#তুমি_কারো_নও
#লেখিকা_মিশু
----
জুয়িন গিয়ে রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিলো। দরজা লাগানোর শব্দে তাসিফা একবার সেদিকে তাকাল। তারপর শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
-"দরজা বন্ধ করছেন কেন?"
জুয়িনের মুখে হালকা হাসি ফুটে উঠল। সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"একজনকে আদর করে কেক খাওয়াবো, তাই।"
তাসিফার দৃষ্টি একবার ঘরের পাশের টেবিলের দিকে গেল। সেখানে জন্মদিনের কেকটি রাখা। আগের তুলনায় অর্ধেকেরও বেশি কেক কাটা হয়ে গেছে। সে আবার জুয়িনের দিকে তাকিয়ে বলল,
-"আমি খাবো না।"
জুয়িন তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
-"আমি কি বলেছি তোকে খাওয়াবো?"
তাসিফা কিছুটা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকাল।
-"তাহলে?"
জুয়িন এবার দাঁত বের করে হাসল। কণ্ঠে স্পষ্ট দুষ্টুমি মিশিয়ে বলল,
-"আমি আমার বউকে খাওয়াবো।"
তাসিফা বিরক্তির সঙ্গে শ্বাস ছাড়ল। জুয়িনের এমন কথাবার্তার সঙ্গে সে বেশ পরিচিত। তবুও প্রতিবারই লোকটার কথায় বিরক্তি প্রকাশ না করে পারে না।
-"এসব ঢং-টং আমার সামনে আর দেখাবেন না।"
জুয়িন কথার উত্তর না দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এল। তাসিফার সামনে এসে দাঁড়াতেই মেয়েটি সামান্য পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। জুয়িন তার অবস্থান থেকে নড়ল না। বরং ঠোঁটের কোণে হাসি ধরে রেখে তাকিয়ে রইল।
তাসিফা তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
-"কী হয়েছে?"
জুয়িন এবার কেকের প্রসঙ্গেই ফিরে গেল।
-"কেক খাবি না?"
-"না।"
তাসিফার সংক্ষিপ্ত উত্তর শুনে জুয়িনের হাসি আরও স্পষ্ট হলো। তবে কেক খাওয়ানোর ব্যাপারে তার নিজেরও একটা পরিকল্পনা ছিল।
সবার উপস্থিতিতে সে ইচ্ছে করেই তাসিফাকে কেক খাওয়ায়নি। জন্মদিনের আয়োজন, বন্ধুদের হৈচৈ আর সবার শুভেচ্ছার ভিড়ে তাসিফার সঙ্গে কাটানোর মতো আলাদা কোনো মুহূর্ত পাওয়া হয়নি। অথচ তার ইচ্ছে ছিল, নিজের হাতে তাসিফাকে কেক খাওয়াবে। খুব সাধারণ একটা মুহূর্ত, কিন্তু সেটুকুতে অন্য কারও উপস্থিতি থাকবে না। তাই সবার সামনে কেক খাওয়ানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সে অপেক্ষা করেছে।
জুয়িন পাশের টেবিল থেকে কেকের একটি টুকরো কেটে নিল। তারপর তাসিফার সামনে এসে সেটি তার দিকে এগিয়ে ধরল।
-"আমার ইচ্ছে ছিল, বউকে নিজের হাতে একটু নিরিবিলিতে কেক খাওয়াবো। সবার সামনে তো খাওয়ানো যেতই, কিন্তু তাতে এই মুহূর্তটার বিশেষত্ব থাকত না।"
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িনের কথায় বাড়তি কোনো আবদার ছিল না, ছিল কেবল নিজের ছোট্ট ইচ্ছেটুকু প্রকাশ করার সরলতা।
তাসিফা আর আপত্তি করল না। জুয়িনের হাত থেকে কেকের টুকরোটা নিয়ে মুখে পুরে নিল।
জুয়িন তৃপ্তির হাসি হাসল। তার কাছে মুহূর্তটা হয়তো খুব সাধারণ, কিন্তু এই সামান্য আয়োজনের মধ্যেই সে নিজের আনন্দ খুঁজে পেয়েছে।
তাসিফা কেক খাওয়া শেষ করে কিছুক্ষণ জুয়িনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই এগিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
জুয়িন সামান্য বিস্মিত হলো। পরক্ষণেই তার মুখে কোমল হাসি ফুটে উঠল। সেও তাসিফাকে স্নেহভরে জড়িয়ে নিল।
তাসিফা জুয়িনের বুকে মাথা রেখে মৃদু স্বরে বলল,
-"শুভ জন্মদিন, জুয়িন ভাইয়া।"
জুয়িনের মুখের হাসি আরও গভীর হলো। সে তাসিফার মাথায় হাত রেখে বলল,
-"ধন্যবাদ।"
কথাটা বলেই সে তাসিফাকে কিছুটা সময় নিজের কাছে রাখল। জন্মদিনে পাওয়া অসংখ্য শুভেচ্ছার মধ্যে এই ছোট্ট শুভেচ্ছাটুকু তার কাছে আলাদা হয়ে রইল। কারণ, তাসিফার কাছ থেকে পাওয়া প্রতিটি ছোট্ট অনুভূতিকেই সে নিজের মতো করে যত্নে রাখতে চায়।
কিছুক্ষণ পর তাসিফা নিজেই জুয়িনের কাছ থেকে সরে এল। ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বলল,
-"আচ্ছা, আমি এখন যাচ্ছি।"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
-"কেন?"
-"এভাবে এতক্ষণ থাকলে সবাই খারাপ ভাববে।"
জুয়িনের মুখে আবারও সেই পরিচিত হাসি ফুটে উঠল।
-"তো?"
তাসিফা এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তো মানে? আপনি বুঝবেন না।"
জুয়িন কিছু বলল না। শুধু তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। মেয়েটার এই অকারণ তাড়াহুড়ো তার অজানা নয়। তবুও সে আর কথা বাড়াল না।
তাসিফা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দরজা খোলার আগে একবার পেছন ফিরে জুয়িনের দিকে তাকাল। তারপর মৃদু হেসে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
জুয়িন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দরজাটা আবার বন্ধ হওয়ার পরও তার দৃষ্টি কিছুক্ষণ সেদিকেই স্থির হয়ে থাকল।
------
তাসিফা জুয়িনের রুম থেকে বেরিয়ে জিনিয়ার রুমের দিকে চলে এল। আজ রাতে সে এখানেই ঘুমাবে। অন্যদিকে, বড়দের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে গেস্ট রুমে।
জিনিয়ার রুমে ঢুকতেই তাসিফা দেখল, সবাই সেখানে বসে আছে। মনে হলো, তার জন্যই অপেক্ষা করছিল। তাকে দেখামাত্র জাহিদের মুখে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে তাসিফার দিকে তাকিয়ে মজা করে বলল,
-"দরজা লাগিয়ে কেক খাওয়ানো হচ্ছিল বুঝি?"
কথাটা শুনে তাসিফা থতমত খেয়ে গেল। কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে না পেরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার এমন অবস্থা দেখে বাকিরা হেসে উঠল।
জিনিয়া হেসে গলা পরিষ্কার করার ভঙ্গিতে বলল,
-"এহেম এহেম!"
আরাফও কম যায় না। সে মুচকি হেসে বলে উঠল,
-"ভালোপাসা।"
তাসিফা এবার অপ্রস্তুত ভাবটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে বলল,
-"আরে না না, তেমন কিছু না। আমি কেক খাইনি।"
জিসা হেসে বলল,
-"আপু, তোর ঠোঁটের কোণে কেকের ক্রিম লেগে আছে। আর তুই বলছিস, কেক খাসনি?”
কথাটা শুনে তাসিফা দ্রুত হাত তুলে ঠোঁটের কোণে হাত বুলিয়ে নিল। সত্যিই সেখানে সামান্য ক্রিম লেগে ছিল। সেটা মুছে নিয়ে সে সবার দিকে তাকাল। মুখে তখন বেশ অপ্রস্তুত একটা হাসি।
-"না মানে, আসলে..."
তাসিফার কথা শেষ হওয়ার আগেই সবাই আবার হেসে উঠল। জাহিদ মজা করে বলল,
-"আচ্ছা আচ্ছা! আসল কথা কী, আর নকল কথাই বা কী, সেসব শুনতে চাই না আমরা।"
সবাইকে এভাবে হাসতে দেখে তাসিফা আর কিছু বলল না। চুপচাপ নিজের হাসিটুকু ধরে রাখার চেষ্টা করল। এদিকে জাহিদও আর তাকে বিব্রত না করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল।
-"আচ্ছা, এসব কথা বাদ দেই। তাসিফা, তুই তোর বন্ধুদের আগামীকাল সন্ধ্যায় চলে আসতে বলিস। আর জুয়িনের বন্ধুদের আমি বলে দেব।"
তাসিফা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
এরপর সবাই মিলে আরও কিছুক্ষণ গল্পগুজব করল। জন্মদিনের পরদিনের আয়োজন নিয়ে টুকটাক কথাও হলো। কে কখন আসবে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করল তারা। তাসিফাও তার বন্ধুদের আসার বিষয়টি নিশ্চিত করার কথা জানাল।
এভাবে গল্প করতে করতেই বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। একসময় জাহিদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, সে নিজের রুমে যাচ্ছে। আরাফও তার সঙ্গে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে দুজনেই বাকিদের গুড নাইট জানিয়ে গেল।
অন্যদিকে, জিসা আর আকসা জানাল, তারা আজ রাতে জিনিয়া আর তাসিফার সঙ্গেই ঘুমাবে। তাই তাদের আর নিজেদের রুমে যাওয়ার তাড়া নেই। চারজন মিলে একই রুমে থাকবে, এমন সিদ্ধান্তে সবাই খুশিই হলো।
জাহিদ আর আরাফ চলে যাওয়ার পর জিনিয়ার রুমে আবার গল্প শুরু হলো। রাতের এই ছোট্ট আড্ডাটা যেন কারও শেষ করতে ইচ্ছে করছিল না।
-----
পরদিন সন্ধ্যায় ভণ্ডপার্টি আবারও শিকদার বাড়িতে এসে হাজির হলো। আজ তাদের সঙ্গে এসেছে রিদ ও সিয়ামও। গত রাতের মতো আজও সবার আসার পেছনে বিশেষ একটা কারণ রয়েছে। জুয়িনের জন্মদিন উপলক্ষে বাড়িতে ছোটখাটো আয়োজন করা হয়েছে। সেই আয়োজনে যোগ দিতেই তাদের আসা। প্রত্যেকের হাতেই জুয়িনের জন্য আনা উপহার। সবাই নিজেদের পছন্দমতো উপহার কিনেছে। এখন শুধু সেগুলো জুয়িনের হাতে তুলে দেওয়ার অপেক্ষা।
এদিকে, জুয়িনের কাজিনরা ছাদে আয়োজন নিয়ে বেশ ব্যস্ত। ছাদের একপাশে সুন্দর করে মাদুর বিছানো হচ্ছে। তার ওপর খাবার সাজিয়ে রাখার প্রস্তুতি চলছে। একে একে পরিবেশন করা হচ্ছে কেক, সমুচা, চানাচুর, মিটবল, সসেজ, নুডলস, পিজ্জা, মোজারেলা স্টিক ও নাগেটস। সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সস ও পানীয়। সব মিলিয়ে ছোটদের জন্য বেশ ভালো আয়োজন করা হয়েছে। কেউ খাবার সাজাচ্ছে, কেউ মাদুরের চারপাশটা গুছিয়ে নিচ্ছে। কাজের ফাঁকেই চলছে হাসি-ঠাট্টা আর গল্প।
অন্যদিকে, তাসিফাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জুয়িনকে ছাদে নিয়ে আসার। তাই সে নিচে চলে গেল। আর ভণ্ডপার্টির বাকি সদস্যরা রিদ ও সিয়ামকে নিয়ে ছাদেই থেকে গেল। তারা কাজিনদের সঙ্গে গল্প করতে করতে আয়োজনের অপেক্ষা করছে।
আজকের আয়োজনটা মূলত ছোটদের জন্যই। তাই ছাদে জুয়িনের কাজিন ও বন্ধুরা মিলে আনন্দ করবে। বড়রা নিচে নিজেদের মতো গল্পগুজবে মেতে আছেন। বাড়ির পরিবেশও বেশ প্রাণবন্ত। জুয়িনের জন্মদিন বলে সবার মধ্যেই আলাদা একটা আনন্দ কাজ করছে।
জুয়িনের জন্মদিন উপলক্ষে আফসানা শিকদার আয়রা বেগম ও আলমগীর আলমকেও আজ আর বাড়ি ফিরতে দিলেন না। বরং সবাই মিলে তাঁদের থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আফসানা শিকদার চাচ্ছিলেন, এতদিন পর সবাই একসঙ্গে হয়েছেন, তাই এই আনন্দের দিনে যেন কেউ তাড়াহুড়ো করে চলে না যান। শেষ পর্যন্ত তাঁদেরও থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
-----
তাসিফা ছাদ থেকে নেমে জুয়িনের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। ভেতরে ঢোকার আগে দরজায় দুবার নক করল। তবে ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজাটা সামান্য ঠেলে খুলে ভেতরে প্রবেশ করল।
রুমে ঢুকেই তার চোখ পড়ল বিছানায় বসে থাকা জুয়িনের দিকে। জুয়িন তখন ল্যাপটপে কাজ করছিল। ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে বেশ মনোযোগ দিয়েই কাজ করছিল সে। তাসিফার উপস্থিতি টের পেয়ে একসময় মুখ তুলে তাকাল।
তাসিফাকে দেখে জুয়িনের কাজের গতি থেমে গেল। মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশে বসে পড়ল। তাসিফার এমন চুপচাপ বসে পড়া দেখে জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। এরপর ল্যাপটপটা বন্ধ করে নিজের পাশে রেখে জিজ্ঞেস করল,
-"কী ব্যাপার?"
তাসিফা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
-"ছাদে চলুন। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।"
জুয়িন আগে থেকেই জানে, আজ তার জন্মদিন উপলক্ষে ছাদে ছোটখাটো আয়োজন করা হয়েছে। কাজিনরা সকাল থেকেই এ নিয়ে ব্যস্ত। তাই তাসিফার কথায় নতুন করে কিছু জিজ্ঞেস করল না।
তাসিফা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। যেন কিছু একটা বলার জন্য কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। জুয়িনও তার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছিল। একসময় তাসিফা একটু এগিয়ে এসে ডাকল,
-"শুনুন না!"
জুয়িন সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর দিল,
-"বলুন না।"
তাসিফা এবার নিজের ওড়নার এক কোণ আঙুলে পেঁচাতে শুরু করল। কিছুটা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল,
-"আমার কাছ থেকে আপনার কী গিফট চাই?
জুয়িন তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর একদম নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
-"তোকে চাই।"
কথাটা শুনে তাসিফার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে কিছুটা লজ্জা আর বিরক্তি মেশানো ভঙ্গিতে বলল,
-"আরে ধুর! ফাজলামো করবেন না। সত্যি করে বলুন না, কী চাই আপনার?"
জুয়িন মৃদু হাসল। তাসিফার কথায় সে বেশ মজা পাচ্ছে। তবুও এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,
-"আমার সত্যিই কিছু লাগবে না।"
তাসিফা তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িনের কথাটা শুনে সে যেন পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারল না। কিছুক্ষণ পর একটু মন খারাপের সুরে বলল,
-"না, আমি আপনাকে কিছু দেব। সেটা তোলা থাকুক। পরে দেব।"
জুয়িন এবার তার দিকে একটু ভালো করে তাকাল। তাসিফা এবার নিজের কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আবার বলল,
-"আসলে আজ বাড়ি থেকে বের হতে পারিনি। তাই আপনার জন্য কিছু কিনতেও পারিনি। ভেবেছিলাম, আপনার জন্মদিনে নিজের পছন্দমতো কিছু একটা দেব। কিন্তু আর হয়ে উঠল না। সরি।"
শেষের কথাটা বলার সময় তাসিফার মুখটা কিছুটা মলিন হয়ে গেল। অন্যরা সবাই জুয়িনের জন্য উপহার নিয়ে এসেছে, অথচ সে কিছুই দিতে পারেনি। বিষয়টা তার মনে একটু খচখচ করছিল। যদিও জুয়িনের কাছে উপহার না থাকার বিষয়টি মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয়, তবুও তাসিফা নিজের মতো করে তাকে কিছু দিতে চেয়েছিল।
জুয়িন তাসিফার মুখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। এরপর একটু এগিয়ে এসে আলতো করে তার গাল টেনে বলল,
-"আমার সামনে একদম মন খারাপ করবি না। আমি কি বলেছি, আমার কিছু গিফট চাই? আমার কাছে তো সবচেয়ে মূল্যবান উপহারটাই আছে। আর সেটা হলি তুই। তাহলে আমার আর কী চাই বল?"
তাসিফা এবার হেসে ফেলল। জুয়িনের এমন কথাগুলো তার ভীষণ ভালো লাগে। মানুষটা কখনো কখনো এমনভাবে কথা বলে যে, তার ওপর অভিমান করে থাকাটাও কঠিন হয়ে পড়ে। সামান্য কয়েকটা কথাতেই তার মন ভালো করে দেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে জুয়িনের।
তাসিফা জুয়িনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর মনে মনে ঠিক করল, জন্মদিন উপলক্ষে তাকে একটা সুন্দর উপহার দিতেই হবে। আজ দিতে পারেনি তো কী হয়েছে, পরে দেবে। নিজের পছন্দমতো কিছু একটা কিনে জুয়িনকে চমকে দেবে সে।
জুয়িন তাসিফার মুখের হাসিটা দেখে আশ্বস্ত হলো। এরপর আর এ নিয়ে কথা বাড়াল না। তাসিফাও আর উপহারের প্রসঙ্গ তুলল না। বরং ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,
-"এবার চলুন। সবাই তো এতক্ষণে আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে গেছে।"
জুয়িন হালকা হেসে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। পাশ থেকে নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে তাসিফার দিকে তাকাল। তাসিফাও উঠে দাঁড়িয়েছে। দুজন একসঙ্গে রুম থেকে বেরিয়ে এল।
এরপর পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে ছাদের দিকে এগিয়ে গেল দুজন।
-----
ছাদে এসে তাসিফা দেখল, সবাই ইতিমধ্যে সেখানে জড়ো হয়েছে। আয়োজনের সব প্রস্তুতিও শেষ। ছাদের চারপাশে ছোট ছোট লাইট জ্বলছে। সেগুলোর আলোয় পুরো ছাদটা বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। একপাশে খাবারগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মাঝখানে বিছানো মাদুরের চারপাশে সবাই নিজেদের মতো বসার জায়গা করে নিচ্ছে।
জুয়িন ছাদে পা রাখতেই রিদ ও সিয়াম এগিয়ে এল। তাদের সঙ্গে কোলাকুলি করল সে। দুজনই জুয়িনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাল। জুয়িনও হেসে তাদের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলল। এরপর ভণ্ডপার্টির সবার সঙ্গে দেখা করল।
সবাই মিলে মাদুরের ওপর গোল হয়ে বসে পড়ল। মাঝখানে রাখা হয়েছে কেক। জুয়িন বসার আগে একবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। সবাইকে একসঙ্গে দেখে তারও বেশ ভালো লাগছিল। এত আয়োজনের মধ্যে আলাদা করে কিছু বলার ছিল না তার। তবে বন্ধু ও কাজিনদের এই ছোট্ট আয়োজনটা সে বেশ উপভোগ করছিল।
কেকের কয়েকটি এস্থেটিক ছবি তুলে নিল জুয়িন। এরপর পুরো আয়োজনটা ক্যামেরাবন্দি করল। সবাই মিলে একসঙ্গে বেশ কয়েকটি ছবিও তুলল। কেউ বসে, কেউ আবার একটু ভিন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলল। ছবি তোলা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হাসি-ঠাট্টাও চলল। একবার ছবি ভালো না হওয়ায় আবারও সবাইকে জায়গামতো বসতে হলো। তাসিফাও বাকিদের সঙ্গে ছবি তুলল। মাঝে একবার জুয়িনের পাশেও বসেছিল সে।
ছবি তোলা শেষ হলে সবাই আবার আগের জায়গায় বসে পড়ল। এরই মধ্যে ইয়াশ হেসে বলল,
-"জুয়িন ভাই, সব সময় তো আপনার গান শুনি। আজ আপনার জন্মদিনে একটা গান শোনাবেন না?"
কথাটা শুনে বাকিরা হৈহৈ করে উঠল। কেউ ইয়াশের কথায় সায় দিল, কেউ আবার জুয়িনকে গান গাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে লাগল। সিয়ামও সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
-"শালা, একটা গান শোনা তো।"
জুয়িন সিয়ামের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। তবে কিছু বলার আগেই জাহিদ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে বলল,
-"ওয়েট! আমি জুয়িনের রুম থেকে গিটারটা নিয়ে আসছি।"
কথাটা বলেই সে নিচে চলে গেল।
জুয়িন বসে রইল। গান গাইতে তার এমনিতেই ভালো লাগে। বিশেষ করে পরিচিত মানুষদের সামনে গিটার হাতে বসে গান ধরতে তার আলাদা আনন্দ হয়। তাই সবার আবদারে না করার কোনো কারণ খুঁজে পেল না। বরং মনে মনে ভাবল, অনেক দিন পর সবার সঙ্গে এমন একটা সন্ধ্যা কাটছে। সময়টা উপভোগ করাই ভালো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহিদ হাতে গিটার নিয়ে ছাদে ফিরে এল। সে জুয়িনের সামনে এসে গিটারটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"নে, এবার শুরু কর।"
জুয়িন মৃদু হেসে গিটারটা হাতে নিল। নিজের বসার জায়গাটা একটু ঠিক করে নিয়ে গিটারের তারের ওপর আঙুল ছোঁয়াল। প্রথমে কয়েকবার টুংটাং শব্দ তুলে সুর মিলিয়ে নিল সে। আশপাশে বসে থাকা সবাইও ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেল।
জুয়িন একবার সবার দিকে তাকাল। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল তাসিফার ওপর। আচমকা দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। তাসিফা চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে ছিল। জুয়িনের চোখে চোখ পড়তেই সে মৃদু হাসল। জুয়িনও ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল।
এরপর গিটারের তারে আঙুল বুলিয়ে সুর তুলল সে। ধীরে ধীরে সেই সুর ছড়িয়ে পড়ল পুরো ছাদে। সবাই মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। জুয়িন গিটারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাইতে শুরু করল,
"চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারো হও
পাবে না কেউ তোমাকে, #তুমি_কারো_নও
চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারো হও
পাবে না কেউ তোমাকে, তুমি কারো নও
তুমি তো আমার-ই, জানো না হো-ও-ওও
এ হৃদয় তোমার-ই
ও-হো-ওও
তোমাকে ছাড়া আমি, বুঝি না কোনো কিছু যে আর
পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আ-মার
তোমাকে ছাড়া আমি, বুঝি না কোনো কিছু যে আর
পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আ-মার।"
জুয়িনের গান শেষ হতেই ছাদজুড়ে হৈহৈ পড়ে গেল। সবাই একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল। রিদ আর সিয়াম দুষ্টু হাসি দিয়ে জুয়িনের পিঠে চাপড় মারল। অন্যদিকে ইয়াশ আর সাদও তাকে খোঁচা দিতে ছাড়ল না। দুজন একসঙ্গে বলে উঠল,
-"ওওওওও! জুয়িন ভাই, কারও কথা ভেবে গানটা গাইলেন নাকি?"
তাসনিম আর জিসা হেসে একে অপরের দিকে তাকাল। তারপর তাসনিম মজা করে বলল,
-"মনে হয় ভালোবাসা।"
জিসাও তার কথায় সায় দিল। আরাফ বলে উঠল,
-"সেই, সেই।"
জাহিদ তো জুয়িনের দিকে তাকিয়ে হেসেই চলেছে। তার হাসি দেখে মনে হচ্ছে, সুযোগ পেয়ে আজ আর জুয়িনকে ছাড়বে না। অন্যদিকে তাসিফার অবস্থা বেশ করুণ। সবার এমন কথাবার্তায় সে লজ্জায় যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছে। মুখে কিছু বলার সাহসও পাচ্ছে না। চুপচাপ বসে রইল সে।
সবাইকে এভাবে জুয়িনকে নিয়ে মজা করতে দেখে জিনিয়া হেসে বলল,
-"আচ্ছা আচ্ছা, হয়েছে। এবার থাম তোরা।"
তার কথায় সবাই আবার হেসে উঠল। তবে জুয়িনও যে একেবারে চুপ করে থাকবে, তা নয়। এবার সে সুযোগ বুঝে ইয়াশকে ধরল। মুচকি হেসে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"ইয়াশ, এবার তুমি একটা গান শোনাও তো! তোমার গলায় গান শুনতে ইচ্ছে করছে।"
জুয়িনের কথা শুনে ইয়াশ যেন আকাশ থেকে পড়ল। মুহূর্তেই তার মুখে লজ্জার ভাব ফুটে উঠল। সে কিছু বলার আগেই তাসিফা, সাদ আর তাসনিম তাকে ঘিরে ধরল। সবাই মিলে তাকে গান গাওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে লাগল। তাদের দেখাদেখি বাকিরাও ইয়াশকে অনুরোধ করতে শুরু করল।
ইয়াশ এবার কিছুটা অসহায় ভঙ্গিতে বলল,
-"আরে, আমি তো গান গাইতে জানি না।"
জুয়িন ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
-"তবুও গাও তুমি। শুনি কেমন গাও।"
এবার আর ইয়াশের কোনো অজুহাত কাজে এল না। এতগুলো মানুষের সামনে আর কতক্ষণ না করবে! অগত্যা রাজি হতেই হলো তাকে।
জুয়িন নিজের হাতে থাকা গিটারটা ইয়াশের দিকে এগিয়ে দিল। ইয়াশ সেটি হাতে নিয়ে একটু ইতস্তত করে কোলে রাখল। তারপর একবার চারপাশে বসে থাকা সবার দিকে তাকাল। এদিকে সাদ, তাসনিম আর তাসিফা নিজেদের ফোন বের করে ভিডিও করার প্রস্তুতি নিল। তিনজনই ক্যামেরা চালু করে ইয়াশের দিকে তাক করল। তাদের এমন প্রস্তুতি দেখে ইয়াশ আরও একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
তবে এবার আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে গিটারের দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর চোখ বন্ধ করল। একসময় গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল ইয়াশ। টুংটাং শব্দে ছড়িয়ে পড়ল মৃদু সুর। সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে গান ধরল,
"যে দেশে চেনা জানা মানুষ কোনো নাই
ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই
যে দেশে শাসন বারণ সোনার খাঁচা নাই
ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই
পিয়ারে জিয়ারে কথা শুনে না
হিয়া টারে কি বলে বুঝাই..
যে দেশে নয়ন বলে স্বপন দেখে যাই
ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই
হাই..ইচ্ছে করে তোরে নিয়ে যাই।"
#চলবে
[ আর মাত্র একটি পর্ব বাকি। এরপরই সমাপ্তি ঘটবে "তুমি কারো নও" গল্পটির। দেখতে দেখতে দীর্ঘ এই পথচলা শেষের দিকে চলে এসেছে। গল্পটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রতিটি স্মৃতি আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। ]