ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 5

লেখক: F. Tabassum

বিকেলের শেষ আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
সন্ধ্যার আজানের শব্দে সবার আগে ঘুম ভাঙল ইনায়ার। চোখ খুলে কিছুক্ষণ বিছানায় বসে রইল। পাশে তাকিয়ে দেখল— অ্যারিস এখনো ঘুমাচ্ছে। এক হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে রেখেছে, যেন ঘুমের মধ্যেও ছেড়ে দিতে রাজি না। ইনায়া মুচকি হেসে তার হাত সরিয়ে উঠতে গেল। ঠিক তখনই—
— "কোথায় যাচ্ছো?"
চোখ না খুলেই প্রশ্ন করল অ্যারিস। ইনায়া অবাক হয়ে গেল।
— "তুমি তো ঘুমাচ্ছিলে!"
— "হুম।"
— "তাহলে বুঝলে কীভাবে?"
অ্যারিস এবার চোখ খুলল।
— "তুমি উঠলে আমি বুঝতে পারি।"

ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই রান্নাঘর থেকে খাবারের গন্ধ ভেসে এলো। শামীমা বেগম আগেই কিছু ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। এদিকে আফরিন সুলতানার বাসা থেকেও খাবার এসেছে। ফলে দুই বাড়ির খাবার মিলে ডাইনিং টেবিল ভরে গেছে।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দ। পরের মুহূর্তেই—
— "মাম্মাআআআআ!"
আইরা দৌড়ে এসে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল। চুল এলোমেলো। চোখ আধা ঘুমে বন্ধ।
— "নানুর বাসায় যাবো।"
— "এইমাত্র উঠেছো।"
— "তবুও যাবো।"
— "মুখ ধুয়েছো?"
— "না।"
— "চুল আঁচড়িয়েছো?"
— "না।"
— "তাহলে?"
— "নানু তো আমার।"
এই যুক্তির কোনো উত্তর নেই। কিছুক্ষণ পর সবাই মিলে আফরিন সুলতানাদের বাড়িতে গেল। দুই বাড়ির মাঝে শুধু একটা ছোট পথ। হেঁটে যেতে এক মিনিটও লাগে না। বাড়িতে ঢুকতেই—
— "নানুউউ!"
আইরা দৌড়ে গিয়ে আফরিন সুলতানাকে জড়িয়ে ধরল। আফরিন সুলতানার মুখে বিরল একটা হাসি ফুটে উঠল। আদালতে যিনি কঠোর বিচারক, নাতনির সামনে তিনি একেবারে অন্য মানুষ।
ইরা আইরাকে দেখেই বলল—
— "এই যে ছোট্ট আপু!"
— "আমি ছোট না।"
— "তাহলে?"
— "আমি বড়।"
— "কত বড়?"
আইরা দুই হাত ছড়িয়ে দেখাল।
— "এত বড়।"
ইরা হেসে ফেলল।
ড্রয়িংরুমে সবাই যখন নিজ নিজ কথায় ব্যস্ত, ঠিক তখনই আদিয়ান ফোনটা পাশে রেখে একটু গম্ভীর গলায় বলল—
— “আমার একটা ডিল ফাইনাল করতে কাল বা পরশু আবার চায়না যেতে হবে। এটা অনেক বড় ডিল।”
সুবা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল—
— “এত তাড়াতাড়ি আবার?”
ইভান ভ্রু কুঁচকে বলল—
— “ভাইয়া, আপনি তো মাত্রই ফিরলেন…”
আদিয়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল—
— “এই ডিলটা মিস করা যাবে না। কোম্পানির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
।ইনায়া পাশ থেকে তাকিয়ে একটু নরম হাসল।
— “তুমি সবসময়ই কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকো।”
আদিয়ান ছোট্ট হাসি দিল।
— “কারণ আমি বড় ভাই।”
এই একটা বাক্য বলার ভঙ্গিতেই তার মধ্যে থাকা অথরিটি টা স্পষ্ট হয়ে গেল। ইভান সঙ্গে সঙ্গে নাটকীয়ভাবে বলল—
— “ঠিক আছে ঠিক আছে, বড় ভাই মানে বড় দায়িত্ব।”
সুবা ধীরে ধীরে বলল—
— “তাহলে কখন যাচ্ছো?”
— “সম্ভবত কাল রাত বা পরশু সকাল।”
আদিয়ান একবার সবাইকে দেখে বলল—
— “সবকিছু তোমরা সামলে নিও। বিশেষ করে আইরা আর সিয়ানকে।”
ইনায়া মাথা নাড়ল।
— “চিন্তা করো না। আমি আছি।”
— “তাই তো। তুমি থাকলে চিন্তা কম থাকে।”

আদিয়ানের কথা শেষ হতে না হতেই ছোট্ট সিয়ান সোফার পাশে এসে দাঁড়াল। চোখে পানি টলমল করছে, কিন্তু কান্নার মাঝেও একটা জেদি প্রশ্ন—
— “চলে যাবে? ”
আদিয়ান একটু নিচু হয়ে ছেলের দিকে তাকাল।
— “হ্যাঁ বাবা, একটু কাজে যেতে হবে।”
সিয়ান মুখটা আরও ফুলিয়ে ফেলল।
— “তবে অনেকগুলো চকলেট আনবে।”
ইভান হেসে বলল—
— “দেখো ভাইয়া, আপনার ডিলের চেয়ে চকলেট বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
সায়মা হাসতে হাসতে বলল—
— “বাচ্চাদের কাছে তো সেটাই আসল বিজনেস।”
আদিয়ানও এবার হালকা হাসল।
সে সিয়ানের সামনে বসে মাথায় হাত রাখল।
— “আচ্ছা, অনেকগুলো চকলেট আনবো।”
— “অনেক মানে কত?”
— “এতগুলো যে তুমি আর আইরা মিলেও শেষ করতে পারবে না।”
এই কথায় সিয়ানের চোখ একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “সত্যি?”
— “সত্যি।”
কিন্তু পর মুহূর্তেই আবার মুখ গম্ভীর করে বলল—
— “তাড়াতাড়ি আসবা।”
আদিয়ান একটু থেমে গেল। তারপর খুব নরম গলায় বলল—
— “আসবো বাবা। খুব তাড়াতাড়ি।”
সিয়ান এবার ছোট্ট হাত দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল। ঘরের সবাই চুপ হয়ে গেল এক মুহূর্তের জন্য।
.
.

পরদিন সকালটা একটু শান্ত ছিল।
রাতের ব্যস্ততা, হাসি-আড্ডা—সবকিছু যেন একটু থেমে গেছে। বাড়ির ভেতরে নরম আলো, আর সবার মুখে ঘুমঘুম ক্লান্তি। সামনের ড্রয়িংরুমে লাগেজ গুছানো শেষ। আদিয়ান কালো জ্যাকেটটা ঠিক করে নিল। সুবা পাশে দাঁড়িয়ে ব্যাগ চেক করছে বারবার।
— “সব ঠিক আছে তো?”
— “হ্যাঁ।”
সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নামল সিয়ান।
— “বাবা!”
কণ্ঠে কান্না মেশানো। আদিয়ান হাঁটু গেড়ে বসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— “এত তাড়াতাড়ি কাঁদছো কেন?”
— “তুমি চলে যাচ্ছো…”
— “কাজে যাচ্ছি, বাবা।”
— “চকলেট?”
এই প্রশ্নে আদিয়ান হেসে ফেলল।
— “আনবো।”
সিয়ান আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— “তাড়াতাড়ি আসবা।”
— “আসবো।”

একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ইনায়া।
— “খেয়াল রেখো।”
আদিয়ান মাথা নাড়ল।
— “তুই আছিস বলেই চিন্তা নেই।”
ইনায়া ছোট্ট হাসি দিল। সুবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল—
— “ফ্লাইট মিস কোরো না।”
— “কখনো করি না।”
আদিয়ান ব্যাগ তুলে নিল। পাশ থেকে ইভান এগিয়ে এল। হাসিমুখে বলল—
— “ভাইয়া, আবার লম্বা মিটিং, লম্বা টেনশন—সব কিছু মনে রাখবেন।”
আদিয়ান ভ্রু তুলে তাকাল।
— “তুমি খুব খুশি মনে হচ্ছে?”
ইভান সঙ্গে সঙ্গে হাত নাড়ল।
— “না না! আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি।”
রোহান দরজা খুলে দিল।
— “স্যার, উই আর রেডি.”
আদিয়ান একবার পিছনে তাকাল। সিয়ান তখনো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। চোখে পানি। আদিয়ান ধীরে ধীরে হাত নাড়ল।
— “বাই, চ্যাম্পিয়ন.”
সিয়ান হাত নাড়ল।
— “চকলেট!”
গাড়ি চলতে শুরু করল।

.
.
.

ইনায়া সকালে রেডি হয়ে নিল। কালো ফরমাল ড্রেস, হালকা মেকআপ, আর হাতে ফাইল। আজ তার নতুন জার্নি।
“প্রাইম লিগ্যাল পার্টনার্স”

বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে একবার আইরাকে জড়িয়ে ধরল।
— "মাম্মা ফিরবে তাড়াতাড়ি। চকলেট আনবে?”
ইনায়া হাসল।
— “আনবো।”
পিছন থেকে অ্যারিস তাকিয়ে ছিল।
— “নিজের খেয়াল রাখবে।”
ইনায়া মাথা নাড়ল।
— “তুমি-ও।”
...
অন্যদিকে অ্যারিস প্রস্তুত হচ্ছে কোম্পানির জন্য। তার পাশে ইভান দাঁড়িয়ে আছে, পুরোই অনিচ্ছুক মুখে।
— “ভাইয়া, আজকেও যেতে হবে?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমি তো একদিনও কাজ করিনি ঠিকমতো।”
অ্যারিস ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— “এই কারণেই নিয়ে যাচ্ছি।”
— “মানে?”
— “শিখবে।”
ইভান দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— “আমি শিখতে চাই না।”
— “তোমার কোনো অপশন নেই।”
ইভান অসহায় মুখে বলল—
— “আমি তো শান্তিতে বাঁচতে চাই।”
অ্যারিস ঠান্ডা গলায় বলল—
— “কোম্পানি ছাড়া শান্তি পরে।”
ইভান মুখ বাঁকালেও আর কিছু বলল না। কারণ সে জানে—অ্যারিস মানে সিদ্ধান্ত ফাইনাল।
...
সুবা রেডি হয়ে বের হচ্ছে, হাতে ব্যাগ!
— “আজ থেকে নতুন হাসপাতাল।”
সায়মা দরজা থেকে বলল—
— “সাবধানে থেকো।”
সুবা মুচকি হাসল।
— “তুইও বাসায় বসে বেশি রিলস দেখিস না।”
— “আমি রিলসের রিসার্চ করি।”

সায়মা আজ পুরো দিন বাড়িতেই থাকবে। ক্যাম্পাস না থাকায় একটু শান্তি। সে সোফায় বসে ফোন স্ক্রল করতে করতে বলল—
— “আজকে পুরো বাড়িটা আমার।”
পাশ থেকে শামীমা বেগম বললেন—
— “তাহলে রান্নাঘরও তোমার।”
সায়মা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল।
— “না না, আমি শুধু রেস্ট নিতে চাই!”

একসাথে সবাই বের হলো। ভিন্ন গন্তব্য, ভিন্ন জীবন—কিন্তু একই শহর, একই গল্পের ভেতরে। ইনায়া চলে গেল তার নতুন কর্মজীবনের দিকে। অ্যারিস ও ইভান গেল কোম্পানির দিকে। সুবা গেল হাসপাতালের পথে।
আর সায়মা রয়ে গেল বাড়িতে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন