ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তিম বসন্তের নীল বিষ

পর্ব 5

লেখক: মেহসুঝ তারাফদার মেহনাজ

ফারহা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এটলিস্ট এই সাইকো থেকে তো বাঁচা গেলো। ফারহা দেখলো একটি অন্ধকার ছায়ার মতো একজন মানুষ তার দিকে এগিয়ে আসছে। ফারহা ভয়ে দুপা পিছিয়ে গেলো। এরপর কালো মাস্ক পরিহিত একটি লোক সামনে এসে দাঁড়ালো। পরনে লোকটির কালো শার্ট। হঠাৎ ফারহাকে কোলে তুলে ফারহার মুখে স্প্রে করে দিলো।
ফারহার জ্ঞান ফিরতেই ফারহা দেখলো সে একটি বদ্ধ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। মাস্ক পরিহিত লোকটি তার সামনে পানির বোতল দিয়ে বললো,

"আরিশ এরহান বলেছিলো আপনাকে এইখানে বন্ধ করে রাখতে। তাই সেটিই করা হয়েছে।" কেমন যেন কর্কশ আর চেনা মনে হলো গলার স্বরটি।

দুদিন এইভাবেই কেটে গেলো। কখনো কখনো অনাহারেও কেটেছে। মাঝে মাঝে মাস্ক পরিহিত লোকটি তাকে দেখতে আসে। এসেই কেমন যেন ব্যবহার করে ফারহার সাথে। কখনো কখনো ফারহার ত্বক এক আঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে থাকে। আবার কখনো কখনো ফারহার দিকে একনজরে তাকিয়ে থাকে। লোকটির গায়ের স্মেল কিছুটা চেনা চেনা মনে হয় ফারহার কাছে। একদিন হঠাৎ মাস্ক পরিহিত লোকটি তাকে সেই  বদ্ধ ঘর থেকে যে করে একটি সোফায় এনে বসালো। সামনে বসে আছে সেই মাস্ক পরিহিত লোকটি। ফারহা আশপাশে তাকিয়ে দেখলো তাকে ঘিরে রয়েছে কিছু ব্ল্যাক স্যুট পরিহিত লোক। ফারহার সামনে টেবিলের সামনে রাখা হয়েছে একটি কাগজ, বিয়ের কাগজ। মাস্ক পরিহিত লোকটি মাস্ক খুললে ফারহা চমকে উঠলো। মুখে হাত দিয়ে বললো,

"ল-লিয়াম ভাই?"

লিয়াম শুধু বাঁকা হাসলো।

"ইয়েস, আই এম লিয়াম চৌধুরী। এন্ড আই বিকেম অবসেস্ড উইথ ইউ। নাউ সাইন ফার্স্ট!"

ফারহা কেঁপে উঠলো। এসব  কি  হচ্ছে তার সাথে? 

"সাইন করুন।" এইবার কণ্ঠটা দৃঢ় শোনাচ্ছে।

ফারহার হাত কাঁপছে। লোকগুলো তার মাথায় বন্দু*ক ধরে রেখেছে।

আরিশ শান্তভাবে বসে আছে বিছানায়। মুখে বাঁকা হাসি। নিউস এসেছিলো, আগ্রাবাদ পুলিশ স্টেশনের প্রায় অধিকাংশ পুলিশ মধ্যরাতে নিহ*ত হয়েছে কোনো এক নিষ্ঠু*র খু*নির কাছে, কিন্তু খু*নির কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি এখনো। কিছুক্ষন পর তাকে ডাকা হলো লাঞ্চ করার জন্য। দুজন পুলিশ তাকে বের করলে সে আর অপেক্ষা না করে সুযোগের সৎ ব্যবহার করে পুলিশ দুজনকে  একটি ছু*রি দিয়ে ১০বার ছু*রিকা*ঘাত করলো।

ফারহা কাঁদছে। তখনি এন্ট্রি হলো আরিশ এরহানের, পরনের সাদা শার্টটি রক্তা*ক্ত হয়ে আছে এখনো।

"লিয়াম! তুই বেইমানি করেছিস! আমি বলেছিলাম আমার জন্য ফারহাকে নেবো আর তুই তুলে নিচ্ছিস?"

আরিশ লিয়ামকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না। ফারহাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো আরিশের যার কারণে লোকগুলোকে ইশারায় বললো যেন লিয়ামকে এইখান থেকে নিয়ে যায়। গার্ডসগুলোও তাই করলো।

"এন্ড আমার জন্য আস্তানায় অপেক্ষা করবি সবাই। আপাতত লিয়ামকে বেঁ*ধে রাখ।"

এরপর ফারহার সামনে পায়ের উপর পা তুলে বসলো আরিশ। সিগা*রেটে আ*গুন ধরিয়ে ফারহার মুখের সামনে ঝুকে সিগারে*টে টান দিয়ে ফারহার মুখের উপর ধো*য়া উড়াচ্ছে। ফারহার নাক মুখ কুঁ*চকে আসছে। জোরে জোরে কাশছে মেয়েটা। তবুও সেইদিকে বিন্দু মাত্র খেয়াল নেই আরিশের। সে অনবরত ধোয়া উড়িয়েই যাচ্ছে। সিগারেট পায়ের নিচে পি*ষে আরিশ শান্ত গলায় বললো,

"সাইন করবেন এইবার আমার সাক্ষীতে।"

ফারহা ঘাবড়ে গেলো। তড়িৎ বেগে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,

"আপনি একজন ক্রিষ্টান! আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না! প্লিজ ছেড়ে দিন আমায়!"

আরিশ কিছুটা হেলান দিয়ে বসলো সোফায়। একটি কাগজ বের করে বিয়ের কাগজটির উপর রেখে উচ্চস্বরে হেসে বললো,

"বিয়ে করছি না, আমি ৫ বছরের জন্য কিনে নিচ্ছি আপনাকে। দ্রুত সাইন করুন নাটক দেখার সময় নেই। কিনে নেয়ার জন্যই তো এখনো রক্তা*ক্ত শার্ট বদলায়নি। বলেছিলাম না শুধিয়ে নেবো সব?"

ফারহা কান্নায় ভেঙে পড়লো।

"আমি একজন মুসলিম প্লিজ এমনটা করবেন না আপনি আমার সঙ্গে। দোয়া করুন।"

আরিশ বিরক্ত হলো খুব। সে এইদিকে সময় নষ্ট করতে চাইছে না আর মেয়েটা তার আরো সময় নষ্ট করছে। আরিশ পকেট থেকে একটি বন্দু*ক বের করে ফারহার বুক বরাবর ধরলো।

"ফাস্ট!"

ফারহা অনবরত কেঁদেই চলেছে। কলমটা পর্যন্ত হাতে নিতে পারছে না কাঁপাকাঁপির কারণে।

"প্লিজ দোয়া করুন, আমি পারছি না! আমি মুসলিম হয়ে আপনার কাছে কিভাবে নিজেকে বিক্রি করে দেব? পারবো না আমি! দরকার হলে মেরে ফেলুন আমায়!"

আরিশ বন্দুকটি আরেকটু চেপে ধরলো ফারহার বুকে। বাঁকা হেসে বললো,

"তাহলে তোর শ্রদ্ধীয় মাকেই নাহয় মেরে ফেলি?"

ফারহা এইবার বড়োসড়ো ধাক্কা খেলো।

আরিশের মুখে ‘মা’ শব্দটা শোনামাত্র ফারহার কান্নার বেগ থমকে গেল। সারা শরীর এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে এল তার। আরিশের চোখের মণি দুটো এখন পাথরের মতো স্থির, সেখানে দয়া বা মায়ার কোনো রেশ নেই।

“মা... মায়ের কোনো ক্ষতি করেছেন আপনি?” ফারহার কণ্ঠস্বর এতটাই ক্ষীণ যে নিজের কানেই তা অস্পষ্ট ঠেকল।

আরিশ পকেট থেকে ফোন বের করে একটি লাইভ ভিডিও অন করল। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে বুড়ো মহিলাকে একটি অন্ধকার ঘরে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। মুখ ভালো করে দেখা যাচ্ছে না তাই ফারহা ঠিক বুঝতে পারছে না যে এইটা সিমি বেগম কিনা। পেছনে একজন লোক ধারালো ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

আরিশ ফারহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “পাঁচ সেকেন্ড সময় দিচ্ছি। ১... ২... ৩...”

“করছি! আমি সই করছি!” চিৎকার করে উঠল ফারহা।

কাঁপা কাঁপা হাতে কলম তুলে নিল সে। ঝাপসা চোখে কাগজের লেখাগুলো ঝাপসা দেখালেও সে আর দ্বিধা করল না। জীবনের সবচেয়ে বড় পরাজয়ের দলিলে নিজের নামটা লিখে দিল ফারহা। ৫ বছরের জন্য সে এখন আরিশ এরহানের সম্পত্তি।

ফারহা কলমটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। প্রথম শর্তেই দেয়া আছে যে ফারহা ঘর থেকে বেরোতে পারবে না, দ্বিতীয় শর্ত হলো আরিশ যাই বলুক না কেন ফারহার তা শুনতে হবে, তৃতীয় শর্ত হলো ফারহার ফোন আরিশের কাছে জমা দিতে হবে, আর সর্বশেষ শর্ত হলো ফারহা কারো সাথে কথা বলতে পারবে না তা প্রয়োজন হোক বা অহেতুক। আরিশ কাগজটা হাতে নিয়ে একবার দেখল, তারপর তৃপ্তির সাথে ভাজ করে পকেটে ভরল।

“গুড গার্ল। সাকিল, ভিডিও বন্ধ কর। ওর মাকে আপাতত ডিনার করিয়ে সাবধানে রাখিস।”

আরিশ উঠে দাঁড়াল। ফারহার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “মুসলিম-অমুসলিম নিয়ে খুব ভাবছেনতো? মনে রাখেন ফারহা, যে পৃথিবীতে আরিশ এরহান থাকে, সেখানে ধর্ম নয়, শুধু ক্ষমতা আর প্রতিহিংসা চলে। আপনি এখন আমার কেনা গোলাম।"

আরিশ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় লিয়ামের ঘরের দিকে একবার তাকাল। লিয়ামকে বেঁধে রাখা হয়েছে। আরিশের ইশারায় দুজন বডিগার্ড লিয়ামের দিকে এগিয়ে গেল। আরিশ ঠান্ডা গলায় বলল, “লিয়াম চৌধুরী, দেখি কোন হাত দিয়ে বিয়ের কাগজটা দিয়েছিস ফারহাকে? আর কোন আঙ্গুল দিয়ে ফারহাকে টাচ করেছিস?”

লিয়ামের হাত কাঁপছে। আরিশ ইশারায় বডিগার্ডরা লিয়ামের হাতের বাঁধন খুলে দিলো। এরপর আরিশ লিয়ামের হাত আলগা করে ধরে পকেট থেকে ছুরি বের করে লিয়ামের ডান হাতের সব আঙ্গুলে দুবার করে আঘাত করেছে এরপর একেবারে আঙ্গুল সবগুলো ছুরি দিয়ে আঘাত করে তুলে ফেললো। আরিশ উঠে দাঁড়িয়ে লিয়ামকে এক ঘুষি দিলো। লিয়ামের চোখ মুখ থেকে রক্ত ঝরছে তবুও আরিশ থামছে না। এক পর্যায়ে লিয়ামকে ধাক্কা মেরে বন্দুকের সাহায্যে নিজের বডিগার্ডদের উপরে পাঠিয়ে দিলো আরিশ। লিয়ামের মুখের বাঁধন খুলে দিলো আরিশ।

"এইবার জোরে জোরে চিৎকার কর, গুড লাক!"

এই বলে আরিশ সে ঘরটি থেকে বেরিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসলো। ফারহাকে অনেক আগেই এরহান ম্যানশনে রেখে আশা হয়েছে।

আরিশের গাড়ি যখন বিশাল ‘এরহান ম্যানশন’-এর সদর দরজায় এসে থামল, তখন রাত প্রায় শেষ হয়ে আসছে। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন আলোয় ম্যানশনটাকে কোনো এক অভিশপ্ত রাজপ্রাসাদের মতো দেখাচ্ছে। ফারহাকে আগেই এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। তাকে রাখা হয়েছে দোতলার একটি নিভৃত ঘরে, যার জানালাগুলো ভারী লোহার গ্রিল দিয়ে ঢাকা।

ফারহা জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ দরজার তালা খোলার কর্কশ শব্দে ফারহা সচকিত হয়ে ফিরে তাকাল। আরিশ ভেতরে ঢুকল। রক্তমাখা শার্টটা বদলে সে এখন একটি কালো সিল্কের পাজামা-পাঞ্জাবি পড়ে আছে। তার হাতে একটি ট্রে, যাতে কিছু খাবার রাখা।

আরিশ ট্রে-টা টেবিলের ওপর রেখে ফারহার দিকে এগিয়ে এল। ফারহা ভয়ে দেয়ালের সাথে সেঁটে গেল। আরিশ ফারহার খুব কাছে এসে দাঁড়াল, তার শরীর থেকে আসা সেই দামি পারফিউমের গন্ধে ফারহার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

"খাবারগুলো খেয়ে নিন। আগামী পাঁচ বছর বেঁচে থাকতে হলে শরীরে শক্তির প্রয়োজন," আরিশের কণ্ঠস্বর এখন অস্বাভাবিক রকমের শান্ত।

ফারহা ঘৃণাভরা চোখে আরিশের দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনার দেওয়া খাবার খাওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন