ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি সিজন-২

পর্ব 56

লেখক: F. Tabassum

সবাই নিজ নিজ নির্দিষ্ট জায়গায় বসে আছে। চারদিকে এক থমথমে নিস্তব্ধতা। মাঝে মাঝে কেবল আইনজীবীদের টেবিল থেকে কাগজ উল্টানোর খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছে। এজলাসের পেছনের সারিতে বসা সাংবাদিকদের ক্যামেরা থেকে দু-একটা চাপা ফ্ল্যাশের আলো এসে পড়ছে কাঠের বেঞ্চগুলোর ওপর।
প্রধান বিচারক এজলাসে প্রবেশ করলেন। আসন গ্রহণ করার সময় সামনের সারিতে বসা আফরিন সুলতানাকে দেখে তিনি অভ্যাসবশত এজলাসেই তাকে সম্মান জানাতে যাচ্ছিলেন। কারণ আফরিন সুলতানা এই হাইকোর্টের অত্যন্ত প্রখ্যাত ও নামকরা একজন জাজ ছিলেন। তবে আফরিন সুলতানা ইশারা করে তাকে মানা করে দিলেন। বিচারক নিজের আসনে বসে হাতুড়িটা হালকা ঠুকে  বললেন
— "আদালতের কার্যক্রম শুরু করা হোক। বাদী পক্ষ, আপনাদের বক্তব্য পেশ করুন।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। তার হাতে ফাইলের একগাদা আইনি ডকুমেন্ট।
— "মাননীয় আদালত… আমার মক্কেল ঝর্ণা বেগমের বিরুদ্ধে ফেং পরিবার এবং রহমান পরিবারের পক্ষ থেকে জালিয়াতির যে অভিযোগ আনা হয়েছে—তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং বানোয়াট।"
সে হাত বাড়িয়ে নথিগুলো বিচারকের দিকে তুলে ধরল।
— "এই যে দেখুন নথিপত্র। এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে—ব্যারিস্টার ইনায়া রহমান নিজেই সম্পূর্ণ সজ্ঞানে এই বিপুল সম্পত্তি হস্তান্তর করেছেন। আর এই কাগজের নিচে থাকা স্বাক্ষরটি স্বয়ং ইনায়া রহমানের নিজের!"
কাঠগড়ার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঝর্ণা বেগম আত্মবিশ্বাসী মুখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে-মুখে স্পষ্ট জয়ের ছাপ। কোর্টরুমের উপস্থিত প্রতিটি মানুষ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে পেছনের দর্শকরা পর্যন্ত একযোগে ইনায়ার দিকে তাকাল। কিন্তু ইনায়া সম্পূর্ণ চুপ। একদম শান্ত। পেছনের বেঞ্চেই বসে আছে অ্যারিস, আর তার সাথে পুরো পরিবার—জিয়ান ফেং, শামীমা বেগম, ইভান, সায়মা, ইরা,  আদিয়ান এবং সুবা। সবার চোখে-মুখে উদ্বেগ।

ডিফেন্স লয়ার: "মাননীয় আদালত, আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে জালিয়াতির এই অভিযোগ সম্পূর্ণ রাজনৈতিক এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বরং নথিপত্র বলছে, বাদী পক্ষই জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে অন্যের সম্পত্তি নিয়ে চীনে অবৈধভাবে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে!"
ডিফেন্স লয়ারের এই দাবির পর পুরো কোর্টরুমে একটা চাপা গুঞ্জন আর শোরগোল শুরু হলো। বিচারক গম্ভীর মুখে চোখ তুলে তাকালেন এবং হাতুড়ি ঠুকলেন।
— "আদালতে নীরবতা বজায় রাখুন। ডিফেন্স পক্ষ, আপনাদের বক্তব্য চালিয়ে যান।"
ঝর্ণা বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে হালকা হাসল।  কিন্তু ইনায়া তখনও একটা শব্দও বলল না। সে কোনো প্রতিবাদ করল না, নিজের আসন থেকেও উঠল না। শুধু টেবিলের ওপর রাখা ফাইলটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার ডান হাতের একটা আঙুল ধীরে ধীরে কাঠের টেবিলের ওপর ছন্দময় টোকা দিচ্ছে—
টিক… টিক… টিক…

ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী যেন এবার পুরো বাজিটাই লুফে নিতে চাইছে। সে একের পর এক মূল দলিল আদালতের সামনে অত্যন্ত দম্ভের সাথে তুলে ধরছে।
— "মাননীয় আদালত, এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে… অ্যারিস ফেং এবং ইনায়া রহমান—দুজনেই সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় এই সম্পত্তি ঝর্ণা বেগমের নামে হস্তান্তর করেছেন। এখানে কোনো জালিয়াতির অবকাশই নেই।"
সে ফাইল থেকে বের করে দুটি মূল দলিল সগর্বে বিচারকের সামনে টেবিলে রাখল। উপস্থিত আইনজীবী, সাংবাদিক এবং দর্শকরা প্রায় শ্বাস রুদ্ধ করে সেই কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে।
ইনায়া তখনও পুরোপুরি চুপ। সে চেয়ারে শান্তভাবে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার মুখটা উদাসীন। পেছনের সারিতে দুই ফ্যামিলি উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে আছে। বাবার পাশে বসা আইরা বারবার ইনায়ার পিঠের দিকে তাকাচ্ছে। যদিও সাত বছরের এই বাচ্চা মেয়েটা আদালতের এত জটিল আইনি মারপ্যাঁচ কিছুই বুঝতে পারছে না… তবে তার মা-কে এভাবে একটানা চুপচাপ বসে থাকতে দেখে তার মনের ভেতর টেনশন হচ্ছে। সে অ্যারিসের হাতটা শক্ত করে ধরে ভাবছে—কোর্টে মাম্মা কি তবে হেরে যাবে? তারা কি সবাই বিপদে পড়তে চলেছে?

বিচারক চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে মনোযোগ দিয়ে দলিল ও স্বাক্ষরগুলো পরীক্ষা করছেন। কোর্টরুমের দেয়াল ঘড়ির টিক টিক শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। এভাবেই বেশ কয়েকটা দীর্ঘ মিনিট কেটে গেল। হঠাৎ—বিচারক নথিপত্র থেকে মাথা তুলে গম্ভীর গলায়  বললেন:
—"প্রাথমিক দৃষ্টিতে এই দলিল এবং স্বাক্ষরগুলো সম্পূর্ণ আসল বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।"
এক মুহূর্তে পুরো কোর্টরুমে যেন ৪৪০ ভোল্টের একটা বৈদ্যুতিক শক নেমে এল। ফেং এবং রহমান পরিবারের সবার বুকটা যেন ধক করে উঠল। উপস্থিত সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ফিসফিসানি আর গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল—
"তাহলে তো দেখছি ইনায়া আর অ্যারিসের স্বাক্ষর আসলেই আসল..."
"তার মানে ঝর্ণা বেগমের নামে সম্পত্তি ট্রান্সফার করাটা সম্পূর্ণ বৈধ ছিল? ইনায়া ফেং নিজেই ফেঁসে গেলেন নাকি?"
ঝর্ণা বেগম এবার আড়চোখে শামীমা বেগম আর আফরিন সুলতানার দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। পেছনে বসা অ্যারিসের চোয়াল রাগে শক্ত হয়ে গেল। তার চোখের মণি দুটো জ্বলছে। পাশে বসা ইভান অস্থির হয়ে নিচু গলায় আদিয়ানের কানে কানে কী যেন বলছে। রহমান পরিবারের সবার কপালে তখন বিন্দু বিন্দু দুশ্চিন্তার ঘাম।
কিন্তু ইনায়া—
সে তখনও একদম শীতল। তার শরীরের একটা পেশিও একটুও নড়ল না, যেন সে আগে থেকেই বিচারকের এই হুবহু উত্তরটা জানত। তার এই কোল্ড রিঅ্যাকশন দেখে মনে হচ্ছে, পুরো নাটকটা ঠিক তার স্ক্রিপ্ট অনুযায়ীই মঞ্চস্থ হচ্ছে।

