ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 46

লেখক: F. Tabassum

ইনায়া তখনও নিথর হয়ে বসে রইল। ইনায়ার অবশ হয়ে আসা হাতে তখনও ফোনটা শক্ত করে ধরা ছিল। মাতৃত্বের এক তীব্র যন্ত্রণায় সে কিছুক্ষণ একদম চুপ করে অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু বেশি সময় ধরে নিজেকে দুর্বল রাখার বিলাসিতা তার নেই। সে নিজের ভেতর থেকে সমস্ত শক্তি আর জেদ এক জায়গায় জড়ো করে উঠে দাঁড়াল এবং ল্যাপটপটা আবার খুলে ফেলল। স্ক্রিন অন হতেই 'Phoenix Jewellery'-এর মূল ফোল্ডারটি ওপেন হয়ে গেল। স্ক্রিনের কোণে একটি নতুন নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। আভা গ্রুপ থেকে পাঠানো হয়েছে আগামীকালের অফিশিয়াল মিটিংয়ের চূড়ান্ত কনফার্মেশন। মেইলটি দেখে ইনায়া নিজের চোখ দুটো সামান্য সরু করে প্রতিটা শব্দ পড়ল। সে নিজের মনেই আস্তে করে উচ্চারণ করল, "আই উইল অ্যাটেন্ড দ্য মিটিং।" এরপর সে ল্যাপটপে একটি নতুন ফাইল খুলে আবার নিজের কাজে ডুবে গেল। রাত যত বাড়তে থাকল, ইনায়ার ডিজাইন, বিজনেস প্ল্যান আর প্রেজেন্টেশনের কাজগুলো এক অভাবনীয় গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
.
..
.

পরের দিন সকাল হতেই ইনায়া আভা গ্রুপের হেড অফিসে গিয়ে পৌঁছাল। সে যখন ফর্মাল পোশাকে সেজে সেই মিটিং রুমে ঢুকল, তখন সেখানে সবাই অলরেডি নিজেদের আসনে বসে অপেক্ষা করছে। আভা গ্রুপের বড় বড় এক্সিকিউটিভ, আন্তর্জাতিক ডিজাইনার এবং মার্কেটিং হেড—সবাই উপস্থিত ছিলেন। রুমের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল স্ক্রিনটিতে তখন ফিনিক্স জুয়েলারির সেই অনন্য কালেকশনগুলো এক এক করে ডিসপ্লে হচ্ছিল।

ইনায়া ঘরে ঢুকতেই একজন এক্সিকিউটিভ তার সামনের ফাইলটা খুলে গম্ভীর গলায় বললেন, "ইনায়া ফেং নুশি, দংশিহুই ইচিন শেনছা-লে নি দে ছেনবু ফাংআন।" (মিস ইনায়া ফেং, বোর্ড আপনার পুরো প্রপোজালটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রিভিউ করেছে।)
ইনায়া তার পেশাদারিত্ব বজায় রেখে শান্তভাবে শুধু মাথা নাড়ল। এক্সিকিউটিভ ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন, "ওমেন ইনশিয়ান শেনখে। দানশি ওমেন শুইয়াও ছুয়ানছিউ খুওঝানশিন দে বাওঝেন।" (আমরা সত্যিই ভীষণ ইমপ্রেসড। কিন্তু আমাদের এই ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক প্রসারের বা গ্লোবাল স্কেলাবিলিটির একটি বড় নিশ্চয়তা প্রয়োজন।)
ইনায়া দৃঢ় কণ্ঠে চিনা ভাষায় জবাব দিল, "ফিনিক্স জুয়েলারি বু জিনজিন শি ইগা বেন্দী পিনপাই। থা ছং দি-ই থিয়েন ছি চিউ শি উই ছুয়ানছিউ শ্যেলুও রংহে এর শ্যেনজী দে।" (ফিনিক্স জুয়েলারি শুধু কোনো স্থানীয় ব্র্যান্ড নয়। প্রথম দিন থেকেই এটি বৈশ্বিক লাক্সারি ইন্টিগ্রেশনের কথা মাথায় রেখে ডিজাইন করা হয়েছে।)

তার এই প্রত্যয়ী জবাবে পুরো রুমে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। টেবিলের অন্য প্রান্ত থেকে একজন চিনা ডিজাইনার প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, "জাই শিজুয়ান ঝৌ ফাবু ছিছিয়ান, নিন রুহে ইংদুই শেনছান ইয়ালি?" (ফ্যাশন উইক লঞ্চের সময় যে বিপুল প্রোডাকশনের চাপ তৈরি হবে, তা আপনি কীভাবে সামলাবেন?)
ইনায়া সেই বিশাল স্ক্রিনের দিকে তাকাল এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিল, "ওমেন ইচিন জাই শাংহাই ঝুনবেই-লে পিংশিং শেনছান ডানওয়েই। ঝিলিয়াং খংঝি চিয়াং ইউ ওমেন জীঝু ঝাংউ।" (আমরা ইতিমধ্যেই সাংহাইতে একটি প্যারালাল প্রোডাকশন ইউনিট প্রস্তুত করে ফেলেছি। আর কোয়ালিটি কন্ট্রোল সম্পূর্ণ আমাদের নিজেদের তত্ত্বাবধানেই থাকবে।)
তার এই গোছানো উত্তর শুনে একজন প্রবীণ চীনা সিনিয়র এক্সিকিউটিভ হালকা মাথা নাড়লেন এবং কিছুটা কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "না পিনপাই ফাংশিয়ান নে?" (আর আপনাদের ব্র্যান্ডিংয়ের মূল দিকনির্দেশনা বা মেসেজটা কী হতে যাচ্ছে?)
ইনায়া তার শান্ত চোখ দুটো ডিরেক্টরের দিকে স্থির রেখে  বলল, "শিনশি হেন চিয়ানদান। ছংচিয়ান হৌ, ছানপো দে দোংশি খ্যেনিং হুই বিয়েন্দে গেং মেঈ।" (বার্তাটি খুবই সহজ। পুনর্নির্মাণের পর ভেঙে যাওয়া জিনিসগুলো আগের চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর হয়ে উঠতে পারে।)
এই কথার আড়ালে যে ইনায়ার নিজের জীবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠার গল্প লুকিয়ে ছিল, তা কেউ বুঝল না। রুমে আবার কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল। সব শেষে আভা গ্রুপের প্রধান হেড এক্সিকিউটিভ তার সামনের ফাইলটি সশব্দে বন্ধ করে চূড়ান্ত রায় দিলেন, "থোংগুও শাংহাই শিজুয়ান ঝৌ গুয়ানফাং ঝানশি।" (সাংহাই ফ্যাশন উইকের অফিশিয়াল শোকেসের জন্য এটি অনুমোদিত হলো।)
এত বড় সাফল্যের ঘোষণা শুনেও ইনায়া মুখে কোনো বাড়তি ইমোশন দেখাল না, সে কেবল হালকা মাথা নেড়ে তাদের ধন্যবাদ জানাল। মিটিং রুম থেকে বের হওয়ার সময় সেই বিশাল কাঁচের করিডোর দিয়ে বাইরের পুরো বেইজিং শহরটাকে দেখা যাচ্ছিল।
.
.
.

অবশেষে সেই বহু প্রতীক্ষিত এবং কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলেই এল। আভা গ্রুপের সেই মেগা রানওয়ে শোর পুরো ভেন্যু তখন কানায় কানায় পূর্ণ। চারদিকে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা নামী ইন্টারন্যাশনাল ডিজাইনার, গ্ল্যামারাস মিডিয়া, নামকরা ইনফ্লুয়েন্সার আর বড় বড় গ্লোবাল বায়ারদের উপচে পড়া ভিড়। বিশাল রানওয়ে স্টেজের মূল কেন্দ্রে আভা গ্রুপের লোগোটি জমকালো আলোয় ঝলমল করছে, আর ঠিক তার পাশেই ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় অক্ষরে লেখা রয়েছে—Phoenix Jewellery × Ava Collaboration। ইনায়া তখন ব্যাকস্টেজে এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। তার পরনে সাদা ফর্মাল আউটফিট, চুলগুলো পেছনের দিকে খুব পরিপাটি করে বাঁধা, আর হাতে শক্ত করে ধরা আছে তার শেষ মুহূর্তের ডিজাইন ফাইলটি। এত বড় ইভেন্ট, অথচ তার চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র নার্ভাসনেস নেই; সেখানে শুধু এক ধরণের শান্ত ফোকাস দৃশ্যমান। ব্যাকস্টেজের স্টাফরা দ্রুত এদিক-ওদিক দৌড়াদৌড়ি করছে, শেষবারের মতো লাইট চেক হচ্ছে আর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সেট করা হচ্ছে। এমন সময় একজন শো-কোর্ডিনেটর ইনায়ার পাশে এসে চটজলদি বলল—
"শো ইজ স্টার্টিং ইন ফাইভ মিনিটস।" (পাঁচ মিনিটের মধ্যে শো শুরু হচ্ছে।)
ইনায়া হালকা মাথা নেড়ে শান্ত গলায় বলল—
"ওকে।"
তার চোখ দুটো একবার সামনের মূল রানওয়ের দিকে চলে গেল। সেখানে আভা গ্রুপের ড্রেস কালেকশনগুলো ইতিমধ্যেই মডেলদের পরানোর জন্য সম্পূর্ণ রেডি। গোল্ড, ব্ল্যাক আর হোয়াইট কালারের এক লাক্সারি ফিউশন থিমে তৈরি হয়েছে ড্রেসগুলো, আর ইনায়ার এক্সক্লুসিভ জুয়েলারিগুলো ডিজাইন করা হয়েছে ঠিক ওই ড্রেসগুলোর সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে কমপ্লিমেন্ট করার জন্য।

হুট করেই হলের ভেতরের চড়া লাইটগুলো কমে এল। হলভর্তি শত শত মানুষের গুঞ্জনের মধ্যে এক নীরবতা নেমে এল এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুরু হয়ে গেল। প্রথম মডেল রানওয়েতে হাঁটা শুরু করল। তার পরনে ছিল একটি ব্ল্যাক সিল্ক গাউন, আর তার গলায় জ্বলজ্বল করছিল ইনায়ার ডিজাইন করা সেই অনন্য নেকলেস। সাথে সাথে শত শত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট একসাথে জ্বলে উঠল। ব্যাকস্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার হাত দুটো অবচেতনভাবেই একটু শক্ত হয়ে গেল; কারণ এই মুহূর্তে শুধু ওই হলের মানুষ নয়, বরং তার ভেতরের সমস্ত কষ্ট আর মেহনতের ডিজাইন লাইভ দেখছে পুরো পৃথিবী! সে ধীরে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে নিজের উত্তেজনা সামলাল।
এরপর একে একে আরও মডেলরা আসতে থাকল। পরের একজন মডেল যখন একটি হোয়াইট এলিগ্যান্ট ড্রেস পরে সামনে এগিয়ে গেল, তার কানে দুলছিল ইনায়ার তৈরি করা ডেলিকেট ডায়মন্ড ইয়ার রিংস—যার ডিজাইনটি ছিল ভাঙা কিন্তু খুব সুন্দরভাবে কানেক্টেড।
গয়নাগুলোর এই অসাধারণ ইমোশনাল টাচ দেখে উপস্থিত দর্শকদের মধ্য থেকে গুঞ্জন আর ফিসফিসানি শুরু হয়ে গেল। সামনের সারিতে বসা বায়ার ও ফ্যাশন বোদ্ধারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলেন—
"দিস ইজ ডিফারেন্ট..." (এটি সত্যিই অন্যরকম...)
"সো ইমোশনাল ডিজাইন..." (ভারী আবেগপূর্ণ একটি ডিজাইন...)
দর্শকদের এই প্রশংসা ব্যাকস্টেজ থেকে শুনে ইনায়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। অ্যারিসের সাথে কাটানো ভাঙা স্মৃতি, ছোট্ট আইরার সেই কান্নাভেজা কণ্ঠস্বর আর নিজের একাকীত্বের সব কষ্ট যেন এই গয়নাগুলোর নিখুঁত নকশায় রূপ নিয়েছে। নিজের অজান্তেই তার চোখে এক ফোঁটা পানি চলে এল, কিন্তু সে তক্ষুণি হাত দিয়ে তা মুছে ফেলল।
রানওয়ে শো এবার একদম শেষের দিকে চলে এল এবং ফাইনাল মডেল রানওয়েতে প্রবেশ করল। তার পরনে একটি গোল্ডেন ড্রেস এবং এই পুরো কালেকশনের মূল আকর্ষণ হিসেবে তার গলায় শোভা পাচ্ছে ইনায়ার সেই বিখ্যাত "Rebirth Necklace" । হলের স্পটলাইটের সব আলো এসে তখন ওই নেকলেসটির ওপর পড়ল, যা হীরা আর পাথরের ছটায় চারিদিক ঝলসে দিচ্ছিল। ডিজাইনটির গভীরতা দেখে পুরো অডিয়েন্স নিজেদের আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল এবং পুরো হল জুড়ে অবিরাম করতালির রোল পড়ে গেল। ধীরে ধীরে পুরো হলটি তুমুল করতালির আওয়াজে ভরে উঠল। ব্যাকস্টেজে আভা গ্রুপের একজন বড় এক্সিকিউটিভ অত্যন্ত উচ্ছ্বসিত হয়ে ইনায়ার দিকে এগিয়ে এসে বললেন—
"দিস ইজ আ গ্লোবাল হিট!" (এটি বিশ্বজুড়ে একটি বিশাল হিট!)
"উই হ্যাভ অলরেডি রিসিভড ইন্টারন্যাশনাল বায়ার ইন্টারেস্ট।" (আমরা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বায়ারদের থেকে দারুণ সাড়া ও আগ্রহ পেতে শুরু করেছি।)
এত বড় অভাবনীয় সাফল্যের পরও ইনায়ার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটি ছোট্ট বিজয়ের হাসি।
তার চোখে এখন আর কোনো ভেঙে পড়া বা হেরে যাওয়া মানুষের দুর্বলতা নেই। সেখানে এখন কেবল একজন শক্তিশালী ও অপরাজেয় নারী দাঁড়িয়ে আছে—যে নিজের জীবনের চুরমার হয়ে যাওয়া সমস্ত কষ্ট আর যন্ত্রণাকে এক রাজকীয় সাম্রাজ্যে বদলে দিয়েছে।
.
.
.
সাংহাই ফ্যাশন উইকের সেই চোখধাঁধানো সাফল্যের পর ইনায়ার জীবন এক রাতে সম্পূর্ণ বদলে গেল. আভা গ্রুপের মতো বিশ্বখ্যাত নামের সাথে যুক্ত হয়ে তার নিজের নাম এখন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন মহলে ছড়িয়ে পড়েছে. রাতারাতি "ফিনিক্স জুয়েলারি" লাক্সারি ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক স্বীকৃতি পেতে শুরু করে. কিন্তু এত বড় আন্তর্জাতিক সাফল্যের আলোতেও ইনায়ার মনের ভেতরের একটা গহীন কোণ বড্ড অপূর্ণ আর ফাঁকা রয়ে গিয়েছিল. সেই শূন্যতা ছিল তার নিজের পুরোনো কোম্পানিকে ঘিরে, যা সে একদিন অনেক স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তুলেছিল.
সকালে অফিসে বসে ইনায়া যখন আভা গ্রুপের নতুন বড় প্রপোজাল, গ্লোবাল অর্ডারের হিসাব আর প্রোডাকশন শিডিউল দেখছিল, তখন হুট করেই তার নজর যায় পুরোনো একটা নোটবুকের দিকে. ধুলো জমা সেই ডায়েরিটা আসলে বন্ধ হয়ে যাওয়া তার প্রথম সাধনার সেই কোম্পানির ছিল. ডায়েরির মলিন পাতাগুলো উল্টাতেই তার নিজের হাতের লেখা পুরোনো সব ডিজাইনের আইডিয়া, লোগোর স্কেচ আর হারিয়ে যাওয়া হাজারো স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠল. ইনায়া কিছুক্ষণ সেগুলোর দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইল. তারপর ধীর গলায় বলল, "এটা শুধু চায়নাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না".
সে তখনই ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে একটা নতুন ফাইল তৈরি করল, যার শিরোনাম দিল—
"Phoenix Jewellery Global Restart Plan".

ইনায়া সিদ্ধান্ত নিল, চায়নার পাশাপাশি এবার বাংলাদেশেও তার সেই পুরোনো অফিস আবার নতুন করে খুলবে. পুরোনো সেই বিশ্বস্ত ডিজাইনার আর স্টাফদের আবার ফিরিয়ে আনা হবে, লোকাল প্রোডাকশন ইউনিট নতুন করে স্টার্ট হবে এবং একটি অনলাইন গ্লোবাল স্টোরও লঞ্চ করা হবে. মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে তার এই অফিশিয়াল অ্যানাউন্সমেন্ট চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল, কারণ ফিনিক্স জুয়েলারি এখন আর শুধু একটা কোলাবোরেশন ব্র্যান্ড নয়, এটি এখন একটি স্বাধীন ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি.
.
.
.
.

ঢাকার সেই পুরোনো অফিসে, যা এতদিন ধরে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল. পরদিন সকালে সেই বন্ধ বিল্ডিংয়ের সামনে একটি ঠিকাদার দল এসে দাঁড়াল. পুরোনো মলিন সাইনবোর্ডটি দেয়াল থেকে যখন খুলে ফেলা হচ্ছিল, তখন আশেপাশের পুরোনো কর্মচারীরা অবাক হয়ে সেখানে এসে ভিড় জমাল. কিন্তু তাদের বিস্ময়ের সীমা রইল না যখন সেখানে একটি জমকালো নতুন বোর্ড বসানো হলো, যেখানে বড় বড় অক্ষরে লেখা—PHOENIX JEWELLERY – HEAD OFFICE.

কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে বলতে লাগল, "এটা আবার চালু হচ্ছে? ম্যাডাম নিজে আমাদের ফিরিয়ে আনছেন?"
চায়নাতে বসেই ইনায়া ভিডিও কলের মাধ্যমে বাংলাদেশে তার সেই পুনর্গঠিত টিমের সাথে প্রথম মিটিংয়ে যুক্ত হলো. স্ক্রিনের ওপাশে থাকা টিম মেম্বারদের দিকে তাকিয়ে সে শান্ত গলায় বলল, "আমরা কোনো সাধারণ কোম্পানি নতুন করে শুরু করছি না। আমরা একটা লিগ্যাসিকে পুনর্জন্ম দিচ্ছি".
.

মিটিংয়ের শেষ পর্যায়ে একজন বাংলাদেশি ম্যানেজার দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "বাংলাদেশ অপারেশনের কে এটা লিড করবেন?"
ইনায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য চুপ থেকে তার চোখ দুটো ক্যামেরার দিকে স্থির করল. তারপর জবাব দিল, "শুরুর দিকে আমি নিজেই সবকিছু সরাসরি দেখব"।

ইনায়ার এই সিদ্ধান্তের পরপরই বাংলাদেশে পুরোনো ফিনিক্স জুয়েলারির অফিসটি সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে ও নতুনভাবে চালু করা হলো।  মুহূর্তের মধ্যে পুরো ঢাকা শহরে এই খবরটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। দেশের কিছু শীর্ষস্থানীয় মিডিয়ার হেডলাইনে দেখা যায়
—"বন্ধ হয়ে যাওয়া লাক্সারি ব্র্যান্ড আবার ফিরে এলো নতুন রূপে",
—"ইনায়া ফেং-এর ফিনিক্স জুয়েলারি আবার বাংলাদেশে কার্যক্রম শুরু করছে"
—"চায়না সফলতার পর দেশে ফিরছে আন্তর্জাতিক জুয়েলারি ব্র্যান্ড"।
এমন খুশির খবরে তাদের পুরোনো কর্মীরাও অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত হয়ে একে একে আবার কোম্পানিতে জয়েন করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গভীর বিস্ময় নিয়ে বলতে থাকেন, "ম্যাডাম সত্যিই আবার সবকিছু শুরু করেছেন..."। আবার কেউ কেউ নিজেদের চোখের জল মুছতে মুছতে আবেগী কণ্ঠে বলেন, "এই ব্র্যান্ডটা তো আমরা একপ্রকার হারিয়েই ফেলেছিলাম..."।

ঢাকার পুরো কর্পোরেট জগতেও ফিনিক্স জুয়েলারির এই দুর্দান্ত কামব্যাক নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে যায়। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকেন,
—"এই ধরণের কামব্যাক করাটা মোটেও সহজ কোনো কথা না..."।
তবে আভা গ্রুপের মতো গ্লোবাল জায়ান্টের সাথে যখন ইনায়ার নাম জড়িয়ে আছে, তখন এই ব্র্যান্ড যে খুব দ্রুত গ্লোবাল লেভেলে পৌঁছে যাবে, তা নিয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।

চায়না থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে যখন ইনায়া তার এই নতুন দলের সাথে মিটিংয়ে বসল, তখন স্ক্রিনে ভেসে ওঠা বাংলাদেশের সাজানো অফিসটি দেখে সে শান্ত গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল—"দিস ইজ নট জাস্ট রিওপেনিং আ কোম্পানি..."।
অনলাইনের ওপাশে থাকা সবাই নীরবতায় তার প্রতিটি কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। ইনায়া নিজের চোখ দুটো স্ক্রিনের দিকে স্থির রেখে দৃঢ়তার সাথে যোগ করল—"দিস ইজ দ্য রিবার্থ অব ফিনিক্স জুয়েলারি।" তার এই গভীর ও অর্থপূর্ণ কথা শুনে পুরো রুমের সবাই এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যান এবং তারপর একজন ম্যানেজার অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে ধীর গলায় জবাব দেন, "আন্ডারস্টুড, ম্যাম।"

এই নতুন শুরুর হাত ধরে বাংলাদেশে ফিনিক্সের এক অভাবনীয় গতিতে কাজ এগোতে থাকে—নতুন দক্ষ ডিজাইনাররা যুক্ত হন, পুরোনো ব্র্যান্ডিংকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে রিডিজাইন করা হয় এবং বাংলাদেশের মার্কেটকে টার্গেট করে প্রথম লোকাল কালেকশনের একটি মাস্টারপ্ল্যান সাজানো হয়। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই মিডিয়ার এই প্রভাব পুরো দেশ জুড়ে ভাইরালে রূপ নেয়। দেশের বিজনেস মিডিয়া, ফ্যাশন ব্লগার থেকে শুরু করে প্রথম সারির টিভি চ্যানেলগুলো কেবল এই একটি অবিস্মরণীয় কামব্যাক নিয়েই মেতে ওঠে। লাইভ টকশোতে এসে একজন নামকরা জার্নালিস্ট অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন—"এটি বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে বড় কামব্যাকের গল্প।
—ফিনিক্স জুয়েলারির এই রাজকীয় প্রত্যাবর্তন আমাদের দেশের লাক্সারি মার্কেটকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দেবে।

বাংলাদেশ অফিস চালু করার পুরো পরিকল্পনা যখন চূড়ান্ত, ঠিক তখনই একটা বড় বাধা সামনে চলে এল। ডাক্তারের কড়া নির্দেশনা ছিল যে ইনায়া এই মুহূর্তে কোনোভাবেই ভ্রমণ করতে পারবে না। বেইজিংয়ের অ্যাপার্টমেন্টে বসে সে পুরো নিয়ন্ত্রণে রেখে নিজের ব্যবসা চালালেও ঢাকার অফিসে সশরীরে উপস্থিত থাকা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। ঢাকা অফিস আবার চালু হওয়ার পর সেখানে ইনায়ার নিজের যাওয়ার কথা থাকলেও চিকিৎসকের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে সে নিজে যেতে পারল না। তাই সবকিছুর দায়িত্ব দিয়ে সে তার সবচেয়ে ভরসাযোগ্য রোহানকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। ইন গ্রুপের একদম শুরুর দিককার প্রথম পর্যায়ের ধাপেও রোহান নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছিল, যার ফলে সে আগে থেকেই ইনায়ার ভীষণ আস্থাভাজন একজন কর্মী। এবার ইনায়ার ডাক পাওয়া মাত্রই সে সব সামলাতে আবার পুরোদমে কাজে নেমে পড়ল। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে ইনায়া রোহানের মুখোমুখি হয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলল, "তুমি বাংলাদেশের পুরো অপারেশন আর সব কাজকর্ম নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সামলাবে।" রোহান সম্মানের সাথে মাথা নেড়ে জবাব দিল, "আমি বুঝতে পেরেছি, ম্যাডাম।"

বাংলাদেশে পৌঁছানোর পর রোহান সরাসরি ফিনিক্স জুয়েলারির সেই পুরোনো অফিসে চলে গেল। সেখানে গিয়ে সে দায়িত্ব নিয়ে একদম নতুন একটি শক্তিশালী টিম নিয়োগ দেওয়ার কাজ শুরু করে দিল। নতুন ডিজাইনারদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা, ওয়ার্কশপের নতুন সেটআপ নিজে দাঁড়িয়ে তদারকি করা, পুরোনো কাঁচামাল সরবরাহকারীদের সাথে আবার নতুন করে যোগাযোগ স্থাপন করা এবং স্থানীয় বাজারের উপযোগী একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং পরিকল্পনা তৈরি করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সে এক হাতে সামলাতে লাগল। রোহানের দক্ষ পরিচালনায় অফিসের সব কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকল।
সবকিছু গুছিয়ে আনে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 46 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন