্তর শুনে জিনিয়া হেসে ফেলল। বাকিরাও মুখ টিপে হাসছিল।

এবার আফসানা শিকদার আয়রা বেগমের হাতটা নিজের হাতে চেপে ধরলেন। তারপর বেশ আন্তরিক স্বরে বললেন,
-"আয়রা, তাসিফা মামনিকে আমার ছেলের জন্য দিবি?"

আয়রা বেগম মেয়ের দিকে তাকালেন। তাসিফা তখন নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। লজ্জায় তার মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। এত মানুষের সামনে এমন কথা শুনবে, তা সে কল্পনাও করেনি।

আয়রা বেগম মৃদু হেসে বললেন,
-"আপা, আমার হাতে তো কিছু নেই। তাসিফা বিয়ে করবে তার নিজের পছন্দ অনুযায়ী। ওর মতামতটাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।"

আফসানা শিকদার এবার সরাসরি তাসিফার দিকে তাকালেন। স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-"তাসিফা, তোমার কি কাউকে পছন্দ আছে?"

তাসিফা কিছু বলার জন্য মুখ খুলতেই জুয়িন চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল। তার এমন আচরণে টেবিলের সবাই থমকে গেল। জুয়িন একবার আয়রা বেগমের দিকে, তারপর আফসানা শিকদারের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
-"মা, আমি তাসিফাকে পছন্দ করি। ওকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চাই এবং বিয়ে করতে চাই।"

মুহূর্তের মধ্যে পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই যেন কথাটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

তবে সেই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ইয়াশ আনন্দে বলে উঠল,
-"সাব্বাশ।"

তার কথা শুনে সাদ আর তাসনিম হেসে উঠল। বাকিদের মুখেও হাসি ফুটে উঠল।

আলমগীর আলম এবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন,
-"আর তাসিফা, তুমি কি জুয়িনকে পছন্দ করো?"

এবার তাসিফাও নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা সংকোচ কাটিয়ে সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"বাবা, আমিও জুয়িন ভাইয়াকে পছন্দ করি। উনাকেই নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে চাই।"

কথাটা শুনে আফসানা শিকদারের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। জিসান শিকদারও সন্তুষ্টির সঙ্গে তাসিফার দিকে তাকালেন। অন্যদিকে কাজিন মহল তো আনন্দে আত্মহারা। তারা প্রথম থেকেই দুজনের মধ্যে কিছু একটা আঁচ করেছিল। তবে আজকের কথার পর আর কোনো সন্দেহ রইল না।

সবাই একসঙ্গে হৈহৈ করে উঠল। জুয়িন হেসে তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফাও লজ্জায় মৃদু হাসল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তাসিফা আবার চোখ নামিয়ে নিল।

আতকিয়া শিকদার এবার হাসিমুখে বললেন,
-"যেহেতু ছেলে-মেয়ে দুজনেরই একে অপরের প্রতি পছন্দ আছে, তাহলে আর দেরি না করে বিয়ের কথাবার্তা এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।"

আয়রা বেগম একটু ভেবে বললেন,
-"তবে জুয়িনের তো বড় বোন আছে। জিনিয়ার বিয়ের আগেই কি ওর বিয়ের আয়োজন করা হবে?"

জিসান শিকদার হেসে উত্তর দিলেন,
-"জিনিয়ার আকদ তো দুই বছর আগেই সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বছর ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসে আনুষ্ঠানিকভাবে ওকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাবে।"

আলমগীর আলম এবার কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন,
-"জিনিয়ার আকদ হয়ে গেছে নাকি? জামাই কোথায়?"

আফসানা শিকদার বললেন,
-"হ্যাঁ, জামাইয়ের নাম রাফসান। আপাতত সে নিজের ব্যবসা সামলাচ্ছে। ব্যবসাটা আরও একটু গুছিয়ে উঠুক, তারপর জিনিয়াকে একেবারে রানির মতো করে নিজের ঘরে তুলে নেবে। এখনো আলাদা করে সংসার শুরু করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।"

আয়রা বেগম মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। এদিকে জুয়িন ও তাসিফাও আবার নিজেদের জায়গায় বসে পড়ল। তাসিফার হাত-পা যেন ঠান্ডা হয়ে আসছে। এতক্ষণ যা ঘটল, সবকিছুই তার কাছে স্বপ্নের মতো লাগছে। আনন্দের পাশাপাশি একধরনের অজানা উত্তেজনাও কাজ করছে তার মধ্যে।

কিছুক্ষণ নীরব থেকে আয়রা বেগম বললেন,
-"আপা, আমি আগামীকাল তোকে আমাদের সিদ্ধান্ত জানাই?"

আফসানা শিকদার হেসে বললেন,
-"ঠিক আছে। তবে সন্ধ্যার মধ্যেই জানাবি।"

-"আচ্ছা, জানাব।"

আফসানা শিকদার আবার বললেন,
-"তাহলে আগামীকালও এই বাড়িতে থেকে যা, আয়রা।"

আয়রা বেগম হেসে আপত্তি জানালেন,
-"আরে, কী বলিস আপা! এত দিন এখানে থাকব নাকি?"

আতকিয়া শিকদার সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন,
-"তো কী হয়েছে? নিজের বাড়ি মনে করেই থাকবেন। এত দিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছি, আরেকটা দিন থাকলে সমস্যা কোথায়?"

জাকিয়া শিকদারও তাঁর কথায় সায় দিলেন। সবাই মিলে আয়রা বেগমকে আগামীকালও থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের আন্তরিক অনুরোধে আয়রা বেগম রাজি হলেন। এরপর আর কেউ বিয়ের প্রসঙ্গ তুললেন না। সবাই আবার স্বাভাবিকভাবে খাওয়া-দাওয়া ও গল্পে মন দিলেন।

তবে তাসিফার মন থেকে দুশ্চিন্তাটা কিছুতেই কাটছিল না। আয়রা বেগম কেন সিদ্ধান্ত জানাতে আগামীকাল পর্যন্ত সময় নিচ্ছেন? জুয়িনকে কি তাঁর পছন্দ হয়নি? তিনি কি এই বিয়েতে রাজি হবেন না? এমন নানা প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতে লাগল। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েও কিছু বুঝতে পারছে না সে।

এসব ভাবনার মধ্যেই ভণ্ডপার্টির সদস্যদের খাওয়া শেষ হয়ে গেল। রিদ ও সিয়ামও উঠে দাঁড়াল। তাদের এবার হোস্টেলে ফিরতে হবে। সবাই একে একে জুয়িনের পরিবারের বড়দের কাছ থেকে বিদায় নিল। এরপর জুয়িনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় রিদ আর সিয়াম বুঝিয়ে দিল, পরবর্তী ঘটনা যেন তাদের জানাতে ভুলে না যায়।

অন্যদিকে ইয়াশ, সাদ ও তাসনিমও তাসিফার কাছ থেকে বিদায় নিতে এগিয়ে এল। বিদায়ের আগে ইয়াশ একটু কাছে এসে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
-"যা-ই হোক, সব কিন্তু আমাদের জানাবি।"

তাসিফা মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।

সবাইকে বিদায় জানিয়ে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। আর তাসিফা তখনো নিজের ভাবনার জগতে ডুবে আছে। আগামীকাল কী সিদ্ধান্ত আসবে, সেটাই এখন তার সবচেয়ে বড় চিন্তা।

-----

সবাইয়ের খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে একে একে রুমে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। রাতও কম হয়নি। সারাদিনের আনন্দ-আয়োজনের পর সবার মধ্যেই কিছুটা ক্লান্তি চলে এসেছে। তবে রুমে যাওয়ার আগে জিনিয়া তাসিফা, জুয়িন এবং তার কাজিনদের নিজের রুমে আসতে বলল। তার কথায় কেউ আর আপত্তি করল না।

জিনিয়ার রুমে ঢুকেই যে যার মতো জায়গা করে নিল। কেউ বিছানায়, কেউ আবার সোফায় গিয়ে বসল। তাসিফা জিনিয়ার পাশে জায়গা করে নিল। আর জুয়িন গিয়ে বসল তাসিফার সঙ্গে। সবাইকে একসঙ্গে বসতে দেখে জিনিয়ার মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে কিছুক্ষণ সবার দিকে তাকিয়ে থেকে জুয়িনের দিকে চোখ ফেরাল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
-"জুয়িন, এবার বল তো, তোদের মধ্যে এসব কবে থেকে চলছে?"

জুয়িন প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। তবে সেটা বুঝতে না দিয়ে ভান করে বলল,
-"কীসব?"

জাহিদ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে জুয়িনের পিঠে চাপড় মেরে বলল,
-"উম! শালা, আর কত ঢং করবি? এতক্ষণ তো কিছু বলার সুযোগই পেলাম না। এবার সব খুলে বল দেখি।"

আরাফও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"হ্যাঁ ভাই, আমরাও তো বিস্তারিত জানতে চাই। এত বড় ঘটনা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার কারণ কী?"

জুয়িন তাদের কথায় মৃদু হাসল। এরপর একবার তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফা তখন চুপচাপ বসে আছে। তার মুখে লাজুক হাসি। জুয়িন আবার সবার দিকে একবার তাকিয়ে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলতে শুরু করল। কীভাবে প্রথমবার তাদের দেখা হয়েছিল, কীভাবে ভার্সিটির ট্যুরে গিয়ে গ্রামের মানুষের ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছিল তারা এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে গ্রামের লোকজনের জোরাজুরিতে তাদের বিয়ে হয়েছিল, সবকিছুই একে একে খুলে বলল জুয়িন। বিয়ের পর থেকে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাও বাদ দিল না সে।

সব কথা শোনার পর জিসা আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল,
-"আরে! তার মানে তাসিফা আপু আমাদের বড় ভাবি?"

তার এমন উচ্ছ্বাস দেখে সবাই হেসে উঠল। তাসিফাও লজ্জায় মাথা নিচু করে মৃদু হাসল। জুয়িন অবশ্য কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বসে রইল।

জিনিয়া এবার তাসিফার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আচ্ছা, সবই তো বুঝলাম। কিন্তু একটা বিষয় মাথায় ঢুকছে না। ছোট খালামনি আগামীকাল পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় চাইলেন কেন? এত সময় নেওয়ার কী আছে?"

জিনিয়ার প্রশ্নে তাসিফার মুখের হাসিটা কিছুটা মলিন হয়ে গেল। এতক্ষণ সবাইকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকলেও মায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়টি তার মন থেকে যাচ্ছিল না। সে একটু চিন্তিত স্বরে বলল,
-"আমিও বুঝতে পারছি না। মা এত সময় কেন নিচ্ছে।"

আরাফ এবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,
-"আন্টি কি তাহলে রাজি নন?"

তার কথা শুনে আকসা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"আন্টি কেন রাজি হবেন না? জুয়িন ভাই তো সব দিক থেকেই পারফেক্ট।"

জিনিয়াও তার কথায় সায় দিয়ে বলল,
-"হুম, সেটাই তো। জুয়িনের মতো ছেলে পেতে গেলে ভাগ্য লাগে!"

জাহিদ মজা করে বলে উঠল,
-"নিজের ভাই বলে বলছি না, আমাদের জুয়িন কিন্তু একেবারে সোনার টুকরো।"

তার কথা শুনে আবারও হাসির শব্দ উঠল। জুয়িন অবশ্য তাদের কথায় বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং তাসিফার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার মুখে যে চিন্তার ছাপ পড়েছে, সেটা তার চোখ এড়ায়নি।

তাসিফা এবার আর চুপ করে থাকতে পারল না। সবার সামনেই জুয়িনের হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
-"আমি আর কিছু জানি না। মা রাজি না হলেও আমি জুয়িন ভাইয়াকেই বিয়ে করব।"

তাসিফার এমন কথা শুনে রুমের সবাই কিছুক্ষণের জন্য তার দিকে তাকিয়ে রইল। এরপর একে একে সবার মুখে হাসি ফুটে উঠল। জাহিদ তো সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"বাহ! ভাবির মুখে তো বেশ সাহসী কথা শুনলাম।"

আরাফ মজা করে বলল,
-"আমাদের তাসিফা আপু দেখি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে। এখন শুধু আন্টির অনুমতির অপেক্ষা।"

তাদের কথায় তাসিফা লজ্জা পেলেও জুয়িনের হাত ছাড়ল না। বরং জুয়িনও তার হাতটা নিজের মুঠোয় আরও শক্ত করে ধরে রাখল। তাসিফার কথাগুলো শুনে তার মনটা ভরে উঠেছে। এতক্ষণ মায়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাসিফার মনে যে অস্বস্তি ছিল, সেটাও যেন কিছুটা কমে গেল। সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।

জিনিয়া দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আচ্ছা, এখন আর এসব নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই। কালকেই তো সব জানা যাবে। আপাতত তোরা দুজন শান্ত থাক।"

জুয়িন আর তাসিফা মাথা নাড়ল। এরপর সবাই মিলে আরও কিছুক্ষণ গল্প করল। তবে রাত যত গভীর হতে লাগল, সবার মধ্যেই ঘুমের ভাব চলে আসতে শুরু করল। একসময় জিনিয়া সবাইকে যার যার রুমে গিয়ে ঘুমানোর কথা বলল। কেউ আর আপত্তি করল না। একে একে সবাই জিনিয়ার রুম থেকে বেরিয়ে গেল।

আজ রাতেও তাসিফা জিনিয়ার সঙ্গেই থাকবে। অন্যদিকে আকসা ও জিসা নিজেদের রুমে ফিরে গেল। জুয়িনও সবার সঙ্গে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।

সারাদিনের আনন্দ-আয়োজনের পর অবশেষে শিকদার বাড়ি ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল।

----

সকালে নিচ থেকে ভেসে আসা চিৎকার-চেঁচামেচিতে তাসিফা ও জিনিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে দুজনেই ঘুমজড়ানো চোখে একে অপরের দিকে তাকাল। কিন্তু নিচের চেঁচামেচি ক্রমেই বাড়তে থাকায় আর বিছানায় শুয়ে থাকা সম্ভব হলো না। দুজন ধড়ফড় করে উঠে বসল। তাদের মনে হলো, বাড়ির নিচতলায় হয়তো কেউ ঝগড়া করছে। তাই আর সময় নষ্ট না করে দ্রুত বিছানা ছেড়ে রুম থেকে বেরিয়ে এল।

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময়ও নিচ থেকে নানা কথা ভেসে আসছিল। জিনিয়া আর তাসিফা একটু দ্রুত পা চালাল। নিচে গিয়ে কোনো সমস্যা হলে অন্তত বোঝা যাবে কী হয়েছে। তবে নিচতলায় পৌঁছাতেই তাদের ধারণা বদলে গেল। সেখানে গুরুতর কোনো ঝগড়া হচ্ছে না, বরং জাহিদ আর আরাফের মধ্যে বেশ জমজমাট বাকবিতণ্ডা চলছে।

জাহিদ রীতিমতো রেগে গিয়ে চিৎকার করছে,
-"আরাফ বেয়াদবটা আমার চার পার্সেন্ট চার্জ থাকা মোবাইলটা চার্জ থেকে খুলে নিজের আটানব্বই পার্সেন্ট চার্জ থাকা মোবাইলটা চার্জে দিয়েছে! এই কাজ কেউ করে?"

অন্যদিকে আরাফ আফসানা শিকদারের পেছনে লুকিয়ে আছে। জাহিদ বারবার তার দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আরাফও একবার আড়াল থেকে মুখ বের করে জাহিদের দিকে তাকাচ্ছে, আবার তাকে এগিয়ে আসতে দেখলেই দ্রুত আফসানা শিকদারের পেছনে সরে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে, বড়দের সামনে আশ্রয় নেওয়াটাই এখন তার একমাত্র ভরসা।

তাসিফা আর জিনিয়া সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাদের কাণ্ড দেখল। ততক্ষণে বাকিরাও একে একে নিচে নেমে এসেছে। জিসা জাহিদের অভিযোগ শুনে হাসছে, আর আকসা আরাফের নির্বিকার মুখ দেখে মজা পাচ্ছে।

এত সকালে এমন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে জুয়িন বেশ বিরক্ত হলো। সে জাহিদের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আর কোনো টপিক নেই তোদের ঝগড়া করার? সকাল সকাল বাড়িটা মাথায় তুলেছিস কেন?"

জাহিদ এবার আরাফের দিকে অভিযোগের দৃষ্টি দিয়ে জুয়িনের কাছে বিচার চাইল। যেন এতক্ষণ ধরে তার রাগের পেছনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা কারণ রয়েছে। সে বলল,
-"জুয়িন, দেখ! আরাফ সব সময় এমন করে। আমার মোবাইলে মাত্র চার পার্সেন্ট চার্জ ছিল। আর ওর মোবাইলে আটানব্বই পার্সেন্ট! তারপরও আমারটা খুলে নিজেরটা চার্জে দিয়েছে। এখন বল, এটা কোনো কাজ হলো?"

জাহিদের কথা শুনে বাকিরা আবার হেসে উঠল। কিন্তু আরাফের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা গেল না। বরং সে আফসানা শিকদারের পেছন থেকে মুখ বের করে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"আরে, আমার মোবাইল একশো পার্সেন্ট চার্জ হলে তো খুলেই ফেলতাম। এত ঝামেলা করার কী আছে?"

আরাফের এমন যুক্তি শুনে জাহিদ যেন আরও ক্ষেপে গেল। সে আবারও তার দিকে তেড়ে গিয়ে বলল,
-"এই দাঁড়া তুই! তোর একশো পার্সেন্ট চার্জ হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে আমার মোবাইল বন্ধ হয়ে যাবে।"

আরাফ সঙ্গে সঙ্গে আবার আফসানা শিকদারের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। তবে এবারও তার মুখে দুষ্টু হাসি লেগে রইল। জাহিদকে রাগাতে পেরে সে বেশ মজাই পাচ্ছে। আর জাহিদের অবস্থা দেখে বাকিদের হাসি যেন থামছেই না।

আফসানা শিকদার এতক্ষণ তাদের কাণ্ড দেখে হাসছিলেন। কিন্তু জাহিদকে বারবার আরাফের দিকে তেড়ে যেতে দেখে এবার দুজনকে থামালেন। হেসে বললেন,
-"হয়েছে, এবার থাম তোরা। আরাফ আর এমন করবে না।"

আয়রা বেগমও হেসে যোগ করলেন,
-"হ্যাঁ, এবারের মতো ছেড়ে দাও তাকে।"

বড়দের কথা শুনে জাহিদ শেষ পর্যন্ত চুপ করে গেল। তবে তার মুখের ভাব দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টা সে এত সহজে ভুলছে না। সে আরাফের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বুঝিয়ে দিল, আপাতত ছেড়ে দিলেও পরে এর হিসাব নেওয়া হবে।

আরাফও জাহিদের সেই ইশারা বুঝতে পেরে মুখ টিপে হাসল। তারপর আবারও আফসানা শিকদারের আড়ালে একটু সরে দাঁড়াল। তার এমন কাণ্ড দেখে জিনিয়া এবার হেসে বলল,
-"তোদের দুজনের ঝগড়া কোনো দিন শেষ হবে না, তাই না?"

জাহিদ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
-"আমি তো ঝগড়া করছি না। ওই বেয়াদবটা আমার সঙ্গে লাগতে এসেছে।"

আরাফও পেছন থেকে বলে উঠল,
-"আমি আবার কী করলাম? মোবাইল চার্জে দিয়েছি, ব্যস।"

তার কথা শুনে আবারও হাসির শব্দ উঠল। জুয়িন এবার বিরক্তির ভান করে মাথা নাড়ল। এতক্ষণে সে বুঝে গেছে, এই দুজনকে নিয়ে কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। তাদের ঝগড়ার বিষয় বদলাবে, কিন্তু ঝগড়া থামবে না।

অবশেষে সবার হাসি-ঠাট্টার মধ্যেই জাহিদ ও আরাফের ঝগড়ার পর্ব শেষ হলো। আফসানা শিকদার এবার সবার দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"আচ্ছা, এবার সবাই যার যার রুমে যা। ফ্রেশ হয়ে নে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাশতা দেওয়া হবে।"

বড়দের কথায় সবাই আর দেরি করল না। যে যার মতো রুমের দিকে যেতে শুরু করল। তাসিফা ও জিনিয়াও একসঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। যাওয়ার সময় তাসিফা একবার পেছনে তাকিয়ে জাহিদ ও আরাফের দিকে তাকাল। দুজনকে তখনো একে অপরের দিকে চোখ রাঙাতে দেখে তার মুখে আবারও হাসি ফুটে উঠল।

-----

সন্ধ্যায় সবাই ড্রয়িংরুমের সোফায় গোল হয়ে বসেছে। জুয়িন বসেছে আফসানা শিকদার ও জিসান শিকদারের মাঝখানে। তার ফরসা হাত দুটো অনবরত কচলাচ্ছে। বাইরে থেকে তাকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে বেশ অস্থির সে। আয়রা বেগম শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেন, তা নিয়েই তার যত দুশ্চিন্তা। কিছুক্ষণ পরপরই সে একবার আয়রা বেগমের দিকে তাকাচ্ছে, আবার চোখ নামিয়ে নিচ্ছে।

অন্যদিকে তাসিফাও তার বাবা-মায়ের মাঝখানে বসেছে। সেও বেশ চুপচাপ। মাঝে মাঝে আড়চোখে সবার দিকে তাকাচ্ছে। জুয়িনের অস্থিরতা তার চোখ এড়ায়নি। তবে এ মুহূর্তে কিছু বলার সুযোগ নেই। ঘরের সবার মনোযোগ এখন আয়রা বেগমের দিকে।

আফসানা শিকদার গলা খাঁকারি দিয়ে আয়রা বেগমের দিকে তাকালেন। তারপর অপেক্ষার সুরে জিজ্ঞেস করলেন,
-"কী সিদ্ধান্ত নিলি, আয়রা?"

আয়রা বেগম একটু হাসলেন। এরপর পাশে বসা আলমগীর আলমের দিকে একবার তাকিয়ে সবার উদ্দেশে বললেন,
-"আমি আর আলমগীর অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাসিফা যেহেতু জুয়িনকে পছন্দ করে, তাই আমাদের আর আপত্তি করার কিছু নেই। তবে ও আমাদের একমাত্র মেয়ে। তাই এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের দুজনেরই কিছুটা সময় প্রয়োজন ছিল। সবদিক বিবেচনা করে আমরা বুঝতে পেরেছি, তাসিফার জন্য জুয়িনের চেয়ে ভালো পাত্র আর কেউ হতে পারে না।"

কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। এতক্ষণ সবার মনে যে অপেক্ষা আর চাপা উত্তেজনা ছিল, মুহূর্তেই তা আনন্দে পরিণত হলো। বাড়ির প্রত্যেকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। বিশেষ করে জুয়িনের মুখে স্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। এতক্ষণ যে চিন্তায় হাত কচলাচ্ছিল, সেই চিন্তার অবসান হতেই সে একটু নিশ্চিন্ত হয়ে বসল।

জিসান শিকদার হেসে আলমগীর আলমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
-"তাহলে আমরা বেয়াই-বেয়াইন হতে যাচ্ছি?"

আলমগীর আলমও হেসে মাথা নাড়লেন। তাঁর সম্মতি পেতেই সবাই একসঙ্গে বলে উঠলেন,
-"আলহামদুলিল্লাহ!"

আতকিয়া শিকদার আনন্দে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এতক্ষণ তিনি চুপচাপ সবার কথা শুনছিলেন। এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। প্রফুল্ল কণ্ঠে আরাফকে উদ্দেশ করে বললেন,
-"এই আরাফ, তুই গিয়ে দোকান থেকে পাঁচ কেজি মিষ্টি নিয়ে আয়। জলদি!"

আরাফও সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
-"আচ্ছা, যাচ্ছি।"

কথাটা বলেই সে দ্রুত বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। তার এমন তাড়াহুড়ো দেখে বাকিরা হেসে উঠল। জাহিদ পাশ থেকে মজা করে কিছু একটা বলতেই আবারও হাসির রোল উঠল।

তাসিফা এতক্ষণ মাথা নিচু করে বসে আছে। মুখে লাজুক হাসি লেগে রয়েছে। সবার সামনে এমন আলোচনা হওয়ায় সে বেশ অস্বস্তি বোধ করছে। তবুও মনের ভেতর যে আনন্দ হচ্ছে, তা লুকানোর উপায় নেই। অবশেষে তার মনের ইচ্ছেটা পরিবারের সবাই মেনে নিয়েছে।

অন্যদিকে তাসিফার মোবাইল থেকে এখনো হইহুল্লোড়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। এরা আর কেউ নয়, ভণ্ডপার্টি। তাসিফা এখানে আসার সময় ভণ্ডপার্টি গ্রুপে অডিও কল দিয়ে রেখেছিল, যাতে তারাও সবকিছু জানতে পারে। এতক্ষণ ধরে তারা চুপচাপ সব শুনছিল। কিন্তু আয়রা বেগমের সম্মতি পাওয়ার পর তাদের উচ্ছ্বাস আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফোনের ওপাশ থেকে একের পর এক চিৎকার আর আনন্দের শব্দ ভেসে আসছিল। তাসিফা লজ্জা পেলেও মনে মনে বেশ উপভোগ করছিল তাদের কাণ্ড। এবার সে মুচকি হেসে কলটি কেটে দিল।

এদিকে জাহিদ আর জিনিয়া মিলে জুয়িনকে খোঁচাতে শুরু করেছে। দুজনের কথাবার্তায় বোঝাই যাচ্ছে, আজ তাকে সহজে ছাড় দেওয়ার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। জাহিদ একবার জুয়িনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে, আবার জিনিয়ার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই দুজন মিলে হেসে উঠছে। জুয়িন প্রথমে চুপচাপ সহ্য করলেও একসময় বিরক্ত হয়ে তাদের দিকে তাকাল। কিন্তু তাতে তাদের খুনসুটি থামার বদলে আরও বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে বাড়ির পরিবেশটা বেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। বড়রা বিয়ের আয়োজন নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন, আর ছোটরা একে অপরকে নিয়ে মজা করছে। এমন সময় জুয়িন একবার চোখ তুলে তাসিফার দিকে তাকাল। ঠিক তখনই তাসিফাও তার দিকে তাকাল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তারা একটু থমকে গেল। তারপর লজ্জা পেয়ে মৃদু হেসে দুজনেই চোখ নামিয়ে নিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আরাফ পাঁচ কেজি স্পঞ্জ মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে ফিরে এল।

আফসানা শিকদার এগিয়ে এসে আরাফের হাত থেকে মিষ্টির প্যাকেটগুলো নিলেন। এরপর একটি প্যাকেট খুলে সেখান থেকে মিষ্টি বের করলেন। প্রথমে আয়রা বেগমের দিকে এগিয়ে দিলেন। আয়রা বেগম হাসিমুখে বোনের হাত থেকে মিষ্টি খেলেন। এরপর নিজেও একটি মিষ্টি তুলে আফসানা শিকদারকে খাইয়ে দিলেন। দুই বোনের এমন আনন্দ দেখে বাকিরাও হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

আফসানা শিকদার এরপর জুয়িন ও তাসিফার দিকে এগিয়ে গেলেন। দুজনের মুখে নিজের হাতে মিষ্টি তুলে দিলেন। তাসিফা লজ্জায় মৃদু হেসে মিষ্টিটা খেয়ে নিল। জুয়িনও মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। আজকের দিনটা যেন সবার জন্যই বিশেষ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা পেরিয়ে অবশেষে দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জাওয়াদ শিকদার হেসে বললেন,
-"তাহলে বিয়ের দিনক্ষণ কবে ঠিক করা যায়?"

আলমগীর আলম একটু ভেবে বললেন,
-"আগামী সপ্তাহে হলে কেমন হয়? তাহলে আর বেশি দেরিও হবে না।"

আতকিয়া শিকদার সঙ্গে সঙ্গেই সম্মতি জানিয়ে বললেন,
-"হুম। আগামী সপ্তাহেই অনুষ্ঠান করে বিয়ে হবে।"

জিনিয়া একটু অবাক হয়ে বলল,
-"এত তাড়াহুড়ো করে বিয়ের আয়োজন করা হবে?"

জুয়িন সবার আড়ালে জিনিয়াকে আলতো করে চিমটি কেটে নিচু স্বরে বলল,
-"চুপ থাক।"

জিনিয়া ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল। জুয়িনের এমন অধৈর্য ভাব দেখে তার মজা আরও বেড়ে গেল। সে কিছু না বলে চুপ করে থাকলেও মুখের হাসি লুকাতে পারল না।

জাকিয়া শিকদার এবার জিনিয়ার কথার জবাব দিয়ে বললেন,
-"তাড়াহুড়ো কিসের? আগামী সপ্তাহে বিয়ে হলে তো ভালোই হয়। এর মধ্যে শপিংটাও সেরে নেওয়া যাবে।"

তাঁর কথায় বাকিরাও সম্মতি জানালেন। এরপর বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। কে কী দায়িত্ব নেবেন, কী কী কেনাকাটা করতে হবে, সেসব নিয়েও কথা উঠল। বড়রা নিজেদের মধ্যে নানা পরিকল্পনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।

আর জুয়িন ও তাসিফা দুজনেই চুপচাপ বসে সবার কথা শুনছিল। মাঝেমধ্যে তাদের চোখাচোখি হচ্ছিল, আর প্রতিবারই দুজনের মুখে লাজুক হাসি ফুটে উঠছিল। আজকের সন্ধ্যাটা তাদের দুজনের জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

----

রাত আটটা বাজে। শিকদার বাড়ির ছাদে রাখা দোলনায় পাশাপাশি বসে আছে জুয়িন ও তাসিফা। তাসিফা জুয়িনের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। দুজনের দৃষ্টিই আকাশের দিকে। রাতের আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ দেখা যাচ্ছে। চারপাশে হালকা বাতাস বইছে। নিচের থেকে মাঝেমধ্যে মানুষের কথাবার্তা ও হাসির শব্দ ভেসে আসছে।

নিচে সবাই বিয়ের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। কে কী দায়িত্ব নেবে, কী কী কেনাকাটা করতে হবে, বিয়েতে কী কী আয়োজন করা হবে, এসব নিয়েই চলছে আলোচনা। বাড়ির প্রত্যেকেই বেশ আনন্দিত। বিশেষ করে দুই পরিবারের সম্মতি পাওয়ার পর থেকে সবার মধ্যে যেন নতুন এক উৎসাহ কাজ করছে। তবে জুয়িন ও তাসিফা যে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদে চলে এসেছে, তা কেউ জানে না।

দুজন বেশ কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল। তাসিফা মাঝেমধ্যে আকাশের চাঁদের দিকে তাকাচ্ছে, আবার কখনো জুয়িনের কাঁধে মাথা রেখেই চোখ বন্ধ করে থাকছে। আজকের দিনটা তার কাছে কতটা বিশেষ, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

অন্যদিকে জুয়িনও বেশ শান্ত হয়ে বসে আছে। সন্ধ্যার দিকে সবার সামনে যতই স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করুক, ভেতরে ভেতরে তার আনন্দেরও কমতি নেই। তাসিফাকে নিজের জীবনের অংশ করে পাওয়ার ইচ্ছেটা এবার সত্যিই পূরণ হতে চলেছে। মেয়েটিকে পাশে নিয়ে বসে থাকতে থাকতে তার মনে হচ্ছে, জীবনের অনেক না-পাওয়া আর অপেক্ষার পর অবশেষে সে নিজের কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে পেতে যাচ্ছে।

হঠাৎ নীরবতা ভেঙে তাসিফা মৃদু স্বরে বলল,
-"জানেন, আমার খুব ইচ্ছে ছিল আপনার জন্য লাল টুকটুকে বউ সাজব। অবশেষে সেই ইচ্ছেটা সত্যি হতে যাচ্ছে, জুয়িন ভাইয়া।"

জুয়িন তার দিকে তাকাল। তাসিফার মুখে মৃদু হাসি। কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে যে আনন্দ আর আবেগ মিশে ছিল, তা জুয়িনের চোখ এড়াল না। তবে শেষের সম্বোধনটা শুনেই তার মুখের ভাব বদলে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"উফ্, তাসিফা! জুয়িনের নামের সঙ্গে প্রতিবার ‘ভাইয়া’ জুড়ে দিস কেন? শুধু জুয়িন বলে ডাকতে পারিস না?"

তাসিফা এবার মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। তারপর দুষ্টু হেসে জবাব দিল,
-"না।"

জুয়িন একটু অবাক হয়ে বলল,
-"কেন? বিয়ের পরেও ভাইয়া বলবি নাকি?"

তাসিফা হেসে মাথা নাড়ল। তারপর বলল,
-"আপনাকে ভাইয়া ডাকতে আমার ভালো লাগে।"

জুয়িন বিরক্তির ভান করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। বলল,
-"আমার ভালো লাগে না। আজ থেকে আমাকে শুধু জুয়িন বলে ডাকবি।"

তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মুচকি হেসে বলল,
-"ডাকব, তবে আমার একটা শর্ত আছে।"

জুয়িন এবার তার দিকে ফিরে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
-"কী শর্ত?"

তাসিফা একটু ইতস্তত করল। তারপর জুয়িনের বাহুতে মুখ লুকিয়ে লাজুক স্বরে বলল,
-"আপনাকেও আমাকে ‘তুমি’ করে ডাকতে হবে। তাহলেই আমিও আপনার নামের পাশে আর ‘ভাইয়া’ যোগ করব না।"

তাসিফার কথা শুনে জুয়িন কিছুটা থমকে গেল। সে যেন কথাটা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছে না। কয়েক মুহূর্ত তাসিফার দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও নিশ্চিত হতে চাইল,
-"আমাকে তুমি করে ডাকতে হবে?"

তাসিফা এবার তার বাহুতে মুখ রেখেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ জানাল। মুখটা লুকিয়ে রাখলেও তার ঠোঁটের কোণে হাসি লেগে আছে।

জুয়িন মুচকি হেসে বলল,
-"ঠিক আছে, 'তুমি' করেই ডাকব।"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। চোখে বিস্ময় আর মুখে আনন্দের ছাপ। সে আবারও জানতে চাইল,
-"সত্যি?"

জুয়িন মাথা নাড়ল। তারপর তাসিফার দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মেয়েটির মুখে এমন খুশি দেখে তার নিজেরও ভালো লাগছে। অবশেষে সে মৃদু স্বরে ডাকল,
-"তাসিফা।"

তাসিফা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,
-"হুম।"

জুয়িন এবার এক হাত দিয়ে তাসিফাকে নিজের কাছে টেনে নিল। তাসিফা আগের মতোই তার কাঁধে মাথা রাখল। জুয়িন তার হাতটি ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর শান্ত, গভীর কণ্ঠে বলল,
-"তোমাকে নিজের জীবনে পেয়ে আমি যেন জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিটাই পেয়ে গেছি, প্রিয়তমা।"

তাসিফা কোনো উত্তর দিল না। শুধু জুয়িনের আরও একটু কাছে সরে এসে নিজেকে তার বাহুডোরে গুটিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুকরো তৃপ্তির হাসি।

—সমাপ্ত—

[ গল্পের এন্ডিং দেখে কেউ হতাশ হবেন না। আপনাদের জন্য সামনে একটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে। সেখানে আপনাদের সবটুকু ঘাটতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব, ইন শা আল্লাহ। এই পর্যন্তই ফেসবুকে এই গল্পের পথচলা। আমাকে এতটা ভালোবাসা দেওয়ার জন্য প্রত্যেককে অসংখ্য ধন্যবাদ। বিশ্বাস করুন, আমিও আপনাদের ভীষণ ভালোবাসি।  আজ থেকে আর কাউকে আমার গল্পের নতুন পর্বের জন্য দুই-তিন দিন ধরে অপেক্ষা করতে হবে না, বিরক্তও হতে হবে না। তবে একটা বিষয় ভেবে আমারও ভীষণ খারাপ লাগছে। সব কাজ শেষ করে ফিরে এসে জুয়িন, তাসিফা আর আমাদের সেই ভণ্ডপার্টিকে নিয়ে আর লিখতে পারব না। চরিত্রগুলোকে নিয়ে এতদিন লিখেছি, তাদের সঙ্গে একটা অভ্যাস তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই অভ্যাসের ইতি টানাটাও আমার জন্য সহজ নয়। সবশেষে, আমার এই গল্পের দীর্ঘ পথচলায় পাশে থাকার জন্য সবাইকে আবারও অনেক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 57 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন