অ্যারিস কাঁপানো গলায় বললো, "ইনায়া... আদিয়ান ভাই... এক্সিডেন্ট... হসপিটালের ইমার্জেন্সি... চল!"
অ্যারিস আর ইভান ঝড়ের গতিতে অফিস থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে ছুটলেন। যাওয়ার পথে ইভান ওদের দুই পরিবারকে—অর্থাৎ মা, সাইমা এবং ওদিকে সুবাকে ফোন করে খবরটা দিলেন।
মিনিট পনেরোর মধ্যে পুরো দুই পরিবার তছনছ হয়ে যাওয়া মন নিয়ে হসপিটালে এসে পৌঁছাল। সুবা ওর ডিউটির অ্যাপ্রন পরা অবস্থাতেই ওটি-র করিডোর দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলেন, পেছনে সিয়ানকে কোলে নিয়ে আনিসুর রহমান আর আফরিন সুলতানা আসছিলেন। সবাই এখন সেই ইমার্জেন্সি রুমের দরজার বাইরে জড়ো হয়েছেন। করিডোরের সাদা আলোটা যেন ওদের সবার মুখের ওপর একটা কালচে ছায়া ফেলছিল। অ্যারিস দেয়ালের এক কোণায় পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন, তার দুই হাত মুঠো করা, কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইমার্জেন্সি রুমের ভারী দরজাটা খুলে গেল। ডাক্তাররা গম্ভীর মুখে বের হয়ে এলেন। ওনারা জানালেন, ইনায়ার প্রাথমিক চিকিৎসা শেষ এবং ওকে আপাতত একটা ভিআইপি কেবিনে শিফট করা হয়েছে, তবে ওনার জ্ঞান এখনো ফেরে নি।
সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই ডক্টর অ্যারিসের সামনে এসে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত দুঃখিত গলায় বললেন,
"আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি মিস্টার অ্যারিস ফেং... আমরা ওনার লাইফ সেভ করতে পেরেছি, কিন্তু গাড়ির ওই মারাত্মক ধাক্কা আর পেটে প্রচণ্ড প্রেশার লাগার কারণে আমরা ওনার বাচ্চাটাকে বাঁচাতে পারলাম না। শি হ্যাড আ কমপ্লিট মিসক্যারেজ..... আমরা অনেক ট্রাই করেছি, কিন্তু ব্লিডিং কিছুতেই কন্ট্রোল করা যাচ্ছিল না। আই অ্যাম রিয়ালি সরি..."
ডক্টরের শেষ শব্দটা উচ্চারণ করার সাথে সাথেই পুরো হসপিটালের করিডোরে যেন একটা বজ্রপাত হলো। শামীমা বেগম আর সাইমা নিজেদের মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। সুবা আফরিন সুলতানার বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন।
আর অ্যারিস? ওর পায়ের তলার মাটিটা যেন সরে গেল। ওর কানের ভেতর ডক্টরের ওই একটা শব্দ "মিসক্যারেজ" বারবার হাতুড়ির মতো আঘাত করতে লাগল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল ইনায়ার সেই লাজুক হাসি, আইরার সেই দুটো খেলার সাথি পাওয়ার আনন্দ... সবকিছু এক পলকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
অ্যারিস করিডোরের সেই ঠান্ডা মেঝের ওপর ধপ করে বসে পড়লেন। দুই হাত ওর মাথার ওপর উঠে গেল। ওর মতো একজন অপরাজেয়, শক্তিশালী মাফিয়া কিং আর বিজনেস টাইকুনকে আজ দেখে মনে হচ্ছিল—সে যেন তার পুরো দুনিয়াটাই চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে মেঝেতে পড়তে লাগল, কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো চিৎকার বের হলো না। এক বুক ভাঙা স্তব্ধতা তাকে গ্রাস করে নিল। চিন্তা ছিলো বাচ্চা নিয়ে না। তার কাছে ইনায়ার বেঁচে থাকাটাই আসল। তবে ইনায়া এই ব্যাপারটা জানলে তার অবস্থার কথা ভেবেই তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিলো।
মেঝের ওপর অ্যারিসকে ওভাবে ধপ করে বসে পড়তে দেখে ইভান নিজের চোখের জল মুছে এক ছুটে এসে অ্যারিসকে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন।
ইভান কেঁদে ফেলে, অ্যারিসকে টেনে তোলার চেষ্টা করে, "ভাইয়া! নিজেকে এভাবে ভেঙে ফেলো না ভাইয়া, প্লিজ ওঠো! ভাবির এই অবস্থায় তুমি যদি এভাবে ভেঙে পড়ো, তবে ভাবিকে কে সামলাবে? ওনার জ্ঞান ফিরলে ওনাকে তোমাকেই তো বুকে টেনে নিতে হবে ভাইয়া! ওঠো প্লিজ!"
আনিসুর রহমানের বুকে মুখ গুঁজে থাকা সিয়ান তখন কিছু না বুঝেই ফুঁপিয়ে কাঁদছিল, আর আনিসুর রহমান ও সুবা ওকে সামলানোর চেষ্টা করছিলেন।
অ্যারিস ইভানের কথায় যেন একটু বাস্তবে ফিরলেন। সে তার চোখের জলটা মুছে দিয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালো। তার ভেতরের কষ্টটা এবার এক ভয়ানক, আর খুনে হিংস্রতায় রূপ নিতে শুরু করল। ওর চোখের মণি দুটো যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল হয়ে উঠল।
সে এগিয়ে গেল ইনায়ার ভিআইপি কেবিনের দিকে। দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। সাদা ধবধবে বিছানায় ইনায়া শুয়ে আছেন। মুখটা একদম ফ্যাকাসে, ঠোঁট দুটো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এক হাতে স্যালাইনের সুঁই ফুটানো, আর ওপাশে হার্ট মনিটরের ধীর গতির 'বীপ... বীপ...'
আওয়াজটা পুরো রুমের স্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলছে।
অ্যারিস নিঃশব্দে গিয়ে ইনায়ার বিছানার পাশে বসলেন। সে ইনায়ার সেই স্যালাইন লাগানো হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিলো। ইনায়ার কপালে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াতেই তার চোখ দিয়ে আবার এক ফোঁটা জল ইনায়ার গালে গিয়ে পড়ল।
অ্যারিস একদম ভাঙা গলায় বললো, "আমাকে মাফ করে দিও বউ... আমি তোমাকে প্রটেক্ট করতে পারলাম না। আমাদের সেই ছোট্ট স্বপ্নটাকে আমি বাঁচাতে পারলাম না..."
অ্যারিস ইনায়ার হাতটা বিছানায় নামিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কেবিনের ভিতরে ঢুকে মাহি হন্তদন্ত হয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল।
মাহি মাথা নিচু করে, ভয়ার্ত গলায় বললো, "বস... এক্সিডেন্টের স্পটে আমাদের ইনভেস্টিগেশন টিম পৌঁছে গেছে। ওই ১০ চাকার ট্রাকের ড্রাইভার এক্সিডেন্ট করার পরপরই ট্রাক ফেলে ওখান থেকে পালিয়ে গেছে। কিন্তু..."
অ্যারিস মাহির কলারটা চেপে ধরে, ওর চোখে তখন আস্ত একটা ডেভিল। "কিন্তু কী মাহি?! এক লাইনে বল, ওটা কি সাধারণ এক্সিডেন্ট ছিল নাকি মার্ডার অ্যাটেম্পট?!"
"বস... ওটা কোনো নরমাল এক্সিডেন্ট ছিল না। আমাদের হ্যাকার টিম ওই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ চেক করে দেখেছে—ওই ট্রাকটা গত এক ঘণ্টা ধরে আপনাদের বাসার বাইরে একটা রাস্তায় ওত পেতে দাঁড়িয়ে ছিল। ইনায়া ম্যাম আর আদিয়ান স্যার গাড়ি নিয়ে বের হতেই ওটা ওনাদের ফলো করা শুরু করে এবং ওই ফাঁকা ইন্টারসেকশনে এসে ব্রেক না চেপে সরাসরি ওনাদের গাড়িকে হিট করে! এটা একটা প্রি-প্ল্যানড ক্রাইম, বস! ওরা ম্যামকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল!"
কথাটা শোনামাত্রই অ্যারিস মাহিকে ছেড়ে দিলো। অ্যারিসের ঠোঁটের কোণে এবার এক পিশাচের মতো ভয়ঙ্কর হাসি ফুটে উঠল। তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দটাকে যারা এভাবে কেড়ে নিল, পেটের সন্তানকে যারা দুনিয়া দেখার আগেই শেষ করে দিল—ওদের জন্য অ্যারিস ফেং এবার নরকের দরজাটা নিজের হাতে খুলবেন।
অ্যারিস ওর ফোনটা বের করে তার আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়া ডার্ক-নেটওয়ার্কের স্পেশাল ডেথ-স্কোয়াডের কমান্ডারকে কল দিলেন। অ্যারিসের গলা তখন এতটাই ঠান্ডা যে শুনলে যে কারোর রক্ত হিম হয়ে যাবে।
"ঢাকার মাটির নিচে যত ইঁদুর আছে, সবগুলোকে টেনে বের করো। ওই ট্রাকের ড্রাইভার আর ওটার মালিককে আগামী দুই ঘণ্টার মধ্যে আমার টর্চার সেলে জ্যান্ত চাই। আর যে এই অর্ডার দিয়েছে —তাকে এমন শাস্তি দেবো যে সে মরার জন্য আল্লাহর কাছে ভিখ মাগবে! হান্ট দেম ডাউন!!!"
আরো দুই ঘণ্টা পার হয়ে গেল। অপারেশন থিয়েটারের বাইরের লাল বাতিটা অবশেষে নিভে গেল। ডক্টররা ক্লান্ত মুখে বের হয়ে আদিয়ানের পরিবারকে আশ্বস্ত করলেন। "আদিয়ানের সার্জারি সাকসেসফুল হয়েছে। ওনার সারা শরীর আর হাতে ব্যান্ডেজ করা হয়েছে, আর মাথার ভেতরে যে মারাত্মক চোটের কারণে রক্তক্ষরণের ভয় ছিল, মেডিসিন দিয়ে সেটা এখন পুরোপুরি ডাক্তারদের নিয়ন্ত্রণে। ওনাকেও ওটি থেকে বের করে একটা আইসোলেটেড কেবিনে শিফট করা হয়েছে, যদিও ওনার জ্ঞান ফিরতে এখনো বেশ কিছুটা সময় লাগবে।"
এদিকে, ইনায়ার কেবিনের ভেতরে তখন এক থমথমে নীরবতা। জানালার বাইরে বিকেলের ম্লান আলোটা এসে পড়েছে বিছানার এক কোণায়।
ইনায়ার হাতের আঙুলগুলো একটু নড়ে উঠল। ধীর ধীরে চোখের পাতা দুটো মেললো সে। সিলিংয়ের সাদা আলোর দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকার পর তার স্মৃতিতে ভেসে উঠল সেই ট্রাকের তীব্র হর্ন আর ভাইয়ার সেই শেষ চিৎকার!
অ্যারিস এতক্ষণ ইনায়ার বিছানার পাশেই ওর হাতটা ধরে বসেছিলেন। ইনায়াকে চোখ মেলতে দেখেই সে কিছুটা ঝুঁকে এলেন, তার চোখে-মুখে এক অদ্ভুত আকুলতা আর ভয়।
অ্যারিস খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো, "বউ? তুমি ঠিক আছ? কোথাও খুব বেশি কষ্ট হচ্ছে?"
ইনায়া অ্যারিসের দিকে তাকালেন। ওর চোখে কোনো জল নেই, কোনো আকুলতা নেই, নেই কোনো আর্তনাদ। সে একদম স্বাভাবিক আর শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন— "বাচ্চাটা নেই??"
ইনায়ার গলার এই অতিপ্রাকৃতিক শান্ত ভাব দেখে অ্যারিসের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। সে ইনায়াকে রাগ করতে দেখেছেন, কাঁদতে দেখেছেন, ইমোশনাল হতে দেখেছেন—কিন্তু এতটা শান্ত, এতটা নিস্পৃহ থাকতে সে ওকে আগে কখনো দেখেননি। ওর এই শান্ত রূপটা যেন ওর কান্নার চেয়েও হাজার গুণ বেশি ভয়ঙ্কর আর বুকফাটা!
অ্যারিস নিজের চোখের জল আর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নাটাকে কোনোমতে চেপে ধরলো। ওর গলাটা কাঁপছিল। সে ইনায়ার হাতটা ধরে কোনোভাবে বললেন— "নেই... আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না বউ..."
অ্যারিসের এই একটা লাইনের স্বীকারোক্তির পর ইনায়া আর একটা কথাও বললেন না। তার চোখ দুটো অ্যারিসের মুখ থেকে সরে গিয়ে আবার সেই শূন্য সিলিংয়ের দিকে আটকে গেল। চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জলও গড়িয়ে পড়ল না, সে একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেললেন না।
সে কেমন যেন একদম চুপচাপ হয়ে গেলেন। সেই চেনা চঞ্চলতা, ঠোঁটের সেই মিষ্টি হাসি—সব যেন এক মুহূর্তে কোথাও হারিয়ে গেল। সে কাঁদলোও না, আবার হাসলোও না; পুরো অস্তিত্বটা যেন একটা জীবন্ত পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। ওর এই ভয়ঙ্কর নীরবতা যেন পুরো কেবিনের বাতাসকে ভারী করে তুলল, যা দেখে পাশে বসে থাকা অ্যারিসের মনে হচ্ছিল ওর নিজের কলিজাটা কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। নিজের সন্তানকে হারিয়ে ইনায়া ওর ভেতরের নিজেকেই যেন পুরোপুরি লক করে ফেলেছেন।
ইনায়ার এই অদ্ভুত নীরবতা অ্যারিসের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। অ্যারিস বারবার ইনায়ার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে, কিন্তু ইনায়া যেন এক অদৃশ্য দেওয়াল তুলে নিয়েছে। অ্যারিস ওর মাথায় হাত রাখছে, কপালে চুমু খাচ্ছে, ইনায়ার প্রিয় কোনো খাবারের কথা বলছে—কিন্তু ইনায়া কোনো কথারই উত্তর দিচ্ছেন না। ওর দৃষ্টি যেন বাইরের কোনো এক অসীমের দিকে স্থির হয়ে আছে। অ্যারিস বুঝতে পারছেন, ইনায়া শুধু ওর সন্তানকেই হারায়নি, বরং ওর ভেতরের সেই প্রাণবন্ত মানুষটাকেও এই ট্রমা পুরোপুরি স্তব্ধ করে দিয়েছে।
আইরাকে নিয়ে শামীমা বেগম কেবিনে ঢুকলেন। মা ইভান আর সাইমার সাথে বাইরে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, আর আইরা মায়ের এই অবস্থা দেখে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে। আইরাকে দেখেই অ্যারিস একপাশে সরে গেলেন, আশা ছিল হয়তো মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইনায়া কথা বলবে।
আইরা দৌড়ে গিয়ে বিছানার পাশে দাঁড়াল। ও ছোট ছোট হাত দিয়ে ইনায়ার একটা হাত ধরল।
"মাম্মা? তুমি আমার সাথে কথা বলছ না কেন? তুমি কি খুব কষ্ট পাচ্ছ? আমি জানি তুমি খুব কষ্ট পাচ্ছ... কিন্তু তুমি এভাবে চুপচাপ থাকলে আমি কার সাথে কথা বলব?মাম্মা, প্লিজ!"
আইরা ইনায়ার হাতের ওপর নিজের গালটা রাখল। ইনায়া আইরার কণ্ঠস্বর শুনে ওর দিকে তাকালে। সেই ভাবলেশহীন চোখে আইরার দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ আইরার সেই কচি মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ইনায়ার ঠোঁট দুটো কিঞ্চিৎ কাঁপল কি? অ্যারিস এক মুহূর্তের জন্য আশা দেখলেন। কিন্তু পরক্ষণেই ইনায়া আবার তার দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। আবার বাইরের জানালার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ইনায়ার এই প্রতিক্রিয়ায় আইরা ভেঙে পড়ল। ও অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "বাবা, মাম্মা কি আমাকে ভালোবাসে না এখন? আমার দিকে তাকাচ্ছেও না!"
অ্যারিস আইরাকে জড়িয়ে ধরে নিজের চোখের জল সামলালো। ইনায়ার এই মানসিক অবস্থা থেকে ওকে বের করে আনা এখন অ্যারিসের জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ইনায়ার জ্ঞান ফিরেছে শুনে ল্যাব রিপোর্টের ফাইল হাতে সুবা, আনিসুর রহমান, আফরিন সুলতানা এবং সিয়ান —সবাই একে একে কেবিনের ভেতরে এসেছিলেন। আফরিন সুলতানার চোখ দুটো তখনো কান্নায় লাল, সুবাও এসে ইনায়ার হাতটা ধরেছিলো। কিন্তু ইনায়া ওদের কারও কোনো কথারই উত্তর দিলেন না। এমনকি ওরা যখন ওর বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালেন, ইনায়া ওদের দিকে একটা বারের জন্যও তাকালো না। ওর দৃষ্টি যেন এক জায়গায় জমে বরফ হয়ে গেছে। বান্ধবীর এই অবস্থা দেখে সুবা ওর মুখটা চেপে ধরে কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন, বাড়ির বড়রাও ওর এই পাথর হয়ে যাওয়া রূপ দেখে ভেতরে ভেতরে আতঙ্কে শিউরে উঠলেন।
ডাক্তাররা এসে ইনায়ার শারীরিক কন্ডিশন এবং ব্লিডিং চেক করার পর জানালেন, ওনার শরীরের বাকি প্যারামিটারগুলো ঠিক আছে, কিন্তু ওনার এই মানসিক ট্রমা কাটতে সময় লাগবে। তাই হসপিটালে আর ফেলে না রেখে ওনাকে ওনার চেনা পরিবেশে নিয়ে যাওয়াই ভালো।
তিন ঘণ্টা পর সমস্ত ফর্মালিটি শেষ করে ইনায়াকে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হলো। আদিয়ানের যেহেতু জ্ঞান ফেরেনি এবং ওর ২৪ ঘণ্টার অবজারভেশন পিরিয়ড চলছে, তাই বাকি সবাই হসপিটালেই থেকে গেলেন। অ্যারিস ইনায়া আর আইরাকে নিয়ে ওর নিজের ব্ল্যাক এসইউভি গাড়িটা নিয়ে ফেং ম্যানশনের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।
গাড়ির পেছনের সিটে আইরা এতক্ষণের কান্নাকাটির কারণে ক্লান্ত হয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়েছে। আর ফ্রন্ট সিটে সিটবেল্ট পরা ইনায়া ঠিক আগের মতোই নিথর হয়ে বসে আছেন। গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনের বাইরে ঢাকার রাজপথের নিয়ন আলো ওর মুখের ওপর এসে পড়ছে, কিন্তু ওর সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। সে এক দৃষ্টিতে জানালার বাইরে রাতের অন্ধকারের দিকে চেয়ে আছে, ওর চোখ দুটো যেন পুরো দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
অ্যারিস স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে আছেন, ওর বুকের ভেতরটা তখনো ইনায়ার এই রূপ দেখে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে। গাড়িটা যখন একটা নিঝুম, গাছপালায় ঘেরা অন্ধকার রাস্তায় এসে পৌঁছাল হেডলাইটের তীব্র আলোর সামনে আচমকা এক মহিলা এসে পড়লো! ওনার পরনে একটা ঢিলেঢালা পোশাক, এলোমেলো চুলগুলো বাতাসে উড়ছে।
অ্যারিস একদম শেষ মুহূর্তে ব্রেক চেপে বললো, "ড্যাম ইট!"
টায়ারের তীব্র ঘর্ষণের শব্দে গাড়িটা ওই মহিলার ঠিক এক ইঞ্চি সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। কিন্তু ইনায়ার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, সে যেমন এক নজরে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, ঠিক তেমনই রইলে। ওর চারপাশের দুনিয়ায় কী ঘটছে, তা ওর মস্তিষ্ক যেন গ্রহণই করছে না।
অ্যারিস বিরক্ত হয়ে গাড়ির ডোর লক খুলে নিচে নামলেন। ওর এমনিতেই মাথা গরম হয়েছিল, ওর ইচ্ছা ছিল ওই মহিলার ওপর চিৎকার করে উঠবেন। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে, হেডলাইটের তীব্র সাদা আলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মহিলার মুখের দিকে তাকাতেই—অ্যারিসের পুরো শরীর এক সেকেন্ডের জন্য বরফ হয়ে গেল!
ওর বুকের ভেতরের হৃৎস্পন্দনটা যেন ধপ করে থমকে গেল। অ্যারিস পুরো নিথর হয়ে মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। ওর পা দুটো যেন মাটির সাথে কেউ পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে, সামনে এক পা এগিয়ে যাওয়ার মতো বিন্দুমাত্র কোনো শক্তি ওর শরীরে অবশিষ্ট নেই।
অ্যারিসের চোখের মণি দুটো বিস্ময়ে একদম বড় বড় হয়ে গেল।
অ্যারিসের ঠোঁট দুটো অবশ হয়ে আসছিল, গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ ফুটছিল না। হেডলাইটের তীব্র আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে কেবল দুটো শব্দ উচ্চারণ করতে পারলেন— "ম......মা..."
হ্যাঁ, এই মহিলাই অ্যারিসের জন্মদাত্রী মা। অ্যারিসের যখন মাত্র ৪ বছর বয়স, তখন ওর আসল বাবা আর মায়ের মধ্যে ডিভোর্স হয়ে যায়। ওরা ওই ৪ বছরের অবুঝ অ্যারিসকে সম্পূর্ণ একা, ফেলে রেখে যে যার মতো নিজেদের নতুন জীবনে চলে যান। পরবর্তীতে শামীমা বেগম আর জিয়ান ফেং ওই অনাথ, অসহায় অ্যারিসকে খুঁজে পান এবং আইনিভাবে দত্তক নিয়ে নিজেদের ফেং ফ্যামিলির বড় ছেলে হিসেবে বড় করে তোলেন।
আজ এতগুলো বছর পর সেই মা ওর সামনে দাঁড়িয়ে। মহিলার চেহারা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ওনার মানসিক অবস্থা এখন আর স্বাভাবিক নেই। ওনার পরনে মলিন কাপড়, চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা। ওনার ডান হাতে একটা জরাজীর্ণ, পুরনো ছবি—যেটা অ্যারিসের ৪ বছর বয়সের ছবি! মহিলা রাস্তার একেকজনকে সেই ছবিটা দেখাচ্ছিলেন আর পাগলের মতো জিজ্ঞেস করছিলেন, "আমার ছেলেকে কোথাও দেখেছেন? ও আমার ওপর রাগ করে চলে গেছে... ওকে একটু খুঁজে দেবেন?" এই জিজ্ঞেস করতে করতেই সে খেয়াল না করে সরাসরি অ্যারিসের গাড়ির সামনে এসে পড়েছিলেন।
অ্যারিস গাড়ি থেকে নেমে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মহিলা অ্যারিসের মুখের দিকে তাকালেন। ওনার ঝাপসা চোখে যেন ওনার সেই ৪ বছরের ছেলের অবয়বটা ভেসে উঠল। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে ওনাদের দুজনের মধ্যে এক দীর্ঘ আবেগঘন কথাবার্তা হলো।
অ্যারিসের বুকের ভেতর এক তীব্র ঝড় বয়ে গেল। অতীত ওকে যত কষ্টই দিক না কেন, এই মুহূর্তে ওর মায়ের এই করুণ অবস্থা দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। একটু পর অ্যারিস ওর মায়ের হাত ধরে ওনাকে যত্ন সহকারে গাড়ির ব্যাক সিটে, যেখানে আইরা ঘুমাচ্ছিল, ওর পাশে বসিয়ে দিলেন।
গাড়ির ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা ইনায়ার এই পুরো ঘটনা, অ্যারিসের মা, ওদের দীর্ঘ কথোপকথন—কোনো কিছুর দিকেই বিন্দুমাত্র খেয়াল ছিল না। ওর চোখ দুটো তখনো জানালার কাঁচের ওপাশে রাতের সেই কালচে অন্ধকারের দিকে আটকে ছিল। সে নিজে আসলে কোথায়, কিসের দিকে চেয়ে আছে, তা হয়তো ওর নিজের মস্তিষ্কও এই মুহূর্তে জানে না। ওর ভেতরের পুরো জগতটাই যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ পর অ্যারিস গাড়ি নিয়ে ফেং ম্যানশনে ফিরে এলো। গাড়ি থেকে নামার পর ইনায়া আর দাঁড়ালো না। অ্যারিস ওকে ধরার জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন, কিন্তু ইনায়া ওর কোনো সাপোর্ট না নিয়ে, যান্ত্রিকভাবে গাড়ি থেকে নেমে সোজা নিজের রুমের দিকে হেঁটে চলে গেলো। হাঁটাচলার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল শুধু নিস্পৃহতা।
অ্যারিস একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আইরাকে কোলে নিয়ে ওর সেই জন্মদাত্রী আসল মাকে ভেতরের একটা বড় গেস্ট রুমে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। ওর মাকে আপাতত ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নেওয়ার জন্য বলে, অ্যারিস আইরা কে নিয়ে আইরার রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।