ইনায়া এবার নিজের কালো কোটটা সোজা করে উঠে দাঁড়াল। মায়ের এই রাজকীয় ভঙ্গি দেখে পেছনের বেঞ্চে বসা আইরার মুখে চওড়া হাসি ফুটে উঠল; সে অনেক খুশি হলো যে তার মাম্মা অবশেষে যুদ্ধের ময়দানে নেমেছে।
ইনায়া পেশাদার কণ্ঠে বিচারকের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল
—"মাননীয় আদালত… ডিফেন্স পক্ষের আইনজীবী এতক্ষণ ধরে আমার যে স্বাক্ষরটি দেখিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তরের দাবি তুলছেন, সেটি মূলত নেওয়া হয়েছিল আজ থেকে প্রায় অনেক বছর আগে, যখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর।"
সে এক মুহূর্ত থামল। নিজের ফাইল থেকে একটি প্রত্যয়িত আইনি নথি বের করে বিচারকের সামনে রাখল।
— "বাংলাদেশ চুক্তি আইন অনুযায়ী, সে সময় আমি একজন নাবালক ছিলাম। আর দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একজন নাবালক কোনো প্রকার আইনি চুক্তি বা সম্পত্তি হস্তান্তরের অধিকার রাখে না। এমনকি সেই নির্দিষ্ট সময়ে আমার ব্যক্তিগত নামে আইনত কোনো সম্পত্তির মালিকানাও ছিল না। মাননীয় আদালত, ওই বয়সে আমার নিজের সমস্ত ভরণপোষণ এবং পড়াশোনার ব্যয়ভার আমার বাবা-মা বহন করতেন। আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ব্যবসা পরিচালনা করিনি।"
সে ফাইল থেকে আরেকটি প্রত্যয়িত প্রাতিষ্ঠানিক ডকুমেন্ট বের করে বিচারকের সামনে পেশ করল।
—"এখানে আমার সেই সময়কার পূর্ববর্তী কোম্পানির সমস্ত অফিশিয়াল রেকর্ড রয়েছে। যা আইনিভাবে আমার বড় ভাই আদিয়ান রহমানের নামে নিবন্ধিত ছিল।"
ইনায়া এবার ব্যাঙ্কিং নথিপত্র এবং স্টেটমেন্টগুলো একে একে বিচারকের সামনে সাজিয়ে দেখাল।
—"এই ব্যাঙ্ক ডিটেইলস এবং অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সময়কার কোম্পানির সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেন ও ফান্ড আদিয়ানের অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়েছে। অতএব, উক্ত সম্পত্তিতে আমার ব্যক্তিগত মালিকানার বা তা হস্তান্তরের কোনো প্রকার বৈধ আইনি প্রমাণ ডিফেন্স পক্ষের কাছে নেই।"

বিচারক ইনায়ার দেওয়া এই ডকুমেন্টগুলো কোর্টের নিজস্ব এক্সপার্ট প্যানেলে তাৎক্ষণিক যাচাইয়ের জন্য পাঠালেন। আদালতের ভেতরের সবাই উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্সপার্ট প্যানেলের সিলমোহরসহ চূড়ান্ত রিপোর্ট বিচারকের টেবিলে চলে এলো। বিচারক সেই রিপোর্টটি হাতে নিয়ে গম্ভীর গলায় পাঠ করে বললেন—
—"বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত যাচাইকরণে এটি নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বাদীর দাখিলকৃত এই নথিপত্রগুলো বিগত ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ডের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। দলিলে থাকা স্বাক্ষরের সময়কাল বাদীর নাবালক থাকার বয়সসীমাকেই নির্দেশ করছে।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে পুরো থমকে গিয়ে নিজের ফাইল হাতে কাঠের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
বিচারক আবার তার সামনের মূল ফাইলটা বন্ধ করলেন এবং হাতুড়িটা হালকা ঠুকে বললেন—
—"আদালত বাদী পক্ষের উপস্থাপিত এই সমস্ত আর্থিক এবং মালিকানার রেকর্ডকে সম্পূর্ণ বৈধ প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করছে।"
ইনায়া নিজের গাউনটা হালকা টেনে আরও এক ধাপ বিচারকের ডেস্কের দিকে এগিয়ে গেল।
—"মাননীয় আদালত… আমার বিয়ের পর আমার আইনগত পরিচয় পরিবর্তিত হয়—‘রহমান’ থেকে ‘ফেং’।এই আইনি পরিচয় পরিবর্তনের পর, আমি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হিসেবে আমার সমস্ত অর্জিত সম্পত্তি ও ব্যাঙ্ক অ্যাসেট সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে নিজের নামে নিবদ্ধ করি। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক—দুই জায়গার অফিশিয়াল রেকর্ডেই তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।"
বিচারক গভীর মনোযোগ নিয়ে ইনায়ার পেশ করা আন্তর্জাতিক ফাইলের দিকে তাকিয়ে আছেন।
ইনায়া এবার ফাইল থেকে চোখ তুলে সরাসরি বিচারকের চোখের দিকে তাকাল।
—"তাহলে মাননীয় আদালতের কাছে আমার প্রশ্ন হলো… যে সম্পত্তি আইনগতভাবে আমি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে আমার নিজের নামে রেজিস্টার করা হয়েছে… সেই একই সম্পত্তি অন্য কোনো ব্যক্তির জালিয়াতি করা দলিলে কীভাবে থাকতে পারে? মাননীয় আদালত, আইনের ভাষায় সহজ করে বললে—'একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যখন নিজের সম্পত্তি সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া মেনে নিজের নামে বৈধভাবে রেজিস্টার করে নেন, তখন অতীতে নাবালক অবস্থায় তার অজান্তে করা কোনো অনৈতিক চুক্তি সেই বর্তমানের বৈধ মালিকানাকে কখনোই বাতিল করতে পারে না।'"
সে নিজের সামনের ফাইলটা একটা হালকা শব্দে করে বন্ধ করল।
—"আর আমি এই আদালতে দাঁড়িয়ে নিশ্চিত করে বলছি… আমি নিজের কোনো সম্পত্তিতে কোনো জালিয়াতি করিনি, এবং ঝর্ণা বেগমের নামে কোনো প্রকার অবৈধ হস্তান্তরও করিনি। যা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ জালিয়াতি।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবীর কপাল বেয়ে তখন টপটপ করে ঘাম ঝরছে। বিচারক ধীর স্থিরভাবে মাথা নাড়লেন। তিনি ইনায়ার জমা দেওয়া বিয়ের পরের এবং আন্তর্জাতিক ব্যাঙ্কের রেজিস্ট্রি কাগজগুলো সূক্ষ্মভাবে চেক করলেন। তারপর হাতুড়িটা হালকা ঠুকে  গম্ভীর গলায় বললেন
—"আইনগতভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর বাদীর এই সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর এবং নিবন্ধন সম্পূর্ণ বৈধ এবং তা অফিশিয়াল সরকারি রেকর্ড দ্বারা সমর্থিত। অতএব, অতীতের কোনো অবৈধ বা অসম্পূর্ণ চুক্তি বাদীর পরবর্তী এই আইনসম্মত ও বৈধ মালিকানার অধিকারকে কোনোভাবেই বাতিল করতে পারে না।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তার মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। কেসটা যে তাদের হাত থেকে পুরোপুরি ফসকে গেছে, তা সে বুঝে গেছে।

ইনায়া এবার একদম শান্তভাবে তার টেবিল থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ নতুন, মোটা ফাইল খুলল। এতক্ষণ সে নিজের ওপর আনা অভিযোগ খণ্ডন করছিল, এবার সে পাল্টা আক্রমণ শুরু করল।
— "মাননীয় আদালত… এবার আমি এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং অকাট্য প্রমাণটি আদালতের সামনে উপস্থাপন করছি।"
সে এক সেট মূল সম্পত্তির দলিল বিচারকের বেঞ্চের দিকে এগিয়ে দিল।
— "এই অফিশিয়াল ডকুমেন্ট অনুযায়ী, অ্যারিস ফেং তার সমস্ত ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ফেং গ্রুপের শেয়ার পূর্বেই আমার নামে আইনগতভাবে হস্তান্তর করে গেছেন। যা সংশ্লিষ্ট নোটারি পাবলিক এবং সরকারি রেজিস্ট্রেশন রেকর্ড দ্বারা সম্পূর্ণভাবে সমর্থিত।"

ইনায়ার এই এক লাইনের কথা শুনে পেছনের বেঞ্চে বসা অ্যারিস নিজেই অবাক হয়ে গেল! সে ভ্রু কুঁচকে একদৃষ্টিতে ইনায়ার পিঠের দিকে তাকিয়ে রইল। তার স্পষ্ট মনে আছে—সে নিজে কখনো ইনায়ার নামে এভাবে সম্পত্তি লিখে দেয়নি। তবে ইনায়া এই দলিল কোথায় পেল? সে আবার কখন ইনায়াকে নিজের সব সম্পত্তি দিয়ে দিল?! অ্যারিসের মাথায় যেন এক মস্ত বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি হলো।
এদিকে দলিলের কথা শুনে ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী বিদ্যুৎবেগে নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
— "মাননীয় আদালত! আমরা বাদী পক্ষের এই দাবিকে তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ করছি… এই পরবর্তী যে কোনো স্বাক্ষর বা দলিল সম্পূর্ণ ভুয়া এবং সাজানো—"
ইনায়া তাকে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো হুলস্থুল করল না। সে শুধু পরের আরেকটি ফাইল খুলে টেবিলের ওপর থাকা ল্যাপটপটার স্ক্রিন অন করল।
— "আমি এখন এই আদালতের সামনে একটি গোপন ভিডিও এভিডেন্স উপস্থাপন করার অনুমতি চাচ্ছি।"
বিচারক গম্ভীরভাবে মাথা নাড়লেন এবং এজলাসের বড় প্রজেক্টর স্ক্রিনে ভিডিওটি প্লে করার নির্দেশ দিলেন।
কোর্টরুমের আলো কিছুটা নিভিয়ে দিতেই বড় পর্দায় ভিডিওটি চালু হলো। পুরো এজলাসের মানুষ একযোগে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনে দেখা গেল—একটি আধা-অন্ধকার রুমে অ্যারিস ফেং অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পাশে বসে আছে। তার চোখ-মুখ দেখে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে সে মানসিকভাবে মারাত্মক অস্থির ও বিভ্রান্ত। আর তার ঠিক পাশেই বসে আছে  ঝর্ণা বেগম। সে অ্যারিসকে অনবরত কিছু একটা বুঝিয়ে ফুসলিয়ে জোরপূর্বক একটা ফাইলে সই করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। অ্যারিসের মুখে স্পষ্ট দ্বিধা আর মানসিক বিভ্রান্তির ছাপ। সে কিছু না বুঝেই, প্রায় অবশ অবশ চোখে ধীরে ধীরে কলম দিয়ে কাগজে সই করছে, তার দৃষ্টি পরিষ্কার নয়।
ভিডিওটি শেষ হতেই কোর্টরুমের লাইট আবার জ্বলে উঠল।
—"মাননীয় আদালত… এই সাইনটি অ্যারিস ফেং-এর কাছ থেকে ঠিক তখন নেওয়া হয়েছিল, যখন সে মানসিকভাবে বিন্দুমাত্র সুস্থ ছিলেন না। তাকে সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত করে,  ভুল তথ্য দিয়ে জোরপূর্বক এই ডকুমেন্টে সই করানো হয়েছে।"
সে ফাইল থেকে আরেকটি সিলমোহরযুক্ত কাগজ বের করে জমা দিল।
—"এখানে ওই নির্দিষ্ট সময়ের মেডিকেল বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত মেডিকেল রিপোর্ট এবং সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট সংযুক্ত রয়েছে। যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ওই সময় অ্যারিস ফেং-এর মানসিক অবস্থা মারাত্মক অস্থিতিশীল ছিল।"

বিচারক অত্যন্ত গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই ভিডিও ক্লিপ এবং অ্যারিসের মেডিকেল রিপোর্টগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি হাতুড়িটা হালকা ঠুকে গম্ভীর গলায় বললেন
—"বাদীর দাখিলকৃত এই ভিডিও ফুটেজ এবং চিকিৎসকদের মেডিকেল রিপোর্ট স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, উক্ত দলিলটি সম্পাদনের সময় অ্যারিস ফেং-এর মানসিক ভারসাম্য ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণ খর্ব করা হয়েছিল। সুতরাং, এই অসুস্থ ও অস্থিতিশীল অবস্থায় জোরপূর্বক নেওয়া পরবর্তী এই স্বাক্ষরের কোনো প্রকার আইনি বৈধতা বা গ্রহণযোগ্যতা এই আদালতের কাছে নেই। এটি আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ।"

ইনায়া ফাইলের ভেতর থেকে একটি সরকারি সিলমোহরযুক্ত সম্পূর্ণ রেজিস্ট্রেশন সেট বের করে দেখাল।
—"অ্যারিস ফেং সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় এবং আইনগতভাবে বৈধ পন্থায়… তার এই সমস্ত সম্পত্তি প্রথমে আমার নামে হস্তান্তর করেছিলেন।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী এবার শেষ চেষ্টা হিসেবে অত্যন্ত দ্রুত নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
—"মাননীয় আদালত, আমরা দাবি করছি—বাদী পক্ষের দেখানো এই হস্তান্তর পরবর্তীতে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত ও বাতিল হয়েছে!"
ইনায়া তার পরের মূল আইনি ডকুমেন্টটি খুলল।
—"এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো… এই সম্পত্তি হস্তান্তরটি ঘটেছিল আমাদের বিচ্ছেদের সময়। তখন অ্যারিস ফেং নিজের সমস্ত সম্পত্তি আমাকে সম্পূর্ণভাবে আইনগত উপায়ে হস্তান্তর করেন। দেশের কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রেশন অফিসের অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী এটি একশ ভাগ বৈধ এবং রাষ্ট্র দ্বারা সম্পূর্ণ স্বীকৃত। এরও বেশ কিছুদিন পর… ঝর্ণা বেগম ওই একই সম্পত্তির ওপর পুনরায় নিজের নামে ভুয়া দাবি তোলেন। এবং অ্যারিস ফেং যখন মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন, তখন তার কাছ থেকে যে সই সংগ্রহ করেন… তা কোনো বৈধ মালিকানার অধিকার ছাড়াই, এবং সম্পূর্ণ জালিয়াতির মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে। আইন অনুযায়ী, যে সম্পত্তির মালিকানা অলরেডি আমার কাছে চলে এসেছে, সেই সম্পত্তির ওপর পরবর্তীতে অন্য কেউ সই নিলেও তার কোনো মূল্য থাকে না।"
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী এবার সম্পূর্ণ চুপ হয়ে গেল। তার আর কোনো পাল্টা যুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা রইল না। বিচারক গভীর মনোযোগের সাথে রেজিস্ট্রেশন অফিসের অফিশিয়াল রেকর্ড ও ইনায়ার কাগজগুলো পরীক্ষা করলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজের আসন থেকে সোজা হয়ে বসে হাতুড়িটা হালকা ঠুকলেন বললেন—
—"আদালত এটি স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করছে যে, উক্ত সম্পত্তির ওপর বাদী ইনায়া ফেং-এর পক্ষে একটি পূর্ববর্তী এবং সম্পূর্ণ আইনসম্মত হস্তান্তর রেকর্ড বিদ্যমান রয়েছে। যেহেতু সম্পত্তিটি আগেই আইনানুযায়ী হস্তান্তর হয়ে গেছে, সেহেতু পরবর্তীতে প্রকৃত মালিকানার কোনো আইনগত অধিকার ছাড়া বিবাদী পক্ষ কর্তৃক কৃত অন্য যে কোনো হস্তান্তর বা চুক্তি আইনত সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল বলে গণ্য হবে।"
ইনায়া এবার আগের চেয়ে কিছুটা নিচু করে বললো। —"মাননীয় আদালত… এতক্ষণ আপনারা আইনি মারপ্যাঁচ দেখলেন। এবার আমি এই মামলার মূল অপরাধের প্রেক্ষাপট আদালতের সামনে উপস্থাপন করছি।"
কোর্টরুমের সবাই একদম নিঃশব্দ। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ঝর্ণা বেগম ততক্ষণে ভয়ে মাথা নিচু করে কাঁপছে।
ইনায়া বলতে শুরু করে,
— "ঝর্ণা বেগম অ্যারিস ফেং-এর জৈবিক মা হলেও, অ্যারিসের বয়স যখন মাত্র চার বছর, তখন তার বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর অ্যারিসকে তার বাবা ও মা—উভয়েই পরিত্যাগ করেন। সে অবহেলায় বড় হয় তার নানুর কাছে। পরবর্তীতে তার নানুর মৃত্যুর পর… সে শামীমা বেগম এবং জিয়ান ফেং-এর পারিবারিক তত্ত্বাবধানে আইনি প্রক্রিয়ায় দত্তক  হিসেবে গৃহীত হয়। অন্যদিকে, ঝর্ণা বেগম পরবর্তীতে পুনরায় বিয়ে করেন। আর ওনার সেই বর্তমান স্বামী আন্তর্জাতিক শিশু পাচার চক্রের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একজন দাগী অপরাধী!"
এই ভয়ঙ্কর তথ্যে পুরো কোর্টরুমে যেন এক তীব্র শক নেমে এলো! উপস্থিত সাংবাদিক ও আইনজীবীরা নিজেদের মধ্যে শোরগোল শুরু করে দিলেন।
ঝর্ণা বেগমের আইনজীবী মরিয়া হয়ে শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠল
— "অবজেকশন , মাননীয় আদালত! বাদীর এই সমস্ত পারিবারিক মনগড়া কথা এই মূল সম্পত্তির মামলার সাথে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক—"
বিচারক হাতুড়িটা শক্ত করে ঠুকে কড়া গলায় বললেন
—"আপত্তির আবেদন নাকচ করা হলো । বাদী পক্ষ, আপনাদের বক্তব্য চালিয়ে যান।"

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 56 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন