পরদিন সকাল...
আদি ওর ফ্ল্যাটে রেডি হয়েই বেশ একটা ফুরফুরে মন নিয়ে ইনায়ার দরজার সামনে এসে নক করল। ইনায়া দরজা খুলে আদিকে ভেতরে আসতে দিলেন। ওর পরনে একটা ঢিলেঢালা গেঞ্জি, প্যান্ট , চুলগুলো খোঁপা করা। প্রেগন্যান্সির ক্লান্তিতে মুখটা কিছুটা ফ্যাকাশে লাগছিল।
"আদি, তুমি ড্রয়িংরুমে বোসো। আমি জাস্ট ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি, তারপর আমরা অফিসের জন্য বের হব।"
"আচ্ছা ম্যাম, আপনি রিল্যাক্স করে ফ্রেশ হন। আমি আছি।"
ইনায়া ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই আদি ড্রয়িংরুমে না বসে কৌতূহল সামলাতে না পেরে ইনায়ার বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। ম্যামের পার্সোনাল লাইফটা কেমন, সে রুমটা কীভাবে গুছিয়েছে—সেটা দেখার এক তীব্র ইচ্ছা ওর মনের ভেতর কাজ করছিল। রুমের এক কোণে বাচ্চার জন্য কেনা সেই কিউট খেলনা আর ফ্রকগুলো সুন্দর করে রাখা। আদি ওগুলোর দিকে তাকিয়ে হাসল।
এরপর ওর চোখ গেল ইনায়ার বিছানার দিকে।
বিছানার চাদরটা একটু এলোমেলো। আদি ড্রয়ারের পাশে গিয়ে যেমনই দাঁড়িয়েছে, ওর চোখ আটকে গেল ইনায়ার সাদা বালিশটার ওপর। বালিশের একপাশটা তখনো গোল হয়ে শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগে ভরে আছে। দাগগুলো দেখেই আদির ভেতরের সেই ফুরফুরে আনন্দটা এক পলকে উধাও হয়ে গেল। ওর বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারল—ইনায়া ম্যাম কাল রাতে একা একা এই নিঝুম ঘরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেছেন। মুখে সে যতই ডিভোর্সের কথা বলুক, অ্যারিস স্যারকে ভুলে যাওয়ার অভিনয় করুক, রাতের অন্ধকার নামলেই ওনার ভেতরের একাকীত্ব আর অ্যারিস স্যারের স্মৃতি ওনাকে জ্যান্ত গিলে খাচ্ছে। ওনার বালিশের এই চোখের জলের দাগই ওনার ভেতরের সেই তীব্র যন্ত্রণার নীরব সাক্ষী। আদি বালিশটার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওর খুব ইচ্ছে করছিল ইনায়া ওয়াশরুম থেকে বের হলে ওনাকে জিজ্ঞেস করতে—"ম্যাম, আপনি এখনো ওনাকে এত ভালোবাসেন? কেন কাঁদেন ওনার জন্য?"
কিন্তু ও নিজের লিমিটেশনটা সে খুব ভালো করেই জানে। সে ইনায়ার শুধুই একজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট আর প্রতিবেশী। ইনায়া ম্যামের ওই ব্যক্তিত্বপূর্ণ রূপের সামনে দাঁড়িয়ে ওনার এই পার্সোনাল কান্নার ব্যাপারে ডিরেক্ট জিজ্ঞেস করার মতো বিন্দুমাত্র সাহস আদির নেই। ও ভালো করেই জানে, এই সীমানা পার করতে গেলে ম্যাম ওকে ওনার জীবন থেকেই চিরকালের জন্য আউট করে দেবেন।
ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দ হলো। আদি চট করে এক সেকেন্ডের মধ্যে নিজেকে সামলে নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমের সোফায় এসে এমনভাবে বসল, যেন সে কিছুই দেখেনি।
ইনায়া তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ড্রয়িংরুমে এলেন। ওর চোখ দুটো এখনো হালকা ফোলা, কিন্তু মুখে আবার সেই শক্ত, পেশাদারী মুখোশ। একদম রেডি হয়ে বের হলো।
—"চলো আদি, ব্যাগটা গুছিয়ে নাও। অফিসে লেট হয়ে যাচ্ছে।"
—"হ্যাঁ ম্যাম, চলুন।"
.
.
ইনায়া প্রতিদিনের মতোই ল ফার্মের কেবিনে বসে ওর আইনি কাজগুলো করে যাচ্ছিলেন। বাইরে থেকে ওকে দেখতে বরাবরের প্রফেশনাল লাগছিল। কিন্তু ওর মাথার ভেতর আজ অন্য একটা চিন্তার ঝড় বইছিল, ওর মন অন্য কোথাও মগ্ন ছিল। তার পেটে এখন এক নতুন প্রাণের স্পন্দন। তার একটা বাচ্চা হবে। একজন নামী আন্তর্জাতিক লয়ার হিসেবে ইনায়ার বর্তমান আয় কিন্তু কম নয়, যথেষ্ট টাকা সে এই ফার্ম থেকে পাচ্ছেন। কিন্তু একজন মা হিসেবে ইনায়ার মন এতে সন্তুষ্ট হতে পারছিল না। সে চায় তার সন্তানকে পৃথিবীর সবথেকে 'বেস্ট লাইফ' দিতে। ওর সন্তান যেন এমন এক রাজকীয় পরিবেশে বড় হয়, যেখানে কোনো জিনিস পাওয়ার জন্য ওকে দ্বিতীয়বার ভাবতে না হয়, জীবনে কখনো কোনো কিছুর অভাব যেন সে টের না পায়। আর তার সন্তানকে সেই সেরা জীবন দিতে হলে শুধু এই ল ফার্মের চাকরির ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না। ইনায়ার মাথায় হঠাৎ একটা দারুণ আইডিয়া খেলে গেল। ওর যে নিজস্ব কোম্পানি-টা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেটা সে আবার নতুন করে খুলবে! বেইজিংয়ের এই বুকে, একদম নতুন একটা পরিচয়ে, নতুন উদ্যমে সব কিছু আবার স্টার্ট করবে সে।
অফিসের ফাইলগুলো সই করতে করতে সে ঘড়ির দিকে তাকাল। আজ তার মনটা প্রফেশনাল কেসের চেয়ে তার নিজস্ব এই বড় স্বপ্নের দিকে বেশি টানছিল। ইনায়া মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল—আজকে অফিস শেষ করে সোজা বাসায় যাবে। নিজের ফ্ল্যাটের বসে, একদম ঠান্ডা মাথায় পুরো বিজনেস প্ল্যানটা নিয়ে ভাবতে হবে। কীভাবে ফান্ড রেডি করবে, কীভাবে নতুন করে লাইসেন্স করাবে—সবকিছুর ছক আজ রাতেই ওকে তৈরি করতে হবে।
অফিসের সময়সীমা পার করতেই ইনায়া টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা ফাইলগুলো গুছিয়ে, ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিয়ে সে সোজা পার্কিং লটের দিকে রওনা দিল। প্রতিদিনের চেনা ব্যস্ততা আজ ওকে ছুঁতে পারছিল না। আদি ল্যাংগুয়েজ একাডেমির ক্লাসে চলে যাওয়ায় আজ গাড়ির সামনের আসনটা খালি ছিল; কোনো চেনা কোলাহল ছাড়াই সম্পূর্ণ একা ড্রাইভ করে সে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরে এল। ফ্ল্যাটের দরজাটা ভেতরে টেনে লক করে দিতেই এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা ওকে গ্রাস করল। ব্যাগটা সোফায় রেখে জুতোজোড়া খুলতেই ওর ক্লান্ত মনের ভেতর নেমে এল শান্তি। ড্রয়িংরুমের চড়া লাইটগুলো নিভিয়ে দিয়ে সে সোজা চলে গেল ওর চেনা পড়ার ঘরে। টেবিলে রাখা ল্যাপটপটা অন করে পাশে টেনে নিল একটা ডায়েরি আর কলম।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল ইনায়া। ঠান্ডা মাথায় সে পুরো ব্যাপারটা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে শুরু করল। বেইজিংয়ের মতো একটা আন্তর্জাতিক বিজনেস হাবে নতুন করে কোম্পানি খোলা যে চারটে খানি কথা নয়—একজন লয়ার হিসেবে সেটা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে! এখানকার কর্পোরেট আইন যেমন জটিল, ট্যাক্স ও লাইসেন্সের ঝক্কিও তেমনই কড়া। কিন্তু ইনায়ার ডিকশনারিতে 'অসম্ভব' বলে কোনো শব্দ কোনোদিনই ছিল না, আর আজ তো থাকার প্রশ্নই ওঠে না।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে বেইজিংয়ের কর্পোরেট ল এবং বিজনেস সেট-আপের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটগুলো একের পর এক খুলে যেতে লাগল। নীলচে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইনায়ার চোখ দুটো। ওর অবচেতন হাতটা একবার আলতো করে ছুঁয়ে গেল ওর পেট—যেখানে বেড়ে উঠছে ওর পৃথিবী। ওর মাথায় এখন একটাই লক্ষ্য, একটাই জেদ—তার সন্তান যেন এই পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে, গৌরবে বাঁচতে পারে।
ডায়েরির সাদা পাতায় নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ছক কাটতে লাগল।
ডায়েরির পাতায় একের পর এক বিজনেস স্ট্র্যাটেজি আর আইনি মারপ্যাঁচের সমাধান লিখতে লিখতে রাতের প্রহর পার হতে লাগল। কিন্তু ইনায়ার চোখের ক্লান্তি যেন উধাও হয়ে গেছে। ডায়েরির পাতায় হাত রেখে ও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, "আমি এই বেইজিংয়ের মাটিতেই আবার আমার হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্য ফিরিয়ে আনব। আমার সন্তানের জন্য আমাকে পারতেই হবে।"
রাত যখন নিঝুম, বাইরের বেইজিং শহর যখন নিস্তব্ধতায় ডুব দিয়েছে, তখন ওর খসড়া প্ল্যানটা সম্পূর্ণ তৈরি। একটা নিঃশ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করল সে। ডায়েরিটা ড্রয়ারে রেখে, লাইটটা নিভিয়ে ইনায়া বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। আজকের রাতের এই ক্লান্তিহীন লড়াই শেষে, এক বুক স্বপ্ন নিয়ে সে গভীর ঘুমের দেশে তলিয়ে গেল...।
.
আজ শনিবার।
ছুটির দিন, তাই অফিসের তাড়া নেই। বেইজিংয়ের আকাশটা আজ সকাল থেকেই বেশ মেঘলা। জানালার বাইরে বইছে মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস। ইনায়া আজ বেশ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ল। এক কাপ গরম দুধ আর হালকা নাস্তা শেষ করে সে সোজা চলে এল তার পড়ার টেবিলে। টেবিলের সামনে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল ইনায়া। বাইরের মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবল। তারপর একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ড্রয়ার থেকে তার নোটবুকটা বের করল।
নোটবুকের একদম প্রথম পাতায় সে গোটা গোটা অক্ষরে লিখল—
"Phoenix Jewellery — Restart Plan"
হ্যাঁ, তার পুরোনো 'In-Group' কোম্পানিটার নাম বদলে সে এবার রেখেছে 'ফিনিক্স জুয়েলারি'। নামটার দিকে তাকিয়ে ইনায়ার ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠল। 'ফিনিক্স'—সেই পৌরাণিক পাখি, যে নিজের ছাই থেকে আবার নতুন করে ডানা মেলে বেঁচে ওঠে। ওর এই ব্যবসাটাও তো একসময় নিজের রক্ত পানি করা পরিশ্রম আর স্বপ্ন দিয়ে গড়ে তোলা। আজ আবার তাকে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে। সে এক এক করে ডায়েরির পাতায় তার আসল প্ল্যানগুলো নোট করতে শুরু করল:
প্রাথমিক পুঁজি : নতুন করে শুরু করতে ঠিক কত টাকা লাগবে।
কারখানা : গয়না তৈরির মূল ওয়ার্কশপটা কোথায় নেওয়া যায়।
সরবরাহকারী : খাঁটি পাথর আর কাঁচামাল কারা জোগান দেবে।
অনলাইন মার্কেটিং : আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে কীভাবে প্রচার চালানো যায়।
প্রথম কালেকশন : বাজারে প্রথম কোন ধরনের গয়না দিয়ে আত্মপ্রকাশ করা হবে।