ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি

পর্ব 10

লেখক: F. Tabassum

অ্যারিস ইনায়ার চোখ দুটো আলতো করে চেপে ধরে তাদের বর্তমান বাসার ঠিক পাশের বাড়িটির সামনে নিয়ে এল। হাতের বাঁধন আলগা হতেই ইনায়ার সামনে উন্মোচিত হলো এক জাদুকরী দৃশ্য। নিস্তব্ধ রাতের বুক চিরে বাড়িটি যেন এক স্বপ্নপুরীর মতো জ্বলছে। ঘিয়েরঙা দেয়ালে ফোকাস লাইটের মায়াবী আলো এমনভাবে পড়ছে যে মনে হচ্ছে পুরো অট্টালিকাটি হিরের দ্যুতি ছড়াচ্ছে। সাদা রঙের প্রশস্ত বারান্দা আর পিলারগুলোর কারুকাজ দেখে ইনায়া বাকরুদ্ধ হয়ে রইল। ড্রাইভওয়ের মসৃণ ব্লকের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা মেরুন গাড়িটির কাঁচে প্রাসাদের সেই আলোকছটা ঠিকরে পড়ছে।
অ্যারিস পকেট থেকে একটি রুপালি চাবি বের করে ইনায়ার নরম হাতের তালুতে রাখল। কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, "আজ থেকে এই স্বপ্নের ঠিকানায় আমরা শুধু দুজন থাকব, মাই ডেইজি।"
ইনায়া অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "হঠাৎ বাড়ি কিনলে কেন?"
"বাড়ি কিনিনি ইনায়া, জায়গাটি কিনে তোমার পছন্দমতো নকশা করে বাড়িটা বানিয়েছি।"
ইনায়া তাকিয়ে দেখল, বাড়িটি ঠিক তেমনই যেমনটি সে মনে মনে চেয়েছিল। সামনে নীল টলটলে পানির এক বিশাল সুইমিং পুল, চারপাশে সযত্নে সাজানো বাগান। বাড়ির ছাদটার অর্ধেকটা ঢাকা আর বাকি অর্ধেকটা খোলা আকাশের নিচে— ঠিক যেন বৃষ্টি উপভোগ করার এক আদর্শ কোণ। ইনায়ার বিস্ময়ের ঘোর কাটছিল না। ইনায়া কিছু বলছে না দেখে, অ্যারিস এবার ইনায়ার দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে খুব গম্ভীর আর গভীর স্বরে বলতে শুরু করল,

"তোমার অতীতের সবটুকু আমি জানি, তোমার সাথে যা হয়েছিল, তাতে তোমার কোনো দোষ ছিল না। আমি কথা দিচ্ছি, আমি সারাজীবন তোমার ছায়া হয়ে পাশে থাকব। তুমি যা বলবে, আমি তা-ই করব, কিন্তু প্লিজ নিজের ওপর এতটা কঠোর হয়ে থেকো না। তোমারও একটা মন আছে। আমাদের বিয়ের পর থেকে আমি তোমাকে কোনোদিন মন খুলে হাসতে দেখিনি, অন্যের সামনে লোকদেখানো হাসির কোনো প্রয়োজন নেই ইনায়া। আমি চাই তুমি যা-ই করো তা যেন মন থেকে হয়।"

অ্যারিসের প্রতিটি শব্দ যেন ইনায়ার মনের তলে থাকা বরফ গলিয়ে দিচ্ছিল। এতদিনের চেপে রাখা কষ্ট আর একাকীত্ব যেন আজ বাঁধ ভাঙল। চোখের কোণে জমা জলটুকু আর আটকে রাখা গেল না। ইনায়া ডুকরে কেঁদে উঠে অ্যারিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
অ্যারিস মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শরীরের রক্ত চলাচলের গতি যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। এই প্রথম ইনায়া তাকে নিজে থেকে জড়িয়ে ধরেছে! অ্যারিসের বুকের ভেতরটা এক অপার্থিব সুখে ভরে উঠল, সে পরম আবেগে ইনায়াকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
তাদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটি দেখছিলেন ইনায়ার মা, বাবা, ছোট বোন, সাথে ছিল অ্যারিসের মা আর ছোট ভাই। দূরত্ব বেশি হওয়ায় অ্যারিসের কথাগুলো তাদের কানে না পৌঁছালেও, ইনায়ার এই আত্মসমর্পণ আর জড়িয়ে ধরা দেখে তাদের মুখে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। তারা বুঝল, ইনায়া অবশেষে অ্যারিসকে মন থেকে গ্রহণ করেছে।

ইনায়া যখন নিজেদের রুমে ঢুকে ভীষণ অবাক হয়, এই রুমটা তার রুমের মতো করে সাজানো। ভীষন খুশি ও ইনায়া, অ্যারিসকে কাছে ডাকে। অ্যারিসও কাছে আসে, ইনায়া কানে কানে ফিসফিসিয়ে কিছু একটা বলে। অ্যারিস নিচে চলে যায়, একটু পর ফিরে আসে হাতে একটা ওয়াইনের বোতল আর ২টা গ্লাস নিয়ে। অ্যারিস আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে, হাতে তার পানীয়ের গ্লাস। উল্টো দিকে ইনায়া।
অ্যারিস মৃদু হেসে গ্লাসটা এগিয়ে দিল। ইনায়া খুব সাবধানে মাত্র কয়েক চুমুক দিয়েছে, তাতেই তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। আধো-বোজা চোখে সে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে হেসে দিল— যে হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে একরাস সারল্য।
অ্যারিস শান্ত হয়ে বসে দেখছে ইনায়ার এই পরিবর্তন। নেশার ঘোরে ইনায়া অ্যারিস কে উদ্দেশ্য করে বলে, " আমি তো তোমাকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করি, আমি বলিনি কারণ তুমি যদি হারিয়ে যাও?. জানো আমার পছন্দের জিনিস বেশি দিন আমার কাছে থাকে না। এমনকি পছন্দের মানুষ ও। তাই আমি নিজের মনের কথা কাউকে বলি না। তুমি ও কাউকে বলবে না বুঝলে নয়তো বাসা থেকে বের করে দিবো। "

অ্যারিস নিজের পানীয়তে চুমুক দিচ্ছিল আর ইনায়ার এই কিউট পাগলামিগুলো উপভোগ করছিল। সে নিজে আরও এক চুমুক পানীয় নিল, কিন্তু তার নেশা ইনায়ার মতো টালমাটাল নয়, বরং তার নেশাটা ছিল ইনায়ার এই রূপ দেখার।
ধীরে ধীরে রাতের গভীরতা বাড়ল, অ্যারিসের রক্তেও তখন নেশার স্রোত বইছে। অবদমিত টান আর মাতাল করা মুহূর্তগুলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। সেই মায়াবী রাতে তারা দুজন একে অপরের খুব কাছে এল। রাতটা শেষ পর্যন্ত তাদের দুজনের গোপন স্মৃতিতে মিশে গেল।

—♡
ভোরের আলো যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের ভেতর উঁকি দিল, ইনায়ার ঘুমটা ভেঙে গেল সবার আগে। চোখ মেলতেই তার শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত শিহরন খেলে গেল। বিছানায় ছড়ানো-ছিটানো অগোছালো পোশাক আর গতরাতের প্রতিটা স্মৃতি একে একে তার মনের আয়নায় ভেসে উঠতে লাগল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার ফর্সা গাল দুটো লাল হয়ে উঠল।
সে খুব সন্তর্পণে বিছানা ছাড়ল। অ্যারিস তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ইনায়া দ্রুত পায়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। গোসল সেরে নিল তবে আজ চুল ভেজালো না, ভেজা চুলে অ্যারিসের সামনে গেলে হয়তো অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, সেই অস্বস্তিটা সে এড়াতে চাইল। গোসল সেরে বের হয়ে সে অতি দ্রুত বিছানার চাদরের প্রতিটি ভাঁজ সোজা করে অ্যারিসের পাশে গিয়ে ধীরস্থিরভাবে শুয়ে পড়ল, যেন কিছুই হয়নি।
কিছুক্ষণ পর অ্যারিসের ঘুম ভাঙল। শরীরটা একটু ভারী লাগছে, সে অনুভব করল তার গায়ে কোনো পোশাক নেই। কম্বলটা একটু সরিয়েই সে পুরো বিষয়টা আঁচ করতে পারল। গতরাতের সেই উদ্দাম স্মৃতিগুলো তাঁর ঠোঁটে এক বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে তুলল।
সে পাশে তাকাল। দেখল ইনায়া খুব শান্ত হয়ে শুয়ে আছে, যেন সে গভীর ঘুমে মগ্ন। অ্যারিস বুঝল, এই পরিপাটি বিছানা আর ইনায়ার এই 'ঘুমন্ত' অভিনয়— সবই তার লজ্জা ঢাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা। সে ইনায়াকে কিছু জিজ্ঞেস করল না, শুধু একদৃষ্টে তার লাল হয়ে থাকা কানের লতির দিকে তাকিয়ে রইল। সে মনে মনে হাসল— সে জানে ইনায়া জেগে আছে।
অ্যারিস ফ্রেশ হয়ে এসে রেডি হয়ে ভার্সিটি চলে যায়। একটু পর ইনায়াও উঠে নিচে গিয়ে দেখে শামীমা বেগম রান্নাঘরে কাজ করছে। তিনি ইনায়াকে নামতে দেখে নাস্তা এগিয়ে দেন।
ইনায়া খেতে খেতে জিজ্ঞেস করে, "মা আমার তো ক্লাস ছিলো, আপনি একটু ডেকে দিলেন না কেনো?"
—"আমি যেতে চেয়েছিলাম তবে অ্যারিস নিজেই বারণ করলো। দুনিয়া ধ্বংস হলেও যেন কেউ উপরতলায় না যায়।"
ইনায়া কথাটা শোনামাত্রই ভীষম খায়। তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে রুমে যায় রেডি হতে।

সকাল ১১:০০
ইনায়া ক্যাফেটেরিয়াতে ঢোকার আগেই যায়েদ স্যারের সাথে দেখা। যায়েদ স্যার কিছু বলার আগেই ইনায়া বলে,
"আকাশটা বাইরে থেকে যতোই পরিষ্কার লাগুক না কেনো, বাতাস কিন্তু বলছে মেঘ জমেছে। ছাতা না নিয়ে বের হলে কপালে কষ্ট আছে।"

যায়েদ স্যার কথার মানে ঠিক বুঝলো না, এই শীতকালে বৃষ্টি কোন দিয়ে হবে? বাতাস তো নেইই তাহলে মেঘ কোথায় জমলো? কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই ইনায়া সেখান থেকে চলে যায়।
ক্লাসে গিয়ে নিজের সিটে বসতেই ইনায়া লক্ষ্য করলো তার ব্যাগের চেইন খোলা। ইনায়া যখন ব্যাগ খোলে একটা লাভ লেটার দেখে। পিছন ফিরে দেখে ইষান মারিয়ার দিকে ফিরে কথা বলছে। লাভ লেটারটা ডাস্টবিনে ফেলে দেয় ইনায়া, কারণ এটা যে ইষান দিয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

দুই মাস কেটে গেল।
প্রথম বর্ষ শেষ হয়ে গেছে, আজ কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম দিন। সকালের রোদেলো আকাশটা বেশ ঝকঝকে, কিন্তু ইনায়ার মনের ভেতরটা আজ কেমন যেন অস্থির। শরীর টাও কেমন যেনো খারাপ লাগছে। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি লাগছে।
নাস্তার টেবিলে অ্যারিস, শামীমা বেগম আর ইভান বসা। গল্পগুজব আর হাসাহাসির মাঝেই ইনায়া প্লেট টেনে নিল। কিন্তু প্রথম লোকমা মুখে দিতেই তার নাকে কেমন একটা তীব্র গন্ধ এসে লাগলো। মুহূর্তেই পেটটা মোচড় দিয়ে উঠল তার, বুক ঠেলে ওঠে আসা বমিভাবটা সে আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। কাউকে কিছু না বলেই খাবারের থালা ঠেলে দিয়ে ইনায়া দৌড়ে ওপরে নিজের রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিল।
টেবিলের সবাই স্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। শামীমা বেগম আর অ্যারিস একে অপরের দিকে তাকাল। অ্যারিস চিন্তিত মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে ডাকল, "ইনায়া দরজা খোলো। কী হয়েছে তোমার?"
বেশ কিছুক্ষণ পর ইনায়া দরজা খুলল। মুখটা ফ্যাকাশে, চোখেমুখে বমির ছাপ স্পষ্ট। অ্যারিস সাথে সাথেই তাকে জড়িয়ে ধরে কপালে হাত রাখল। ব্যাকুল স্বরে বলল, "বউ, ঠিক আছো তুমি? খুব বেশি শরীর খারাপ লাগছে? চলো এখনই ডাক্তারের কাছে যাই।"
ইনায়া নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ম্লান হাসল। "তেমন কিছু না অ্যারিস, হয়তো সকালে খালি পেটে গ্যাস হয়েছিল, এখন ঠিক আছি।"

অ্যারিস মানতে চাইল না, কিন্তু ইনায়ার জোরাজুরিতে শেষ পর্যন্ত শান্ত হলো। সে ইনায়াকে আজ ভার্সিটি যেতে নিষেধ করে নিজের অফিসের জন্য বেরিয়ে গেল। যাওয়ার সময় মাকে বার বার বলে গেল ইনায়ার খেয়াল রাখতে। অ্যারিস যাওয়ার পর ইনায়া শামীমা বেগমকে কোনোমতে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সে ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল।
ভার্সিটিতে মারিয়ার সাথে ইনায়ার সম্পর্কটা এখন বেশ ঘনিষ্ঠ। ক্লাসের ফাঁকে ইনায়ার আবার বমি বমি ভাব লাগে, মুখে হাত দিয়ে আছে।
মারিয়া ভ্রু কুঁচকে বলে, "তুই কি প্রেগন্যান্ট?"
ইনায়া সকালের ঘটনাটা মারিয়াকে বলল, মারিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল, "ইনায়া, তুই মনে হয় প্রেগন্যান্ট, আমি সিওর!"
ইনায়া যেন আকাশ থেকে পড়ল! "কী বলছিস এসব! মাত্র একবারই তো... এত তাড়াতাড়ি কীভাবে সম্ভব??"
মারিয়া হাসল, "সবই সম্ভব, তুই আজই টেস্ট কর।" সে জোর করে ইনায়াকে ফার্মেসি থেকে একটা প্রেগন্যান্সি কিট কিনে দিল।

বাসায় ফিরে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষার পর যখন ইনায়া দেখল কিটে দুটো লাল দাগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তখন তার হৃদস্পন্দন যেন থেমে যাওয়ার যোগাড়। সে সত্যিই মা হতে চলেছে?
অ্যারিস বাসায় ফিরেই আগে ইনায়াকে খুঁজল। সুস্থ আছে দেখে শান্ত হলো। ইনায়াকে ফোনে না পেয়ে মাকে যে সারাদিন কতবার ফোন করে ইনায়ার খবর নিয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। শামীমা বেগম অ্যারিসকে মিথ্যা করে বলেছিলেন, ইনায়া রুমে ঘুমাচ্ছে।

পরদিন সকালে ইনায়া চুপিচুপি একাই হাসপাতালে গেল কনফার্ম হওয়ার জন্য। যখন হাতে রিপোর্ট এল, সেখানে লেখা— ইনায়া দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা! ইনায়া অনেক অবাক হয়ে জায়গায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, মনে মনে ভীষণ খুশি। তার ছোট্ট একটা সাজানো সংসারের স্বপ্ন আজ সত্যি হতে চলেছে। সে কাঁপা কাঁপা হাতে রিপোর্টের একটা ছবি তুলে অ্যারিসকে পাঠিয়ে দিল।
অফিসে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিং চলছিল। অ্যারিস গম্ভীর মুখে প্রেজেন্টেশন দেখছিল, ঠিক তখনই তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। স্ক্রিনে ইনায়ার পাঠানো ছবিটা দেখে অ্যারিসের চোখের পলক স্থির হয়ে গেল, দুই মিনিট... সে পাথরের মতো মূর্তির মতো তাকিয়ে রইল ওই রিপোর্টের দিকে। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে এল, মাথার ভেতর এক অদ্ভুত ঝিলিক দিয়ে সে চেয়ার থেকে ঢলে পড়ল। পুরো মিটিং রুমে হইচই পড়ে গেল। বসের এমন অবস্থা দেখে সবাই ঘাবড়ে গেল। মাহি দ্রুত ছুটে এল। চোখেমুখে পানির ঝাপটা দেওয়ার পর অ্যারিস ধীরে ধীরে চোখ মেলল। জ্ঞান ফিরতেই অ্যারিস মাহির কলার চেপে ধরে।
মাহি ভয় পেয়ে গেল, "কী হয়েছে বস?"
অ্যারিস একগাল হেসে চিৎকার করে বলল, "মাহি! আমি বাবা হচ্ছি! পুরো অফিসে মিষ্টি বিলিয়ে দাও, আর শোনো, লাঞ্চের পর সবার ছুটি! আজ কেউ কাজ করবে না!"
মাহি হা করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর আনন্দে অ্যারিসকে জড়িয়ে ধরল। মুহূর্তের মধ্যে খবরটা দাবানলের মতো অফিসে ছড়িয়ে পড়ল, সবাই ভীষণ খুশি। পুরো অফিস যেন এক উৎসবে মাতল। অ্যারিসের নির্দেশে মাহি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে কয়েক মন মিষ্টি আনিয়ে সবাইকে খাওয়াল। কিন্তু অ্যারিসের আনন্দ যেন তাতেও মিটছিল না। সে মাহিকে সাথে নিয়ে তাদের বাড়ির আশেপাশের প্রতিবেশীদের ঘরে ঘরে গিয়েও মিষ্টি দিয়ে এল। তার চোখেমুখে তখন এক অন্যরকম দ্যুতি, এক অপার্থিব সুখ।

অ্যারিস প্রথমেই ফোন করল ইনায়ার বাবা-মাকে। ফোনের ওপাশ থেকে ইনায়ার মা যখন খবরটা শুনলেন, তিনি আনন্দে কেঁদে ফেললেন। অ্যারিসকে তিনি সবসময়ই নিজের ছেলের মতো পছন্দ করতেন, আর এই খবরটা যেন তাঁর জন্য পাওয়ার সেরা পাওয়া। তিনি খবরটা শোনার পর আফিসে ফোনে সাথে সাথেই ছুটির দরখাস্ত দিলেন। তার একটাই চিন্তা— এখনই মেয়ের কাছে যেতে হবে।
তবে ইনায়ার বাবার প্রতিক্রিয়া ছিল কিছুটা মিশ্র। তিনি অ্যারিস আর ইনায়ার বিয়েটা মেনে নিলেও তাঁর মনে একটা বড় আক্ষেপ ছিল— নিজের বড় মেয়েকে ধুমধাম করে বিয়ে দিবেন, সমাজকে জানাবেন। কিন্তু তার আগেই ইনায়ার মা হতে যাওয়ার খবরটা তার সেই অপূর্ণ ইচ্ছাকে যেন আরও এক ধাপ দূরে ঠেলে দিল। তবুও মনের গহীনে নানু হওয়ার সুপ্ত আনন্দটা তিনি পুরোপুরি চেপে রাখতে পারলেন না। স্ত্রীর সাথে তিনিও তৈরি হলেন মেয়ের শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার জন্য।
অ্যারিস ঝড়ের বেগে বাসায় ফিরল। ঘরে ঢুকেই কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে ইনায়াকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। ইনায়া অনুভব করল অ্যারিসের তপ্ত নিঃশ্বাস আর তার বুকের ধুকপুকানি। কতক্ষণ তারা ওভাবে জড়িয়ে ছিল তার হিসেব নেই।
যখন অ্যারিস ধীরে ধীরে মাথা তুলল, ইনায়া চমকে উঠল। অ্যারিসের মতো পাথরের মতো শক্ত আর গম্ভীর মানুষের চোখে আজ টলটলে পানি। ইনায়ার কোমল হাত দুটো বাড়িয়ে সে আলতো করে অ্যারিসের গাল বেয়ে পড়া অশ্রু মুছে দিল। অ্যারিস তখন ইনায়ার হাত দুটো নিজের মুঠোয় পুরে নিল। সে যেন কিছুতেই এই হাত ছাড়তে চায় না। নিচতলায় তখন উৎসবের আমেজ। শামীমা বেগম ফোনের পর ফোন করে আত্মীয়-স্বজন সবাইকে এই সুখবর জানাচ্ছেন, তার হাসিমুখ আর থামছেই না।
এমন সময় দরজায় বেল বাজার শব্দ হলো, ইনায়ার মা আর বাবা এসে উপস্থিত। মা ঘরে ঢুকেই ইনায়াকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেলেন। বাবার চোখেমুখে তখনও সেই গাম্ভীর্য লেগে থাকলেও, মেয়ের ফ্যাকাশে চেহারার দিকে তাকিয়ে তার মনটা গলে গেল। তিনি অ্যারিসের কাঁধে হাত রেখে শুধু বললেন, "সাবধানে রেখো ওকে।"

বাসাটা এখন প্রিয়জনে পরিপূর্ণ। জিয়ান কথাটা শোনামাত্রই চায়না থেকে চলে আসে, সাথে তার মা আর বোনও ছিলো। সবার ভীষণ পছন্দ হয় ইনায়াকে, অনেক গিফটও দেয়।
ইনায়া বরাবরই ছিলো সবার চোখের মণি, কিন্তু এখন তার কদর যেন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। প্রতিদিনাই অ্যারিস ইনায়ার পছন্দের কিছু না কিছু কিনে আনে। শামীমা বেগমও ইনায়ার ভীষণ যত্ন নেয়। সেপ্টেম্বর থেকে সায়মার SSC পরীক্ষা শুরু হবে কিন্তু অ্যারিস ইনায়াকে একা একা যেতে দিবে না, তাই সায়মা এসে এই বাসায় পড়ে যায়।

অন্যদিকে অ্যারিস ইনায়ার ভার্সিটি ছুটির জন্য প্রভাব নিয়ে বসে ভিসি সাহেবের রুমে, তখন ভিসি কিছুটা আমতা আমতা করছিলেন। "কিন্তু মিস্টার অ্যারিস, ল ডিপার্টমেন্টের নিয়ম তো খুব কড়া, ইউজিসি-র চাপও আছে..."
অ্যারিস তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, "আমি জানি, বোর্ড মেম্বার হিসেবে রিসার্চ উইং আমি স্পন্সর করেছি, সেখানে নিয়ম পরিবর্তনের ক্ষমতা আমার আছে। আপনি কি রেজিস্ট্রারকে এখনই নোটটা পাঠাচ্ছেন, নাকি আমি বোর্ড মিটিং কল করব?"
ভিসি নতি স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। ইনায়ার জন্য একটি বিশেষ ব্যবস্থার ব্যবস্থা করা হলো— সে বাড়িতে বসেই সব লেকচার নোট পাবে, শুধু পরীক্ষাগুলো দিতে আসবে।
যাওয়ার সময় করিডোরে যায়েদ স্যারের সাথে দেখা। অ্যারিস তখন তাকে ভার্সিটিতে ইনায়ার খেয়াল রাখার অনুরোধ করল, জায়েদ একটু বাঁকা হেসে বললেন, "বা.... বা ফেং কোম্পানি সিইও আমাকে রিকোয়েস্ট করছে?"
অ্যারিস উত্তর দিল, "আমার বউয়ের ব্যাপারে আমি সব করতে রাজি।"
___

এদিকে ইষান কিছুই জানে না। ইনায়া মেসেজ বা কলের উত্তর দেয় না এমনকি ভার্সিটিও যাচ্ছে না। খোঁজ নেওয়ার জন্য মারিয়াকে সাথে নিয়ে ইনায়াদের বাসায় যায়, কিন্তু ইনায়া তার শ্বশুরবাড়ি থাকতো। ইনায়া যে প্রেগন্যান্ট তা মারিয়া জানতো, ইষানের সামনে এমন ভাব করল যেন সে কিছুই জানে না।
কলিং বেল দিতেই ইরা এসে দরজা খোলে, ইরা ওদের ভেতরে বসতে বলে, ইষান ইনায়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই ইরা বলে উঠল, "আপু তো এখন—"
কথাটা শেষ করার আগেই আফরিন সুলতানা কঠোর চোখে ইরাকে থামিয়ে দিলেন, "ইরা তুমি ভেতরে গিয়ে পড়তে বসো।" ইরা ভয়ে দ্রুত ঘরে চলে গেল।
ইষান কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, " সেকেন্ড বর্ষ থেকেও ইনায়া ভার্সিটি যাচ্ছে না, কোনো সমস্যা হয়েছে কি?"
আফরিন সুলতানা স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, "ইনায়া একটু অসুস্থ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতি নিয়ে এখন ছুটিতে আছে, চিন্তার কিছু নেই।"
"সিরিয়াস কিছু? কি হয়েছে ও?" ইষান চিন্তিত স্বরে বলল।
আফরিন সুলতানা ছোট করে বলে, "না।"
অল্প কিছু কথা বলে ইষান মারিয়াকে নিয়ে চলে, অ্যারিসের বলাতে সবাই বিয়েটা আপাতত সিক্রেট রেখেছে।
~•~

ইনায়া ভার্সিটি যাওয়ার জন্য জেদ ধরলো। তবে অ্যারিস বুঝিয়ে বললো, "ওয়াইফি, এখন তুমি প্রেগন্যান্ট, এ সময় বাইরে যাওয়া ঠিক না।"
তার বিপরীতে ইনায়াও বললো, "তোমার কি আমাকে ছোট বাচ্চা মনে হয়? আমি যথেষ্ট স্ট্রং, অন্ততপক্ষে তোমার থেকে বেশি, আমি আমাদের বাচ্চার খেয়াল রাখব, কিছু হবে না ওর।" — এভাবেই অনেকক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ইনায়ার কাছে হার মানতে বাধ্য হলো।
ইনায়া এখন প্রতিদিন ভার্সিটি যায় তবে ইষানকে এড়ানোর চেষ্টা চলে। ইনায়া চায় না অ্যারিস আবারও ইষানকে নিয়ে জেলাস করুক। আজ যখন ইনায়া করিডোর থেকে ক্লাসের দিকে আসছিল ইষান সামনে গিয়ে পথ আটকে দাঁড়ায়, মিনতি সুরে বলে, "আই অ্যাম সরি ইনায়া, আমি যদি জানতাম একটা লাভ লেটারের জন্য তুমি আমাকে এভাবে ইগনোর করবে তাহলে আমি ওই লেটারটা কোনোদিনও দিতাম না। প্লিজ মনে করো যে আমি তোমাকে কিছু দেইনি আমার সাথে ফ্রেন্ডশিপ নষ্ট করো না প্লিজ।"
ইনায়া থামল, তার চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, বরং এক অদ্ভুত শীতলতা। সে ইষানের ক্ষমা প্রার্থনার দিকে কোনো পাত্তাই দিল না। ইষানের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা কণ্ঠে বলে, "তুমি কি কখনো তোমার খুনির প্রেমে পড়বে??"
এমন অদ্ভুত আর অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে ইষান পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলে, "ম....মানে? আমাকে যদি খুনই করা হয়, তবে আমি খুনির প্রেমে কীভাবে পড়ব? এটা তো অসম্ভব।"
ইনায়া ধীরস্থিরভাবে বলতে শুরু করল, "আসলে রিসেন্টলি একটা গল্প পড়ছিলাম, যেখানে ছেলেটা মেয়েটার গলা টিপে প্রায় মেরে ফেলেছিল। মেয়েটা সেযাত্রায় কোনোভাবে বেঁচে যায়। রাত অন্ধকার থাকায় ছেলেটা মেয়েটার মুখ দেখতে পায়নি, কিন্তু মেয়েটা ঠিকই ছেলেটিকে দেখেছিল। পরে যখন ছেলেটা সুস্থ অবস্থায় মেয়েটাকে দেখে তার প্রেমে পড়ে যায়— এখন বলো, সেই মেয়েটার কি উচিত সেই খুনি ছেলেটাকে ভালোবাসা?"
ইষান কোনো কিছু না ভেবেই দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল, "না, একদমই উচিত না। যে মারতে চেয়েছিল, তার সাথে ভালোবাসা হয় না।"—
ইনায়া হেসে সেখান থেকে চলে যায়। ইষান ঠায় দাঁড়িয়ে রইল করিডোরে। তার মাথায় শুধু ঘুরপাক খাচ্ছিল ইনায়ার সেই অদ্ভুত গল্পের কথা। বাসায় ফিরে ইষানের অস্বস্তিটা যেন কিছুতেই কাটছিল না, সে বারবার অনলাইনে ইনায়ার বলা সেই গল্পের প্রেক্ষাপট লিখে সার্চ কর......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 10 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন