ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 17

লেখক: F. Tabassum

— "বাহ! আমার রাজকুমারী তো দেখছি তাহলে ভীষণ সাহসী মেয়ে!" ইনায়ার মুখে প্রশান্তির হাসি।
ঠিক তখনই অ্যারিস , ইভান ও সায়মাকে সাথে নিয়ে ভেতরে ঢুকল। অ্যারিস কোটটা খুলে মেয়ের দিকে এগিয়ে এসে নিচু হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল— "কী ব্যাপার প্রিন্সেস? সব গল্প কি শুধু মাম্মাকেই বলবে? বাবাকে কিচ্ছু বলবে না?"
আইরা এবার বাবার কোলের ভেতর আরও একটুঁ সেঁধিয়ে গিয়ে এক নিঃশ্বাসে নিজের সারাদিনের অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলতে শুরু করল— "আমাদের ক্লাসের ম্যাম না খুব ভালো বাবা! আমি একটা লাল রঙের আপেল ছবি এঁকেছি। তারপর সবাই মিলে 'টুইঙ্কেল টুইঙ্কেল' গানও গেয়েছি। আর জানো, ম্যাম আমাকে একটা মস্ত বড় চকোলেটও দিয়েছে!"
মেয়ের এই অফুরন্ত উচ্ছ্বাস আর আধো-আধো বোল দেখে অ্যারিসের ক্লান্তি যেন এক নিমেষেই উধাও হয়ে গেল।
...
সবাই মিলে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই কিচেন থেকে এক বাটি গরম সিঙ্গারা আর চাটনি হাতে বেরিয়ে এলেন শামীমা বেগম। — "এসো সবাই, ঝটপট হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। গরম গরম নাস্তা আর চা রেডি।"
সোফায় বসে থাকা জিয়ান ফেং ফোন বন্ধ করে রাখতে রাখতে বললেন— "কী ব্যাপার? আজ বাড়ি ফেরার পর সবাইকে বেশ ফুরফুরে আর খুশি লাগছে বলে মনে হচ্ছে!"
ইভান চট করে নিজের টাইটা একটু ঢিলে করে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল— "উম... আসলে আব্বু, অফিসে আজ... মানে... আমাদের ডিপার্টমেন্টের কাজটা বেশ ভালো হয়েছে। একটা বড় প্রজেক্টের খসড়া রেডি করেছি।"
অ্যারিস সোফার ওপাশে কোটটা রাখতে রাখতে একবার শুধু আড়চোখে ছোট ভাইয়ের দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে সেই সকালের গোলাপি লিপস্টিকের ঘটনার চাপা কৌতুকী হাসিটা আবারও হালকা করে ফুটে উঠল।
ইভান বড় ভাইয়ের সেই এক্সপ্রেশন দেখামাত্রই চোরের মতো নিজের চোখ সরিয়ে অন্যদিকের দেওয়ালে তাকাল। মনে মনে এক মস্ত ঢোক গিলে বিড়বিড় করল— "উফ! ভাইয়াটা একটা আস্ত শয়তান! সে নিশ্চয়ই এখনও ওই মারাত্মক দাগটার কথাই ভাবছে আর মনে মনে হাসছে!"
...
ঠিক তখনই সায়মা নিজের ফাইলটা একপাশে রেখে ইভানের ঠিক পাশের সোফাটায় এসে বসল।
শামীমা বেগম নিজের ছোট পুত্রবধূর ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে স্নেহভরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন— "কী রে সায়মা? অফিসের প্রথম কয়েকটা দিন কেমন কাটছে তোর? মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে না তো?"
সায়মা শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে উত্তর দিল— "খুব ভালো লাগছে, আম্মু। সত্যি বলতে, প্রথম প্রথম একটু ভয় লাগলেও এখন অনেক নতুন নতুন কাজ শিখছি।"
— "শরীরে বেশি চাপ পড়ছে না তো মা? কাজের জায়গায় কেউ কোনো কথা শোনায়নি তো?" শামীমা বেগমের গলায় মাতৃত্বের চিন্তা।
— "না আম্মু, একদম না। অফিসের ওখানকার সবাই খুব কো-অপারেটিভ, অনেক সাহায্য করছে আমাকে।" সায়মা বলল।
ইভান পাশে চুপচাপ বসে মায়ের আর স্ত্রীর এই কথোপকথন শুনছিল। মুখে সে কোনো মন্তব্য না করলেও, তার চোখ দুটো তখন সায়মার দিকেই নিবদ্ধ ছিল। নিজের স্ত্রীকে কোনো রকম পারিবারিক প্রভাব ছাড়া, সম্পূর্ণ নিজের মেধা আর যোগ্যতায় এভাবে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে দেখে তার ভেতরের পুরুষটার বুকটা এক অজানা গর্বে আর আনন্দে ভরে উঠছিল।

অন্যদিকে...
