একটুপর দরজা খুলে অ্যারিস বের হয়ে আসে। নাক থেকে রক্ত পড়ছে। সামনে শামীমা বেগম দাঁড়িয়ে অ্যারিসের এমন অবস্থা দেখে মুখ চেপে হাসছে।
অ্যারিস টিস্যু বের করে নাকে চেপে ধরে আবার আফরিন সুলতানার রুমের দিকে যায়।
আফরিন সুলতানা অ্যারিসকে নিয়ে বাগানে গিয়ে বসে। অ্যারিসকে একটু ভয় পেতে দেখে আফরিন সুলতানা মুচকি হাসে।
আফরিন সুলতানা: তোমরা বিয়ে করে ফেলেছো তাই তোমার কিছু বিষয় জানা উচিত।
অ্যারিস চোখ ঘুরিয়ে আফরিন সুলতানার দিকে তাকায়। "কোন বিষয়?"
আফরিন সুলতানা বলতে শুরু করে, "ইনায়া কিছু মাস আগে কোনো একটা ব্যাপারে অনেক ঘাটাঘাটি করছে যার ফলস্বরূপ তার উপর হামলা হয়। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়; যদিও এখন পুলিশ প্রোটেকশনে আছে তাও ইনায়াকে নিয়ে আমার ভীষণ টেনশন হয়।"
বাকী কথা শেষ করার আগে অ্যারিস বলে উঠে, "উহুম, এটা কিছু মাস আগের ঘটনা না, এটা দুই থেকে তিন বছর আগের ঘটনা।"
আফরিন সুলতানা অবাক দৃষ্টিতে অ্যারিসের দিকে তাকায়, "তুমি জানো কিভাবে?"
অ্যারিস অন্যদিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করে, "ইনায়া কোন বিষয়ে ঘাটাঘাটি করছে তা সবই জানি আমি। কিছুদিন পর ইনায়া আপনাদের একটা অনেক বড় সারপ্রাইজ দিবে, যা আপনাদের জন্য হবে অনেক খুশির খবর, এর জন্য ইনায়ার লাইফ রিস্ক ও নিতে হয়েছে। আর যে হামলা করছে ইনায়ার উপর ওই লোক দেশের বাইরে যায় নি।"
আফরিন সুলতানা এবার একটু ভয় পায়, যদি আবার ইনায়ার উপর হামলা করে।
অ্যারিস: "ভয় পাওয়ার কোনো কারন নেই, ওই লোকটা বাংলাদেশে আছে ঠিকই তবে আবার হামলা করার মতো অবস্থাতে নাই। আর যে তাকে মারার অর্ডার দিয়েছিলো তাকে আপনি চেনেন। ২ জনের কেউ মরে নাই তবে বেঁচেও নেই।"
আফরিন সুলতানা ভ্রু কুঁচকে অ্যারিসের দিকে তাকায়, "মানে??"
অ্যারিস মুচকি হেসে বলে, "মানে হলো; তারা ২ জন এমন অবস্থাতে আছে যেখানে তারা নিজেরাই নিজেদের মৃত্যু কামনা করছে। কয়েকদিনের মধ্যে তাদের মৃত্যুর খবর ও বের হবে।"
আফরিন সুলতানা আড় চোখে অ্যারিসের দিকে তাকায়, সবকিছু যেন মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
অ্যারিস এবার শব্দ করেই হাসে, "শাশুড়ি মা, আপনার এত কিছু বুঝতে হবে না। ইনায়া এখন আমার দায়িত্ব, ওর সব ভালো মন্দ দেখার দায়িত্ব আমার। আমি আমার সবটা দিয়ে ইনায়াকে আগলে রাখবো। ইনায়াকে নিয়ে আর কোনো চিন্তা করার দরকার নেই আপনাদের।"
আফরিন সুলতানার মাথার উপর থেকে যেন অনেক বড় একটা বোঝা নেমে গেলো। মেয়ের প্রোটেকশন নিয়ে অনেক চিন্তায় ছিলো।
আফরিন সুলতানা অ্যারিসের হাত ধরে, তার চোখ পানিতে টলমল করছে, "আমার মেয়েকে তোমার বোঝা মনে হলে আমাদের আবার দিয়ে দিও তাও ওকে কোনো কষ্ট দিও না। ইনায়ার বাবা ইনায়াকে নিজের থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসে, ইনায়ার কিছু হলে ওর বাবাও শেষ। যদি তোমার কোনোদিন মনে হয়, তোমার পক্ষে ইনায়াকে ভালোবাসা সম্ভব হচ্ছে না আমাদের কাছে ফিরিয়ে দিও। ইনায়ার জন্য সবসময় এই বাড়ির দরজা খোলা থাকবে।"
আফরিন সুলতানার কথা শুনে অ্যারিসের চোখ ও পানিতে টলমল করছে, "শাশুড়ি মা, আজ আপনাকে একটা সত্যি কথা বলবো? আমি ইনায়াকে প্রথম দেখেই ভালোবেসেছি তবে সেটা কয়েকদিন আগের না, আমি ইনায়াকে দীর্ঘ ১৩ বছর যাবৎ ভালোবাসি। তাকে প্রথম দেখেছিলাম স্কুলে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমে। সেদিন ইনায়া ক্লাসের একটা মেয়েকে মারছিলো তাই বিচার বসছিলো। আমি অফিস রুমে গেছিলাম ক্লাস টিচার পাঠিয়েছিলো, সেখানেই তাকে প্রথম দেখি। ছুটির সময় দেখলাম একটা ছেলের সাথে বাসায় যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখি ওটা ইনায়ার ভাই ছিলো। সেদিন থেকেই ইনায়াকে আগলে রাখি। যা এখন পর্যন্ত ইনায়াও জানে না কিছু। যারে এত কষ্ট করে পেয়েছি তারে কিভাবে কষ্ট দিবো??? নিজের জীবন দিয়ে হলেও আমি ইনায়াকে সুখে রাখবো।"
আফরিন সুলতানা চোখ মুছতে মুছতে ঘরে চলে যায়। অ্যারিস বাগানে সেভাবেই বসে থাকে। চারদিক অন্ধকার, হালকা ঠান্ডা বাতাস, দূর থেকে ভেসে আসে কিছু কুকুরের ঘেউ ঘেউ আওয়াজ। অ্যারিস দু হাত ঘষতে থাকে, হাত গরম করার জন্য। পিছন থেকে কেউ একজন কম্বল জড়িয়ে দেয় অ্যারিসের গায়ে। অ্যারিস ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতেই ইনায়াকে দেখে কিছুটা অবাক হয়।
অ্যারিস মুখ ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকায়; "আমাকে তো রুম থেকে বের করে দিয়েছো, এখন আবার আসছো দরদ দেখাতে?"
ইনায়া মুচকি হেসে বলে, "আমাদের বাসায় মরলে আমার নামে কেস হতো কারন শেষবার আমার সাথেই ঝামেলা হয়েছিলো।"
অ্যারিস কপাল কুঁচকে ইনায়ার দিকে তাকায়, "তুমি সত্যিই অনেক পাষাণ।"
ইনায়া মাথা উপর নিচ করে বলে , "রুমে চলো, কাজ আছে।"
অ্যারিস অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। একটুপর আড়চোখে ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া রাগী দৃষ্টিতে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখার সাথে সাথে অ্যারিস উঠে দাঁড়ায়। ১ সেকেন্ড ও না দাঁড়িয়ে সোজা ইনায়ার রুমের দিকে হাঁটা দেয়। ইনায়াও উঠে রুমে যায়।
গভীর রাত পর্যন্ত ২ জন মিলে ল্যাপটপে কাজ করে। অ্যারিস কাজ করতে করতে ইনায়ার রুমেই ঘুমিয়ে পড়ে। ইনায়াও এক পাশে ঘুমিয়ে পড়ে।
ভোর ৪:৩০
পাখির কিচির-মিচির আওয়াজে আগে ঘুম ভাঙে অ্যারিসের। ঘুম ভরা চোখ নিয়ে পাশে তাকাতেই দেখে ইনায়াকে। ভোরের সেই মৃদু আলোয় ইনায়ার মুখটা অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতায় ভরে আছে। কোনো মেকআপ নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। কেবল একদম পবিত্র আর নিষ্পাপ অবয়ব। অ্যারিস কিছুক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে সেই মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তটা যেন এক চিরচিত্র, যেখানে সময় থমকে দাঁড়িয়েছে।
নিজের অজান্তেই অ্যারিস একটু এগিয়ে গেল ইনায়ার কাছে। অ্যারিস আলতো করে ইনায়াকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। এক অদ্ভুত প্রশান্তি ওর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। বাইরের কিচির-মিচির শব্দ আর ঘরের ভেতরের এই নিস্তব্ধতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। ইনায়াকে এভাবে কাছে পাওয়ার অনুভূতি অ্যারিসের কাছে একদমই নতুন অথচ কত চেনা।
ইনায়ার চুলে হালকা শ্যাম্পুর ঘ্রাণ অ্যারিসের নাকে এসে ঝাপটা দিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইনায়ার তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল। নিজের কোমরের ওপর একটা শক্ত হাতের বাঁধন অনুভব করে ইনায়া বুঝতে পারল, অ্যারিস ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে আছে।
ঘুম জড়ানো ভারী কণ্ঠে, আধো-বোজা চোখে ইনায়া ফিসফিস করে বলল, "ছাড়ো, আমাকে উঠতে হবে।"
অ্যারিস বাঁধনটা আলগা করল না, বরং আরও একটু নিবিড়ভাবে ওকে জাপটে ধরে আদুরে গলায় বলল, "উহুঁ, আরো একটু এভাবেই থাকোনা।"
ইনায়া শাসন করার ভঙ্গিতে বলল, "একদম না, ওঠো।"
অ্যারিস দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুটা অভিমানী সুরে বিড়বিড় করল, "তুমি আসলেই খুব পাষাণ ইনায়া।"
ইনায়া বিছানা ছেড়ে উঠতে যাবে অ্যারিস আরো শক্ত করে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে, "প্লিজ আর কিছুক্ষণ আমার সাথে থাকো।"
অ্যারিসের মায়াবী আবদার আর রহস্যময় হাসির কাছে ইনায়া আজ হার মেনে গেল। ইনায়া অ্যারিসের বুকের একপাশে মাথা রেখে নিশ্চুপ হয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তেই করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছিলেন আফরিন সুলতানা। মেয়ের ঘুম ভাঙাতে তার ঘরে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই পা বাড়িয়েছিলেন তিনি, কিন্তু রুমের সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। রাতের কোনো এক সময় হয়তো দরজাটা ঠিকমতো আটকানো হয়নি, তাই পাল্লাটা কিছুটা ফাঁক হয়ে ছিল।
সেই সরু ফাঁক দিয়ে ভেতরের দৃশ্যটা দেখে আফরিন সুলতানার মুখে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো। তিনি দেখলেন, তার জেদি আর গম্ভীর মেয়েটা আজ অ্যারিসের সান্নিধ্যে কতটা শান্ত হয়ে আছে। অ্যারিস আর ইনায়া দুজনকে এভাবে একসাথে দেখে মায়ের বুকটা এক অজানা সুখে ভরে গেল।
তিনি ডাকতে এসেও আর ডাকলেন না। এই সুন্দর মুহূর্তটিতে বিঘ্ন ঘটানোর কোনো ইচ্ছে তার নেই। অত্যন্ত সন্তর্পণে, প্রায় নিঃশব্দে তিনি সেখান থেকে সরে এলেন। কোনো কথা না বলে, মনে একরাশ আনন্দ নিয়ে তিনি নিচে নামলেন।
সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই বসার ঘরের কাছে আনিসুর রহমানের সাথে তাঁর মুখোমুখি দেখা হলো। আনিসুর রহমান তখন হাতে খবরের কাগজটা নিয়ে চশমাটা ঠিক করছিলেন।
আনিসুর রহমান ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, "কী গো, ইনায়াকে কি ডাকলে? কাল রাতে তো বলছিল আজ কোম্পানিতে যাবে, আজ তো চায়নার ওই কোম্পানির সাথে পার্টনারশিপে আসবে, ইনায়াও থাকবে বলছিল। দেরি হয়ে যাবে না?"
আফরিন সুলতানা স্বামীকে থামিয়ে দিলেন। গলার স্বর কিছুটা নামিয়ে রহস্যময় এক হাসি দিয়ে বললেন, "ডাকতে গিয়েছিলাম, কিন্তু না ডেকেই ফিরে এলাম। দেখলাম অ্যারিস আর ইনায়া দুজনে একসাথে ঘুমাচ্ছে। নতুন বিয়ে হয়েছে ওদের, এই সময়টাতে ওদের ডিস্টার্ব করো না। কাজ তো সারাজীবনই থাকবে, কিন্তু এই মুহূর্তগুলো তো আর ফিরে আসবে না।"
আনিসুর রহমান স্ত্রীর কথা শুনে কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইলেন, তারপর তাঁর গম্ভীর মুখেও একটা প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠলো। মেয়ের ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তাটা যেন মুহূর্তেই উড়ে গেল। তিনি আর কোনো কথা বাড়ালেন না, শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলেন। মনে মনে হয়তো মেয়ের সুখী জীবনের দোয়া করতেই নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন।
———
অ্যারিস ইনায়াকে জড়িয়ে শুয়ে ছিল, ঠিক তখনই নিস্তব্ধ ঘরটাকে কাঁপিয়ে ইনায়ার ফোনটা টেবিলে রাখা অবস্থায় সজোরে কয়েকবার কেঁপে উঠল। একের পর এক নোটিফিকেশনের শব্দে ভোরের সেই মায়াবী পরিবেশটা মুহূর্তেই বিষিয়ে গেল। ইনায়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিল, স্ক্রিনে তাকাতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল—ইষান। ইউনিভার্সিটি অনুষ্ঠানের অজুহাতে সে ইনায়াকে একের পর এক মেসেজ পাঠিয়েছে।
ইনায়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। অ্যারিস যেন কিছু বুঝতে না পারে, সেজন্য ইনায়া তড়িঘড়ি করে ফোনটা বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল। কিন্তু অ্যারিসের তীক্ষ্ণ নজর এড়ানো অত সহজ নয়। ইনায়ার চোখেমুখে ঘনিয়ে আসা ভয়ের ছায়া দেখে অ্যারিস মরিয়া হয়ে উঠল সত্যটা জানার জন্য। ইনায়ার মৃদু বাধা উপেক্ষা করে অ্যারিস ঝটকা দিয়ে ফোনটা কেড়ে নিল।
মেসেজের ইনবক্সে ইষানের নামটা দেখামাত্র অ্যারিসের চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপালে রাগের রগগুলো ফুলে উঠল। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অ্যারিস ফোনটা সজোরে বিছানার অন্য প্রান্তে ছুড়ে ফেলে দিল। পরক্ষণেই অ্যারিস ইনায়ার দিকে ফিরল, ওর দু চোখে তখন আগ্নেয়গিরির লাভা ঝরছে। কোনো কথা না বলে, অ্যারিস শক্ত এক হাতে ইনায়ার গাল দুটো চেপে ধরল। ইনায়ার কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই অ্যারিস ইনায়ার ঠোঁটে গভীর আর তীব্র এক চুম্বনে ডুবে গেল। সেই চুম্বনে ভালোবাসার চেয়েও যেন ইষানের প্রতি জমে থাকা ঘৃণা আর ইনায়াকে নিজের করে রাখার এক চরম অধিকারবোধ মিশে ছিল।
অ্যারিসের তীব্র আচমকা আক্রমণে ইনায়া প্রথমে হকচকিয়ে গিয়েছিল। ইনায়া সর্বশক্তি দিয়ে অ্যারিসকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু অ্যারিসের উন্মাদনার কাছে তা ছিল নগণ্য। অ্যারিস যেন আজ নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। অ্যারিস ইনায়ার দুই হাত এক হাতে লোহার মতো শক্ত বাঁধনে মুচড়ে ধরল এবং চুম্বনের সেই গভীরতা আরও বাড়িয়ে দিল। ইনায়ার মৃদু আর্তনাদ আর বাধা দেওয়ার চেষ্টা অ্যারিসের সেই
অধিকারবোধের কাছে হার মানলো।
বেশ কিছুক্ষণ পর, যখন দুজনেরই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, তখন অ্যারিস নিজেই কিছুটা শান্ত হয়ে সরে এল। অ্যারিসের চোখ দুটো তখনো লাল হয়ে আছে, বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। অ্যারিস ইনায়ার চোখের দিকে গভীর তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে ভেজা গলায় বলল, "আই রিয়েলি লাভ ইউ, ওয়াইফি। তোমাকে অন্য কারো সাথে কল্পনা করাও আমার জন্য যন্ত্রণার।"
ইনায়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে অ্যারিসের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। অ্যারিসের এই তীব্র ঈর্ষা আর অধিকারবোধ ইনায়াকে অবাক করেছে। ইনায়া ধীরস্থিরভাবে তার দুই হাত বাড়িয়ে অ্যারিসের দুই গালে আলতো করে হাত রাখলো। অ্যারিসের উত্তপ্ত ত্বকে ইনায়ার হাতের শীতল স্পর্শ যেন এক অদ্ভুত জাদুর মতো কাজ করল।
ইনায়া শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "বিলিভ মি অ্যারিস, আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি না। তোমার এই অহেতুক জেলাস হওয়াটা এবার বন্ধ কর।"
অ্যারিস যেন আজ এক অবাধ্য শিশুর মতো হয়ে উঠেছে। ইনায়ার সেই নরম কথার তোয়াক্কা না করে, ইনায়ার শরীরের ওপরই ভর দিয়ে শুয়ে পড়ল অ্যারিস। ইনায়ার তখন নিঃশ্বাস নিতেও কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবুও ইনায়া খুব শান্ত ও নরম গলায় বলল, "অ্যারিস এবার অন্তত ওঠো, আমার এক জায়গায় যাওয়ার কথা আছে।"
ইনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই অ্যারিসের শরীর আবার শক্ত হয়ে উঠল। ইনাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সন্দেহের সুরে জিজ্ঞেস করল, "এর মানে তুমি ওই ছেলের সাথে ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছো? ইষানের কাছে?"
অ্যারিসের গলার স্বরে যেমন অধিকারবোধ ছিল, তেমনি ছিল হারানোর এক চাপা ভয়। ইনায়া কোমল সুরে বলল, "না হাজবেন্ড, আজ আমি বাবার কোম্পানিতে যাবো। আগে থেকেই কথা দেওয়া ছিল।"
কোম্পানির কথা শুনে অ্যারিসের ভেতরের সেই উত্তপ্ত জেলাসি মুহূর্তেই যেন জল হয়ে গেল। অ্যারিস কিছুটা নরম হয়ে এল, ইনায়ার ওপর থেকে চাপ কমিয়ে দিল। কিন্তু তবুও তার শাসন করার অভ্যাসটা গেল না। অ্যারিস ইনায়ার নাকটা আলতো করে টেনে দিয়ে বলল, "ওকে যেতে পারো, কিন্তু একদমই সেজেগুজে যাবে না। আমার বউয়ের দিকে অন্য কেউ তাকিয়ে থাকুক, সেটা আমি সহ্য করতে পারবো না।"
ইনায়া কিছু না বলেই উঠে যায়।
—
দুপুরে আনিসুর রহমানের অফিসের কনফারেন্স রুমটা ছিল টানটান উত্তেজনায় ঠাসা।
চীনের এক নামকরা বিশাল কোম্পানি "ইন গ্রুপ "-এর প্রতিনিধির সাথে আজ পার্টনারশিপের চুক্তি সই হওয়ার কথা। আনিসুর রহমান যখন ফাইলগুলো দেখছিলেন, ঠিক তখনই ইনায়াকে সেখানে উপস্থিত হতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন। সকালে স্ত্রীর কাছে শুনেছিলেন ইনায়া আর অ্যারিস একসাথে আছে, তাই ভেবেছিলেন মেয়ে আজ হয়তো অফিসেই আসবে না। তবে গম্ভীর স্বভাবের আনিসুর রহমান মুখে কিছু বললেন না। শুধু মেয়ের কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখে মনে মনে তৃপ্তিবোধ করলেন।
পুরো মিটিং জুড়ে ইনায়া ছিল অত্যন্ত পেশাদার। তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর আলোচনার ধরন দেখে চীনা প্রতিনিধি দলও বেশ মুগ্ধ হলো। সন্ধ্যার মধ্যে সকল কাজ গুটিয়ে বাবাকে সাথে নিয়ে বাসায় ফিরল।
সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ঢোকা মাত্রই অ্যারিস ডেজার্ট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। ইনায়া এগিয়ে গিয়ে ডেজার্টটি এক চামচ মুখে দিলো। টেস্ট ছিল অসাধারণ। ইনায়া মুগ্ধ চোখে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে বললো, "তুমি যে এত ভালো ডেজার্ট বানাতে পারো, সেটা আমার জানাই ছিল না। সত্যিই অনেক দারুণ হয়েছে।"
অ্যারিস তখন পাশে দাঁড়িয়ে ইনায়ার প্রশংসা শুনে তৃপ্তির হাসি হাসছে। শামীমা বেগম ডাইনিং টেবিলের এক কোনে দাঁড়িয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে ছেলের কান্ড দেখছিলেন। অ্যারিস, যে ছেলে কোনোদিন এক গ্লাস পানি ঢেলে খাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি, যাকে রান্নাঘরের আশেপাশেও কোনোদিন দেখা যায়নি—সে আজ নিজের হাতে ইনায়ার জন্য ডেজার্ট বানিয়েছে!
আনিসুর রহমান এবং আফরিন সুলতানাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুই পরিবারের বড়রা যখন দেখলেন অ্যারিস কতটা যত্ন নিয়ে ইনায়াকে ডেজার্ট খাইয়ে দিচ্ছে এবং ইনায়াও হাসিমুখে তার প্রশংসা করছে, তখন পুরো ড্রয়িং রুম জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এল।
ইনায়া ডেজার্ট খেতে খেতে শামীমা বেগমকে জিজ্ঞেস করে, " বাবা আর ইভান কোথায়? তাদের দেখছি না যে?"
শামীমা বেগম মুচকি হেসে বলে, "জিয়ান তো আবার চায়না চলে গেছে ব্যবসার কাজে, সাথে ইভানকে ও নিয়ে গেছে।"
ইনায়া আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে যায় ফ্রেশ হতে।
ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা ৪০। রাতের খাবার শেষ করে বাড়ির সবাই যার যার ঘরে চলে গেছে। করিডোরের বাতিগুলো নিভিয়ে দেওয়ায় এক অদ্ভুত মায়াবী অন্ধকারের চাদর বিছিয়ে দিয়েছে পুরো বাড়িতে। ইনায়া নিজের রুমে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই দরজায় দুই-তিনবার মৃদু টোকা পড়ল।
ইনায়া অবাক হলো; এই অসময় কে আসলো আবার? দরজা খুলতেই দেখল সামনে অ্যারিস দাঁড়িয়ে, তার হাতে তিনটা বড় বড় শাড়ির বক্স। ইনায়ার বিস্ময় কাটানোর সুযোগ না দিয়েই অ্যারিস ঘরে ঢুকে বক্সগুলো বিছানায় রাখল।
একটা একটা বক্সগুলো খুলে ইনায়াকে শাড়ি গুলো দেখাতে লাগলো। ইনায়া অবাক হয় তবে কিছু বলে না। মেরুন, গাঢ় নীল, আর হালকা সবুজ রঙের সুন্দর তিনটা শাড়ি, সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ, রেশমি চুড়ি, ঝুমকো কানের দুল। শাড়ি পরার জন্য যা যা লাগে, অ্যারিস কোনো কিছুই বাদ রাখেনি।
অ্যারিস ইনায়ার হাতে শাড়ি দিয়ে তাড়াতাড়ি পরার জন্য বলে যায়। ইনায়া পড়ে যায় মহাবিপদে, কারণ, ইনায়া কখনো শাড়ি পড়া তো দূরে থাক ও কিনে নাই পর্যন্ত। ইনায়া ইউটিউব দেখে পরার চেষ্টা করে তবে হয় না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে অ্যারিস তবে ইনায়াকে বের হতে না দেখে নিজেই রুমে ঢুকে পড়ে, দেখে ইনায়া শাড়ি পরতে পারছে না। অ্যারিস এগিয়ে এসে ইনায়াকে শাড়ি পরিয়ে দেয়, সুন্দরভাবে সাজিয়ে দেয়। ইনায়া অনেক অবাক হয়ে বলে, "তুমি কি তোমার গার্লফ্রেন্ড কে এভাবে শাড়ি পরিয়ে সাজিয়ে দিতে?"
অ্যারিস ভ্রু কুঁচকে ইনায়ার দিকে তাকায়, "তুমিই প্রথম ওয়াইফি। সকালে তুমি অফিস যাওয়ার পর থেকে ইউটিউব দেখে সব শিখেছি।"
ইনায়া অন্যদিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। ইনায়াকে দাঁড় করিয়ে অ্যারিস নিজের রুমে গিয়ে ক্রিম কালার পাঞ্জাবি, সাদা প্যান্ট পড়ে আসে। ইনায়া এই প্রথম অ্যারিসকে পাঞ্জাবিতে দেখেছে, অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। ইনায়া চাইলেও যেন চোখ সরাতে পারছে না। অ্যারিস ইনায়ার দিকে তাকাতেই ইনায়া ঘুরে আয়নার সামনে যায়। ইনায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখা বাদ দিয়ে অ্যারিসকে দেখছে। একটু পর অ্যারিস পেছন থেকে এসে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে বলে, "ওয়াইফি, আজ কি আমাকে অনেক বেশি সুন্দর লাগছে? এভাবে লুকিয়ে কেন দেখছো? আমি তো তোমারই হাজবেন্ড, সরাসরি দেখো।"
ইনায়া খানিকটা লজ্জা পেল, এতক্ষণ যে অ্যারিসকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছিল তা অ্যারিস দেখে ফেলেছে।
অ্যারিসের উষ্ণ নিঃশ্বাস ইনায়ার কাঁধে আছড়ে পড়ল এবং নিজের থুতনিটা ইনায়ার কাঁধে রেখে অ্যারিস ফিসফিস করে বলে, "ওয়াইফি, তোমাকে একদম আমার বউয়ের মতো লাগছে। একটা কথা জানো? তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তোমার চুল দেখে সত্যি অনেক ফিদা হয়ে গেছিলাম। যখন চুল গুলো সরিয়ে আমার দিকে তাকালে, বিশ্বাস করো, তখন জাস্ট মনে হলো আত্মাটা দেহ থেকে বের হয়ে গেছে। তখন একটা গান মনে আসছিলো।"
ইনায়া অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে বলে, "কোন গান?"
অ্যারিস গেয়ে উঠল :
"ঝড়ের বেশে এলো কে সে...
কাজল সে চোখ দুটি,
দিলো কঠিন কথার
বিষন্নতার ছুটি...
তারই সাথে, খেলনা পাতে...
অযথা হাসাহাসি, হাজার বারণ...
আরও কারণ, তবুও সে দারে ই আছি...
চলনা দুজন মিলে দু'জন...
নীল ঐ আকাশে ভাসি,
দেখুক লোকে, ঐ দুচোখে
তোর ঐ দু'চোখের হাসি..."
ইনায়া অন্যদিকে তাকিয়ে বলে, "তোমার গানের গলা একটুও ভালো না।"
অ্যারিস অভিমানী সুরে বলে, "এই প্রথমবার কারো জন্য গান গাইলাম, একটু মিথ্যা প্রশংসাও তো করতে পারো?"
ইনায়া কঠিন কণ্ঠে বলে, "না পারি না।"
অ্যারিস এবার ইনায়াকে ঘুরিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করায়, চোখে চোখ রাখে। মুহূর্তের পরপর অ্যারিস এক হাতেই ইনায়াকে কোলে তুলে নিল। ইনায়া অপ্রস্তুত হয়ে প্রথমে চুপসে গেলেও, পর মুহূর্তে সামলে নিলো। অ্যারিস ইনায়াকে নিয়ে সোজা গাড়ির সামনে নামায়।
ইনায়া একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
অ্যারিস ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে বলে, "লং ড্রাইভ।" ইনায়া আর কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসে। অ্যারিস গাড়ি স্টার্ট দেয়।