আরিশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে এক ঝটকায় ফারহার চুল মুঠো করে ধরল, তবে খুব জোরে নয়। ফারহার মুখটা নিজের চোখের সামনে এনে সে ফিসফিস করে বলল, "আমার অবাধ্য হওয়ার চেষ্টা করবেন না ফারহা। আমি আপনাকে কিনেছি মানে আপনার প্রতিটি নিঃশ্বাস এখন আমার কেনা। আপনি যদি না খান, তবে আপনার ওই অসুস্থ মা-কেও আজ অনাহারে থাকতে হবে। সিদ্ধান্ত আপনার।"
ফারহা আর্তনাদ করে উঠল না, শুধু চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। এই মানুষটা জানে কোথায় আঘাত করলে ফারহাকে কাবু করা যাবে। সে অগত্যা টেবিলের কাছে গিয়ে বসল।
আরিশ ঘরে রাখা একটি আরামকেদারায় বসে সিগারেট ধরাল। ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে সে বলতে লাগল, "এই পাঁচ বছর আমি দেখব, আপনার ওই তথাকথিত ‘আদর্শ’ আর ‘ধর্ম’ আপনাকে কতটা রক্ষা করতে পারে।"
ফারহা খাবার মুখে দিতে গিয়েও থেমে গেল। সে বুঝতে পারল, আরিশ কেবল তাকে শারীরিকভাবে বন্দি করেনি, সে ফারহার মানসিক শক্তিকেও চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিতে চায়।
খাওয়ার পর আরিশ ফারহার ফোনটা টেবিল থেকে তুলে নিল। "আপনার দুনিয়ার সাথে শেষ যোগাযোগটাও বিচ্ছিন্ন করে দিলাম।" এই বলে সে ফোনটা আছড়ে মেঝেতে ভেঙে ফেলল।
ফারহা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সে এখন সম্পূর্ণ একা। ঠিক সেই মুহূর্তে ম্যানশনের নিচে থেকে কোনো এক মহিলার আর্তচিৎকার শোনা গেল। ফারহা চমকে উঠল। আরিশের মুখে এক পৈশাচিক হাসি ফুটে উঠল। সে জানালার দিকে ইশারা করে বলল, "শুনতে পাচ্ছেন? এই বাড়িতে প্রতিটি দেয়ালের একটা করে গল্প আছে। খুব শীঘ্রই আপনিও সেই গল্পের অংশ হবেন।"
আরিশ ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে তালা আটকে দিল। ফারহা মেঝেতে বসে পড়ল। তার মনে হতে লাগল, সে কোনো মানুষের কাছে নয়, এক জীবন্ত শয়তানের খাঁচায় বন্দি হয়েছে। তবে যে মহিলার আর্তনাদ মাত্র শুনতে পেলো সে কে? ফারহার মাথার উপর দিয়ে সব যাচ্ছে যেন। এখন তার মনে হচ্ছে আবুল মঞ্জুরের কথা শুনে ওই সাইক্রিয়াট্রিক হাসপাতালে যোগ দেয়া তার মস্ত বড়ো ভুল ছিল।
বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে ফারহা সেই আর্তনাদের উৎস খোঁজার চেষ্টা করল। নিচ থেকে ভেসে আসা শব্দটা কি সত্যিই মানুষের, নাকি আরিশ তাকে কোনো হ্যালুসিনেশনের জালে আটকাচ্ছে? প্রতিটি মুহূর্ত যেন বিষাক্ত সাপের মতো তার শরীরের চারপাশ দিয়ে পেঁচিয়ে ধরছে।
হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে আরিশের বডিগার্ড সাকিলের গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল, "ম্যাম, খাবার শেষ হলে ট্রে-টা দরজার কাছে রাখুন।"
ফারহা সাহসে ভর করে দরজার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, "নিচে কে চিৎকার করছে? কার আওয়াজ ওটা?"
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। শুধু কয়েক জোড়া ভারী জুতোর শব্দ ক্রমশ দূরে মিলিয়ে গেল। ফারহা বুঝতে পারল, এই বিশাল অট্টালিকায় কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য বসে নেই। সে জানালার গ্রিল ধরে বাইরের ঝাউবনের দিকে তাকাল। চাঁদের আলোয় ঝাউগাছগুলোকে মনে হচ্ছে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা প্রেতাত্মা।
রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে হঠাৎ তার ঘরের দরজার তালা খোলার শব্দ হলো। ফারহা চমকে দাঁড়িয়ে গেল। আরিশ কি আবার এসেছে? কিন্তু না, দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল এক মাস্ক পরিহিত অদ্ভুত মেয়ে, মেয়েটি মাস্ক খুললে ফারহা দেখতে পেলো এটি শিফা! কিন্তু শিফার চোখে কোনো চপলতা নেই, আছে এক গভীর ভীতি।
"শিফা! তুই এখানে কীভাবে?" ফারহা জড়িয়ে ধরতে গিয়েও থেমে গেল। শিফার পরনে ছিঁড়ে যাওয়া কাপড় আর গালে কালচে দাগ।
"পালিয়ে যা ফারহা! আরিশ তোকে মারবে না, কিন্তু তোকে দিয়ে ও এমন কিছু করাবে যা মৃত্যুর চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক," শিফা দ্রুত পায়ে ফারহার কাছে এসে ওর হাতে একটা ছোট কাগজ গুঁজে দিল। "আরিশ কেবল সোশিওপ্যাথ নয়, ও একটা সিন্ডিকেটের অংশ। তোর বড় মামা আর আরিশ—ওদের শত্রুতা অনেক গভীরে।"
ফারহা কিছু বলতে যাবে তার আগেই করিডোরে আরিশের জুতোর 'খট খট' শব্দ শোনা গেল। শিফা বিদ্যুতবেগে ঘরের এক কোণে রাখা আলমারির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল আরিশ। তার হাতে এখন একটা পুরনো ডায়েরি।
ফারহা তাকিয়ে আছে আরিশের দিকে। হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে ভয়ে। যদি আরিশ বুঝে ফেলে যে শিফা এইখানে আছে? আরিশ ফারহার থেকে কিছুটা দূরে ডায়েরিটা ছুড়ে ফেললো এরপর লাইটার দিয়ে পুরো ডায়েরিটা ফারহার সামনে পুড়িয়ে ফেললো। শুধু পার্থক্য অভিব্যক্তির, একজনের চোখে মুখে ভীতি তো আরেকজনের মুখে বাঁকা হাসি। ফারহা সত্যিই বুঝতে পারছে না আরিশ করতে চাইছে কি?
