আরিশের সেই বজ্রকণ্ঠের হুঙ্কারে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল। গার্ডদের হাতের শিকলগুলোও যেন একবার কেঁপে উঠল। আরিশ রক্তমাখা শার্ট গায়ে নিয়েই ম্যানেজারের দিকে এক পা এগিয়ে গেল। তার চোখে তখন সেই অবুঝ কিশোর নেই, বরং ফিরে এসেছে সেই কুখ্যাত সোশিওপ্যাথ, যার প্রতিটি নিঃশ্বাসে লুকিয়ে থাকে আতঙ্ক।
"নো ওয়ে সি ইজ গোয়িং টু বি ফায়ার্ড!!" আরিশ দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
জিদান কাস্পিন আরিশের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। আরিশকে রাগানো মানে নিজের মৃত্যু পরোয়ানা লিখে ফেলা।
রাত তখন প্রায় বারোটা। বৃষ্টির শব্দে মুখর হয়ে আছে ‘তারাফদার ভিলা’র আঙিনা। ফারহা নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি, যা অনেকক্ষণ আগেই ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে গেছে। বিকেলে ঘটে যাওয়া সেই বীভৎস দৃশ্যটা বারবার তার চোখের সামনে ভাসছে। আরিশ যেভাবে ওই লোকটিকে মা*রছিল, সেটা কোনো সাধারণ রাগ ছিল না, কিন্তু কিসের রাগ? লোকটিকে কি আরিশ চিনে?
ফারহা নিজেকে এক বাগানে আবিষ্কার করলো। কিভাবে আসলো সে বাগানে তা তার মনে নেই। সে এই গভীর জঙ্গল থেকে পালানোর জন্য দৌড়াতে লাগলো। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। আশপাশের শেয়াল এবং হিং*স্র প্রাণীরা ডাকতে শুরু করেছে।
হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন ফারহার মুখ চে*পে ধরলো। ফারহা সাথে সাথে অজ্ঞা*ন হয়ে পড়লো।
মুখে পানির ছিটেফুটো পড়লে ফারহার জ্ঞান ফেরে। নিজেকে বা*ধা এবং মাটিতে বসে থাকা অবস্থায় পেলো। তার সামনে তার মামা আবুল মঞ্জুর, ছোট ভাই ইসতিয়াক তারাফদার সহ আরো কয়েকজনকে দেখতে পেলো অজ্ঞা*ন অবস্থায় । ফারহার চোখে মুখে এক ভয়ের ছাপ ফুটে উঠলো। সামনে পায়ের উপর পা তুলে চেয়ারে বসে আছে আরিশ এরহান, মুখে বাঁকা হাসি। পেছনে মাস্ক পরিহিত যুবক দাঁড়িয়ে আছে। অন্ধকারের কারণে চেহারা দেখা যাচ্ছে না।
আরিশ অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো,
"এখন আপনার সামনে পুরো আপনার পরিবারকে খু*ন করা হবে। এরপর আপনাকে।"
আরিশের অট্টহাসি ফারহার কাছে বিষাক্ত এবং খুব বিচ্ছিরি শোনাচ্ছে।
"আমাকে মে*রে ফেলুন তবে আমার বাবাকে নয়।"
আরিশ ফারিহাকে কোলে তুলে জায়গাটির বাহিরের রাস্তার চেয়ারে বসিয়ে দিলো। আরিশ মাস্ক পরিহিত অজ্ঞাত লোকটির থেকে একটি লা*ইটার নিয়ে পুরো ঘর জ্বা*লিয়ে দিয়ে ফারহার সামনে চেয়ার টেনে বসে উচ্চস্বরে হাসতে লাগলো। যেন কোনো পিশা*চ এই মাত্র কোনো খাবার খেয়ে এসেছে। ফারহা চোখ খিচে বসে আছে। এখন যে তার পালা। হঠাৎ পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এলো,
"আরিশ, ওকে এখন মা*রিস না। মানসিক খেলায় তাকে মা*রতে হবে।"
ফারহা চোখ খুলে তাকালে কাউকে দেখতে পেলো না। কিন্তু সুরটি চেনা চেনা লাগছে তার কাছে। আরিশ ফারহার বাঁধন খুলে দিলো। কিন্তু ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ঘরটি জ*লে ছা*ই হয়ে গিয়েছে।
আগুনের লেলিহান শিখাগুলো আকাশের বুক চিরে উপরে উঠছে। ফারহা অসার হয়ে বসে আছে রাস্তার ধারের সেই জরাজীর্ণ চেয়ারটায়। তার চোখের সামনে তার পরিবার, তার আপনজনরা ওই আগু*নের কুণ্ডলীতে হারিয়ে গেল, অথচ তার চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানিও বেরোচ্ছে না। অতিরিক্ত শোক মানুষকে পাথর করে দেয়, ফারহা এখন সেই পাথরের প্রতিমূর্তি।
আরিশ তার খুব কাছে এসে নিচু হয়ে বসল। আগু*নের র*ক্তিম আভা আরিশের মুখে পড়ে তাকে সত্যিই কোনো নরকের পিশা*চের মতো দেখাচ্ছে। সে ফারহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
"কেমন লাগছে ডক্টর? আপনার থেরাপিতে কি এই জ্বালা মেটানোর কোনো ওষুধ আছে?"
ফারহা কোনো উত্তর দিল না। তার কান তখনো সেই পরিচিত কণ্ঠস্বরটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। কে সেই ব্যক্তি? যে আরিশকে হুকুম দিচ্ছিল?
এরপরে ফারহার আর কিছু মনে নেই। নিজেকে আবিষ্কার করলো একটি দীর্ঘ বিছানায়। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসলো সে। সামনে বসে আছে আরিশ। মুখে তৃপ্তির হাসি। ফারহা কিছু বুঝতে পারলো না আরিশের ভঙ্গিমা দেখে। আরিশ ডান পাশে তাকিয়ে চোখের ইশারায় একটি যুবককে কিছু একটা যেন বললো। বোধহয় আরিশের বডিগার্ড। যুবকটি সাথে সাথে দুটি লা*শ নিয়ে আসলো। ফারহা বেডশীট খামচে ধরলো আতং*কে। সে যেটি ভাবছে তা নয় তো? আরিশ লা*শগুলোর কাপড় স*রিয়ে নিলো। ফারহা চোখ খিচে বসে আছে। আরিশ লা*শ দুটিকে সে অবস্থায় ফেলে রেখে ফারহার সামনে গেলো। ফারহা চিবুক শ*ক্ত করে চে*পে ধরে বললো,
"চোখ খুলুন, নাহয় আরো ভয়ং*কর কিছু করতে বাধ্য হবো। আশা করি বাধ্য করবেন না আমায়।"
ফারহা বুঝতে পেরে চোখ খুললো। ভয়ে সারা শরীর হিম হয়ে আসছে। হাত ও পা ঠান্ডা বরফের মতো হয়ে আছে। আরিশ ঠান্ডা কণ্ঠে বললো,
"একবার যদি চোখের পল্লব ঝাপটান তাহলে আর ওয়ার্নিং দেয়া হবে না।"
আরিশ ফারহার চিবুক ছেড়ে আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেলো।
"সাকিব, ছু*রি দে।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটি ছু*রি দিলো আরিশের হাতে। আরিশ ছু*রি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখছে। যেন তা ধার আছে কিনা তা দেখছে। এরপর আর কিছু না ভেবে জোরে আঘা*ত করে বসলো প্রথম লা*শটির বুকে। এরপরে পেটে, অতঃপর লিভার সাইডে আঘা*ত হান*লো আরিশ। ফারহা চোখ খিচতেই যাবে তার আগেই কানে প্রতিধ্বনি হলো, "চোখের পল্লব ঝাঁপটালে আরো ভয়ং*কর কিছু করে বসবো।" ফারহার ইচ্ছে হচ্ছে মাটি ছেদ করে মাটির ভেতরে ঢুকে যেতে। একটি একটি করে বডি পার্ট*স বে*র করছে আরিশ। হৃদপি*ন্ড, কলি*জা, লিভা*র বের করে এনে ফারহার সামনে ধরে নিঃশব্দে হাসলো আরিশ।
"প্রত্যেকদিন এমন খু*ন আপনার সামনে করা হবে মিস ফারহা।" মিস ফারহা শব্দটি আরিশ তাচ্ছিল্লের কণ্ঠে বললো।
আরিশের হাতের সেই রক্তা*ক্ত হৃৎপি*ণ্ডটা তখনও যেন ধকধক করছে। ফারহার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে, পাকস্থলী উল্টে বমি আসতে চাইছে, কিন্তু আরিশের সেই শীতল চোখের শাসনে সে পাথরের মতো স্থির হয়ে আছে।
"জানেন ডক্টর," আরিশ তার রক্ত*মাখা আঙুল দিয়ে ফারহার গালের ওপর একটা লা*ল দা*গ টেনে দিল, "মানুষের শরীরের ভেতরে ঘৃণা আর ভালোবাসা একই লাল রঙের হয়ে থাকে। কিন্তু যখন এগুলো বের করে আনা হয়, তখন শুধু প*চা মাং*সের গন্ধ পাওয়া যায়। আপনার ভেতরের গন্ধ*টা কেমন হবে?"
ফারহা কাঁপাকাঁপা গলায় শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করতে পারল, "কেন?"
আরিশ আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। সে ছু*রিটা বিছানার চাদরে মুছে নিয়ে জানালার দিকে ফিরে তাকাল। বাইরে তখনো বৃষ্টির তাণ্ডব চলছে। সে শান্ত গলায় বলল, "সব প্রশ্নের উত্তর নেই ফারহা।"
বিছানার চাদরে ছিটেফোঁটা তাজা র*ক্ত লেগে আছে। মেঝেতে রক্তে*র বন্যা বসেছে।
আরিশ কক্ষ ত্যাগ করলো। ফারহা নিজের ফোন খুঁজতে থাকে। এক সময় বালিশের নিচে পেয়েও যায়। দ্রুত পুলিশের নম্বরে কল দিলো ফারহা। ৫ মিনিটের মধ্যে পুলিশের দল এসে হাজির হলো।
পুলিশের সাইরেনের শব্দে চারপাশের নিস্তব্ধতা খানিকটা বিদীর্ণ হলো, কিন্তু ফারহার বুকের ভেতরের ধকধকানি থামল না। পুলিশ যখন পুরো ঘর তল্লাশি করছিল, ফারহা তখনো মেঝেতে জমাট বাঁধা র*ক্তের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মস্তিষ্কে শুধু একটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল—আরিশ কি সত্যিই পালিয়ে গেছে, নাকি সে কোনো বড় ফাঁদ পেতেছে?
ইনস্পেক্টর রাজিব ফারহার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
"মিস ফারহা, আরিশকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ঘরের সব সিসিটিভি ক্যামেরা ঠিক ৫ মিনিট আগে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কেউ একজন ভেতর থেকেই ওকে সাহায্য করছে।"
আরিশকে পুরো ঘর খুঁজেও পাওয়া যায়নি। ফারহার আতঙ্ক আরো বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ লোকেশন ট্র্যাক করে সেইদিকে পৌছালো। এমনিতেও আরিশের নামে অনেক গুলো কেস আছে। কিন্তু আরিশ মানসিকভাবে অসুস্থ হওয়ার কারণে তাকে জেলে ঢুকানো হয়নি। কয়েকদিন আগেও একটি কেস ধরা পড়েছে আরিশের নামে। আরিশ হাসপাতালের দুজনকে নিশ্বং*শ ভাবে হ*ত্যা করে পালিয়েছে হাসপাতাল থেকে মধ্যরাতে। হাত মুখ বেঁ*ধে হ*ত্যা করেছে যাতে আওয়াজ করতে না পারে।
ফারহার মনে হলো, আরিশের হাত পাকা। আর বুদ্ধিমত্তার পাকা খেলোয়াড় আরিশ। পুলিশ আরিশকে খুঁজতে যে লোকেশনে গিয়েছে, সেটা হয়তো আরিশের কোনো নতুন চাল। সে দ্রুত ইনস্পেক্টরকে ফোন করার চেষ্টা করল, কিন্তু নেটওয়ার্ক জ্যাম। ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের আলোগুলো একবার জ্বলে উঠে নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ফারহা অনুভব করল, তার ঠিক পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার ঘাড়ের ওপর কারো তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে।
ফারহা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শক্ত একটা হাত তার মুখ চেপে ধরল। সেই পরিচিত ঘ্রাণ—ক্রিড অ্যাভেন্টাস পারফিউমের সুগন্ধ!
"খাঁচা ভাঙার আনন্দ একা নিতে নেই, ডক্টর। খেলা তো কেবল শুরু হলো।" আরিশের কণ্ঠস্বর তার কানের কাছে ফিসফিস করে উঠল। "পুলিশকে ডেকে খুব ভুল করলেন, ফারহা। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি আমার ব্যক্তিগত ডাক্তার হয়েই থাকবেন।"
ফারহা ছটফট করে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। আরিশ তাকে দেয়ালের সাথে চে*পে ধরল। অন্ধকারের মাঝেও আরিশের চোখ দুটো হিরের মতো জ্বলছে। সে ফারহার কানের কাছে মুখ নিয়ে অদ্ভুত এক শান্ত গলায় বলল,
"এখন খা*রাপ কিছু করতে বাধ্য হবো।"
তবে ফারহা কি কাঁচা খেলোয়াড়? সে তো অনেক আগে থেকেই নিজের সাথে ছোট্ট একটি ক্যামেরা সেট করে রেখেছিলো যাতে পুলিশ আরিশকে ধরতে পারে। ফারহার আগে থেকেই বোধগম্য হয়েছিল যে আরিশ কোনো না কোনোভাবে ফারহাকে আটকাতে আসবে। তাই ফারহা এমন চাল খেলেছে। একজন পুলিশ নিঃশব্দে আরিশের কাছে এগিয়ে আসলো। আরিশকে পেছন থেকে চে*পে ধরে সমস্ত পুলিশ গ্যাংদের জড়ো করে আরিশকে শেষ পর্যন্ত বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ স্টেশনে। অবশ্য আরিশকে ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে ফারহাকে দেখে একটি বাঁকা হেসে আরিশ বলেছিলো,
"সময়ের সাথে সাথে সব হিসেবে শুধিয়ে নেবো আমি।"