— "আআআআব্বুউউউউ! "
লিভিংরুম কাঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে এলো। সবাই একসাথে শব্দের দিকে তাকাল। দেখে কারও আর বুঝতে বাকি রইল না কী হয়েছে। সিয়ান কান্না করছে। এক গাল লাল হয়ে আছে। আর তার পাশে একদম নির্দোষ মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে আইরা। আদিয়ান কপালে হাত দিয়ে বলল—
— "ইনায়া! তোর মেয়ে কে সামলা।"
ইনায়া একবার আইরার দিকে, একবার সিয়ানের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল
— "কেনো সামলাবো?"
— "কেনো মানে?"
— "ছোটো বেলায় কি বলেছিলে মনে নেই?"
আদিয়ান ভ্রু কুঁচকাল। কয়েক সেকেন্ড পরই মুখটা কেমন হয়ে গেল। কারণ তার মনে পড়ে গেছে।ছোটবেলায় একদিন সে ইনায়াকে মেরেছিল। তখন ছোট্ট ইনায়া কান্না করতে করতে বলেছিল— "আমি বাবা কে বিচার দিব!"
আর সে খুব ভাব নিয়ে উত্তর দিয়েছিল—
— "ছোটো হলে বড়দের মার খেতে হয়।"
সাথে সাথে পুরো রুমে হাসির রোল পড়ে গেল।
সুবা হাসতে হাসতে বলল—
— "আল্লাহ! আবার শুরু হলো!"
সায়মা বলল—
— "প্রতি বার একই কথা বলে।"
ইনায়া গর্বিত মুখে বলল—
— "কিছু শিক্ষা কখনো ভোলা উচিত না।"
আদিয়ান অসহায় মুখে মাথা নাড়ল।
অ্যারিস নিচু হয়ে আইরার সামনে বসল।
— "আম্মু, কেনো মারলে?"
আইরা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল—
— "ও আমাকে জানালার পাশে বসতে দিবে না।"
— "তাই বলে মারতে হবে?"
— "ও আগে না করেছে।"
অ্যারিস গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ল।
— "ওইটা প্রাইভেট জেট , আম্মু।"
— "হুম?"
— "প্লেনের সব জানালা তো তোমার ।"
ইভান মুখ ফিরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করছে। অ্যারিস আবার বলল—
— "আর ওকে মারবে না।"
আইরা কিছুক্ষণ ভেবে খুব সিরিয়াস মুখে বলল
— "কিন্তু ওর গালগুলো অনেক নরম , তাই একটু মারি। "
পুরো ঘরে হাসির বিস্ফোরণ। ইভান সোফায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম। সুবা চোখের পানি মুছছে হাসতে হাসতে। আর সিয়ান? সে আরও জোরে কাঁদতে শুরু করল।
— "বাবাআআ!"
আদিয়ান নিজের ছেলেকে কোলে তুলে নিল।
— "আমার বেচারা ছেলে।"
সিয়ান কাঁদতে কাঁদতেই অভিযোগ করল—
— "ও আবার মারবে।"
আইরা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
— "না।"
সবাই অবাক হয়ে তাকাল। আইরা মিষ্টি করে হাসল।
— "বাংলাদেশে গিয়ে মারবো।"
— "আআআআব্বু!"
অনেক কষ্টে সিয়ানের কান্না থামানো হলো। তারপর সবাই বেরিয়ে এলো। বাড়ির সামনে চারটি রয়্যাল কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সিকিউরিটি টিম আগে থেকেই প্রস্তুত। গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাহি আর রোহান। মাহি এগিয়ে এসে বলল—
— "স্যার, এভরিথিং ইজ রেডি."
অ্যারিস মাথা নাড়ল।
রোহানও ইনায়ার দিকে তাকিয়ে সম্মান জানাল।
— "ম্যাম."
সবাই নিজেদের গাড়িতে উঠে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ির বহর এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিল।
VIP প্রবেশপথ দিয়ে দ্রুত সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। আইরা আর সিয়ানকে সামলাতেই সবচেয়ে বেশি সময় লাগল। কারণ একজন সবকিছু ছুঁতে চায়। আর অন্যজন সবকিছুর বিচার চায়।
অবশেষে সবাই বিমানে উঠে বসল। কয়েক মিনিট পর—
বিশাল বিমানটা রানওয়ে ছেড়ে আকাশের দিকে উঠতে শুরু করল। জানালার বাইরে মেঘ ভেসে যাচ্ছে। বাংলাদেশ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু বিমানের ভেতর শান্তি নেই। এক পাশে আইরা জানালার সিট দখল করে বসেছে। আর অন্য পাশে সিয়ান কাঁদো কাঁদো মুখে।
— "ও আবার জানালার পাশে বসছে।"
— "কারণ আমি বড়।"
— "এক বছরের বড়!"
— "বড় তো!"
— "না!"
— "হ্যাঁ!"
ইভান মাথা সিটে ঠুকে বলল—
— "ফ্লাইট মাত্র শুরু হয়েছে..."
সায়মা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "আরও কয়েক ঘণ্টা বাকি।"
বিমানটা মেঘের স্তর ভেদ করে এগিয়ে চলেছে। প্রথম এক ঘণ্টা মোটামুটি শান্তই ছিল।
— "আম্মু, আমি জুস খাবো।"
— "আচ্ছা।"
ইনায়া জুস এনে দিল। আইরা এক চুমুক খেল। তারপর খুব স্বাভাবিকভাবে জুসটা সিয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিল।
— "নাও।"
সিয়ান খুশি হয়ে জুস নিল। দুই চুমুক খাওয়ার পরই—
— "এইটা আমার!"
বলেই আইরা আবার কেড়ে নিল। সিয়ান হতবাক। কয়েক সেকেন্ড পর...
— "বাবাআআ!"
পুরো কেবিনে আবার কান্না। আদিয়ান চোখ বন্ধ করে মাথা সিটে ঠেকাল।
— "আল্লাহ, আর কত?"
.
অন্যদিকে ইভান ঘুমানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু আইরা হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল।
— "চাচ্চু।"
— "হুম?"
— "আপনি বুড়ো হয়ে গেছেন?"
ইভান চোখ খুলল।
— "কি?!"
— "আম্মু বলে বুড়ো মানুষ বেশি ঘুমায়।"
সায়মা হাসি চেপে মুখ ফিরিয়ে নিল। আর অ্যারিস কাশির ভান করল। ইভান আহত গলায় বলল—
— "আমি এখনো যুবক।"
আইরা মাথা নাড়ল।
— "না।"
— "কেন?"
— "আপনার দাঁড়ি আছে।"
...
কিছুক্ষণ পর। আইরা এবার অ্যারিসের কোলে উঠে বসেছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে।
— "বাবা।"
— "হুম?"
— "বাংলাদেশে নানু থাকবে?"
— "থাকবে।"
— "নানা?"
— "উনিও।"
— "খালা?"
— "ইরা খালা।"
ছোট্ট মেয়েটার চোখ চকচক করে উঠল।
— "তাহলে আমি ওদের বাসায় থাকবো।"
অ্যারিস ভ্রু তুলল।
— "আমাদের বাসায় না?"
— "সকাল তোমাদের বাসা।"
— "আর?"
— "বিকেল নানুর বাসা।"
অ্যারিস গভীর চিন্তার ভান করল।
— "আমার মেয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে?"
আইরা বাবার গালে চুমু খেল।
— "না। তোমাকেও নিয়ে যাবো।"
কয়েক ঘণ্টা পর।
পাইলটের কণ্ঠ ভেসে এলো।
— "Ladies and gentlemen, we are preparing to land in Bangladesh..."
আইরা সঙ্গে সঙ্গে সিট থেকে লাফ দিয়ে উঠতে গেল।
— "নেমে গেছি?"
— "না।"
— "এখন?"
— "এখনো না।"
— "এখন?"
সুবা হেসে বলল—
— "ঠিক তোমার মায়ের মতো।"
— "মানে?"
— "ধৈর্য কম।"
ইনায়া প্রতিবাদ করল।
— "আমি এমন না।"