পরদিন সকাল...
ফেং ম্যানশনের বিশাল ড্রয়িংরুমের সোফাটায় একদম পা দুলিয়ে, নবাবী কায়দায় বসে আছেন ঝর্ণা বেগম। সকালের ব্রেকফাস্ট করার জন্য বাড়ির সবাই একে একে নিচে নেমে আসছিল। টেবিলে খাবার সাজানো, কিন্তু ঝর্ণা বেগমের এই অকারণ রাজকীয় ভাবভঙ্গি এবং অহংকারী চাউনি দেখে অ্যারিস বাদে বাড়ির বাকি সবার মুখ বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। ইনায়া চলে যাওয়ার পর এই মহিলা নিজেকে এই বাড়ির সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেছেন।
এদিকে সায়মার এখন প্রেগনেন্সির ৫ মাস চলছে। ওর বেবি বাম্প এখন বেশ ভালোমতোই বোঝা যাচ্ছে, পেটটা অনেকটাই ফুলে উঠেছে। ইভান এই সময় সায়মার একটুও কষ্ট হতে দেয় না; ছায়ার মতো আগলে রাখে, একদম রাজকন্যার মতো ভীষণ যত্ন নেয় ওর। ইভান সায়মার হাত ধরে সাবধানে ডাইনিং টেবিলের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।
তাদের ওভাবে যেতে দেখে সোফা থেকে ঝর্ণা বেগম এক হাত নেড়ে কর্কশ গলায় টিটকারি মারলেন—
"বলি, সবাই দল বেঁধে ওদিকে কোথায় যাওয়া হচ্ছে শুনি?"
সায়মা এমনিতেই ঝর্ণা বেগমকে একদম সহ্য করতে পারে না। ও ইভানের বাহু চেপে ধরে প্রথমে একদম আস্তে করে ফিসফিসিয়ে বলল, "আমরা তো আমেরিকা যাচ্ছি নাস্তা করতে। আবাল মার্কা মহিলা। চোখে দেখে না, নেবা হয়েছে নাকি?.।"
তারপর ডাইনিং টেবিলের সামনে এসে ঝর্ণা বেগমের দিকে ঘুরে একটু তেজ দেখিয়ে আবার জিজ্ঞেস করল, "কই যাচ্ছি মানে? ব্রেকফাস্ট করতে ডাইনিং টেবিলে যাচ্ছি! সকাল সকাল চোখেও কি কম দেখছেন নাকি?"
সায়মার এই তাৎক্ষণিক ত্যাঁদড়ামি আর মুখের ওপর দেওয়া জবাব শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইভান মুখ নামিয়ে মুচকি হাসল।
ইভানের হাসি দেখে ঝর্ণা বেগমের যেন গায়ে ফোসকা পড়ল। সে সোফা থেকে ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন—
"মুখ সামলে কথা বলো সায়মা! মনে রেখো, আমার বাড়িতে কোনো ত্যাঁড়া কথা চলবে না! এই বাড়িতে থাকতে হলে আমার নিয়মেই থাকতে হবে!"
ওনার মুখে 'আমার বাড়িতে' শব্দটা শুনে টেবিলে বসা শামীমা বেগম আর জিয়ান ফেং-এর চামচ হাত থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো। অ্যারিস তখনো নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে বসে ছিল, ওর এসবে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিন্তু বাকি সবার বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছাল। মাত্র কদিন ওনাকে এই বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছে, আর উনি এখনই একদম মাথায় উঠে নাচতে শুরু করেছেন!
ইভান সায়মাকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে ডাইনিং স্পেস থেকে ড্রয়িংরুমে এগিয়ে এল। ওর চোখ-মুখ তখন রাগে শক্ত।
ইভান হাত দুটো পকেটে পুরে, কড়া গলায় বললো, "আপনার বাড়ি মানে? মুখ সামলে কথা বলুন ঝর্ণা বেগম। এটা ফেং ম্যানশন, আমার ভাইয়ার বাড়ি। আপনি এই বাড়ির কেউ নন। এতই যদি নিজের বাড়ি দাবি করার শখ থাকে, তাহলে দলিল দেখান এই বাড়ির!"
ইভান ভেবেছিল এই কথা শুনে ঝর্ণা বেগম দমে যাবেন। কিন্তু ওর ধারণা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করে ঝর্ণা বেগম ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে তুললেন।
"দলিলের কথা বলছিস তো? দাঁড়াবাপু, তোদের সেই শখটাও মিটিয়ে দিচ্ছি!"
সে তার সাথে থাকা ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে একটা আইনি ফাইল বের করলেন। তারপর বেশ দেমাক নিয়ে ফাইলের ভেতরের মূল দলিলটা ইভানের বুকের সামনে মেলে ধরলেন।
"এই দেখ, চোখের চশমা ভালো করে মুছে! ফেং ম্যানশনের আসল মালিক এখন কে!"
ইভান ভ্রু কুঁচকে দলিলের কাগজের ওপর চোখ বোলাতেই ওর পুরো শরীর যেন এক মুহূর্তে অবশ হয়ে গেল। চোখ দুটো কপালে উঠে গেল! দলিলের একদম নিচের পাতায়, যেখানে মূল মালিকের সম্মতির সই থাকে, সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে ঝর্ণা ওর ভাইয়া অর্থাৎ 'অ্যারিস ফেং'-এর আসল সাইন করা রয়েছে! আর এই ম্যানশনের পুরো মালিকানা আইনিভাবে বেগমের নামে ট্রান্সফার হয়ে গেছে! শুধুমাত্র বাড়ি না সকাল সম্পত্তি ও। জিয়ান ফেং আগেই দুই ভাই কে সব সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে দিয়েছিলো। ইভানের এই সব সামলানোর কোনো ইচ্ছা ছিলো না তাই বড় ভাই কে দিয়ে দিয়েছিলো।
ইভান নিজের চোখ দুটোকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। দলিলের প্রতিটা পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে ওর হাত দুটো কাঁপছিল। ঝর্ণা বেগম যে অ্যারিসের নিজের জন্ম দেওয়া মা, তা তো তারা বেশ কিছুদিন আগেই জেনেছে। কিন্তু মায়ের রূপ ধরে এই মহিলা এতটা নিচে নামতে পারে? ফেং সাম্রাজ্যের সম্পত্তি আর এই মাথা গোঁজার আশ্রয়, এই বিশাল ফেং ম্যানশনটাও সে অ্যারিস ভাইয়াকে ফাঁদে ফেলে নিজের নামে লিখিয়ে নিল?
ইভানের ভেতরের রক্ত যেন টগবগ করে ফুটে উঠল। ওর মুখটা রাগে একদম লাল হয়ে গেল। সে ঝড়ের গতিতে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে অ্যারিসের সামনে দলিলটা আছাড় মেরে ফেলল।
ইভান তীব্র চিৎকারে করে উঠলো, "ভাইয়া!! এই সব কী? তুমি নিজের জ্ঞানত এই মহিলাকে আমাদের এই বাড়ি আর সম্পত্তি লিখে দিয়েছ? বলো ভাইয়া, মুখ খোলো! কীসের জন্য এই কাজ করলে তুমি?"
ইভানের চিৎকারে অ্যারিস ধীরলয়ে ওর পাথরের মতো স্তব্ধ চোখ দুটো তুলে দলিলের দিকে তাকাল। নিজের চেনা সাইনটার ওপর চোখ পড়তেই ওর পুরো মস্তিষ্ক যেন এক সেকেন্ডের জন্য জ্যাম হয়ে গেল। সে কখন এই দলিলে সই করল? ওর স্মৃতিতে তো শুধু কাল রাতের আইরার ওই স্কুলের রেজাল্ট কার্ডটা ভাসছে! তখন কি তবে এই কাগজটাও নিচে গোঁজানো ছিল? ওর মাথায় তো তখন ইনায়ার রক্ত আর চলে যাওয়ার ঘোর ছাড়া কিচ্ছু ছিল না! সে কিচ্ছু মনে করতে পারল না, ওর মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে যেতে চাইল।
অ্যারিসের এই নীরবতা দেখে ঝর্ণা বেগম এক অদ্ভুত পৈশাচিক উল্লাসে ফেটে পড়লেন। তিনি কোমর দুলিয়ে ডাইনিং স্পেসের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।
"আরে ইভান, অ্যারিসকে চিল্লাচিল্লি করে কী লাভ? ও তো নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করছে! যে মা ওকে পেটে ধরেছে, তাকে তোরা এত বছর পথে পথে ঘুরিয়েছিস। আজ ও নিজের ভুল বুঝতে পেরে ওর মাকে ওর পাওনা বুঝিয়ে দিয়েছে। এখন এই বাড়ি, এই জমি—সব আমার!"
সায়মা চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে, তীব্র ঘৃণায় চেঁচিয়ে উঠলো, "মুখ বন্ধ করুন আপনার! মা? আপনি নিজেকে মা বলেন কোন মুখে? আপনি একটা ডাইনি, একটা লোভী মহিলা! অ্যারিস ভাইয়ার ওই মানসিক অবস্থার ফায়দা তুলে আপনি এই জালিয়াতি করেছেন!"
ঝর্ণা বেগম সায়মার ৫ মাসের ফোলা পেটের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললেন, "মুখ সামলে কথা বলবি সায়মা! পেটে বাচ্চা নিয়ে এত লাফাস না, নাইলে এই মুহূর্তেই তোদের সবাইকে ঘাড় ধরে এই বাড়ি থেকে বের করে দেবো! মনে রাখিস, এখন আমি এই বাড়ির মালকিন!"
শামীমা বেগম চোখে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন।
"খোদার গজব পড়বে তোমার ওপর! অ্যারিস বাড়িটা ইনায়ার জন্য বানিয়েছি। আর তুমি আমার ছেলেদের উস্কানি দিয়ে আজ আমাদেরই পর করে দিলে?"
জিয়ান ফেং শামীমা বেগমকে ধরে, শক্ত গলায় বললো, "শামীমা, এই লোভী মহিলার সাথে কথা বলে লাভ নেই। ও জালিয়াতি করেছে, আমরা কোর্টে যাব! ইভান, আজই আমাদের লয়ারকে ফোন করো!"
চিৎকার, চেঁচামেচিতে পুরো বাড়ির বাতাস ভারী হয়ে উঠল।নঅথচ, এই বিশাল ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দু যে মানুষটা, সেই অ্যারিস তখনো ওভাবেই ডাইনিং চেয়ারটায় বসে রইল। ওর চারপাশের এই চিল্লানি, কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়া, ঘর থেকে উচ্ছেদের হুমকি—কোনো কিছুই যেন ওর কানে পৌঁছাচ্ছিল না। তার চোখ দুটো শূন্য, হাত দুটো টেবিলের ওপর জড়ো করা। সে শুধু মনে মনে ভাবছিল—"ইনায়া, তুমি ঠিকই বলেছিলে। এই বাড়ির বাতাস বিষাক্ত, এখানে কোনো মানুষ থাকে না। আমি আজ সত্যিই সব হারালাম...।"
ইভান ঝর্ণা বেগমের দিকে তেড়ে গেলো।
"জালিয়াতি! এটা একদম পরিষ্কার চিটিং! অ্যারিস ভাইয়া যখন নিজের হুঁশেই ছিল না, তখন এইটা করিয়েছেন তাই না??! একটা মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মানুষের সাথে এই নোংরামি করতে আপনার একটুও বাধল না? আপনি নিজেকে মা বলেন কোন মুখে? আপনি একটা আস্ত ক্রিমিনাল!"
—"মুখ সামলে কথা বল ইভান! কারে ক্রিমিনাল বলছিস? তোদের ওই সাধের অ্যারিস ভাইয়া একটা খুনি! নিজের বউরে যে পেটে ছুরি মারতে পারে, ও তো একটা জানোয়ার! ওর মতো জানোয়ারের হাত থেকে এই সম্পত্তি বাঁচানোর জন্যই তো ওর আসল মা এই দলিল নিজের নামে করেছে। এখন আইন আমার পক্ষে, পুলিশ আমার পক্ষে! বেশি ত্যাঁড়ামি করলে এই ৫ মাসের পোয়াতি বউসহ তোকে ঘাড় ধরে রাস্তায় ছুড়ে ফেলব!"
সায়মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে টেবিল থেকে একটা কাঁচের পানির গ্লাস তুলে সোজা ঝর্ণা বেগমের পায়ের কাছে আছাড় মারলো।
"খবরদার! আমার স্বামীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, ওর দিকে আঙুল উঁচিয়ে কথা বলবেন না! আপনি একটা ডাইনি, একটা লোভী সাপের মতো এই বাড়িতে ঢুকেছেন!"
গ্লাস ভাঙার তীক্ষ্ণ 'ঝনঝন' শব্দে পুরো ঘর এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু ঝর্ণা বেগম উল্টো আরও জোরে হেসে উঠলেন। তার সেই পৈশাচিক হাসির আওয়াজে শামীমা বেগম নিজের কান দুটো চেপে ধরে বসে পড়লেন। চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছিল।
শামীমা বেগম কেঁদে কেঁদে জিয়ানের হাত ধরল, "ওগো, তুমি কিছু বলো! এই ম্যানশনের প্রতিটা ইট অ্যারিসের নিজেদের হাতের তৈরি। আমাদের এত বড় সাজানো সংসারটা এই রাক্ষসী এক নিমেষে ছারখার করে দিল! আমাদের ছেলেদের ও পর করে দিল! ও আল্লাহ, আমাদের কপালে আর কী কী দেখা বাকি আছে?"
জিয়ান শামীমা বেগমকে শক্ত করে ধরে, তার চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে গেছে।
"শান্ত হও শামীমা। এই সস্তা মহিলার এত বড় সাহস যে ফেং পরিবারের ওপর ও হুকুম চালায়! ইভান, লয়ারকে ফোন করার দরকার নেই। আমরা সোজা আইনি অ্যাকশনে যাব। এই দলিলে অ্যারিসের সিগনেচার ফোর্থ ক্লাস জালিয়াতি করে নেওয়া হয়েছে, সেটা আমরা কোর্টে প্রমাণ করব।"
ঝর্ণা জিয়ান ফেং-এর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল।
"যান! যান না! দেখি কোন লয়ার আমার এই আসল দলিলের বিরুদ্ধে লড়তে আসে! বেইজিং থেকে এসে এখানে ফেং সাম্রাজ্য গড়েছ তো, এবার তোদের সব অহংকার এই বাংলাদেশের মাটিতে আমি ধূলোয় মিশিয়ে দেব! এই বাড়ি থেকে তোদের আমি ভিক্ষুক বানিয়ে ছাড়ব!"
একটু থেমে .......!
ঝর্ণা বেগম তীব্র চিৎকারে, দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরলো, "অনেক নাটক দেখেছি! আর এক মুহূর্তও তোদের এই বাড়িতে আমি সহ্য করব না। গেট আউট! এই মুহূর্তেই তোরা সবাই আমার বাড়ি থেকে দূর হ!"
ঝর্ণা বেগম আর কোনো কথা শুনলেন না। দারোয়ান আর তার সাথে আসা কয়েকজন কড়া সিকিউরিটি গার্ডকে ইশারা করতেই তারা জিয়ান ফেং, শামীমা বেগম, ইভান আর সায়মাকে প্রায় ধাক্কা দিতে দিতে সদর দরজার বাইরে বের করে দিল। অ্যারিস তখনো একটা ঘোরের মধ্যে ছিল; ওকেও ওনারা প্রায় টেনেহিঁচড়ে গেটের বাইরে এনে দাঁড় করিয়ে দিল। সাথে আইরাকেও
নিজের রক্ত-পানি করা ফেং ম্যানশনের গেটটা ওদের চোখের সামনে দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল।
আদিয়ান ও ফেং ম্যানশনের দিকে আসছিল। ইনায়া চলে যাওয়ার পর থেকে ওর মনটাও ভালো নেই, তাই ভাবছিল ফেং বাড়ির মানুষগুলোর একটু খোঁজ নিয়ে যায়। কিন্তু গেটের সামনে গাড়ি আসতেই ওর চোখ চড়কগাছ! ও দেখল ইনায়ার পুরো শ্বশুরবাড়ির লোক, এমনকি অ্যারিস আইরা সহ সবাই রাস্তার ওপর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আদিয়ান তাড়াহুড়ো করে এসে দাঁড়াল, "কী ব্যাপার? আপনারা সবাই এভাবে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? আঙ্কেল, আন্টি... কোথাও যাচ্ছেন আপনারা? সাথে লাগেজও তো দেখছি না!"
ইভান প্রায় কেঁদে ফেলার মতো গলায় ঝর্ণা বেগমের ওই জালিয়াতি, দলিলে সই নেওয়া আর ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সবটুকু ঘটনা একদমে খুলে বলল। সব শুনে আদিয়ানের নিজের মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। ও অ্যারিসের দিকে তাকাল, কিন্তু অ্যারিস তখনো মাটির দিকে তাকিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে, যেন ওর কোনো হুঁশ নেই।
আদিয়ানের চোখ গেল সায়মার দিকে। ৫ মাসের প্রেগনেন্ট সায়মা এতক্ষণের ধকল আর রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা ওর, সে ইভানের হাতটা শক্ত করে ধরে কাঁপছিল। ওর দাঁড়িয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
আদিয়ান ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
"ইভান! দেখছ না সায়মার অবস্থা? এই অবস্থায় ওকে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে রাখা বোকামি। তোমরা সবাই এই মুহূর্তে আমাদের বাসায় চলো!"
সায়মার ফ্যাকাশে মুখ দেখে ইভান সায়মাকে নিজের দুই হাতে কোলে তুলে নিল। ওর মাথাটা নিজের বুকে চেপে ধরে ও দ্রুত পায়ে আদিয়ানের বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। আদিয়ান বাকি সবাইকে নিয়ে ওর পেছনে পেছনে নিজের গেটে ঢুকল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আদিয়ানদের বিশাল ড্রয়িংরুমে
সোফায় পাশাপাশি দুই পরিবার বসে আছে। একপাশে আনিসুর রহমান আর আফরিন সুলতানা, আর ওদের ঠিক মুখোমুখি বসে আছেন জিয়ান ফেং, শামীমা বেগম, ইভান আর সায়মা। সুবা দ্রুত এসে সায়মাকে একটা কুশন এগিয়ে দিয়ে ওর মাথায় পানি ঢেলে দিল এবং এক গ্লাস গ্লুকোজের পানি খেতে দিল। আর অ্যারিস এর কোলে আইরা ড্রয়িংরুমের একদম এক কোণের একটা সিঙ্গেল সোফায় ওভাবেই নিথর হয়ে বসে রইল। অ্যারিসের চোখের চাউনি এখনো শূন্য।
আফরিন সুলতানা আর আনিসুর রহমান যখন জিয়ান ফেং-এর মুখ থেকে ঝর্ণা বেগমের এই পৈশাচিক জালিয়াতির কথা শুনলেন, ওনারাও স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
আনিসুর রহমান: "ঝর্ণা বেগম যে এতটা নিচে নামতে পারে, এটা আমার ধারণার বাইরে ছিল। একটা মানসিকভাবে অসুস্থ ছেলের সরলতার সুযোগ নিয়ে পুরো বাড়ি লিখে নেওয়া—এটা দস্তুরমতো ফৌজদারি অপরাধ!"
ইভান সোফায় চাপড়ে বলে উঠল, "আমি এটা কিছুতেই ছাড়ব না! ওনার ওই দলিল আমি কোর্টে টিকতে দেব না। ভাইয়া যখন নিজের সেন্সে ছিল না তখন এই কাজ করা হয়েছে।"
আফরিন সুলতানা চোখের জল মুছে শামীমা বেগমের হাত ধরে বললো, "আপা, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। ইনায়া এই বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের বুকটাও ফেটে যাচ্ছে। আজ আপনারা এই বিপদে পড়েছেন, যতদিন এই সমস্যার সমাধান না হচ্ছে, আপনারা এই বাড়িতেই থাকবেন। এই ঘর আপনাদেরও।"
ইভানের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে একটা অপরিচিত নম্বর। ইভান ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশের মাঝেই ফোনটা রিসিভ করল। ওপাশ থেকে একজন ডেলিভারি ম্যান বলল, সে ফেং বাড়ির মেইন গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ইভানের নামে একটা জরুরি পার্সেল আছে। ইভান রহমান বাড়ির সামনে আসতে বলে বাইরে গেল এবং কিছুক্ষণ পর যখন ড্রয়িংরুমে ফিরে এল, ওর হাতে কোনো সাধারণ পার্সেল ছিল না, ওর হাতে ছিল তিন -.তিনটা মোটা লিগ্যাল ফাইল ।
ড্রয়িংরুমে বসা শামীমা বেগম, জিয়ান ফেং, আদিয়ান, সুবা, এমনকি সোফায় নিথর বসে থাকা অ্যারিসও এবার ইভানের হাতের ফাইলগুলোর দিকে তাকাল। আদিয়ান কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, "কীসের ফাইল এগুলো ইভান? কে পাঠাল?"
ইভান কোনো কথা না বলে প্রথম ফাইলটা খুলল। ভেতরের ডকুমেন্টসগুলো দেখে ইভানের চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল।
ইভান ভাঙা গলায় বললো, "এই ফাইলগুলো আর কেউ না... আমাদের ইনায়া ভাবী পাঠিয়েছে! তোমরা দেখো এখানে কী লেখা!"
ইভান প্রথম ফাইলটা টেবিলের ওপর মেলে ধরল।
ইভান: ফার্স্ট ফাইল— ইনায়া ভাবীর যে অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, ওটা কোনো সাধারণ অ্যাক্সিডেন্ট ছিল না! ওটা ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত এবং ইচ্ছাকৃত! ইনায়া ভাবী সেই ট্রাক ড্রাইভার লোকটাকে খুঁজে বের করেছে। পুলিশ অলরেডি ওই লোকটাকে ধরে রিমান্ডে নিয়েছিল এবং রিমান্ডের থার্ড ডিগ্রি টর্চারের চোটে লকআপের ভেতরেই ওই লোকটা মারা গেছে!
অ্যারিস মোটেও অবাক হয় না। সে তদন্ত করছিলো তবে যাকে দিয়ে তদন্ত করতে গিয়েছিলো তাকে কেউ আগেই মেরে ফেলেছে তাই আর আগাতে পারে নি। আসল টার্গেট ছিল ভাবির বাচ্চা আর আদিয়ান ভাইয়া।
ইভানের কথা শুনে আদিয়ান আর সুবা চমকে উঠল। ইভান এবার সেকেন্ড ফাইলটা খুলল।
ইভান:সেকেন্ড ফাইল— আদিয়ান ভাইয়া, যে মেয়েটা এসে নোংরা ছবি তুলে তোমাকে ফাঁসানোট চেষ্টা করেছিল, ইনায়া ভাবী ওকেও ছাড়েনি। পুলিশ ওকে অলরেডি অ্যারেস্ট করে জেলে ঢুকিয়েছে! মেয়েটা কাস্টডিতে স্বীকার করেছে যে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সে আদিয়ান ভাইয়ার ক্যারিয়ার ধ্বংস করার জন্য এই কাজটা করেছিল।
ইভান এইবার তৃতীয় ফাইল খুললে- সেদিন ঝর্ণা বেগম ইচ্ছে করে ওই বাদাম দেয়া কেক বানিয়েছিল তবে তার টার্গেট আইরা ছিলো না । আসল টার্গেট ছিলো অ্যারিস। আর ঝর্ণা বেগমের কোনো ক্যান্সার ছিল না, নাটক ছিলো এই বাসায় ঢোকার জন্য।"
ইভানের শেষ কথাটা ড্রয়িংরুমে যেন একটা পারমাণবিক বোমার মতো ফাটল। শামীমা বেগম আর জিয়ান ফেং নিজেদের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আর এতক্ষণ ধরে পাথরের মতো বসে থাকা অ্যারিস ... ওর চোখের মণি দুটো এবার কেঁপে উঠল। মাথার ভেতর ঝড়ের গতিতে সবকিছু পরিষ্কার হতে লাগল। ইনায়া... ওর ইনায়া তাহলে এই সব কিছু আগে থেকেই জানত!
আদিয়ান টেবিলের ওপর থেকে ফাইলগুলো হাতে নিয়ে দেখল, প্রতিটা ফাইলের নিচে আইনজীবী হিসেবে সই করা রয়েছে—"Advocate Inaya Feng."
আফরিন সুলতানা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে বসে এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। নিজের বুকের ভেতরটা যেন তপ্ত কয়লার মতো জ্বলছিল।
আফরিন সুলতানা কান্নায় ভেঙে পড়লেন, "ওরে আমার মা রে... আমি তোকে কত বড় অপবাদ দিলাম! তুই পুরো পরিবারকে বাঁচানোর জন্য একাই এই নরকের সাথে যুদ্ধ করলি, আর আমি নিজের জন্মদাত্রী মা হয়ে তোকে কত বাজে কথা বললাম? এই বাড়ির দরজা তোর জন্য সারা জীবনের জন্য বন্ধ করে দিলাম? আল্লাহ গো, আমি কোন মুখে আমার মেয়ের সামনে দাঁড়াবো! আমার মতো পাপী মাকে ইনায়া কোনোদিনও মাফ করবে না... "
আনিসুর রহমান তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। আজ পুরো ড্রয়িংরুমের বাতাসে শুধু ইনায়ার জন্য আফসোস আর কান্নার শব্দ।
.
.
বেইজিংয়ে...
কয়েকদিন ধরে একটানা কেসের ফাইল নিয়ে কাজ করা, রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে থাকা আর মানসিক চাপের কারণে আজ সকাল থেকেই ইনায়ার শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছিল। মাথা ঘুরানো আর প্রচণ্ড দুর্বলতার কারণে সে ল ফার্মে না গিয়ে সোজা বেইজিংয়ের একটা হাসপাতালে ডক্টরের কাছে গেল। যথারীতি ছায়ার মতো সাথে ছিল রোহান।
হাসপাতালে বেশ কিছু চেকআপ আর ব্লাড টেস্টের পর ডক্টর যখন ফাইলটা নিয়ে ইনায়ার কেবিনে ঢুকলেন, তার মুখে তখন এক চিলতে হাসির রেখা। ডক্টর ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, "কংগ্রাচুলেশনস মিস ইনায়া, ইউ আর প্রেগন্যান্ট !"