ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 55

লেখক: F. Tabassum

বিকেলের নরম আলো তখন ড্রয়িংরুমের কাঁচের জানালা গলে মেঝেতে এসে পড়েছে। শামীমা বেগম, জিয়ান ফেং, আদিয়ান, সুবা, ইভান আর সায়মা—সবাই একসাথে বসে চা খেতে খেতে হালকা মেজাজে গল্প করছিলেন। সুবা তার পাশে ছয় বছরের সিয়ানকে নিয়ে বসে আছে, সিয়ান মনোযোগ দিয়ে একটা ড্রয়িং খাতা আঁকিবুঁকি করছে।
আইরা দুপুর থেকেই নিজের রুমে বন্দি ছিল। মাঝখানে সায়মা তাকে ডাকতে গিয়েও দেখল দরজা ভেতর থেকে লক। কেউ আসলে জানত না যে এই ছোট্ট মানুষটা এতক্ষণ ঘরের ভেতর কী কাণ্ড কারখানা করছে।
হঠাৎ করে ওপরের সিঁড়ি দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে নেমে এলো ছোট্ট একটা মানুষ। তার হাঁটার স্টাইল আর পোশাক দেখে ড্রয়িংরুমে বসা প্রতিটা মানুষের হাতের চায়ের কাপ বাতাসে থমকে গেল।
আইরার পরনে—
একটা কুচকুচে কালো ফিটিং প্যান্ট। ভেতরে গোঁজা ধবধবে সাদা শার্ট। চোখে গোল ফ্রেমের একটা ব্ল্যাক সানগ্লাস। আর কাঁধের ওপর ঝুলছে ইভানের আলমারি থেকে টেনেটুনে বের করা একটা কালো ওভারকোট, যা আইরার ছোট শরীরের তুলনায় মাটিতে প্রায় লুটোপুটি খাচ্ছে। একদম হুবহু ইনায়ার সেই ভাইরাল হওয়া ছবির কার্বন কপি!
আইরা চোখের চশমাটা নাক দিয়ে একটু ওপরে ঠেলে, হাত দুটো কোমরে রেখে ডাকলো, "বাবা!"
সোফায় বসে থাকা অ্যারিস মেয়ের দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল।
— "দেখো তো বাবা... আমাকে একদম মাম্মার মতো লাগছে না?"
আইরার ওই গম্ভীর মুখের আধো-আধো প্রশ্ন শুনে পুরো ড্রয়িংরুমে একসাথে হাসে ফেললো। কারণ সত্যি বলতে—কালো চশমা আর ওই পোশাকে গোলগাল মেয়েটাকে দেখতে অবিকল ঠিক ছোট্টবেলার ইনায়ার মতোই লাগছিল। অ্যারিস সোফায় সোজা হয়ে বসে দুই হাত বাড়িয়ে আইরাকে নিজের কাছে ডাকল।
—"না, একদমই লাগছে না।"
আইরার সেই ফোলা ফোলা মিষ্টি মুখটা কথা শুনে সাথে সাথে ছোট হয়ে গেল। সে ঠোঁট উল্টে বলল
—"লাগছে না? কেন লাগবে না? চাচ্চু তো বলল একদম মাম্মার মতো ড্রেসআপ হয়েছে!"
অ্যারিস আইরাকে টেনে নিজের কোলে তুলে নিল এবং তার চোখের ওপর থেকে কালো চশমাটা সরিয়ে দিল।
—"You look like my Daisy."
আইরা অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকালো, "ডেইজি ?"
—"হুম।"
—"ওটা আবার কে পাপা?"
পাশ থেকে ইভান নিজের হাসি চেপে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। সায়মা সোফার কুশনে মুখ ঢেকে ফিকফিক করে হাসছে। আদিয়ান আর সুবাও একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। অ্যারিস হুট করে সবার এই অদ্ভুত হাসি দেখে বড্ড বেশি লজ্জাতে পড়ে গেল। সে একটু আমতা আমতা করতে লাগল।
— "বলো না বাবা, ডেইজি কে?"
— "ডেইজি... ডেইজি আসলে একটা খুব সুন্দর  ফুল।"
— "তাহলে আমি কি ফুল?"
— "হ্যাঁ, তুমি আমার সবচেয়ে প্রিয় ফুল।"
— "আর?"
— "আর... আর তোমার আম্মুও।"
আইরার কিছু একটা মনে পড়ে। সে এক গাল হেসে চিৎকার করে উঠল—
—"ওওওও... বুঝেছি! তোমার ফোনে মাম্মার নাম 'ডেইজি' দিয়ে সেভ করা, তাই না বাবা?"
অ্যারিস এবার সত্যিই লজ্জায় পড়ে গেল। সে অস্বস্তি ঢাকতে নকল কাশির অভিনয় করতে শুরু করল—
—"আইরা, ওসব কিছু না... তুমি বেশি বুঝো।"
ইভান জীবনে প্রথমবার সুযোগ পেয়ে ভাইকে খোঁচা দেওয়ার। সেটা তো হাতছাড়া করবেই না। এতদিন অ্যারিসের খোঁচা সহ্য করেছে সে। আজ তার পালা, বললো, "হা হা হা! ধরা খাইছো ভাই! একদম হাতেনাতে ধরা।"
সায়মা: "এত দিন পার হয়ে গেল, ডিভোর্সের হলো , তবুও ফোনের নাম চেঞ্জ করা হলো না?"
অ্যারিস সবার দিকে চোখ রাঙিয়ে বললো, "চুপ থাকো তো তোমরা সবাই! বাচ্চাদের সামনে যা তা বলছ!"
আইরা: "কিন্তু পাপা, মাম্মা কি এই নামের কথা জানে?"
— "হুম, জানে।"
— "এটা কি মাম্মার পছন্দের ফুল?"
— "হ্যাঁ, ও ডেইজি ফুল খুব পছন্দ করে।"
—"তাহলে এটা তোমারও পছন্দের ফুল?"
অ্যারিস এবার নিজের কোলে বসা মেয়ের গালটা আলতো করে টিপে দিয়ে মাথা নাড়ল।
—"না মা।"
— "তাহলে তুমি কেন এই নামে ডাকো?"
অ্যারিস কয়েক সেকেন্ড পুরো চুপ করে রইল। পুরো ঘরের মানুষ তখন অ্যারিসের উত্তরের অপেক্ষায় নিস্পন্দ। অ্যারিস আইরার চোখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল—
—"কারণ ওটা তোমার মাম্মা পছন্দের ফুল... আর আমার পছন্দ তোমার মাম্মা কে ।"
অ্যারিসের এই অকপট ভালোবাসার গভীরতা দেখে আদিয়ান আর ইভান নিজেদের মুখ চেপে হাসতে লাগল। সায়মা অ্যারিসের এই অতিরিক্ত রোমান্টিকতা দেখে মজা করে চোখ উল্টাল। সুবা সিয়ানের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।

আর আইরা? সে তো এই যুগের জেন-জি বাচ্চা! সে বাপের এই কাব্যিক ডায়লগ শুনে নাটকীয়ভাবে নিজের দুই হাত দিয়ে মাথা নাড়তে লাগল।
— "উফফফ! তোমরা বড়রা এত ক্রিনজ কেন গো?!"

এই হাসাহাসির মাঝেই ড্রয়িংরুমের মেইন দরজা খুলে ভেতরে পা রাখল ইরা। যে এতকাল নিজের খালার বাসায় অভিমান করে থাকত,  ইনায়া বাংলাদেশে ব্যাক করছে এই খুশির খবরটা পাওয়া মাত্রই সে সব অভিমান ভুলে সে সোজা এই বাড়িতে চলে এসেছে। আরো একবার এসেছিলো, সাইভা দেখতে। কিন্তু ড্রয়িংরুমে ঢুকেই তার চোখ জোড়া চড়কগাছ হয়ে গেল। সে দেখল সোফার ওপর ওভারকোট আর কালো চশমা পরে একটা পুচকু ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে!
ইরা দরজায় ব্যাগটা হাত থেকে ফেলে, চোখ বড় বড় করে চেঁচিয়ে উঠলো, "ও মাই গড! আপু কি তবে সাইজে ছোট হয়ে চীন থেকে ব্যাক করেছে নাকি?! আইরা ... এটা তুমি?! তোমাকে তো পুরো অবিকল ইনায়া আপুর মতো লাগছে!"
ইরা হন্তদন্ত হয়ে আইরার দিকে এগিয়ে গেল! নিজের ফোনটা বের করে সোফার ওপর দাঁড়ানো সেই পুচকু  আইরাকে নিয়ে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে চটচট করে বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। কোনো ছবিতে আইরা হাত দুটো বুকে বেঁধে মায়ের মতো গম্ভীর লুক দিচ্ছে, আবার কোনো ছবিতে কালো চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে দুষ্টুমি করে তাকাচ্ছে।
ইরা ছবিগুলো ফেসবুকে পোস্ট করে দিল। আর পোস্ট করা মাত্রই যেন পুরো সোশ্যাল মিডিয়ায় আরেকটা ছোটখাটো সুনামি বয়ে গেল! ইনায়ার ভাইরাল ছবির রেশ কাটতে না কাটতেই এই ছবিগুলো আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
পোস্ট করার মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে নোটিফিকেশনের টোনে ইরার ফোন প্রায় হ্যাং হওয়ার উপক্রম! সে অবিশ্বাস্য চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল—
—"ও মাই গড! ভাইয়া দেখবা আসো! আমার নরমাল পোস্টে আগে ১০-১২ টার বেশি লাইকই আসত না, চেনা-পরিচিতরাই শুধু রিয়্যাক্ট দিত। আর এখন... এখন তো লাইক-শেয়ার হাজার ছাড়িয়ে হাজারে চলে যাচ্ছে! কমেন্টের স্পিড দেখ জাস্ট!"
পুরো ঘরে আবার সবাই ফোনের স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। কমেন্ট সেকশনে তখন রীতিমতো ভালোবাসার বন্যা বয়ে যাচ্ছে:
— "ওরে বাবা! এই পুচকুটা কি আমাদের ব্যারিস্টার ইনায়া রহমানের মেয়ে? মাগো মা, একদম হুবহু তার মতো দেখতে হয়েছে!"
— "The Junior Mafia Queen has arrived!
মায়ের কার্বন কপি একদম!"
— "ওই বড় ওভারকোট আর চশমাটা পরে যা কিউট লাগছে না ওকে! ঝর্ণা বেগমের এবার সত্যি সত্যি দেশ ছেড়ে পালানো উচিত, জুনিয়র ল-ইয়ারও রেডি!"
— "চোখের চাউনি আর এক্সপ্রেশন খেয়াল করেছেন? মায়ের মতোই কোল্ড আর এটিটিউড ওয়ালা। অ্যারিস ফেং স্যারের জিনও মিক্সড আছে এতে!"
— "আজকের দিনের বেস্ট ইন্টারনেট কন্টেন্ট! এই মা-মেয়ের জুটিকে এবার সরাসরি কোর্টরুমে দেখতে চাই।"
ইভান কমেন্টগুলো পড়তে পড়তে অ্যারিসের কাঁধে একটা ধাক্কা দিল।
—"কী ভাইয়া? জুনিয়র ডেইজি তো এক পোস্টেই ইন্টারনেট ক্রাশ হয়ে গেল! এবার সামলাও তোমার মেয়েকে।"
অ্যারিস কোনো উত্তর দিল না। সে আইরাকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
.
.
.

কয়েক দিন পর......
শহরের রাতের বুক চিরে আলো ঝলমল করছে। ট্রাফিকের একটানা শব্দ, দূরের কোনো গাড়ির হর্ন আর চিরচেনা ব্যস্ত ঢাকার রাত—সবকিছুই একদম স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। কিন্তু এই কোলাহলের এক কোণে—এক থমথমে নীরবতা।
ইনায়া অবশেষে বাংলাদেশে এসেছে... কিন্তু সে নিজের পরিবারের কাছে বা ফেং বাড়িতে যায়নি। এয়ারপোর্ট থেকে নেমে সে সোজা চলে এসেছে গুলশানের সেই ফ্ল্যাটে—যেটা সে দুই বছর আগে চীন যাওয়ার ঠিক আগে নিজের নামে কিনে রেখেছিল। ফ্ল্যাটের ভেতরটা ঠিক আগের মতোই সাজানো। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে শহরের এই মায়াবী আলো আর ব্যস্ততা দেখছে সে। তার কোলে শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট আয়ান।
বাচ্চাটা একটু নড়েচড়ে উঠে আধো-আধো চোখ মেলে মায়ের দিকে তাকাল। ইনায়া তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে দোলাতে লাগল। পেছনে ড্রয়িংরুমের দরজার কাছে এসে দাঁড়াল রোহান। তার হাতে ইনায়ার আইনি নথিপত্রের ব্যাগ।
—"ম্যাম… এখনো কিন্তু মিডিয়া বা অন্য কেউ বিন্দুমাত্র টের পায়নি যে আপনি বাংলাদেশে ল্যান্ড করেছেন। আপনার আসার খবরটা সম্পূর্ণ সিক্রেট আছে।"
ইনায়া জানালার বাইরে শহরের আলোর ওপর থেকে নিজের চোখ না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল—
—"আপাতত কারও জানার কোনো দরকারও নেই।"
রোহান একটু মাথা নাড়ল। সে স্যুটকেসটা এক পাশে রেখে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল—
—"আর আপনার ফ্যামিলি? অ্যারিস স্যার বা আপনার বাবা-মা... ওনাদেরও কি জানাবেন না?"
ইনায়া এবার ধীরে ঘুরল।
— "সময় হলে ওনারা নিজ থেকেই জানতে পারবেন।"
তার কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কোনো আবেগপ্রবণ অস্থিরতা নেই। কোলে থাকা আয়ান আবার একটু নড়েচড়ে উঠে হালকা ওহ শব্দ করল। ইনায়া বাচ্চার পিঠে হাত বুলিয়ে অত্যন্ত আস্তে করে বলল
—"শশশ… আম্মুর আব্বুটা ঘুমায়..."
মায়ের সেই চেনা চুলে হাত বুলানোর স্পর্শ পেয়ে বাচ্চাটা আবার শান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
রোহান বড় জানালার দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল
—"ম্যাম… আপনি আসলে এভাবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে লুকিয়ে এসেছেন।"
—"ভুল বললে রোহান। আমি কোনো চোরের মতো লুকিয়ে আসিনি। আমি শুধু আমার প্রতিপক্ষকে কিছুটা সময় দিচ্ছি... যাতে সে তার আনন্দের শেষ সীমা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। কারণ ওপর থেকে নিচে পড়ার পেইনটা তখন অনেক বেশি তীব্র হয়।"
রোহানের মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হলো না।
রোহান ফাইলটা একটু শক্ত করে ধরে সাবধানে জিজ্ঞেস করল
— "ম্যাম, কাল কি তাহলে সরাসরি কোর্টে যাচ্ছেন?"
ইনায়া সোফায় আরাম করে হেলান দিয়ে বসল। তার চোখ দুটো ক্লান্তিতে বুজে আসছিল। সে চোখ না খুলেই নিস্তেজ গলায় বলল
—"হ্যাঁ, রোহান… কোর্টে তো যেতেই হবে। তবে তার আগে আমার একটা খুব লম্বা আর নিশ্ছিদ্র ঘুম দরকার।"
রোহান ইনায়ার কথা শুনে মনে মনে ভাবল—আশ্চর্য! কাল সকালে পুরো দেশের মিডিয়া, আইন মন্ত্রক আর ঝর্ণা বেগমের বাঘা বাঘা আইনজীবীরা কোর্টের সামনে ওত পেতে থাকবে। এত বড় একটা কেস, এত মিডিয়া প্রেসার… আর উনি এই মুহূর্তে বলছেন ওনার শান্ত একটা ঘুম দরকার!
ইনায়া সোফা থেকে উঠে গিয়ে আয়ান কে শুইয়ে দিয়ে টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে নিল। কিছুক্ষণ সে গ্লাসটা হাতে নিয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঢাকার রাতের আলো যেন তার চোখের ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল। সে ড্রয়ার থেকে একটা স্ট্রিপ বের করে একটা স্লিপিং পিল  মুখে দিয়ে পানিটুকু গিলে নিল। রোহান সেটা দেখা মাত্রই একটু থমকে গেল। তার চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।
—"ম্যাম… এভাবে পিল খাওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে? আপনি তো অনেকদিন পর দেশে ফিরলেন..."
—"ঘুম না হলে কালকে আদালতে আমার মাথা কাজ করবে না, রোহান। আর কালকে আমার ব্রেনের প্রতিটা সেল একদম পারফেক্টলি সজাগ থাকা দরকার।"
সে গ্লাসটা টেবিলে রেখে আবার এসে সোফায় বসল এবং ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। ঔষধের তীব্র কার্যকারিতায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার শরীরের সমস্ত শক্ত ও টানটান হয়ে থাকা পেশিগুলো নরম হয়ে এল।  ভিতরের জমানো সব ক্লান্তি আর মানসিক চাপ যেন তাকে গ্রাস করে নিল। সে সোফায় বসেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল, তার মাথাটা হালকা কাত হয়ে সোফার কুশনের ওপর হেলে পড়ল।
রোহান দ্রুত কয়েক পা এগিয়ে এসে নিচু হয়ে ডাকল
—"ম্যাম? ম্যাম শুনতে পাচ্ছেন?"
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। সে এখন নিষ্পাপ একটা বাচ্চার মতো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার মুখে এখন স্বর্গীয় শান্ত ভাব। রোহান আর তাকে বিরক্ত করল না। সে ভেতরের রুম থেকে একটা কম্বল এনে ইনায়ার গায়ের ওপর বিছিয়ে দিল। তারপর ঘরের সব লাইট অফ করে দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল
—"কালকের দিনটা আপনার জীবনের অন্যতম বড় একটা দিন, ম্যাম… আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করুক।"
রোহান সিকিউরিটি লকটা চেক করে দরজা টেনে নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
রাত যত গভীর হচ্ছে, ঢাকার আদালতের ঘড়ির কাঁটা ততটাই ধেয়ে আসছে এক ঐতিহাসিক সকালের দিকে।
.
.
.

পরদিন সকাল
কোর্ট চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই। ইনায়ার গাড়িটা এসে থামতেই চারপাশের শত শত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ একসাথে জ্বলে উঠল। গাড়ি থেকে যখন সে পা বাড়াল, পুরো প্রাঙ্গণ যেন এক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সেই পরিচিত কালো ওভারকোট, ধবধবে সাদা শার্টের ওপর ফরমাল ল-ইয়ার ড্রেস আর চোখে YSL- এর কালো সানগ্লাস। পেছনেই বডিগার্ডের মতো ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে রোহান, আর তার কোল ঘেঁষে শান্তিতে চোখ পিটপিট করছে পুচকু আয়ান।
ভিড়ের ভেতর থেকে গুঞ্জন, ফিসফিসানি মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মতো—
"ব্যারিস্টার ইনায়া রহমান এসেছেন?!"
"উনি তো চীনে ছিলেন, কবে ফিরলেন?!"
"তাহলে এই মামলাই কি আজ নতুন টার্নিং পয়েন্ট নিতে যাচ্ছে?"
মিডিয়ার রিপোর্টাররা পঙ্গপালের মতো মাইক আর ক্যামেরা নিয়ে তাকে ছেঁকে ধরল।
রিপোর্টার: "ম্যাম! ঝর্ণা বেগমের আনা জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে আপনি কি কিছু বলবেন?"
"আপনার বিরুদ্ধে যে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ এসেছে, সেটার সত্যতা কতটুকু ম্যাম?"
ইনায়া সানগ্লাসটা এক আঙুলে সামান্য নামিয়ে সে রিপোর্টারদের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে একটা হালকা, কোল্ড হাসি দিল।
—"তা, ছবিতে আমাকে সুন্দর লাগছে তো?"
রিপোর্টাররা ওভাবে তেড়ে এসেও এই অদ্ভুত প্রশ্নে এক নিমেষে থমকে গেল। ইনায়া চশমাটা আবার ঠিক করে বলল
— "ভালো ভালো এঙ্গেলে সুন্দর ছবি তুলবেন সবাই। পত্রিকায় বা নিউজে যদি আমার কোনো খারাপ ছবি পাবলিশ করেন, তবে কিন্তু মানহানির মামলা দেবো সবার নামে।"
তার এই সোয়াগ আর রসবোধ দেখে একজন তরুণ রিপোর্টার মুখ চেপে হেসেই ফেলল, অন্য ক্যামেরা পারসনরা তাড়াহুড়ো করে ক্যামেরা সোজা করতে লাগল। তবে পেশাদারিত্বের খাতিরে আবার প্রশ্ন ছুড়ল আরেকজন—
রিপোর্টার ২: "ম্যাম, প্লিজ বলুন! আপনার বিরুদ্ধে যে সই জালের অভিযোগ—"
ইনায়া এবার নিজের মাথাটা ঘোরাল। সে স্পষ্ট কণ্ঠে ঘোষণা করল
— "আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আজ আদালতের ভেতরেই পেয়ে যাবেন। আজ কোনো হিয়ারিং ডেট  নিতে আসিনি আমি। আজ আমি এই কেস চিরতরে ক্লোজ করে দেবো। আজই শেষ হবে এই নাটকের।"
ইনায়ার এই চ্যালেঞ্জিং বক্তব্যের পর কেউ আর দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেল না।

ইনায়া মিডিয়ার বেষ্টনী পার হয়ে যখনই মেইন কোর্ট বিল্ডিংয়ের করিডোরে পা রাখল, অমনি তার সামনে এসে দাঁড়াল দুই পরিবারের পুরো দলটা। রহমান পরিবার আর ফেং পরিবার—
ভিড়ের ভেতর থেকে কালো জামা আর চশমা পরা ছোট্ট একটা মানুষের দৌড় শুরু হলো। আইরা নিজের গায়ের জামা সামলাতে সামলাতে ডানা কাটা পাখির মতো ছুটে এলো।
— "মাম্মা !!!  আই মিস ইউ সো মাচ মাম্মা!!"
আইরা এক ছুটে এসে ঠিক ইনায়ার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল। জাস্ট এক সেকেন্ড সে মায়ের ওই রূপের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকাল, তারপর ইনায়ার দুই পা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ইনায়ার হাত দুটো রাখল আইরার মাথায়। নিচু হয়ে আইরাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল—
—"আমি আছি মা। মাম্মা চলে এসেছে। তোমার মাম্মা কথা রেখেছে।"
মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে ধরে ইনায়া যখন সোজা হয়ে দাঁড়াল, তখন ঠিক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে অ্যারিস। অ্যারিস সম্পূর্ণ নিশ্চুপ, তার ভারী হয়ে আসা চোখের পলকগুলো ইনায়ার ওপর স্থির।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফরিন সুলতানা নিজের মেয়ের এই রূপ দেখে একটু থমকে যায় । দুই বছর আগে যে মেয়েকে তিনি বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন, আজ সেই মেয়েই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি অপরাধীর মতো কিছু বলতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ সরল না।
অ্যারিস ইনায়ার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। তার কণ্ঠস্বর আজ আবেগে ভরা।
—"ভেতরে যাবে না ইনায়া?"
ইনায়া একবার চোখ তুলে তাকালো । শান্ত গলায় বলল
—"হ্যাঁ। চলো।"
আইরা মায়ের হাতের আঙুলগুলো নিজের ছোট মুঠোয় শক্ত করে টেনে ধরে আবদার করল—
"মাম্মা! আমি কিন্তু আজকে একদম তোমার পাশের চেয়ারটায় বসবো!"
ইনায়া মেয়ের এই জুনিয়র রূপ দেখে ঠোঁট টিপে হালকা হাসল।
— "আজকে তুমি তোমার বাবার পাশে গিয়ে বসবে, মা।"
অ্যারিস আস্তে আর দৃঢ় গলায় বলল— "চলো।"
কোর্ট চত্বরের বিশাল দরজা ঠেলে রহমান এবং ফেং পরিবারের প্রতিটি সদস্য ব্যারিস্টার ইনায়া রহমানের পেছনে আদালতের ভেতরে ঢুকতে শুরু করল।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 55 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন