সেখানে জ্বলজ্বল করছে ' হাসবেন্ড' নামটা। প্রথম দেখায় ইনায়া ভাবল ফোনটা তুলবে না। যে অতীত আর যে মানুষকে পেছনে ফেলে সে চীনে চলে এসেছে, তার সাথে আর কোনো যোগাযোগ রাখা ঠিক হবে না। কিন্তু ঘড়ির দিকে তাকিয়েই ওর বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। এত রাতে অ্যারিস ফোন করেছে? তবে কি আইরার কোনো বিপদ হলো? আইরা ভালো আছে তো? মায়ের মন কোনো বাধাই মানল না, আইরার আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল। কোনো কিছু না ভেবেই সে দ্রুত ফোনটা রিসিভ করল। ইনায়া ওপাশ থেকে কিছু বলার আগেই ফোনের স্পিকার থেকে ভেসে এল এক অবুঝ কণ্ঠস্বর—
"মাম্মা... "
ইনায়া পুরো স্তব্ধ হয়ে গেল। সবকিছু যেন এক সেকেন্ডে হারিয়ে গেল। চেনা পড়ার ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এই একটি শব্দের জন্য তার কান দুটো তৃষ্ণার্ত হয়ে ছিল কতদিন! নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে ফিসফিস করে বেরিয়ে এল, "আইরা..."
আইরা ওপাশ থেকে কান্নাভেজা গলায় বলল, "তুমি বলেছিলে তাড়াতাড়ি চলে আসবে... এখনো আসলে না কেনো?"
চোখ বন্ধ করে ইনায়া আস্তে করে বললো, "আর একটু অপেক্ষা করো মা... আমি আসবো..."
আরো জোরে কেঁদে ওঠে আইরা বললো, "নো... আমি আমার মাম্মা কে চাই... এখনই চাই... "
গলা ভারী হয়ে আসা ইনায়ার, "জেদ করে না মা..."
নাক টেনে আইরা বললো, "আমি জেদ করছি না... আমি শুধু তোমাকে চাই... জানো, আজকে তোমার বালিশটা জড়িয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলাম..."
কষ্ট চেপে ইনায়া বললো: "তারপর?"
অভিমানী গলায় আইরা বলে, "কিন্তু তোমার মতো গন্ধ ছিল না..."
ইনায়া ঠোঁট কামড়ে চোখের জল আটকানোর চেষ্টা করল। ব্যর্থ হলো। কান্না লুকিয়ে বললো : "আমার সাহসী মেয়েটা কাঁদছে কেন?"
— "কারণ আমার মাম্মা আমার কাছে নেই... সবাই আছে... বাবা আছে... দাদু আছে... কিন্তু তুমি নেই..."
—"আমি তো তোমার কাছেই আছি মা..."
সাথে সাথে প্রতিবাদ করে উঠলো আইরা, "না! ফোনের মধ্যে থাকলে হয় না... আমি জড়িয়ে ধরতে পারি না। রাতে ঘুমানোর আগে চুমু দিতে পারি না... তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না মাম্মা?"
প্রশ্নটা শুনে ইনায়ার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কাঁদতে কাঁদতে ইনায়া বললো, "এমন কথা কখনো বলবে না... তোমাকে আমি পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি..."
ফোঁপাতে ফোঁপাতে আইরা বললো, "তাহলে চলে আসো..."
নীরব হয়ে যায় ইনায়া। এত কঠিন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়ে নি সে। আস্তে করে আইরা ডাকে, "মাম্মা?"
চোখের জল মুছতে মুছতে ইনায়া বলে: "হুম..."
— "আমি প্রতিদিন আল্লাহর কাছে দোয়া করি..."
কৌতূহলী গলায় ইনায়া বলে: "কী দোয়া করো?"
কান্না মেশানো সরল কণ্ঠে আইরা বললো, "যেন আমার মাম্মা আর বাবা আবার একসাথে থাকে..."
ইনায়া আর কোনো উত্তর দিতে পারল না।
—"মাম্মা? তুমি কথা বলছো না কেন?"
— "শুনছি মা..."
— "আমি তোমাকে অনেক মিস করি...অনেক অনেক..."
ইনায়া ভাঙা হাসি দিয়ে বলে, "আমিও তোমাকে মিস করি মা..."
— "মাম্মা..."
—"হুম মা..."
—"বাবাও miss করে..."
ইনায়া চুপ হয়ে গেল। সরল গলায় আইরা বললো: বাবা কিন্তু তোমাকে ভীষণ miss করে..."
— "আচ্ছা?"
মাথা নাড়ার ভঙ্গিতে আইরা বললো, "হ্যাঁ... প্রতিদিন তোমার ছবি দেখে...মাঝে মাঝে রাতে কাঁদেও..."
একটু থেমে কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করে, "বড়রা কাঁদলে কি লজ্জা লাগে?"
—"না মা... কষ্ট পেলে সবাই কাঁদে..."
—"তাহলে বাবা অনেক কষ্ট পায়..."
—কেন এমন বলছো?
আইরা এক নিঃশ্বাসে বলে, "কারণ বাবা প্রতিদিন তোমার রুমে যায়... তোমার আলমারি খোলে... তোমার শাড়িগুলো ধরে বসে থাকে... আর আমাকে জড়িয়ে ধরে বলে— "মাম্মার মতো গন্ধ আসে?" বাবা কত পাগলামি করে জানো?"
— "কী করে?"
— তোমার favourite কফি বানায়...তারপর নিজেই খায় না...বলে, এটা ইনায়ার জন্য... একদিন তো তোমার নম্বরে অনেকবার কল করেছিল... তারপর ফোনটা বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল ... বাবা একদম পাগল হয়ে গেছে..."
আইরা ফিসফিস করে ডাকে, "মাম্মা..."
— "হুম?"
—"তোমরা দুজনই কাঁদো... তুমি ওখানে কাঁদো... বাবা এখানে কাঁদে... তাহলে একসাথে থাকো না কেন?"
প্রশ্নটার উত্তর ইনায়ার কাছে ছিল না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আইরা আবার ডাকলো : "মাম্মা?"
চোখের জল মুছতে মুছতে বলে, "বলো মা..."
কান্নাভেজা গলায় আইরা বললো, "আমি না... তোমাদের দুজনকেই খুব মিস করি... "
কষ্ট চেপে ইনায়া বলে: "খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো মা..."
সাথে সাথেই অভিমানী গলায় আইরা: "তুমি আগেও বলেছিলে... কিছুদিন পর আসবো...এখন তো প্রায় দুই মাস হতে চললো... দুই মাস কি কিছুদিন হয়?"
উত্তর খুঁজতে থাকা ইনায়া: "মা..."
ফুপিয়ে উঠে আইরা, "আমি প্রতিদিন ক্যালেন্ডারে দাগ দিই... কতদিন হলো তুমি নেই... প্রথমে ভাবছিলাম কয়েকদিন... তারপর এক সপ্তাহ... তারপর এক মাস... এখন দুই মাস...তুমি এখনো আসো না কেন?"
—"কিছু কাজ আছে মা..."
অভিমান ভরা কণ্ঠে আইরা বলে উঠে, "কাজ কি আমার চেয়েও বেশি দরকারী ?"
ইনায়া চোখ বন্ধ করল। কান্না জড়ানো বললো, "না মা... তুমি আমার সবকিছুর চেয়েও দরকারী ...
সাথে সাথে আইরা বলে উঠে, "তাহলে চলে আসো..."
—"সবকিছু এত সহজ না মা..."
—"আমি তো ছোট...আমি এত কিছু বুঝি না... আমি শুধু বুঝি, রাতে ঘুমানোর আগে মাম্মা কে জড়িয়ে ধরতে পারি না... সকালে উঠে মাম্মা কে দেখতে পাই না... স্কুল থেকে এসে মাম্মা কে ডাকতে পারি না...
আমি আর কতদিন অপেক্ষা করবো?"
আইরার কথা শুনে গলা ধরে আসে ইনায়ার : "আর বেশি না মা..."
অবিশ্বাসী গলায় আইরা বলে উঠে, "সত্যি?"
—"হুম..."
আঙুল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে আইরা বললো, "Promise?"
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইনায়া: "Promise..."
কষ্ট মেশানো হাসি দিয়ে আইরা বললো, "তুমি promise ভাঙবে না তো?"
প্রশ্নটা শুনে ইনায়ার বুকটা হাহাকার করে উঠল। কাঁপা গলায় ইনায়া: "না মা... এবার ভাঙবো না..."
—"আমি প্রতিদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকি...মনে হয়, এখনই হয়তো বেল বাজবে... তারপর দরজা খুললেই তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে... আমি দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরবো... আর ছাড়বো না..."
ওপাশে ছোট্ট মেয়েটার কান্নার শব্দ ভেসে আসতে লাগল, আর এপাশে ইনায়া ফোনটা শক্ত করে ধরে নীরবে কাঁদতে লাগল। নিজেকে সামলে নিয়ে ইনায়া বললো, "আচ্ছা মা... তুমি ফোন পেলে কীভাবে?"
আইরা কান্নার মাঝেও একটু আস্তে বলে : "বাবার ফোন থেকে..."
— "বাবা দিয়েছে?"
মাথা নাড়ার ভঙ্গিতে আইরা বলে, "না... বাবা ঘুমিয়ে গেছে..."
— "এত তাড়াতাড়ি?"
—"বাবা কান্না করতে করতে ঘুমিয়ে গেছে..."
ইনায়ার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। চুপ হয়ে যায় ইনায়া: ...
— "আমি পানি খেতে উঠেছিলাম.. দেখি বাবা সোফায় বসে আছে... তোমার ছবিটা হাতে ছিল... তারপর কাঁদছিল... আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম...:বাবা তো সাধারণত কাঁদে না... কিন্তু আজকে অনেক কাঁদছিল... তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি..."
শিশুসুলভ কৌতূহলে মেশানো গলায় বলে: "মাম্মা?"
— "হুম?"
— "বড়রা কি কাউকে এত বেশি ভালোবাসলে এমন কাঁদে?"
ইনায়া কোনো উত্তর দিতে পারল না।
— "বাবা তোমাকে এখনো অনেক ভালোবাসে, তাই না?"
— "মা... এসব কথা..."
কথা কেটে দিয়ে আইরা বলে: "আমি বুঝি.. বাবা যখন তোমার কথা বলে, তখন তার চোখ অন্যরকম হয়ে যায়... আর তোমার নাম শুনলেই চুপ হয়ে যায়...তোমরা দুজনই একে অপরকে মিস করো... কিন্তু কেউ কাউকে বলে না..."
কিছুক্ষণ নীরব থাকে আইরা ! ইনায়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করে: "এখন কোথায় আছো মা?"
— "তোমার বাসায়..."
— "মানে?"
— "ওই যে একটা খালাম্মা আছে না... ঝর্ণা না কী যেন নাম... উনি নাকি আমাদের সম্পত্তি নিয়ে গেছে... আর সবাইকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে... তাই আমরা এখন তোমার বাসায় থাকি..."
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড একদম নিশ্চুপ হয়ে রইল।
— "তোমরা... নানুর বাসায় আছো?"
— "হুম... আমি এখন তোমার রুমে বসে আছি... সবকিছু এখনো আগের মতো আছে... তোমার বালিশও... তোমার বইও... তোমার পারফিউম ও..."
ইনায়ার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। আস্তে করে ইনায়া বললো: "মা, একটা কাজ করবে?"
— "করবো।"
— "আমার আলমারিটার কাছে যাও..."
দৌড়ে যেতে যেতে আইরা: "আচ্ছা..."
কিছুক্ষণ শুধু পায়ের শব্দ শোনা গেল।হাপাতে হাপাতে বললো : "চলে এসেছি..."
— "আলমারিটা খোলো।"
— "খুলেছি।"
— "দ্বিতীয় ড্রয়ার টা টানো।"
কিছু খুঁজতে খুঁজতে আইরা: "এখানে অনেক কাগজ... একটা খামও আছে..."
— "ওই খামটা বের করো।"
— "করেছি..."
— "খোলো।"
কিছুক্ষণ কাগজের খসখস শব্দ হলো। আইরা অবাক হয়ে বলে: "মাম্মা! এখানে একটা ফোন আছে!"
— "হুম!"
— "এটা কার?"
— "এখন থেকে এটা তোমার।"
— "সত্যি?"
— "হুম।"
— "কিন্তু এতে তো কোনো নাম্বার নেই..."
— "একটা আছে।"
—"কার?"
— "আমার। এখন থেকে যখনই আমাকে খুব মনে পড়বে... যখন কাঁদতে ইচ্ছে করবে... যখন আমার সাথে কথা বলতে চাইবে... এই ফোন দিয়ে কল করবে।"
— "যে কোনো সময়?"
— "যে কোনো সময়।"
—"তুমি ধরবে?"
— "যত ব্যস্তই থাকি... তোমার কল আমি ধরবো।"
কাঁদতে কাঁদতে হাসল আইরা: "তাহলে আমি প্রতিদিন কল দিবো..."
—" দিও।"
— "দিনে অনেকবারও?"
হেসে ফেলল ইনায়া: "অনেকবারও।"
খুশিতে কেঁদে ফেলা আইরা: "তাহলে আর তোমাকে মিস করলে একা একা কাঁদতে হবে না..."
—" না মা..."
আইরা ফোনটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে: "এটা আমি কাউকে দিবো না... এটা শুধু আমার আর আমার মাম্মার ফোন... "
—"তবে একটা কথা মনে রাখবে মা..."
কৌতূহলী গলায় আইরা: "কী কথা?"
—"বাসার কেউ যেন এটা না জানে..."
অবাক হয় আইরা, "কেউ না?"
ইনায়া: "হুম... কেউ না।"
ফিসফিস করে আইরা: "বাবাও না?"
ইনায়া কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।ধীরে ধীরে বললো, "বাবাও না, মা..."
—"কেন?"
—"কিছু কিছু কথা বড়দের মধ্যে থাকে..."
— "ও... তাহলে এটা আমাদের সিক্রেট?"
হালকা হেসে ইনায়া: "হ্যাঁ... আমাদের ছোট্ট সিক্রেট।"
উত্তেজিত গলায় আইরা বলে উঠে, "সিক্রেট মিশন!"
অনেকদিন পর একটু হেসে ফেলল ইনায়া: "একদম।"
—"আমি কাউকে বলবো না।"
—"খেয়াল রাখবে যেন ফোনটা কেউ না দেখে।"
—"আমি লুকিয়ে রাখবো।"
— "কোথায়?"
ভাবতে ভাবতে আইরা বললো, "উমম...তোমার রুমে যে টেডি বিয়ার আছে, তার পেছনে!"
—"তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান হয়ে গেছো।"
— "আমি তোমার মেয়ে।"
চোখ ভিজে উঠল ইনায়ার। আস্তে করে ইনায়া: "ঠিক বলেছো..."
হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া গলায় আইরা: "জানো মা..."
— "কী মা?"
—"নানু তোমাকে অনেক ভালোবাসে..."
ইনায়ার মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। শান্ত কিন্তু কষ্টভরা গলায় ইনায়া বললো : "ভালোবাসলে বাসা থেকে বের করে দিতো না..."
চুপ হয়ে যায় আইরা! আস্তে করে বলে : "সেদিন তোমার কথা ভেবে নানু অনেক কান্না করেছিল..."
—"কান্না করলে সব ঠিক হয়ে যায় না মা..."
—"আমি জানি না... কিন্তু আমি দেখেছি..."
—"কী দেখেছো?"
—" সেদিন রাতে সবাই ঘুমিয়ে গিয়েছিল... আমি পানি খেতে উঠেছিলাম... তখন দেখি নানু একা বসে আছে... তোমার একটা ছবি হাতে..."
ইনায়ার বুকটা ধক করে উঠল। তবে চুপ করে রইলো...
—"নানু ছবিটা বুকে ধরে কাঁদছিল... বলছিল... আমার মেয়েটাকে আমি হারিয়ে ফেলেছি... একবার যদি সামনে আসতো... একবার যদি মা বলে ডাকতো...আমি আর কিছু চাইতাম না..."
শিশুসুলভ কৌতূহলে আইরা ডাকলো, "মাম্মা?"
—"হুম..."
—"মানুষ কি কাউকে ভালোবেসেও কষ্ট দিতে পারে?"
প্রশ্নটা শুনে ইনায়া কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বলতে পারল না। আস্তে করে ইনায়া বললো, "কখনো কখনো পারে..."
—"তাহলে নানু কি তোমাকে ভালোবেসে কষ্ট দিয়েছে?"
—"জানি না মা..."
—"আমি মনে করি নানু তোমাকে ভালোবাসে..."
—"কেন এমন মনে হয়?"
—"কারণ তোমার নাম শুনলে নানুর চোখে পানি আসে... আর কেউ না দেখলে তোমার ছবিতে চুমু দেয়... আমি নিজের চোখে দেখেছি..."
ইনায়ার চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল।
ফিসফিস করে আইরা ডাকলো, "মাম্মা..."
—"বলো মা..."
খুব আস্তে করে বলে: "সবাই তোমাকে মিস করে... বাবা. নানু . নানা. দাদা. দাদু. চাচ্চু. চাচি. মামা. মামী. সিয়ান ও তোমায় মিস করে... আর জানো যখন খালামণি শুনেছে নানু তোমাকে বের করে দিয়েছে উনি রাগ করে সেদিন বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছে.. তার খালার বাসায় থাকে... আর বলেছে, তুমি না আসা পর্যন্ত এই বাসায় আসবে না। আমি তো করি-ই... তুমি কি কাউকে মিস করো না...?"
চোখের জল মুছতে মুছতে ইনায়া বললো, "তোমাদের সবাইকেই করি মা..."
আইরা সাথে সাথেই দুষ্টু গলায় বলে: "বেশি বাবা কে করো, তাই না? "
হতভম্ব হয়ে ইনায়া: "এই পাকা পাকা কথা কে শিখিয়েছে তোমাকে?"
খিলখিল করে হেসে উঠল আইরা, "কেউ না... আমি জানি..."
ইনায়া ভ্রু কুঁচকে বলে : "কী জানো?:
আত্মবিশ্বাসী গলায় আইরা বললো, "তোমরা দুজন একে অপরকে ভীষণ মিস করো..."
—"আইরা..."
— "দেখো, আবার আমার নাম ধরে ডাকলে..."
মৃদু বিরক্তি দেখিয়ে ইনায়া বললো, "খুব বেশি বড় হয়ে গেছো তুমি..."
— "আমি তো তোমার মেয়ে... "
ইনায়া হেসে ফেলল। অনেকদিন পর মন থেকে হাসি এল। নরম গলায় ইনায়া: "আচ্ছা, এখন আর কোনো কথা না... অনেক রাত হয়েছে... ঘুমাও মা..."
মুখ ভার করে আইরা: "উমম..."
—"কী হলো?"
— "ফোন রাখলে আবার তোমাকে miss করবো..."
— "কাল আবার কথা হবে..."
— "Promise?"
— "Promise."
খুশি হয়ে যায় আইরা: "তাহলে ঠিক আছে..."
—" ভালো মেয়ের মতো ঘুমাবে।"
—"আচ্ছা মাম্মা..."
—"আর কান্না করবে না।"
—"চেষ্টা করবো..."
—"চেষ্টা না, করবেই।"
—" ইয়েস মাম্মা....."
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। কেউ ফোন কাটতে চাইছিল না। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে আইরা: "মাম্মা..."
—"হুম?"
ভীষণ আস্তে করে আইরা: "I love you..."
ইনায়ার চোখ আবার ভিজে উঠল। কাঁপা গলায় ইনায়া: "I love you too, princess..."
হাসতে হাসতে আইরা: "গুড নাইট মাম্মা ..."
মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে ইনায়া: "গুড নাইট, মা..."
আইরা শেষবারের মতো বায়না ধরে বলে," মাম্মা একটা গান শোনাও না।"
ইনায়া একটু হাসে। তারপর চোখ মুখে শুরু করে:
"খোলা চোখখানা করো বন্ধ,
বাতাসের ঠান্ডা গন্ধ
বয়ে বেড়ায় ঘরেরও বাহিরে..
আসো ছোট্ট একটা গান করি,
যাতে ঘুমপাড়ানি মাসি এসে পাশে
বসে হাতখানা দিবে কপাল ভরে..
ভয় নেই আছি আমি পাশে,
হাতখানা ধরে আছি হেসে,
কোলেতে আমার মাথা তোমার...
অন্ধকার রাত, নিশ্চুপ সব
জোনাকির দল আজও জেগে আছে,
তারা হয়তো অপেক্ষায় তোমার ঘুমের..
হাতে রেখে হাত দেখে ঘড়ি,
বসে অপেক্ষা করি,
কবে হবে কাল, ফুটবে সকাল..."
গান শুনতে শুনতে আইরা ঘুমিয়ে পড়ে। ইনায়া ডাকে, সাড়া না পেয়ে কল কেটে দেয়। অনেকক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল ইনায়া। কল শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু ছোট্ট মেয়েটার "গুড নাইট মাম্মা " কথাটা যেন এখনো কানে বাজছে... অনেক দিন পর সে হাসলো! কেমন একটা ভালোলাগা কাজ করছে ভিতরে। মনে হচ্ছে সব যেনো আবার ফিরে পেয়েছে। বাড়ির সবার খবর জেনে কিছুটা হলেও হালকা লাগছিল। তবে অ্যারিসের কথা ভেবে আবার মন খারাপ হয়ে গেলো। লোকটা কি একটু নিজের খেয়াল রাখতে পারে না? ওর জন্য কত টেনশন হয়, বোঝে একটুও???