প্রেগন্যান্ট শব্দটা শুনতেই ইনায়ার চোখের পলক স্তব্ধ হয়ে গেল। তার হাত দুটো অবশ হয়ে পেটের ওপর চলে এলো। আগেরবার যখন শত্রুদের অ্যাটাক হয়েছিল, তখন তার গর্ভের সন্তানটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেই সন্তান হারানোর তীব্র ক্ষতটা তার বুকে আজীবন তাড়া করে বেড়িয়েছে। আজ আবার ওর গর্ভে এক নতুন প্রাণের স্পন্দন! ইনায়ার চোখের কোণ দিয়ে আনন্দের অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোণে অনেকদিন পর সত্যিকারের খুশির হাসি ফুটে উঠল।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রোহানও এই খবর শুনে ভীষণ খুশি হলো। তার ম্যাডাম এত কষ্টের পর অবশেষে হাসতে পেরেছেন, এটাই ওর বড় পাওনা।
হাসপাতাল থেকে বের হয়ে গাড়িতে বসার পর রোহান ইতস্তত করে ইনায়ার দিকে তাকাল।
—"ম্যাম, একটা কথা বলব? অ্যারিস স্যারকে কি এই সুখবরটা জানাবেন না? উনি তো নিজের ভুলের আগুনে জ্বলছেন, এই খবরটা পেলে হয়তো...
—"না, রোহান। ওকে কিচ্ছু জানানোর দরকার নেই।"
—"কিন্তু ম্যাম, উনি তো বাচ্চার বাবা। পরে যখন উনি জানতে পারবেন যে ওনার অজান্তেই ওনার সন্তান পৃথিবীতে এসেছে, উনি ভীষণ কষ্ট পাবেন..."
—"আমাদের ডিভোর্স হয়ে গেছে, রোহান। আইনিভাবে অ্যারিস ফেং-এর সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই। এই সন্তান শুধু আমার, এর ওপর আর কারো কোনো অধিকার নেই।"
ইনায়ার গলার সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেখে রোহান আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না, সে চুপ হয়ে গেল। তবে মনে মনে রোহানের খুব আফসোস হচ্ছিল। সে ইনায়া আর অ্যারিসকে খুব কাছ থেকে দেখেছে। এই দুজনকে কাপল হিসেবে কতটা পারফেক্ট মানাত, ওনারা একসাথে থাকলে পুরো পৃথিবী একদিকে আর ওনারা একদিকে থাকত। রোহানের মনে মনে খুব ইচ্ছে হলো, কোনো এক অলৌকিক উপায়ে যদি আবার এই দুটো মানুষকে এক করে দেওয়া যেত!
তবে ইনায়া ওসব অতীত নিয়ে আর ভাবতে চাইল না। ফ্ল্যাটে ফিরেই ওর মনটা এক অদ্ভুত মাতৃত্বে ভরে উঠল। সে ওর বেইজিংয়ের নতুন ফ্ল্যাটের একটা অতিরিক্ত বড় রুমকে ওর অনাগত সন্তানের জন্য সুন্দর করে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিল। এখন থেকেই সে ল ফার্ম থেকে ফেরার পথে টুকটাক জিনিসপত্র কেনা শুরু করে দিয়েছে—ছোট ছোট নরম খেলনা, বাচ্চার কিউট ড্রেস, রঙিন লাইট আর সুন্দর একটা দোলনা।
.
.
ঢাকার ল ফার্মের সেই 'খাটাস' বসের অত্যাচার দিন দিন আক্ষরিক অর্থেই আদির সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছিল। তার ওপর ম্যাম চলে যাওয়ার পর পুরো অফিসটাই কেমন যেন মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল। তাই আদি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। জমানো কিছু টাকা আর নিজের ল-ডিগ্রির জোড়ে সে সোজা চায়নার ভিসা লাগিয়ে বেইজিংয়ে চলে আসে। ওর উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক কোনো ফার্মে কাজ শেখা। কপাল ভালো থাকায় আদি বেইজিংয়ের সেই নামকরা নামী ল ফার্মটাতেই ইন্টারভিউ দিয়ে একজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করে ফেলে, যেখানে ইনায়া অলরেডি সিনিয়র আইনজীবী হিসেবে কর্মরত। তবে বেইজিংয়ের এই বিশাল কর্পোরেট অফিসের হাজারো কর্মীর ভিড়ে আদি তখনো জানত না যে ওর প্রিয় ইনায়া ম্যামও এই একই ছাদের নিচে বসেন!
চাকরি পাওয়ার পর প্রথম কাজই ছিল একটা থাকার জায়গা খোঁজা। আদি বেইজিংয়ের ওই অভিজাত এলাকাতেই বেশ কিছুটা টাকা খরচ করে নিজের জন্য একটা ফ্ল্যাট রেন্ট নেয়। কাকতালীয়ভাবে, সেই ফ্ল্যাটটা ছিল ঠিক ইনায়ার ফ্ল্যাটের পাশে! করিডোরের একদম মুখোমুখি একটা অ্যাপার্টমেন্টে আদি ওর ব্যাগ-লাগেজ নিয়ে এসে ওঠে।
পরদিন সকাল...
ইনায়া তখন ওর প্রেগন্যান্সির প্রথম কয়েক মাসের হালকা ক্লান্তি সত্ত্বেও একটা ফরমাল কোট পরে অফিসের জন্য রেডি হচ্ছিলেন। ওর হাতে হ্যান্ডব্যাগ আর গাড়ির চাবি।
একই সময়ে আদিও ওর নতুন অফিসের প্রথম দিন বলে বেশ টানটান একটা শার্ট পরে, গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে ওর ফ্ল্যাটের দরজা লক করে করিডোরে এসে দাঁড়িয়েছে। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে লিফটের বাটনে চাপ দিতে যাবে, তখনই ওর পেছনের ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলে গেল। ইনায়া দরজাটা লক করে যেমনই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, ওর আর আদির চোখাচোখি হয়ে গেল। করিডোরের আলোয় আদি যখন সামনে তাকাল, ওর হাতের ফোনটা হাত থেকে পড়ে যাওয়ার জোগাড় হলো! তার চোখ দুটো প্রায় কপালে উঠে গেল। বেইজিংয়ের বুকে তার নিজের ফ্ল্যাটের সামনে ইনায়া ম্যাম দাঁড়িয়ে!
আদি তুতলিয়ে, চিৎকার করে উঠলো, "ই... ইনায়া ম্যাম?! আপনি এখানে?! আমি কি স্বপ্ন দেখছি, নাকি সত্যি সত্যি ভূত দেখছি?!
ইনায়াও হুট করে এই দূর প্রবাসে পুরোনো অফিসের চেনা জুনিয়র আদিকে দেখে মারাত্মক চমকে গেলেন। তার শান্ত চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
"আদি?! তুমি এখানে কীভাবে? আর এই ফ্ল্যাট থেকে বের হচ্ছ কেন?"
আদি এখনো শকড অবস্থা থেকে বের হতে না পেরে বললো, "ম্যাম! আমি এই ফ্ল্যাটটাই কাল রেন্ট নিয়েছি! আর... আর আমি তো বেইজিংয়ের ওই নামকরা ল ফার্মে জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে জয়েন করেছি আজ থেকে! কিন্তু আপনি... আপনি এই বেইজিংয়ের ফ্ল্যাটে থাকেন? তার মানে ম্যাম, আপনিই আমার পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী?!"
ইনায়া একটা হালকা হাসলেন। তার মনে হলো, দুনিয়াটা আসলেই গোল! ঢাকা থেকে পালালেও ঢাকার অতীত কোনো না কোনোভাবে তার সামনে এসেই দাঁড়ায়।
—"হ্যাঁ আদি, আমি এই ফ্ল্যাটেই থাকি। আর তুমি যে ফার্মে জয়েন করেছ, আমিও ওখানেই আছি। চলো, লিফট এসে গেছে। যেতে যেতে কথা হবে।"
আদি যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না তার ভাগ্য এতটা ভালো! তার সেই প্রিয় ম্যাম, যার জন্য সে ঢাকায় আফসোস করত, সে এখন তার বসের পাশাপাশি পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী! লিফটে চড়ে নিচে নামার সময় আদি এখনো ওর চোখ বড় বড় করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ওর ম্যাম ওর ঠিক পাশের ফ্ল্যাটেই থাকেন! ইনায়া গাড়ির চাবিটা হাতে ঘোরাতে ঘোরাতে আদির দিকে তাকালেন। তার চোখে একটু কৌতূহল।
—"আদি, বেইজিংয়ের ল ফার্মে তোমার জয়েন করার খবর তো জানলাম। কিন্তু হুট করে দেশ, চেনা অফিস—সব ছেড়ে এই বেইজিংয়ে আসার আসল কারণটা কী?
ইনায়ার প্রশ্নটা শুনতেই আদির মুখটা আবার সেই আগের মতো তিতকুটে হয়ে গেল। ওর ঢাকার সেই 'খাটাস' বসের অত্যাচারী মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আদি একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"আর বলবেন না ম্যাম! আপনি চলে যাওয়ার পর আমাদের ওই ল ফার্মটা যেন আক্ষরিক অর্থেই একটা নরক হয়ে গিয়েছিল। আপনার জায়গায় যে নতুন মহিলা লয়ারকে এনে বসিয়েছিল না, ওরে বাপরে বাপ! একটা আস্ত খাটাস মহিলা! সারাদিন কোনো কারণ ছাড়াই শুধু চিল্লাইত আর ক্যাচক্যাচ করত। কাজের কোনো সিস্টেম নাই, খালি আমাদের ওপর ঝাড়ি!"
আদির বলার ভঙ্গি দেখে ইনায়ার ঠোঁট টিপে একটু হাসলো। আদি বলতে থাকল—
"ম্যাম, অফিসে আপনার ওই শান্ত মুখ আর চমৎকার গাইডেন্সের পর ওই মহিলার অত্যাচার সহ্য করা আমার পক্ষে আর পসিবল হচ্ছিল না। প্রতিদিন মনে হতো চাকরিটা ছেড়ে দিই। তারপর ভাবলাম, এভাবে মার খাওয়ার চেয়ে নিজের লাইফে একটা বড় রিক্স নিই না কেন? জমানো কিছু টাকা আর নিজের আইনি ডিগ্রিটা সম্বল করে সোজা বেইজিংয়ের ভিসা লাগিয়ে দিলাম। ইচ্ছে ছিল ইন্টারন্যাশনাল কোনো ফার্মে কাজ শিখে নিজেকে বড় লয়ার হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ম্যাম, বিশ্বাস করুন, আমি বিন্দুমাত্র জানতাম না যে আপনিও এই বেইজিংয়ে, আর তাও আবার এই সেম ল ফার্মেই আছেন! আমার তো মনে হচ্ছে আজ মেঘ না চাইতেই জল পেয়ে গেলাম!"
আদির এই সরল মুখের প্রতিচ্ছবি দেখে ইনায়ার মনের ভেতরের ভারী মেঘটাও যেন একটু হালকা হলো। এই দূর প্রবাসে, যেখানে ওর পাশে শুধু রোহান ছাড়া আর কেউ নেই, সেখানে পুরোনো দিনের একজন শুভাকাঙ্ক্ষীকে পাশে পাওয়া ওর মানসিক শক্তির জন্য ভীষণ দরকার ছিল।
—"খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছ আদি। জীবনে বড় হতে হলে চেনা গণ্ডি থেকে বের হতেই হয়। তবে মনে রেখো, এটা ইন্টারন্যাশনাল ফার্ম, এখানে কাজের প্রেশার কিন্তু ঢাকার চেয়েও ডাবল হবে।"
—"আপনি সাথে থাকলে আমি দিনে ২৪ ঘণ্টার জায়গায় ২৮ ঘণ্টা খাটতে রাজি আছি ম্যাম! শুধু ওই খাটাস বসের মুখ আর দেখতে হবে না, এটাই আমার সাত রাজার ধন!"
ইনায়া ওর গাড়ির লকটা আনলক করতেই আদি বেশ কিছুটা ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল। বেইজিংয়ের রাস্তায় প্রথম দিন ওর এমনিতেই ট্যাক্সি বা সাবওয়ে চেনার ঝক্কি পোহাতে হতো, তার উপর কিছু চেনে না, কিন্তু ম্যামের সাথে গাড়িতে চড়ে অফিসে যাওয়াটা কেমন দেখাবে—সেটা ভাবছিল। ইনায়া গাড়ির দরজা খুলে আদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে, "কী হলো আদি? দাঁড়িয়ে আছ কেন? উঠে এসো, প্রথম দিনই লেট করতে চাও নাকি?"
—"না মানে ম্যাম, আপনিই ড্রাইভ করবেন আর আমি পাশে বসে নবাবী করে যাব, ব্যাপারটা কেমন দেখায় না?
—"সমস্যা নেই, চলে এসো! ওঠো।"
আদি সামনের সিটে গিয়ে বসল। বেইজিংয়ের ঝকঝকে রাস্তা দিয়ে ইনায়ার গাড়ি যখন এগিয়ে যাচ্ছিল, আদি তখন ঢাকার অফিসের গল্প আর ওখানকার সব খবরাখবর অনর্গল বলে যাচ্ছিল। ইনায়া চুপচাপ ড্রাইভ করতে করতে শুনছিলেন, নিজের মনটাও অনেকদিন পর বেশ হালকা লাগছিল।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা যখন বেইজিংয়ের সেই সুবিশাল, কাঁচঘেরা ইন্টারন্যাশনাল ল ফার্মের মেইন ড্রপ-অফ জোনে এসে থামল, তখন অফিসের ব্যস্ত সময়। শত শত চাইনিজ আর বিদেশি কর্পোরেট আইনজীবীরা ফর্মাল স্যুট-বুট পরে অফিসের ভেতরে ঢুকছিলেন।
ইনায়া গাড়ি থেকে নামতেই ওখানকার সিকিউরিটি আর জুনিয়র স্টাফরা ওনাকে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল। কারণ এই অল্প কদিনেই ইনায়া কয়েকটা কেস সামলে ফার্মে বেশ ভালো একটা পজিশন তৈরি করে নিয়েছেন। গাড়ির ওপাশ থেকে আদি ওর ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বেশ একটা চওড়া হাসি নিয়ে নেমে এল।
ল ফার্মের কিছু সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট আর ফ্রন্ট ডেস্কের কর্মীরা যারা ওখানে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল, তারা এই দৃশ্য দেখে একদম থমকে গেল! ওদের চোখ চোখাচোখি হতেই ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল।
চাইনিজ কলিগ ১ আরেকজনকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে দেখালো, "এই দেখো, ওটা তো নতুন জয়েন করা ওই বাংলাদেশী জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট না? ও সিনিয়র অ্যাডভোকেট মিস ইনায়ার পার্সোনাল কার থেকে নামছে কেন?"
চাইনিজ কলিগ ২: "তাই তো! মিস ইনায়া তো এই ফার্মের অন্যতম স্ট্রিক্ট আর গম্ভীর একজন লয়ার। উনি সাধারণত কাউকেই ওনার পার্সোনাল স্পেসে ঢুকতে দেন না, কারো সাথে অকারণ মেশেনও না। এই ছেলে প্রথম দিনেই ওনার গাড়িতে করে এল কীভাবে? ওনাদের কি আগে থেকেই কোনো রিলেশন আছে নাকি?"
আদি আসলে এক অক্ষরও চাইনিজ ভাষা বোঝে না। বাংলাদেশে থাকতে ও শুধু 'চিং চ্যাং চং' মার্কা সাউন্ডই শুনে এসেছে, তাই ওই চাইনিজ কলিগদের ফিসফিসানি ওর কানের পাশ দিয়ে একদম বাউন্সার হয়ে চলে গেল। ও শুধু দেখল কয়েকজন ওদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে কী যেন বলাবলি করছে। ও বুঝতেই পারল না ওরা ওকে গালি দিল, নাকি ওর প্রশংসা করে ভালো কিছু বলল! ওর ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন তখন দেখার মতো ছিল—পুরো বোকার মতো হাঁ করে ওরা কী বলছে তা বোঝার চেষ্টা করছিল। তবে ইনায়া কান এড়াতে পারেনি ওই কলিগদের কানাকানি। ওরা যখন বলছিল, "এই ছেলে প্রথম দিনেই ওনার গাড়িতে করে এল কীভাবে? ওনাদের কি আগে থেকেই কোনো রিলেশন আছে নাকি?"—তখনই ইনায়া বুঝে গিয়েছিলেন যে অফিসের গসিপ পার্টনাররা অলরেডি অ্যাক্টিভ হয়ে গেছে।
আদি যখন বোকার মতো মুখ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, "ম্যাম, ওরা যেভাবে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, আমার তো মনে হচ্ছে আমি কোনো ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম করে ফেলেছি! আপনার অফিসের ভাবমূর্তি আমার জন্য নষ্ট হচ্ছে না তো আবার?"
ইনায়া তখন মনে মনে বেশ মজাই পেলেন আদির এই সরলতা দেখে। ও যে চাইনিজ বোঝে না, সেটাই ওর জন্য এক দিক দিয়ে ভালো হয়েছে। নাইলে প্রথম দিনই বেচারা লজ্জায় অর্ধেক হয়ে যেত। ইনায়া তার গম্ভীর ভাবটা বজায় রেখে বললেন, "এসব ফালতু কথায় কান দেওয়ার সময় আমাদের নেই আদি। তুমি এখানে কাজ শিখতে এসেছ, মানুষের গসিপের খোরাক হতে নয়। নিজের কেবিনে যাও।"
আদি ওর ফাইলপত্র নিয়ে নিজের ডেস্কের দিকে হাঁটা দিল। ও মনে মনে ভাবল, "যাক বাবা! ম্যাম যখন নরমালি বলল, তার মানে ওই চাইনিজরা হয়তো আমার শার্টের কালার সুন্দর এই প্রশংসাই করতেছিল! বেইজিংয়ের মানুষ তো বেশ ভালোই দেখছি!"
আদি তো ওর নিজের মনে খুশিতে ডগমগ হয়ে কাজে বসে গেল..
.
.
লাঞ্চের সময় আদি যখন ক্যাফেটেরিয়া থেকে কফি নিয়ে ইনায়ার কেবিনে ঢুকল, তখন ওর চোখ-মুখ পুরো উষ্কখুষ্ক। চাইনিজ ফাইল আর ইংরেজি ডিকশনারি ওল্টাতে ওল্টাতে ওর মাথা তখন প্রায় হ্যাং হয়ে গেছে। আদি টেবিলে কফির মগটা রেখে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল, "ম্যাম, বাঁচান! বেইজিংয়ে আসাটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার ভাবছিলাম, এখন মনে হচ্ছে এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় টর্চার! ওই চাইনিজ ক্লায়েন্টরা মুখে কী বলে আর ফাইলে কী লেখে, কিচ্ছু মাথায় ঢোকে না। মনে হচ্ছে আবার ওই ঢাকার খাটাস বসের কাছে ফিরে যাই!"
ইনায়া কফির মগে একটা চুমুক দিয়ে আদির এই করুণ দশা দেখে না হেসে পারলো না। নিজেরও প্রেগন্যান্সির কারণে শরীরটা একটু ভারী আর ক্লান্ত লাগছিল, কিন্তু আদির এই ছটফটানি ওর মনটা ভালো করে দিল।
—"এত তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দিলে হবে, আদি? প্রথম প্রথম একটু কঠিন লাগবেই। তুমি বরং এই ইন্টারন্যাশনাল কেসের সামারিটা ভালো করে বোঝো, ট্রান্সলেশনের পার্টটা আমি তোমাকে হেল্প করব।"
~
বিকেলের দিকে কাজ শেষ করে যখন ওরা দুজন একসাথে আবার ইনায়ার গাড়িতে করে ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন, আদির মুখে তখন আবার চওড়া হাসি। ম্যাম পাশে থাকলে তার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। ফ্ল্যাটের করিডোরে এসে দুজন যখন নিজের নিজের দরজার সামনে দাঁড়াল, আদি একটু ইতস্তত করে বলল
—"ম্যাম, আপনি তো একা থাকেন। আর আজ সারাটা দিন যেভাবে আমার পেছনে খাটলেন... আপনি যদি কিছু মনে না করেন, রাতের ডিনারটা কি আমার ফ্ল্যাটে করবেন? আমি খুব ভালো ডিম ভুনা আর ডাল রাঁধতে পারি! ঢাকার টেস্ট পাবেন একদম।"
'ঢাকার টেস্ট' শব্দটা শুনতেই ইনায়ার মনের ভেতর আবার ওর মায়ের সেই বিষাক্ত কথাগুলো আর বাংলাদেশের ফেলে আসা দিনগুলোর স্মৃতি ছ্যাঁত করে উঠল। ওর চোখের কোণে পলকের জন্য একটা মেঘ জমে গেল। তাছাড়া ওর পেটের ভেতরের সন্তানটার কথা চিন্তা করে ওকে এখন ভীষণ সাবধানে ডায়েট মেইনটেইন করতে হয়, ডক্টরের দেওয়া ভিটামিন ঠিক সময়ে খেতে হয়।
—"আজ থাক আদি। শরীরটা আজ একটু বেশি ক্লান্ত লাগছে। আমি বরং ফ্রেশ হয়ে একটু রেস্ট নিই। তুমিও আজ প্রথম দিন অনেক ধকল গেছে, খেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। কাল সকালে আবার ল ফার্মে বের হতে হবে।"
আদি একটু মন খারাপ করলেও ম্যামের ক্লান্ত মুখ দেখে জোর করল না। "আচ্ছা ম্যাম, ঠিক আছে। আপনি রেস্ট নিন। গুড নাইট।"
আদি ওর ফ্ল্যাটে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। ইনায়াও ওর ফ্ল্যাটে ঢুকে লকটা আটকে দিলেন। অন্ধকার ড্রয়িংরুমে ব্যাগটা রেখে ইনায়া তার অনাগত সন্তানের জন্য সাজানো সেই বিশেষ রুমটার দিকে এগিয়ে গেলেন। রঙিন ডিম লাইটের আলোয় রুমটা এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। সে বিছানায় বসে ওর পেটের ওপর হাত রাখলেন। আজ সারাদিন ভেতরের এই নতুন প্রাণটাই ওকে ল ফার্মে লড়ার শক্তি দিয়েছে। ক্যাবিনেট থেকে ডক্টরের দেওয়া সেই ভিটামিন ওষুধ বের করে এক ঢোক পানিতে গিলে নিলেন ইনায়া। ওর চোখ দুটো আস্তে আস্তে বুঁজে আসছিল ক্লান্তিতে .....