তখন সন্ধ্যার নাস্তার সময়। ডাইনিং টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম সুজির হালুয়া আর বিস্কুট নিয়ে একসাথে বসে আছে আফরিন সুলতানা, আনিসুর রহমান, সুবা আর তাদের পরিবারের প্রাণভোমরা ছোট্ট সিয়ান।
সিয়ান নিজের প্লেটে রাখা বিস্কুটটায় ছোট ছোট ইঁদুরের মতো কামড় দিতে দিতে হঠাৎ নিজের ডাগর চোখ দুটো তুলে জিজ্ঞেস করল—
— "আম্মু... ও আম্মু..."
— "হুম, বলো বাবা? কী হয়েছে?" সুবা হালুয়ার বাটিটা এগিয়ে দিতে দিতে বলল।
— "আব্বু কবে আসবে গো? আর কতদিন পর?"
সুবা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল— "আর মাত্র কয়েকটা দিনের তো ব্যাপার বাবা! আব্বুর ওখানে কাজ শেষ হলেই চলে আসবে, ইনশাআল্লাহ।"
সিয়ান এবার নিজের ছোট ঠোঁট দুটো ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল— "আমি না আব্বুকে অনেক অনেক মিস করছি, আম্মু।" একটু থেমে, তার ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টুমি ভরা হাসি ফুটিয়ে — "আর আমি এটাও খুব ভালো করে জানি... যে আমার মতো তুমিও কিন্তু আব্বুকে অনেক মিস করছো!"
আচমকা বাচ্চার মুখ থেকে এমন পাকা কথা শুনে সুবা পুরো আকাশ থেকে পড়ল। তার হাতের চামচটা প্লেটেই থমকে গেল— "কী! কী বললে তুমি?"
সিয়ান নিজের গম্ভীর মুখ করে মাথা নাড়ল— "হুম, আমি ভুল বলিনি। তুমিও যে রাতে ঘুমানোর আগে আব্বুর ছবির দিকে তাকিয়ে থাকো, আমি জানি। তুমিও আব্বুকে অনেক মিস করো।"
কথাটা শোনামাত্রই সুবার পুরো গাল দুটো লজ্জায় এক লহমায় টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে নিজের লজ্জা লুকাতে ছেলের কপালে একটা আঙুলের টোকা দিয়ে বলল— "এই পিচ্চি ছেলে! এইসব পাকা পাকা কথা তোমাকে কে শিখিয়েছে শুনি? একদম মার দেবো!"

নাতির এই বুদ্ধিমত্তা আর সুবার অমন লাল হয়ে যাওয়া মুখ দেখে সোফার ওপাশে বসা আফরিন সুলতানা আঁচলে মুখ চেপে মৃদু শব্দে হেসে ফেললেন।
সুবা নিজের শাশুড়িকে ওভাবে হাসতে দেখে আরও বেশি অপ্রস্তুত হয়ে অভিমানী গলায় বলল— "মা! আপনিও হাসছেন? আপনার এই গুণধর নাতি যে আমাকে এভাবে টিজ করছে, আপনি তার কোনো বিচার করছেন না?"
আফরিন সুলতানা হাসতে হাসতেই বললেন— "আমি আর কী বিচার করব বল তো বউমা? ও তো কোনো বানিয়ে বলা কথা বলেনি, একদম খাঁটি সত্যি কথাই বলেছে!"
সুবা এবার আরও বেশি লজ্জা পেয়ে দুই হাতে নিজের মুখ ঢাকল— "মা! আপনিও ওর দলে!"
এতক্ষণ টিভিতে খবর দেখতে থাকা আনিসুর রহমান সাহেব চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, "ভুলকিছু বলেনি, মা।"
সুবা এবার বিস্ময়ে তার শ্বশুরের দিকে তাকাল— "বাবা... শেষ পর্যন্ত আপনিও আমার পেছনে লাগলেন?"
আনিসুর রহমান মুচকি হেসে পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে বললেন— "আরেহ, স্বামী যদি কোনো কাজের জন্য বাইরে থাকে, তবে ঘরে থাকা স্ত্রী তাকে প্রতি মুহূর্তে মনে মনে মিস করবে—এটাই তো একটা সুখী সংসারের চিরন্তন নিয়ম, মা। এতে লজ্জার কী আছে?"
আফরিন সুলতানা স্বামীর এই সংলাপ লুফে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন— "একদম ঠিক কথা! তোর বাবাও যখন তরুণ বয়সে অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে যেত, আমিও তো সারা বিকেল এই জানালার গ্রিল ধরে ওনার ফেরার পথ চেয়ে অপেক্ষা করতাম।"
আনিসুর রহমান সাহেব এবার স্ত্রীকে একটু খোঁচা মারার সুযোগ পেয়ে মজা করে বললেন— "কেন? শুধু তরুণ বয়সে করতে? এখন বুড়ো হয়ে গেছি বলে বুঝি আর অপেক্ষা করো না?"
— "এই! সবার সামনে একদম যা তা বলবেন না তো!" আফরিন সুলতানা এবার নিজেই লজ্জা পেয়ে সুবার মতো মুখ আড়াল করলেন।
সুবা দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে হাসতে হাসতে বলল— " আজ দেখছি সবাই মিলে সিন্ডিকেট করে শুধু লজ্জা দেওয়ার প্ল্যান করেছেন!"
সিয়ান এবার খিলখিল করে হেসে উঠে টেবিল থেকে নেমে এক লাভে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরল— "আম্মু! আব্বু যখন ওখান থেকে দরজা খুলে আসবে না, আমি কিন্তু সবার আগে দৌড়ে গিয়ে আব্বুকে মস্ত একটা জাপটানি দিয়ে জড়িয়ে ধরব, ওকে?"
সুবা ছেলেকে নিজের বুকের মাঝে শক্ত করে টেনে নিয়ে তার কপালে একটা গভীর চুমু খেল— "আচ্ছা বাবা, ঠিক আছে। তুমিই আগে জড়িয়ে ধরো।"
সিয়ান মায়ের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে মিষ্টি করে যোগ করল— "হুম, আমি আগে জড়িয়ে ধরব... তারপর আমার ছাড়ার পর তুমি আব্বুকে জড়িয়ে ধরো, কেমন?"
ছেলের এই সরল কথা শুনে আবারও সবাই হেসে উঠলো।  সুবা মনে মনে বলে, "দেখতে আমার মতো হলে কি হবে? স্বভাব চরিত্র পেয়েছে একদম বাপের মতো।"

আফরিন সুলতানা চায়ের খালি কাপটা টেবিলে রাখলেন। সুবার দিকে তাকিয়ে মাতৃসুলভ গলায় জিজ্ঞেস করলেন—
— "আচ্ছা সুবা, তোর আব্বা-আম্মা তো অনেকদিন হলো এদিকে ঘুরতে আসেনি। ওনারা কি এখন ঢাকার বাইরে? এবার আসবেন না?"
সুবা ঠোঁটের কোণে মৃদু একটু হাসি ফুটিয়ে মাথা নাড়ল— "আসতে তো খুব করে চেয়েছিলেন, মা। কিন্তু হুট করেই ভাইয়ার নতুন পোস্টিং হয়েছে চট্টগ্রামে। ভাইয়া তো একদম নতুন জায়গায় একা একা সামলাতে পারছিল না, তাই আব্বু আর আম্মুও আপাতত ওনার সাথেই চট্টগ্রামে শিফট হয়ে গেছেন। ভাইয়াকে একটু সেট করে দিয়ে ওনারা ফিরবেন।"
— "আহা, এই জন্যই তাহলে আসতে পারেনি।" আফরিন সুলতানা বুঝলেন।
আনিসুর রহমান মাথা নেড়ে বললেন— "তা অবশ্য খারাপ করেনি, একদম ঠিক কাজই করেছে। নতুন পোস্টিংয়ের প্রথম দিনগুলোতে ফ্যামিলির কাউকে পাশে পাওয়াটা খুব বড় একটা মেন্টাল সাপোর্ট।"
— "জি, বাবা। একদম ঠিক।" সুবা শ্বশুরের কথায় সায় দিল।
আফরিন সুলতানা মুচকি হেসে আবার জিজ্ঞেস করলেন— "তাহলে ওদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখিস তো মা? খোঁজখবর নিস?"
— "জি, মা। প্রায় প্রতিদিনই ওনাদের সাথে ভিডিও কলে কথা হয়। বিশেষ করে সিয়ান তো ফোন পেলেই ওনার সাথে জুড়ে বসে। আজ বিকেলেও ভিডিও কলে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে শুধু নিজের দুষ্টুমির গল্পই করেছে।"

আনিসুর রহমান সাহেব হেসে সিয়ানের পিঠে হাত রাখলেন— "নাতি যদি এমন পাকা কথা বলতে পারে, তবে নানু-নানি তো সব কাজ ফেলে গল্প শুনবেই।"
আফরিন সুলতানা এবার গভীর স্নেহভরা চোখে সুবার দিকে তাকিয়ে বললেন— "দূরত্ব যতই থাকুক মা, সম্পর্ক যেন কখনো দূরে সরে না যায়। সুযোগ আর সময় পেলেই সিয়ানকে নিয়ে ওখান থেকে কয়েকদিন ঘুরে আসিস।"
সুবা শাশুড়ির এই আন্তরিকতা দেখে মুচকি হেসে উত্তর দিল— "ইনশাআল্লাহ, মা। আদিয়ান চায়না থেকে ফিরে এলেই আমরা একদিন সবাই মিলে একসাথে চট্টগ্রামে ঘুরতে যাব।"

কথাটা শুনে আফরিন সুলতানা ও আনিসুর রহমান —দুজনে সন্তুষ্টির হাসি হাসলেন। এই বাড়িতে সুবা শুধু একজন পুত্রবধূ হয়ে আসেনি, সে তার সততা আর ভালোবাসা দিয়ে এই পরিবারের নিজের আপন মেয়ের মতোই একজন হয়ে উঠেছে।
...

রাতের খাবার শেষ করে ফেং পরিবারের সবাই মিলে বেশ কিছুক্ষণ ড্রয়িংরুমে বসে হালকা গল্পগুজব আর হাসাহাসি করল। তারপর রাতের ক্লান্তি নামতেই ঘড়ির কাঁটা দশটা ছোঁয়ার দিকে একে একে সবাই যে যার বেডরুমের দিকে চলে গেল।
ইভানও ক্লান্তিতে একটা মস্ত হাই তুলতে তুলতে নিজের রুমের দরজাটা খুলল। শার্টটা খুলে সোফায় ছুঁড়ে দিয়ে সে যখন রুমের চারপাশে তাকাল, তার চোখের ঘুম এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল।
রুমের ভেতরের বিছানাটা সুন্দর করে গোছানো। ড্রেসিং টেবিলের হালকা হলদেটে লাইটটাও জ্বলছে। কিন্তু... পুরো রুমে সায়মা কোথাও নেই।
ইভান দুই ভ্রু কুঁচকে প্রথমে অ্যাটাচড ওয়াশরুমের বন্ধ দরজার দিকে তাকাল— "সায়মা? ভেতরে আছো?"
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না। সে এবার বারান্দার কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা সরিয়ে বাইরে উঁকি দিল। সেখানেও কেবল রাতের অন্ধকার আর বাতাস ছাড়া কেউ নেই। ইভান এবার নিজের ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গলাটা একটু উঁচিয়ে ডাকল—
— "সায়মাআআ! কোথায় তুমি?"
তবুও পুরো ঘর নিস্তব্ধ, কোনো সাড়াশব্দ নেই। ইভান এবার দুই হাত নিজের কোমরে রেখে পুরো ঘরটার দিকে তাকিয়ে একা একাই বলল— "হোয়াট দ্য...! আমার লক্ষ্মী বউটা হুট করে এই মাঝরাতে গেল কোথায়? নাকি কেউ চুরি করে নিয়ে গেলো? এত সুন্দর লক্ষী বউ আমার। আমি বউ কে ছাড়া কিভাবে থাকবো?