ডায়েরিটা যখন দাউদাউ করে জ্বলছিল, আগুনের শিখাগুলো ফারহার চোখের মণিতে প্রতিফলিত হচ্ছিল। পোড়া কাগজের ছাইগুলো ঘরের বাতাসে হাহাকারের মতো উড়ছে। আরিশ শান্ত ভঙ্গিতে তার পকেট থেকে সিলভার রঙের একটি ফ্ল্যাস্ক বের করে এক চুমুক জল খেল। যেন কোনো এক যজ্ঞ শেষ করে সে তৃপ্ত।
আরিশ থামল। তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসিটা ফিরে এল। "আপনার মা এখনো জীবিত, তবে তার আয়ু নির্ভর করছে আপনার আনুগত্যের ওপর।"
আরিশ রুমের আলোর সুইচটা বন্ধ করে দিল। অন্ধকার ঘরে শুধু ডায়েরি পোড়া আগুনের শেষ আভাটা অবশিষ্ট রইল। সে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজায় তালা দিয়ে গম্ভীর গলায় বলে গেল, "শিফাকে বলবেন, আমার বাড়িতে ইঁদুর হয়ে থাকাটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। পরের বার ধরা পড়লে ফল ভালো হবে না।"
ফারহা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আরিশ জানত! সে শুরু থেকেই জানত শিফা এখানে আছে।
দরজার শব্দ মিলিয়ে যেতেই শিফা আলমারি থেকে বেরিয়ে এল। তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। "ফারহা, ও মানুষ নয়! ও আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ জানে। আমি আর এক মুহূর্ত এখানে থাকতে পারব না।"
শিফা জানালার গ্রিল গলে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে গেল, যেমনটা সে এসেছিল।
পরদিন আরিশকে একদম স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল যেন কালকে সে কিছুই করেনি। আরিশ আজ আবার ফারহাকে একটি সুন্দর এবং সুসজ্জিত রুমে থাকতে দিচ্ছে। ফারহা মনে মনে আওড়ালো,
"এই পাগলের কি মাথা কি গেছে? কি আজব ব্যাপার স্যাপার।"
রাতের দিকে সদর দরজায় আগমন ঘটলো শিয়াহাবের।
"ভাই, আমাদের কিছু প্রয়োজনে বাংলাদেশে আবার ফিরতে হবে!"
আরিশ খাবার টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছিলো। সে কাটা চামচটি রেখে শান্ত চোখে তাকিয়ে বললো,
"ওকে পাসপোর্ট সব রেডি কর।"
ফারহা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে। শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
"তাহলে আমি কোথায় থাকবো আরিশ সাহেব?"
আরিশ ফারহার দিকে তাকালো। তার চোখে মনে হচ্ছে চাঁদের কিছু আলো ফারহার চোখে মুখে পড়ছে। সাথে সাথে সে বিড়বিড়িয়ে "চন্দ্রাঙ্গেশি" বলে মাথায় হাত দিয়ে ছটফট করতে লাগলো। তার চোখে আবার ভিশন ভেসে উঠলো। এইবার কিছুটা স্পষ্ট। সামনে থাকা শিয়াহাব হতভম্ব হয়ে গেলো।
"ভাই!!"
শিয়াহাব দ্রুত আরিশের দিকে ছুটলো। ফারহা পেছনে ঘুরে দেখলো আরিশ ছটফট করছে। সে কোনোমতে ব্যাথা করা পা নিয়ে আরিশের দিকে ছুটলো। আরিশ ফারহার হাতের কব্জি খোপ করে ধরে নিজের কাছে হেচ্কা টান দিলো। ফারহা তাল সামলাতে না পেরে আরিশের উপর কিছুটা ঝুকে গেলো। আরিশ ফারহাকে সেই অবস্থায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। আরিশের বাহু শক্ত হয়ে আছে ফারহার কোমরে। আরিশের মুখ ফারহার পেটে গুঁজে আছে। ফারহা শিয়াহাবকে দেখে বললো,
"আমাকে বাঁচান।"
শিয়াহাব ফারহার কাছ থেকে আরিশকে ছুটাতে চাইলো। তবে ব্যর্থ হলো ৩ বার। আরিশ কোনোমতেই ছাড়ছে না ফারহাকে। ফারহা কিছুটা অবাকও হলো আরিশের কাণ্ডে! আরিশ সবসময় কর্কশ এবং ফারহাকে কখনো কাছে আসতে দেয় না। তবে আজ কি হলো?