অবশেষে বিমানটা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের মাটিতে স্পর্শ করল। জানালার বাইরে পরিচিত দৃশ্য। পরিচিত আকাশ।পরিচিত দেশ। ইনায়া কিছুক্ষণ চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে রইল। তিন বছর। অনেকটা সময়। এই দেশের মাটিতে পা রাখেনি সে। অ্যারিস ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরল।
— "কি ভাবছো?"
ইনায়া মৃদু হাসল।
— "বাড়ি ফিরলাম।"
ইমিগ্রেশন, লাগেজ, সিকিউরিটি—সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে বেশ কিছুটা সময় লেগে গেল। VIP সুবিধা থাকায় কাজগুলো দ্রুতই হলো, কিন্তু এত বড় একটা দল নিয়ে বের হতে তবুও সময় লাগে। অবশেষে এয়ারপোর্টের আগমনী গেট পেরিয়ে বাইরে আসতেই— ইনায়ার চোখ থেমে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন আফরিন সুলতানা। তার পাশে আনিসুর রহমান।
আর একটু দূরে উত্তেজনায় লাফাতে থাকা ইরা। ইনায়ার মুখে বড় একটা হাসি ফুটে উঠল।
— "আম্মু!"
বলে সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে আফরিন সুলতানাকে জড়িয়ে ধরল। আফরিন সুলতানা সাধারণত সবার সামনে আবেগ প্রকাশ করেন না। কিন্তু মেয়েকে তিন বছর পর সামনে দেখে তার চোখও ভিজে উঠল। তিনি মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
— "কেমন আছো, মা?"
— "ভালো আছি।"
কথাটা বললেও ইনায়া মায়ের কাঁধ ছাড়ল না। মনে হচ্ছিল অনেক দিনের শূন্যতা এক মুহূর্তে পূরণ হয়ে গেছে। এরপর সে বাবার দিকে তাকাল।
— "বাবা..."
আনিসুর রহমান হেসে দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন।
— "আমার রাজকন্যা।"
ইনায়া এবার বাবাকেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— "তোমাদের অনেক মিস করেছি।"
আনিসুর রহমান মেয়ের মাথায় চুমু খেয়ে বললেন—
— "আমরাও।"
— "আচ্ছা, আমি কি অদৃশ্য?"
ইরা দুই হাত কোমরে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া হেসে ফেলল।
— "আমার ছোট্ট বোন!"
পরের মুহূর্তেই ইরাকে জড়িয়ে ধরল। ইরা নাটকীয়ভাবে বলল—
— "এখন মনে পড়েছে?"
— "না।"
— "কি?!"
— "তোকে দেখেই মনে পড়েছে।"
— "আপু!"
...
এদিকে ছোট্ট আইরা কৌতূহলী চোখে সব দেখছে।
তারপর ইনায়ার হাত ছেড়ে আফরিন সুলতানার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
— "আপনি নানু?"
আফরিন সুলতানার কঠোর মুখ মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন।
— "হ্যাঁ, আমি তোমার নানু।"
আইরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— "আমি আইরা!"
— "আমি জানি।"
— "আম্মু বলে আমি খুব ভালো মেয়ে।"
পাশ থেকে অ্যারিস কাশল।
— "সব সময় না।"
— "বাবা!"
...
এরপর সিয়ানও দৌড়ে এসে আনিসুর রহমানের হাত ধরল।
— " দাদা, আমাকে চিনছেন?"
— "অবশ্যই চিনেছি।"
— "আমি বড় হয়ে গেছি।"
— "অনেক বড়।"
— "আইরার থেকেও?"
আইরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল—
— "মিথ্যা!"
— "সত্যি!"
— "মিথ্যা!"
আদিয়ান মাথায় হাত দিল।
— "শুরু হয়ে গেছে।"
সুবা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— "বাংলাদেশে পৌঁছেই।"
....
এয়ারপোর্টের সামনে সারি করে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর দিকে সবাই এগিয়ে গেল। লাগেজগুলো সিকিউরিটি আর ড্রাইভাররা গাড়িতে তুলে দিল।
কথা বলতে বলতেই কে কোন গাড়িতে উঠবে সেটা নিয়ে ছোটখাটো আলোচনা শুরু হয়ে গেল।
— "আমি আম্মুর সাথে বসবো!"
আইরা ঘোষণা দিল।
— "না, তুমি আমার সাথে বসবে।"
অ্যারিস সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি করল।
— "কিন্তু আমি নানুর সাথে গল্প করবো।"
আফরিন সুলতানা মুচকি হেসে বললেন—
— "ওকে আমার কাছেই বসতে দাও।"
অ্যারিস অসহায় মুখে নিজের মেয়ের দিকে তাকাল।
— "আমাকে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?"
আইরা কয়েক সেকেন্ড ভেবে বাবার গালে একটা চুমু দিল।
— "ভুলিনি।"
— "তাহলে?"
— "বাংলাদেশে এসেছি।"
যেন এটাই যথেষ্ট কারণ।
অবশেষে সবাই গাড়িতে উঠে বসল।
সামনের গাড়িতে আফরিন সুলতানা, আনিসুর রহমান, ইনায়া আর আইরা।
পেছনের গাড়িগুলোতে অ্যারিস, ইভান, সায়মা, আদিয়ান, সুবা, সিয়ান, আর বাকিরা।
গাড়ির বহর ধীরে ধীরে এয়ারপোর্ট এলাকা ছেড়ে শহরের দিকে এগিয়ে চলল।
...
জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে ইনায়া। একটার পর একটা পরিচিত রাস্তা চোখের সামনে ভেসে উঠছে! অনেক কিছু বদলে গেছে। নতুন ভবন উঠেছে। অনেক জায়গা আধুনিক হয়েছে। তবুও কিছু জিনিস ঠিক আগের মতোই আছে। সেই ব্যস্ততা। সেই হর্নের শব্দ। সেই চেনা শহর। আফরিন সুলতানা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— "কী ভাবছো?"
ইনায়া মৃদু হাসল।
— "অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে।"
— "তোমার ছোটবেলায় এই রাস্তা দিয়ে স্কুলে যেতাম। মনে আছে?"
— "মনে আছে।"
— "আর চকলেটের জন্য কাঁদতে?"
ইনায়া লজ্জা পেয়ে বলল—
— "বাবা!"
সামনে বসা আইরা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল।
— "আম্মুও চকলেটের জন্য কাঁদতো?"
— "অনেক।"
— "সত্যি?"
আনিসুর রহমান মাথা নাড়লেন।
— "তোমার থেকেও বেশি।"
আইরা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল—
— "তাহলে আমি আম্মুর মতো।"
.
.
এদিকে অন্য গাড়িতে—
সিয়ান জানালার পাশে বসে বাইরে দেখছে। ইভান ফোনে কিছু দেখছিল। হঠাৎ সিয়ান জিজ্ঞেস করল—
— "আঙ্কেল, বাংলাদেশে ভূত আছে?"
ইভান চোখ বড় করল।
— "কে বলেছে?"
— "আইরা।"
সঙ্গে সঙ্গে সবাই বুঝে গেল সমস্যার উৎস কে। সুবা মুখ চেপে হাসছে। আদিয়ান মাথা নাড়ল।
— "আমার ছেলে বাঁচবে না।"
...
দীর্ঘ ভ্রমণের পর অবশেষে গাড়িগুলো পরিচিত এলাকায় ঢুকে পড়ল। এক পাশে আফরিন সুলতানাদের বাড়ি। আর তার পাশেই অ্যারিসদের বাড়ি। ইনায়ার জন্যই কয়েক বছর আগে অ্যারিস এই বাড়িটা বানিয়েছিল, যেন সে যখন খুশি বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারে। গাড়ি থামতেই সবাই একে একে নেমে পড়ল।
— "আমরা পরে আসছি।"
আদিয়ান বলল।
সুবাও হাসিমুখে মাথা নাড়ল।
— "আগে একটু ফ্রেশ হই।"
ইভান হাই তুলতে তুলতে বলল—
— "আমি এখন এক সপ্তাহ ঘুমাবো।"
সায়মা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল—
— "এক ঘণ্টা পরই তোমাকে জাগিয়ে দিব।"
— "তুমি আমার সুখ দেখতে পারো না।"
— "না।"
...
আইরা তখনো নানুর হাত ধরে আছে। আফরিন সুলতানা নিচু হয়ে বললেন—
— "নানুর বাসায় আসবে?"
— "আসবো।"
— "কখন?"
আইরা একটু ভেবে বলল—
— "ঘুম থেকে উঠে।"
— "ঠিক আছে।"
আফরিন সুলতানা তার কপালে চুমু খেলেন। এরপর সবাই বিদায় নিয়ে যে যার বাড়ির দিকে চলে গেল।
দুই বাড়ির দূরত্ব এমনিতেই কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ।
তাই কারও মনেই হলো না যে তারা আলাদা হচ্ছে।
নিজেদের বাড়িতে ঢুকতেই আইরা দুই হাত ছড়িয়ে বলল—
— "আমাদের বাংলাদেশের বাড়ি!"
ইনায়া হেসে ফেলল।
— "হ্যাঁ, আম্মু।"
মেয়েটা দৌড়ে এক রুম থেকে আরেক রুমে ঘুরে দেখতে লাগল। কোথায় কী আছে, যেন সবকিছু আবার নতুন করে আবিষ্কার করছে। অ্যারিস সোফায় বসতেই গভীর নিঃশ্বাস ফেলল।
— "অবশেষে।"
ইনায়া পাশে বসে বলল—
— "ক্লান্ত?"
— "একটু।"
তারপর ইনায়ার কাঁধে মাথা রেখে বলল—
— "কিন্তু তোমাকে খুশি দেখে ভালো লাগছে।"
ইনায়া মৃদু হেসে তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
...
কিছুক্ষণ পর আইরা দৌড়ে এসে অ্যারিসের কোলে উঠল।
— "বাবা, আমি ঘুমাবো।"
— "চলো।"
অ্যারিস মেয়েকে কোলে তুলে নিল। ছোট্ট আইরা—মাথা বাবার কাঁধে রাখতেই চোখ বুজে এলো।
সারাদিনের উত্তেজনা, ভ্রমণের ক্লান্তি—সব মিলিয়ে আর জেগে থাকতে পারল না। অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বাড়ি শান্ত হয়ে গেল। আইরা নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছে। অ্যারিসও ইনায়া নিজের রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে।