সায়মা নিজের চোখ দুটো বুজে ফেলল। ইভানের হাত তখন সায়মার চুলের মধ্যে । কপাল থেকে নেমে ইভানের ঠোঁট এবার সায়মার বন্ধ চোখের পাতায়, তারপর তার ঠোঁটের সেই তিলটার ওপর এসে থমকাল।
সায়মা ইভানের কাঁধটা শক্ত করে চেপে ধরে নিচু গলায়, প্রায় বুঁদ হওয়া স্বরে ফিসফিস করল— "ইভান... লাইটটা নিভিয়ে দাও।"
ইভান সায়মার ঠোঁটের খুব কাছে নিজের ঠোঁট রেখে বাঁকা একটু হাসল— "আজ কোনো লাইট নিভবে না, সায়মা। আজ আমার চোখের সামনে আমার এই সুন্দর রূপটা এভাবেই জ্বলজ্বল করবে।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই ইভান সায়মার ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট সঁপে দিল।
ইভানের ঠোঁটের নিবিড় ছোঁয়ায় সায়মার সারা শরীরে যেন এক অবশ করা ভালোলাগার ঢেউ খেলে গেল। তার দুই হাত চেপে বসল ইভানের চওড়া পিঠে। ইভান সায়মার অধর থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে নিল, কিন্তু দূরত্ব বাড়াল না। সায়মার চোখের পাতা আর ওষ্ঠাধরের কোণে লেগে থাকা লাজুক হাসিটা সে চোখের খুব কাছ থেকে দেখছিল।
সায়মা বুক ভরে এক লম্বা শ্বাস নিয়ে ইভানের চোখের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক মহাসমুদ্রের মতো গভীরতা। সে ফিসফিস করে বলল—
— "তুমি দিন দিন বড্ড বেশি অবাধ্য হয়ে উঠছ, ইভান..."
ইভান সায়মার গালে আলতো করে নিজের হাতের আঙুলগুলো বোলাতে বোলাতে তার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল—
— "কারণে-অকারণে যার মন শুধু তোমাতেই হারিয়ে যেতে চায়, সে একটু অবাধ্য হলে কি খুব বেশি অপরাধ হবে, মায়াবতী?"
কথাটা সায়মার কানের লতিতে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাল। সে লজ্জায় নিজের মুখটা লুকানোর জন্য ইভানের চিবুক আর বুকের মাঝখানের ওমে মাথা গুঁজে দিল। ইভানের হৃদপিণ্ডের দ্রুত ধুকপুক শব্দটা সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল।
ইভান সায়মাকে নিজের বাহুবন্ধনে আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল। সায়মার রেশমি চুলের সুবাস তার মস্তিস্কে এক মাদকতা তৈরি করছিল। সে সায়মার চুলে একটা চুমু দিয়ে বলল—
— "বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, অথচ প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে কেন আমার একদম প্রথম দেখার মতোই নতুন আর সুন্দর মনে হয়, বলতে পারো?"
সায়মা ইভানের বুকের ভেতরের ওম থেকে মুখ না তুলেই মৃদু হাসল। তার হাত দুটো ইভানের পিঠে শক্ত করে ধরেছিল। সে নিচু স্বরে বলল— "কারণ আমাদের প্রেমটা কখনো পুরনো হতে পারেনি। আমরা যে আজীবন একে অপরের চোখে সেই লুকিয়ে প্রেম করা যুগলই রয়ে গেলাম।"
ইভান সায়মার চিবুকটা ধরে মুখটা একটু উঁচিয়ে ধরল। টিমটিমে আলোয় সায়মার চোখ দুটো তখন এক অদ্ভুত মায়ায় জ্বলজ্বল করছে। ইভান আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সায়মার দুই ঠোঁটের মাঝখানের আবার নিজের ঠোঁট দুটো ডুবিয়ে দিল।
বাইরের শীতল বাতাস বারান্দার কাঁচের পাল্লায় মৃদু দোলা দিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ঘরের ভেতরের আবহ তখন দুজনের গভীর নিশ্বাসের উষ্ণতায় এক অন্যরকম ভালোবাসার গল্প লিখছিল।
পরদিন শুক্রবার।
সপ্তাহের একমাত্র ছুটির দিন বলে আজ ফেং ভিলার অন্দরমহলে কারও ঘুম থেকে ওঠার তেমন কোনো তাড়া নেই। চারপাশটা এক অদ্ভুত আলসে শান্তিতে মুড়ে আছে। অ্যারিস আর আইরা তখনও ওপরতলার বেডরুমে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
নিচে ড্রয়িংরুমের বিশাল আরামদায়ক সোফায় প্রায় আধশোয়া হয়ে টিভিতে একটা স্পোর্টস চ্যানেলে লাইভ ফুটবল ম্যাচ দেখছিল ইভান। তার শরীরটা সোফায় থাকলেও মস্তিস্কটা তখনও যেন গতরাতের সেই মধুর স্মৃতির আবেশেই বুঁদ হয়ে ছিল।
বাড়ির মূল রান্নাঘরে— ইনায়া আর শামীমা বেগম একসঙ্গে সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। চুলোয় ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি খিচুড়ি আর ডিম ভাজার ম ম গন্ধ চারপাশের বাতাসকে চনমনে করে তুলেছে।
শামীমা বেগম চুলোর ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দের মাঝেই বললেন— "ইনায়া, সালাদের বাটিটা একটু এগিয়ে দিয়ে লবণটা দাও তো মা।"
— "এই নিন, আম্মু।" ইনায়া সাথে লবণের কৌটোটা এগিয়ে দিল।
ঠিক তখনই সায়মা ওড়নাটা কোনোমতে জড়িয়ে হাই তুলতে তুলতে রান্নাঘরে এসে ঢুকল। তাকে ঢুকতে দেখে ইনায়া তার দিকে ঘুরে তাকাল। তার চোখে-মুখে তখন বিরক্তির ছাপ। সে সায়মার হাতটা সরিয়ে দিয়ে তীব্র গলায় বলল—
— "এক কথা কতবার বলতে হবে তোমাকে সায়মা? একবার বললে মাথায় ঢোকে না নাকি?"
সায়মা থতমত খেয়ে হাতটা গুটিয়ে নিল।
কথাগুলো বলেই ইনায়া আর কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে আবার চুলার ফুটন্ত চায়ের ডেকচির দিকে মন দিল। সায়মা নিজের দুই ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী মুখ করে চুপচাপ রান্নাঘর থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল।
...
ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ইভানের কান এড়ায়নি এই দৃশ্য। সে টিভির রিমোটটা হাতে নিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করে সায়মার সেই গোমড়া মুখের দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল— "একটু ভাবীর কথা শুনলেও তো পারো। সবসময় নিজের জেদ খাটাতে যাও কেন?"
কথাটা বলেই সে টিভিটা অফ করে দিয়ে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল, যেন সেও ভাবীর দলেই আছে। সায়মা এবার ড্রয়িংরুমের মাঝখানেই বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখটা তখন অভিমানে একদম ছোট হয়ে গেছে।
...
ঠিক সেই সময়— ফেং ভিলার গেটটা পেরিয়ে এসে দাঁড়াল একটা ছাই রঙের নোয়া গাড়ি। গাড়ি থেকে নামলেন সায়মার বাবা রফিক সাহেব আর মা শাহানা বেগম। গ্রাম থেকে মেয়ে আর জামাইকে কোনো কিছু না জানিয়ে, একদম হুট করে সারপ্রাইজ দিতেই আজ সাতসকালে তাদের এই আকস্মিক আগমন।
কিন্তু মূল গেট পেরিয়ে সামনে আসতেই ভেতরের খোলা দরজা দিয়ে তাদের কানে ভেসে এলো ইনায়ার শাসনমিশ্রিত কণ্ঠস্বর— "এক কথা কতবার বলতে হবে তোমাকে? একবার বললে বোঝা যায় না নাকি?"
রফিক সাহেব আর শাহানা বেগম—দুজনেই দরজার মুখেই পাথরের মতো থমকে গেলেন। তাদের পায়ের গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। এরপর তারা নিজেদের চোখেই দেখলেন, তাদের আদরের ছোট মেয়ে সায়মা মুখ গোমড়া করে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। আর তার পরপরই জামাই ইভানও তাকে আরও এক চোট শুনিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল— "একটু ভাবীর কথা শুনলেও তো পারো।"
এই পুরো দৃশ্যপট চোখের সামনে দেখামাত্রই শাহানা বেগমের মুখটা মুহূর্তের মধ্যে গম্ভীর আর কালো হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক তীব্র আশঙ্কার ঢেউ আছড়ে পড়ল। তিনি মনে মনে তীব্র ক্ষোভে বললেন— "আমি তো ভেবেছিলাম ইনায়া মেয়েটা বড় ঘরের হলেও বড্ড ভালো আর বিনয়ী! আর ইভান ছেলেটাকেও কত ভদ্র আর শান্ত মনে হয়েছিল! আমার সরল মেয়েটার পেছনে ওরা এভাবে লেগে আছেন? এই রূপ জানলে খোদার কসম, কখনো আমার কলিজার টুকরো মেয়েটাকে এই কোটিপতির বাড়িতে বিয়ে দিতাম না...।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রফিক সাহেবের চোয়ালও শক্ত হয়ে উঠল। পিতৃত্বের এক তীব্র অপমান বোধ তার ভেতরে চাড়া দিয়ে উঠল। তারও মনে হলো— "আমার মেয়েটা কি তাহলে এই রাজপ্রাসাদের মতো বাড়িতে সবার বকুনি খেয়ে মুখ বুজে পড়ে থাকে? জিয়ান ফেংয়ের পরিবার কি তবে সায়মাকে এক ফোঁটাও সম্মান দেয় না?"
ঠিক তখনই সায়মা হুট করে সদর দরজার দিকে তাকাতেই বাইরের আলো-ছায়ার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা চেনা অবয়ব দুটো দেখতে পেল। সে এক মুহূর্তের জন্য নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। তার চোখের সমস্ত মেঘ কেটে গিয়ে সেখানে এক আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল—
— "আম্মু! আব্বু! তোমরা?!"
বলেই সে প্রায় দৌড়ে গিয়ে দরজার বাইরে এসে দুজনকে শক্ত করে জাপটে জড়িয়ে ধরল। তার চোখ দিয়ে তখন খুশির জল উপচে পড়ার দশা— "তোমরা গ্রাম থেকে হুট করে কবে আসলে? আমাকে তো একটা বারও জানাওনি!"
শাহানা বেগম মেয়ের মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। তিনি মেয়ের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে চাপা গলায় প্রশ্ন করলেন— "এইমাত্র , গ্রাম থেকে সোজা এখানে এলাম রে মা। কিন্তু তুই আগে এই কথার উত্তর দে— ওই ইনায়া তোকে ওভাবে বকা দিল কেন? তুই কী অপরাধ করেছিলি?"
সায়মা বাবা-মায়ের এই রুক্ষ রূপ দেখে একটু অবাক হলো। সে নিজের মুখটা আরও একটু ছোট করে অভিমানী গলায় বলল— "ওই... আমি একটু সকালের নাস্তা রান্না করতে গিয়েছিলাম। তার জন্যই ভাবি ওভাবে..."
রফিক সাহেব এবার নিজের রাগ ধরে রাখতে না পেরে একটু চড়া গলায় বললেন— "কী বলছিস তুই সায়মা? শুধু একটু রান্না করতে গিয়েছিলি বলেই একটা মানুষ তোকে ওভাবে যাচ্ছেতাই কথা শোনাবে? এই বাড়িতে কি তোকে চাকর-বাকরের মতো খাটানো হয়?"
সায়মা এবার মাথা নাড়ল। তারপর তার সেই ঠোঁট ফোলানো অভিমানী গলাটা আরও চড়া হলো— "হুম, ঠিক তাই! আমাকে এই বাসায় কোনো কাজই করতে দেয় না আব্বু! আমি একটু হাত বাড়ালেই সবাই মিলে আমাকে বকা দেওয়া শুরু করে। একটু বঁটি ধরলেই ভাবি চিল্লিয়ে ওঠে, আম্মু এসে হাত থেকে হাঁড়ি কেড়ে নেয়, এমনকি ইভানও এসে বলে—'তুমি যাও, রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও, তোমার এসব খাটুনি করতে হবে না।' আমি কি এই বাড়ির কেউ না যে আমাকে কোনো কাজই করতে দেবে না?!"
মেয়ের মুখের এই অদ্ভুত এবং নিষ্পাপ নালিশ শোনামাত্রই রফিক সাহেব আর শাহানা বেগম—দুজনেই আক্ষরিক অর্থেই পুরো বোকা বনে গেলেন। তারা কয়েক সেকেন্ড সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে একে অপরের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে বাবা-মা ভাবছিলেন তাদের মেয়ে হয়তো শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারে কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, এখন তারা বুঝতে পারলেন ঘটনা আসলে সম্পূর্ণ উল্টো! এই বাড়িতে সায়মাকে কষ্টের কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ ঘরের কাজটুকুও করতে দেওয়া হয় না। বরং রাজকুমারীর মতো সবাই তাকে এক অদৃশ্য ভালোবাসার চাদরে আগলে রাখে।
শাহানা বেগম নিজের ভুল বুঝতে পেরে হুট করেই খিলখিল করে হেসে ফেললেন। সুতির আঁচলটা মুখে চেপে বললেন— "আমরা তো তোদের এই ঘরের বাইরের চিল্লামিলি শুনে অন্য কিছুই ভেবে মারাত্মক এক অনর্থ ঘটিয়ে ফেলেছিলাম!"
সায়মা অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে তাকাল— "অন্য কী ভেবেছিলে আম্মু?"
রফিক সাহেব নিজের শক্ত হয়ে থাকা চোয়ালটা মুচকি হেসে উত্তর দিলেন— "দূর থেকে তোর ওই শুকনো আর গোমড়া মুখটা দেখে আমাদের মনে হয়েছিল, তোকে বুঝি এই বাড়ির সবাই মিলে মারাত্মক কোনো অত্যাচার করছে।"
সায়মা এবার পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরে নিজেও হো হো করে হেসে ফেলল— "আরে না, আব্বু! তোমরাও যে কী ভাবো না! ভাবি তো বিয়ের আগেও এমন কড়া ছিল, এখনও ঠিক একই রকম আছেন। উনি বাইরে যেমন ব্যারিস্টার, ঘরের ভেতরও ওনার রুলস একই রকম।"
ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে ইনায়ার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর আবার ভেসে এল—
— "সায়মা! তোমার স্পেশাল এলাচ চা কিন্তু টেবিলে ঢালা হয়ে গেছে। আর পাঁচ মিনিট বাইরে থাকলে ওটা পুরো বরফ হয়ে যাবে। তখন কিন্তু আমি আর নতুন করে করে দেব না!"
সায়মা হেসে বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ নাচাল— "দেখলে তো আব্বু? আমার ভাবির শাসনের দ্বিতীয় ডিরেকশন আবার শুরু হয়ে গেছে।"
রফিক সাহেব আর শাহানা বেগম এবার সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত মনে, এক বুক হালকা অনুভব নিয়ে মেয়ের হাত ধরে ফেং ভিলার ড্রয়িংরুমে পা রাখলেন। তাদের মনের কোণে জমে থাকা শেষ কুয়াশাটুকুও নিমেষে উধাও হয়ে গেল—তারা বুঝতে পারলেন, এই বাড়িতে সায়মা বকুনি পেলেও, সেই কড়া বকুনির আড়ালে আছে এক মহাসমুদ্রের মতো যত্ন আর অগাধ পারিবারিক ভালোবাসা।
ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই সোফা গোছাতে থাকা শামীমা বেগম সবার আগে তার বেয়াই-বেয়ানকে দেখতে পেলেন। আকস্মিক এই অতিথিদের দেখামাত্রই তার মুখে এক মস্ত বড় আন্তরিকতার হাসি ফুটে উঠল—
— "আরে! বেয়াই সাহেব! বেয়ান! আপনারা সাতসকালে এভাবে?"
তিনি দ্রুত নিজের হাতের কাজ ফেলে এগিয়ে এসে শাহানা বেগমকে জড়িয়ে ধরে সালাম বিনিময় করলেন— "কবে এলেন ঢাকাতে? আসার আগে তো একটা বারও ফোন করে জানালেন না! জানলে ইভানকে তো সোজা বাস টার্মিনালে গাড়ি নিয়ে পাঠাতাম!"
শাহানা বেগম এবার নিজের আগের সেই ভুল ধারণার কথা ভেবে মনে মনে একটু অপ্রস্তুত ও লজ্জিত হয়ে বললেন— "আসলে ভাবলাম, কোনো কিছু না জানিয়ে হুট করে এসেই মেয়ে আর জামাইটাকে একটা চমক দেব।"
রান্নাঘরের অ্যাপ্রনটা শরীর থেকে খুলতে খুলতে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকল ইনায়া। রফিক সাহেব আর শাহানা বেগমকে সোফায় বসতে দেখে সে নিজের সেই গম্ভীর রূপটা এক পাশে সরিয়ে রেখে অত্যন্ত বিনীতভাবে মুচকি হেসে সালাম দিল—
— "আসসালামু আলাইকুম, আঙ্কেল... আসসালামু আলাইকুম, আন্টি। আপনারা কখন এলেন?"
— "ওয়ালাইকুমুস সালাম, মা। এই তো মাত্রই এসে পৌঁছালাম।" রফিক সাহেব স্নেহের সুরে বললেন।
ইনায়া চটপটে গলায় বলল— "আপনারা অনেক জার্নি করে এসেছেন, হাত-মুখ ধুয়ে আরাম করে বসুন। সায়মা, একটু সাহায্য করো ওনাদের ঘরটা ঠিক করতে। আমি চট করে ভেতরের কিচেন থেকে গরম নাস্তার ব্যবস্থা করছি।"
শাহানা বেগম এবার আর নিজের ভেতরের সেই কৌতূহলটা সামলাতে পারলেন না। তিনি হালকা হেসে বললেন— "তা তো করবেই মা... তবে একটু আগে রান্নাঘরে যে সায়মা মেয়েটাকে ওভাবে এত বড় বকা দিলে, তার কী হবে?"
ইনায়া প্রথমে আক্ষরিক অর্থেই কিছুটা অবাক হলো। তার চোখ জোড়া এক পলক পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সায়মার চোরের মতো মুখের দিকে তাকাতেই সে পুরো ক্রাইম সিনের ব্যাকগ্রাউন্ডটা বুঝে ফেলল। সে হেসে মাথা নাড়ল—
— "ওহ... আচ্ছা! আপনারা তাহলে ওই দরজার মুখের অর্ধেক ডায়লগটুকুই শুনেছেন?"
রফিক সাহেব মুচকি হেসে বললেন— "হ্যাঁ মা। হুট করে শুনে তো আমরা বুড়ো-বুড়ি একটু কেঁপেই গিয়েছিলাম।"
ইনায়া এবার সায়মার দিকে নিজের তর্জনী আঙুলটা উঁচিয়ে ধরে আন্টির দিকে তাকিয়ে বলল— "আচ্ছা আন্টি, আপনিই এবার আপনার এই গুণধর মেয়ের এজাহারটা শুনুন। আপনিই ওকে জিজ্ঞেস করুন তো— গত এক মাসে ও এই রান্নাঘরে এসে নিজের খামখেয়ালিতে কতবার হাত পুড়িয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে?"
সায়মা নিজের মাথাটা একদম নিচু করে, মেঝের কার্পেটের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে অপরাধীর মতো বলল— "উম... মোটে দু'বার..."
শামীমা বেগম সোফার ওপাশ থেকে চায়ের কাপ রাখতে রাখতে সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে উঠলেন— "দু'বার না বেয়ান, তিন তিনবার! সেদিন তো ফুটন্ত গরম ডালের হাঁড়ি খালি হাতে ধরতে গিয়ে নিজের পুরো ডান হাতটা লাল করে ফোস্কা ফেলে বসেছিল। আর তার জন্য দুই দিন এই বাড়িতে রান্নার চুলোই জ্বলেনি, সবাই ওর সেবা করেছে।"
সায়মা এবার লজ্জায় আর কোনো পথ না পেয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল।
ইনায়া হেসে রফিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল— "ঠিক এই কারণেই আঙ্কেল, ও যখনই এই ধারালো বঁটি বা চুলোর দিকে একটু হাত বাড়ায়, আমি আগে থেকেই ওকে কড়া বকা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিই। কারণ ও কাজ করতে গেলে কাজের চেয়ে নিজের শরীরের ক্ষতিটাই বেশি করে বসবে।"
শামীমা বেগমও বেয়ানের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন— "ও হলো আমাদের ফেং ভিলার সবচেয়ে ছোট আর আদরের বউ। একটু-আধটু আদর আর শাসন তো ও আমাদের সবার কাছ থেকেই পাবেই, বলুন?"