ঠিক তখনই তার মাথায় হুট করে বুদ্ধি খেলল— "নাকি আম্মুর রুমে কোনো দরকারে গেছে?" সে আবারও দরজার দিকে এগোতে এগোতে এবার পুরো গলা ছেড়ে চিৎকার করে উঠল—
— "সায়মাআআআআআআ! ও সায়মা!"
...
এদিকে—
বাড়ির বিশাল, খোলা ছাদে। রাতের মৃদু শীতল বাতাস বইছে চারপাশ জুড়ে। ছাদের এক কোণায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ইনায়া আর সায়মা নিশ্চিন্তে নিজেদের মধ্যে সারাদিনের অফিসের অভিজ্ঞতা নিয়ে গল্প করছিল। আর আইরা একটা রঙিন বল নিয়ে ছাদের এদিক-ওদিক খুশিতে দৌড়াদৌড়ি করে খেলছিল।
হুট করেই নিচ তলার করিডোর থেকে ইভানের সেই তীব্র চিৎকার ভেসে এল— "সায়মাআআ!"
সায়মা আচমকা নিজের নাম শুনে চমকে উঠল। লজ্জায় তার মুখটা ছোট হয়ে গেল— "আরেহ! ইভান এভাবে চিৎকার করছে কেন?"
আইরা বলটা হাতে নিয়ে দুই হাত তুলে খিলখিল করে হেসে উঠে বলল— "ওমা! চাচী দেখো, চাচ্চু আবার পাগল হয়ে চাচীকে খুঁজছে!"
ইনায়াও এই পরিস্থিতিতে নিজের ঠোঁটের কোণের মুচকি হেসে সায়মার কাঁধে হাত রেখে ঠাট্টার ছলে বলল— "আর এক সেকেন্ডও দেরি কোরো না সায়মা, জলদি যাও। যেভাবে ডাক শুরু করেছে, আর কিছুক্ষণ ওভাবে থাকলে মনে হয় পুরো বাড়ি মাথায় তুলবে ও!"
সায়মা লজ্জায় লাল হয়ে ওড়নাটা মাথায় টেনে নিয়ে বলল— "উফ ভাবি, আমি তাহলে সত্যিই যাই। ও আসলেই একটা পাগল!"
— "হ্যাঁ, যাও যাও।" ইনায়া হাসল।
সায়মা নিজের ওড়নাটা ঠিক করে প্রায় দৌড়ের গতিতে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
...
কয়েক মুহূর্ত পর, নিজের রুমের দরজায় এসে একহাতে হাঁপাতে হাঁপাতে দাঁড়িয়ে পড়ল সায়মা। চুলগুলো বাতাসে কিছুটা এলোমেলো। সে ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা ইভানের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে বলল— "কী হয়েছে টা কী তোমার? এভাবে চিল্লাচ্ছিলে কেন?"
ইভান সায়মাকে অক্ষত অবস্থায় দরজার মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজের বুকের ওপর হাত রেখে এক মস্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল— "আলহামদুলিল্লাহ! যাক, বাঁচা গেল!"
সায়মা পুরোপুরি অবাক— "মানে কী? কী বাঁচা গেল?"
— "আমি তো ভেবেছিলাম আমার এত সুন্দর বউটা বুঝি এই বিশাল বাড়ি থেকে হুট করে কেউ তাকে কিডন্যাপ করেছে!"
সায়মা ইভানের এই পাগলামি দেখে হেসে ফেলে বলল— "ধুর! কী যে বলো না! আমি হারিয়ে যাব কেন? আমি শুধু ভাবির সাথে আইরাকে নিয়ে ওপরে ছাদে একটু গল্প করছিলাম।"
— "তাহলে তো অন্তত যাওয়ার আগে আমাকে একটা বার বলে যেতে পারতে!" ইভান মুখ ফুলিয়ে অভিমানী টোনে বলল।
— "আমি কি আর জানতাম মিস্টার ইভান ফেং, যে মাত্র পাঁচটা মিনিট আমাকে চোখের সামনে না দেখলেই আপনি এভাবে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে চিৎকার করা শুরু করবেন?" সায়মা ডেস্কে ঝুঁকে হাসল।
ইভান এবার নিজের মুখটা মারাত্মক গম্ভীর করে, আঙুল উঁচিয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলল— "ভুল ইনফরমেশন দিচ্ছ ম্যাডাম। পাঁচ মিনিট না... কাঁটায় কাঁটায় ঠিক তিন মিনিট বিশ সেকেন্ড তোমাকে রুমে দেখিনি আমি। আর তাতেই আমার মস্তিস্কের ডিসিপ্লিন নষ্ট হয়ে গেছে।"
সায়মা এবার হেঁটে ইভানের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। — "ও আচ্ছা! মিস্টার ম্যানেজারের মাত্র তিন মিনিটেই এত কষ্ট হয়ে গেল?"
ইভান এবার নিজের গলার স্বরটা একদম নিচু করে বলল— "কী করব বলো? এই চার দেওয়ালে তোমাকে না দেখলে পুরো রুমটাই কেমন যেন ফাঁকা আর শূন্য লাগে।"
সায়মার মুখে মুহূর্তের মধ্যে এক লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই তাদের ঘরের আধখোলা দরজার বাইরে দিয়ে করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় আইরার আধো-আধো কণ্ঠের পাকা সংলাপ ভেসে এল—
— "মাম্মা! মাম্মা দেখো! চাচ্চু আবার কষ্ট করে তার হারানো চাচীকে খুঁজে পেয়ে গেছে!"
করিডোর থেকে ইনায়ার হাসির শব্দও স্পষ্ট ভেসে এল ঘরের ভেতর।
রুমের ভেতরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা ইভান আর সায়মা—দুজনেই আইরার এই টাইটেল ট্র্যাক শুনে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসেই ফেললো ।
ইভান সায়মার আরও কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল— "দেখলে তো? এবার তোমার এই অতি ব্যাকুল স্বামীর কল্যাণে পুরো ফেং পরিবার জেনে গেল যে আমি পাগলের মতো তোমাকে খুঁজছিলাম।"
সায়মা মজা করে উত্তর দিল— "দোষ কিন্তু সম্পূর্ণ আপনার, মিস্টার ইভান। এত জোরে কোনো সুস্থ মানুষ ডাকে? আস্তে ডাকলে কী হতো?"
ইভান কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল— "আরেহ! আমি আমার নিজের বিবাহিত বউকে খুঁজছিলাম, এতে চুরির কী আছে? আর আস্তে ডাকলে যদি ছাদের অত বাতাসে আমার এই রোমান্টিক কণ্ঠস্বর তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাতই না, তখন আমার কী হতো বলো?"

সায়মা নিজের দুই ঠোঁট চেপে ইভানের মুখের দিক থেকে চোখ সরিয়ে বিছানার দিকে এক পা বাড়াতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার পায়ের গতি পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ঘরের  একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হলো—ক্লিক!
ইভান নিজের হাত বাড়িয়ে ভেতরের ছিটকিনিটা আটকে দিয়েছে।
সায়মা চকিত পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে দুই ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চোখের তারায় তখন একাধারে কৃত্রিম শাসন আর এক বুক লুকানো হৃদস্পন্দন— "এই... দরজা আটকালেন কেন?"
ইভান কোনো উত্তর দিল না। সে খুব ধীর পায়ে সায়মার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে তখন অবাধ্য দুষ্টু হাসির রেখা। এক হাত পকেটে গুঁজে সে সায়মার চোখের অবয়বটা মেপে নিয়ে নরম গলায় বলল— "কোথায় পালাচ্ছ, মিসেস ফেং?"
সায়মা পিছু হটতে গিয়ে ড্রেসিং টেবিলের কাঠের কোণে আটকে গেল। সে আর কোনো পথ না পেয়ে দুই হাত সামান্য তুলে আত্মরক্ষার ভান করে বলল— "আআআ... আমি কিন্তু এখন আর কিচ্ছু শুনব না! আমি সোজা ঘুমাবো!"
ইভান সায়মার ঠিক এক কদম দূরত্বে এসে থামল। মাথা নেড়ে অত্যন্ত আশ্বাসের সুরে বলল— "ঘুমাবে... অবশ্যই ঘুমাবে। সারাটা দিন অনেক খাটুনি গিয়েছে তোমার।"
আরও এক পা এগিয়ে এসে, সায়মার চিবুকটা নিজের আঙুলের ডগায় আলতো করে ছুঁয়ে ফিসফিস করে যোগ করল— "তবে ঘুমানোর আগে... অন্তত আমাকে আমার কাজটা তো করতে দাও।"
সায়মা দু'চোখ বড় বড় করে তাকাল। তার বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক চঞ্চলতায় দুলছে। ইভানের এমন সম্মোহনী চাহনির সামনে নিজের ভেতরের লজ্জা লুকাতে সে হুট করেই দুই হাত তুলে বলে উঠল— "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন!"
ইভান আক্ষরিক অর্থেই কয়েক সেকেন্ড পুরো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে সে হুট করেই ঘর কাঁপিয়ে হেসেই ফেলল— "আরে বাবা! কোনো রোমান্টিক মোমেন্ট শুরু করার আগে মানুষ এই দোয়া পড়ে নাকি?"
সে সায়মার কোমরে নিজের শক্ত হাতটা জড়িয়ে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে মজা করে বলল— "যেকোনো ভালো কাজ তো বিসমিল্লাহ বলে শুরু করতে হয়, সোনা।"
সায়মা লজ্জায় লাল হয়ে সঙ্গে সঙ্গে নিজের দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল— "আস্তাগফিরুল্লাহ! আপনি আসলেই একটা আস্ত দুষ্টু! আপনি একদম ভালো না!"
ইভান মুখে নিষ্পাপ ভাব এনে ভান করে অবাক হলো— "ওমা! আমি আবার কী করলাম? আমি তো জাস্ট আমার পাওনা হিসাবটা মেলাতে এসেছি।"
— "আপনার মাথায় সারাক্ষণ শুধু এইসব দুষ্টুমি ঘোরে।" সায়মা ইভানের বুকের ওপর নিজের  হাত দুটো রেখে তাকে সামান্য ঠেলার চেষ্টা করল।
ইভান সায়মার সেই বাধা অগ্রাহ্য করে তার মুখের আরও কাছে নিজের মুখটা নামিয়ে আনল। তার নিশ্বাসের উষ্ণতা তখন সায়মার গালে এসে আছড়ে পড়ছে। সে খুব গভীর স্বরে বলল— "মাথায় দুষ্টুমি ঘুরবে না তো কী হবে বলো? আমার চোখের সামনের এই বউটা যে, দিনকে দিন বড্ড বেশি মিষ্টি হয়ে উঠছে।"
সায়মা লজ্জায় আর কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইল— "যান! আমি আপনার সঙ্গে আর কোনো কথাই বলব না।"
ইভান এবার সায়মার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। হাতের আঙুলগুলো একটির ভাঁজে অন্যটি গলিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল— "আচ্ছা, সরি বাবা। আর একদম মজা করব না। প্রমিস।"
সায়মা এবার সন্দেহের চোখে ইভানের চোখের দিকে তাকাল— "সত্যি বলছ? আর ফাজিলমো করবে না?"
— "না..." ইভানের কণ্ঠস্বর এবার পুরোপুরি বদলে গেল। রসিকতার চপলতা হারিয়ে সেখানে নেমে এলো এক আদিম ভালোবাসার টান।
ইভানের সেই চোখের ভাষা বুঝতে সায়মার এক মুহূর্তও সময় লাগল না। তার গাল দুটো ড্রেসিং টেবিলের হলদেটে আলোয় লাল থেকে যেন টকটকে গোলাপি হয়ে উঠল।
ইভান সায়মার আলতো আপত্তিগুলোকে নিজের ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে নিয়ে তাকে আলতো করে পাঁজকোলা করে তুলে নিল। সায়মা অতর্কিত এই কাণ্ডে মৃদু একটা চিৎকার দিয়ে ইভানের গলাটা দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
বিছানার নরম চাদরের ওপর সায়মাকে শুইয়ে দিয়ে ইভান তার ওপর ঝুঁকে পড়ল। ইভান খুব আলতো করে সায়মার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াাল—এক দীর্ঘ চুম্বনে যেন সারাদিনের সমস্ত ক্লান্তি নিমেষেই হারিয়ে গেল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন