করতে লাগল— "ছেলেটি মেয়েটিকে মারতে চেয়েছিল, তারপর প্রেমে পড়ে গেল। ." কিন্তু ইন্টারনেটের অগণিত পাতায় খুঁজেও সে অবিকল তেমন কোনো গল্পের হদিস পেল না। কিছুক্ষণ পর বিরক্ত হয়ে ল্যাপটপ বন্ধ করে দিল সে। ভাবল, ইনায়া কোনো অখ্যাত লেখকের বই পড়েছে, তবে ইদানীং আরও একটা বিষয় ইষানকে পোড়াচ্ছিল। ক্লাসে যায়েদ স্যার ইনায়ার দিকে বড্ড বেশি নজর রাখছেন। ইনায়া একটু এদিক ওদিক হলেই স্যার এগিয়ে আসছেন, তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিচ্ছেন। ব্যাপারটা একদমই হজম হচ্ছে না ইষানের। যায়েদ স্যার ইনায়ার সম্পর্কে কিছু হয় কিনা তা জানতে স্যারের জীবনবৃত্তান্ত অনলাইনে খোঁজা শুরু করল। সার্চ রেজাল্ট খুব বেশি কিছু পাওয়া গেল না। নাম: জায়েদ, বাবার নাম: ডক্টর মোহাম্মদ রাব্বী, মায়ের নামের জায়গায় কোনো তথ্য নেই ।
ইষানের কাছে ডক্টর মোহাম্মদ রাব্বি নামটা খুব চেনা চেনা লাগলো। কোথায় শুনেছে নামটা? না, শোনে নি, দেখেছিলো কোনো একটা ফাইলের মধ্যে! তবে এই মুহূর্তে ঠিক মনে করতে পারছে না সে।
হঠাৎ ড্রয়িংরুমে চলা টিভির নিউজে ইহানের চোখ আটকে গেল। ব্রেকিং নিউজ: "স্কয়ার হাসপাতালের প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. মোহাম্মদ রাব্বীর বীভৎস লাশ উদ্ধার।"
ইষানের চোখ কপালে উঠল। সেই সাথে আরও একজনের লাশ পাওয়া গেছে, যাকে ইষান চেনে না। কিন্তু ডা. রাব্বী লাশের বর্ণনা শুনে তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। লাশের সারা শরীরে, মাথা থেকে পা পর্যন্ত কাঁচের টুকরো গেঁথে দেওয়া হয়েছে। কী ভয়ানক প্রতিহিংসা! পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও ঘটনাস্থলে কোনো প্রমাণ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট কিছুই পাওয়া যায়নি।
~•~
ইনায়া নিউজের লিংকটা জায়েদ স্যারকে পাঠিয়ে মেসেজ দিল— "ফিলিং কেমন?"
পরক্ষণেই রিপ্লাই এল— "ফাক ইউ ডা. মোহাম্মদ রাব্বী ।"
ইনায়ার ঠোঁটে এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। পুরো মিডিয়াতে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছে, সবাই ডা. রাব্বীকে খুব 'ভালো মানুষ' হিসেবে জানে। তাকে কেনো এভারে হত্যা করা হবে?
ঠিক সেই সময় ইনায়ার ফোনে 'A' নামে সেভ করা একটা নম্বর থেকে মেসেজ এল: 'Done...'।
ইনায়া রিপ্লাই দিল: 'ব্যাক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে যাও ইমিডিয়েটলি।'
A-এর সংক্ষিপ্ত উত্তর এল: 'OK BOSS...'
ইনায়া আবার লিখলো: "ভর্তি হয়ে কাল আমার সাথে দেখা করবে।"
A-এর রিপ্লাই ছিল: 'OK BOSS...'
আনিসুর রহমানের ড্রয়িংরুমে তখনো টেলিভিশনের পর্দায় ডা. মোহাম্মদ রাব্বীর বীভৎস লাশের দৃশ্যটা ভাসছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরে ঢুকলেন পুলিশ অফিসার রাকিব চৌধুরী। তার চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়েও বেশি ফুটে উঠেছে বিস্ময়।
আনিসুর রহমান রাকিবকে দেখে এক চিলতে হেসে আপ্যায়ন করলেন, "আরে রাকিব, এসো বসো। কী খবর? ইনায়ার উপর যে হামলা করেছিল, তাকে ধরতে পারলে?"
রাকিব চৌধুরী সোফায় বসে খুব ধীর গলায় প্রশ্ন করলেন, "স্যার, মাত্র পাওয়া খবরটা দেখেছেন?"
"হ্যাঁ, ওই তো ডা. মোহাম্মদ রাব্বী, স্কয়ার হাসপাতালের নামকরা ডাক্তার।" আনিসুর রহমান স্বাভাবিকভাবেই বললেন।
রাকিব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "স্যার, ডা. রাব্বীর সাথে যার লাশ পাওয়া গেছে, সেই লোকটাই ইনায়াকে মারতে চেয়েছিল। আমাদের তদন্তে বের হয়ে এসেছে ইনায়াকে মারার অর্ডারটা সরাসরি ডা. রাব্বীই দিয়েছিলেন। আমরা তাদের কল রেকর্ডস, দেখা করার সিসিটিভি ফুটেজ আর টাকার লেনদেনের সব প্রমাণ পেয়েছি।"
আফরিন সুলতানা আর আনিসুর রহমান যেন আকাশ থেকে পড়লেন। "একজন ডাক্তার কেন আমাদের মেয়েকে মারতে চাইবে? তার সাথে আমাদের পরিচয়ও নেই"— আফরিন সুলতানা রুদ্ধদ্বরে বললেন।
রাকিব মাথা নেড়ে বললেন, "সেটা এখনো রহস্য মিস। তবে ডা. রাব্বীই যে এই ষড়যন্ত্রের মাস্টারমাইন্ড ছিল, সেটা এখন নিশ্চিত।"
ইনায়া আগে থেকেই জানতো তাকে কে মারতে চেয়েছিলো, তাই তার খুনের খবর শুনলেও তার মনে কোনো ক্ষোভ ছিলো না।
অফিসার রাকিব একবার ইনায়ার দিকে তাকায়, তারপর টুকটাক কিছু কথা বলে।
—
পরদিন সকালে যথারীতি অ্যারিস অফিসে যাওয়ার পথে ইনায়াকে নামিয়ে দিয়ে গেল। ঠিক হয়েছে, ক্লাস শেষ হলে যায়েদ স্যার নিজে ইনায়াকে বাসায় পৌঁছে দিবেন।
ইনায়া মাত্র দুটি ক্লাস করে ক্যাফেটেরিয়া এরিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। একটি নির্জন টেবিলে বসতেই সামনে এসে বসল এক যুবক। ইনায়া মাথা তুলে দেখল রোহান, তার বিশ্বস্ত "A"।
রোহান নিচু গলায় রিপোর্ট দিতে শুরু করল, "বস, মিস মোহনা কাল বাংলাদেশে আসছেন। কালই তিনি যায়েদ স্যারের সাথে দেখা করতে আসবেন।"
ইনায়া নির্লিপ্তভাবে বলল, "আসতে দাও, বাকিদের খবর কী?"
"সবাই আমাদের নজরদারিতে আছে। মিস মোহনার কেস কোর্টে উঠলে বাকিরা এমনিতেই ফেঁসে যাবে, আর আরাফাত বাংলাদেশে ঢুকলে তার ব্যাপারটা আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখবো।" তারপর একটু থেমে বলল, "বস, চেঞ্জিং রুমের আর বার্থডে পার্টির ফুটেজ রিকভার করে এক কপি পুলিশকে দিয়েছি।"
ইনায়া নিজের কফিটা রোহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, "গুড"— এরপর উঠে চলে যায়।
ঠিক সেই সময় দূর থেকে ইষান দেখল ইনায়া এক অপরিচিত ছেলের সাথে গভীর আলোচনায় মগ্ন। তার বুকের ভেতরটা ঈর্ষায় পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতেই ইনায়া ততক্ষণে চলে যায়। ইষান রোহানের সাথে কথা বলে বুঝতে পারে রোহান তাদের সিনিয়ার।
_________
সন্ধ্যায় ছায়ায় ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে বসে ছিল ইনায়া। হঠাৎ ফোনের কম্পন নীরবতা ভাঙল, সুবার কল।
ইনায়া: "ঠিকমতো পৌঁছেছিস চায়না?"—
ওপাশ থেকে সুবা জানাল, "হুঁ, তেমন কোনো সমস্যা হয়নি।"
ইনায়া দৃঢ়ভাবে, "এখন মন দিয়ে পড়াশোনা কর। কোনো ঝামেলা হলে আমাকে জানাবি।"
সুবা হেসে বলে, "ওকে, বেবি."
সুবার সাথে কথা শেষ হতেই অফিস থেকে ফিরল অ্যারিস। গিয়ে ইনায়ার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে, "কিছু লাগবে আমার বউয়ের??"
ইনায়া একটু সময় নিয়ে বলল, "কাল কি ফ্রি আছো?"
অ্যারিস হেসে বলল, "তোমার জন্য আমি সবসময় ফ্রি।" ইনায়া তখন অ্যারিসের কানের কাছে নিজের পরিকল্পনার কথা জানাল, অ্যারিস প্রথমে একটু অবাক হলেও পরক্ষণেই হেসে মাথা নাড়ল।
পরদিন দ্বিতীয় ক্লাস নিতে যায়েদ স্যার ক্লাসে ঢোকে। একটু পরেই ক্লাসে প্রবেশ করল ন্যাশনাল ফুটবলার মোহনা। মোহনাকে দেখে যায়েদ স্যার যতটা অবাক হলেন, মোহনা তার চেয়েও বেশি খুশি হলো। সে এগিয়ে গিয়ে স্যারের সাথে বেশ অন্তরঙ্গ ভাবে কথা বলতে শুরু করল। পুরো ক্লাস তখন ফিসফাস— ন্যাশনাল ফুটবলার মোহনা এখানে কী করছে? যায়েদ স্যারের সাথে কি তার কোনো রিলেশন আছে?
ইনায়া একদম শান্ত হয়ে বসে দেখছিল সব। মোহনা কথা শেষ করে ইনায়ার কাছে এল। ইনায়ার কানের কাছে মুখ নামিয়ে বিষাক্ত সুরে বলল, "কেমন লাগছে দেখতে, মিস লুজার? বলেছিলাম না তোর থেকে তোর বাবা-মা, ভাই-বোন সব কেড়ে নেব? ক্যারিয়ার তো অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছি। দেখ আর কী কী হয়? মাত্র তো শুরু।"
ইনায়া হেসে উত্তর দিল, "শুরু হওয়ার আগেই যেন শেষ না হয়।" এই বলেই সে মোহনাকে একটা শক্ত ধাক্কা দিল। মোহনা অপ্রস্তুত হয়ে উল্টে পড়তে যাবে, তখনই যায়েদ স্যার তাকে ধরে ফেললেন। যায়েদ স্যার বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "কী করছ কী ইনায়া? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে?" -
ইনায়া তখন ধীর অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলল, যা কেবল যায়েদ আর মোহনা শুনতে পেল— "মিস্টার যায়েদ, আপনি যদি আমাকে ভিলেন বানান, তবে আপনার নায়িকাকে কোনোদিনও পাবেন না। be careful . "
পুরো ক্লাস হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। ইনায়ার মতো শান্ত মেয়ে মোহনাকে ধাক্কা দিল! এদিকে মোহনা সুযোগ বুঝে জায়েদ স্যারের হাত আঁকড়ে ধরে কান্নার নাটক শুরু করল। ইনায়ার এই দৃশ্যটা অসহ্য লাগল। তার দৃষ্টি যখন দরজার দিকে গেল দেখল রাকিব চৌধুরী আর অ্যারিস দাঁড়িয়ে কথা বলছে। ইনায়া এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে হনহন করে হেঁটে রাকিব চৌধুরীর কোমরে থাকা রিভলভারটি হাতে নিল। ক্লাসের সবাই ভয়ে চিৎকার করে উঠল যখন ইনায়া রিভলভারটি মোহনার হাত বরাবর তাক করল।
যায়েদ স্যার আতঙ্কিত হয়ে বললেন, "পাগল হয়ে গেছো ইনায়া, ওটা ফেলে দাও! ওটা খেলার জিনিস না!"
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই একটা বিকট আওয়াজ হলো— 'ঠাস!'
আর সেই সাথে মোহনার গগনবিদারী চিৎকার।
রাকিব এগিয়ে এসে ইনায়ার হাত থেকে অস্ত্রটা নিলেন, ক্লাসের এক ছেলে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, "অফিসার, ইনায়াকে অ্যারেস্ট করুন! ও এভাবে সবার সামনে গুলি করেছে !"
রাকিব ছেলেটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, "তুমি কি সিওর যে ইনায়া গুলি করেছে?"
"আমি কেন, পুরো ক্লাস দেখেছে!" ছেলেটা সহ সবাই সায় দিল, এমনকি ইহানও।
শুধুমাত্র মারিয়া বাদে। মারিয়া দাঁড়িয়ে বলে, "আমার মনে হয় না ইনায়া ওটা করেছে।"
রাকিব সবাইকে থামিয়ে রিভলভার থেকে একে একে ছয়টি গুলি বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন, "রিভলভারে ছয়টি গুলিই তো ঠিকমতো আছে, তাহলে ইনায়া গুলি করল কীভাবে?"
পুরো ক্লাস স্তব্ধ, তাহলে সেই শব্দ আর মোহনার হাতের জখম কোত্থেকে এল? ঠিক তখনই অ্যারিস সামনে এগিয়ে এল, তার হাতে ধরা অন্য একটি পিস্তল। ঠান্ডা গলায় সে বলল, "আমি করেছি।"
সবার বিস্ময় তখন চরমে। অ্যারিস মোহনার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমরা এসেছি মিস মোহনাকে গ্রেফতার করতে। তো মিস মোহনা, স্ট্যান্ড আপ! অনেক করেছেন নাটক। ওটা জাস্ট ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। বাকি নাটক জেলে বসে করবেন, উঠুন।"
মোহনা হতভম্ব হয়ে বলল, "আমি কিছু করিনি! আমাকে কেন অ্যারেস্ট করবেন?"
রাকিব এগিয়ে এসে মোহনার অপরাধের ফিরিস্তি দিলেন, "আপনার টিমের একজনকে ড্রাগস দিয়ে ক্যারিয়ার ধ্বংস করা, তাকে দুবার মারার জন্য লোক ভাড়া করা আর চায়নাতে থাকা একটা মেয়েকে মেরে কোমায় পাঠানো— এগুলো কি যথেষ্ট নয় অ্যারেস্ট করার জন্য???"
যায়েদ স্যার স্তম্ভিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "চায়নাতে থাকা মেয়েকে কোমায় পাঠিয়েছে মানে?"
রাকিব তার দিকে তাকিয়ে বললেন, "চায়না তে থাকাকালীন বাস অ্যাক্সিডেন্টে যে মেয়ে আপনাকে বাঁচিয়েছিল, তাকে মোহনা মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। তবে সৌভাগ্যক্রমে মেয়েটি কোমাতে চলে যায়। মেয়েটার পরিবর্তে মিস মোহনা আপনার কাছে আসে, চোখ খুলে আপনি তাকে সামনে দেখায় ভেবেছিলেন মোহনা আপনাকে বাঁচিয়েছে। আর মোহনাও আপনার ভুল ভাঙায়নি।"
জায়েদ স্যার আবারও জিজ্ঞেস করে, "মেয়েটা কে ছিল?"
রাকিব: "সেটা তো আমি জানি না, ওইটা মিসেস ইনায়া ভালো জানে। তাকে জিজ্ঞেস করুন।"
জায়েদ স্যার পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি ভাবতেই পারছেন না মানুষ চিনতে এত বড় ভুল তিনি করেছেন। ইনায়া যেদিন সাবধান করলেও জায়েদ স্যার ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। আজ বুঝতে পারে ইনায়া তাকে আসলে কি বলতে চেয়েছিলো।
রাকিব মোহনাকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেলেন।
ইনায়া অ্যারিসের কাছে গিয়ে মৃদু হেসে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ মাই হাজবেন্ড।"
অ্যারিস লজ্জা পেয়ে বলে, "বের হওয়ার সময় কল দিও। এসে নিয়ে যাবো।স্যারের শরীরের যা অবস্থা তাকে নিতেই আরো একজনকে লাগবে।"— ইনায়া ঠোঁট চেপে হাসে।
অ্যারিস বিদায় নিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল, পুরো ক্লাসের পরিবেশ বদলে গেছে। যায়েদ স্যার বিব্রত অবস্থায় ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। ইনায়া কাঁধে ব্যাগ নিয়ে সবার দিকে একবার তাকায় তারপর কিছু না বলে বের হয়ে যায়। মারিয়া ও ইনায়ার সাথে বের হয়ে গেল।
ইষানের কাছে সব কিছু যেন ভুল মনে হচ্ছে। নিজেকে নিজে বলছে, "আমি কীভাবে ইনায়াকে অবিশ্বাস করতে পারি? চোখের সামনে এসব দেখলে কাউকে বিশ্বাস করা অনেক কঠিন তবে ইনায়াকে কীভাবে অবিশ্বাস করলাম?"
ইনায়া আর মারিয়া রেস্টুরেন্টে খেতে বসে। ইনায়া অনেক খাবার অর্ডার করে। মারিয়া অবাক হয়ে বলে, "এত খাবার কে খাবে?" -
ইনায়া হেসে বলে, "আমরা।"
খাবার খাওয়া যখন শেষের দিকে তখন একটা কল আসে ইনায়ার ফোনে। খাওয়া রেখে ইনায়া বিল দিয়ে চলে যায়।
~○~
স্কয়ার হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের বাইরের করিডোরটা একদম নিস্তব্ধ। সাদা দেয়াল আর ফিনাইলের কড়া গন্ধ ইনায়ার বুকের ভেতর এক ধরনের হাহাকার তৈরি করছে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে ওটি-র দরজার ওপর। লাল আলোটা নিভে যাওয়ার প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটা মৃত্যুর মতো কাটছে। হঠাৎ দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। ইনায়া এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে গিয়ে দাঁড়াল তাঁর সামনে। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, "আমার বাবা... আমার বাবা ঠিক আছে তো?"
ডাক্তার মাস্কটা নিচে নামিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাসলেন, "হ্যাঁ, তিনি এখন বিপদমুক্ত । অতিরিক্ত কাজের চাপে ছোটখাটো একটা হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল, ভয়ের কিছু নেই। আমরা উনাকে কেবিনে শিফট করছি, জ্ঞান ফিরলে দেখা করতে পারবেন।"
এক মুহূর্তের জন্য ইনায়ার সারা শরীরের টেনশনটা নেমে গেল। সে ধপ করে করিডোরের প্লাস্টিকের চেয়ারটাতে বসে পড়ল। কোনো শব্দ নেই, শুধু চোখ দিয়ে অবিরল ধারায় পানি পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই হন্তদন্ত হয়ে করিডোর দিয়ে ছুটে এল অ্যারিস। ইনায়াকে এই অবস্থায় দেখে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল সে। "ইনায়া শান্ত হও, কিছু হয়নি তো। আঙ্কেল ঠিক হয়ে যাবে, লক্ষ্মীটি, কান্না থামাও। তোমার এই অবস্থায় এভাবে কান্না করা একদম ঠিক না।" অ্যারিস নিচু স্বরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু ইনায়ার কান্নার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। বাবার প্রতি তার দুর্বলতা সবসময়ই একটু বেশি।
কিছুক্ষণ পর আফরিন সুলতানা ছোট মেয়ে ইরাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছালেন। মাকে দেখামাত্রই ইনায়ার কান্না আরও বেড়ে গেল। আফরিন সুলতানা স্তব্ধ হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বোধ বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে ইনায়াকে তিনি কখনো এভাবে ভেঙে পড়তে দেখেননি। আনিসুর রহমান তাঁর মেয়েটিকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন, আর ইনায়ার পৃথিবীটাও বাবাকে কেন্দ্র করেই। অসহায় আফরিন সুলতানা বুঝতে পারছিলেন না মেয়েকে কী বলে শান্ত করবেন। তিনি অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন ওকে একটু বাইরে নিয়ে যেতে। অ্যারিস আলতো করে ইনায়াকে ধরে করিডোর দিয়ে বাইরের দিকে নিয়ে গেল।
খানিকক্ষণ পর তারা যখন ফিরে এল, ততক্ষণে আনিসুর রহমানের জ্ঞান ফিরেছে। সবাই কেবিনের ভেতরে ঢুকল। আনিসুর রহমান বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করতেই ইনায়া বাধা দিল।
আফরিন সুলতানা বিছানার একপাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "আজ যদি আমাদের ছেলেটা থাকতো, তবে তোমাকে এভাবে বুড়ো বয়সে খাটতে হতো না। শরীরের ওপর এত চাপ পড়তো না।"
আনিসুর রহমান ঘরের কোণায় রাখা আয়নাটার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলেন। "পুরোনো কথা কেন তুলছ? বাদ দাও তো ওসব। আমি এখনো যথেষ্ট ইয়াং, সব সামলে নিতে পারবো।"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইরা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে ছিলো। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ইরা জানতো, তারা দুই বোন। তাদের যে বড় ভাই ছিলো, সেটা তার অজানাই ছিল। পুরো ঘরটায় এক ধরনের গুমোট নীরবতা নেমে এল।
পরিবেশ হালকা করতে আফরিন সুলতানা বললেন, "অ্যারিস, তুমি ইনায়া আর ইরাকে নিয়ে বাসায় যাও। এখানে আমি আছি।"
অ্যারিস মাথা নেড়ে সায় দিল। ইনায়া আর ইরা বাধ্য মেয়ের মতো অ্যারিসের পেছনে পেছনে বেরিয়ে এল। গাড়িতে অ্যারিস ড্রাইভিং সিটে, পাশে বিষণ্ণ মুখে ইনায়া বসা। ইরা পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার মাথায় তখনো মা আর বাবার সেই কথোপকথন ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ সে নিস্তব্ধতা ভেঙে জিজ্ঞেস করল, "আপু, একটা সত্য কথা বলবে?
ইনায়া ঘাড় না ফিরিয়েই বলল, "কী?"
"আমাদের কি কোনো বড় ভাই ছিল?" ইরার কণ্ঠে একরাস কৌতূহল।
ইনায়া একটু চুপ থেকে ছোট করে উত্তর দিল, "হুম।"
"তাহলে... এখন ভাইয়া কোথায়?"
"মারা গেছে।" ইনায়ার কণ্ঠস্বর কিছুটা ভারী শোনাল। ইরা আঁতকে উঠে বলল, "আল্লাহ! কীভাবে?"
"হার্ট অপারেশন হয়েছিল। ওই সময়ে ওরকম জটিল অপারেশন খুব রিস্কি ছিল, বাঁচানো যায়নি।" ইনায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে উত্তর দিল।
ইরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করল, "ভাইয়া দেখতে কেমন ছিল?"
"পুরো আমার মতো।" ইনায়া এবার একটু মুচকি হাসল। ইরা মুখ কালো করে বলল, "আমার মতো ছিল না? তার মানে আমিই কি দেখতে সবচেয়ে পচা?"
ইনায়া এবার মিরর দিয়ে ইরার দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কাটল, "না রে, তোর মতো হবে কেন? তোরে তো ডাস্টবিনের পাশ থেকে কুড়িয়ে আনছিল, তুই তো আমাদের ফ্যামিলিরই না!"
ইরা চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলল, "নানানা... একদম না! আমি আম্মুকে গিয়ে সব বলে দেব, তুমি পচা আপু।" ইনায়া মুখ টিপে হাসছে। দুই বোনের এই খুনসুটি দেখে অ্যারিসের ঠোঁটের কোণেও হাসির রেখা ফুটে উঠল। গত কয়েক ঘণ্টার মানসিক ধকল যেন এই মুহূর্তেই অনেকটা হালকা হয়ে গেল।
———
বিকেলের নরম আলোয় আনিসুর রহমানকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। ইনায়া আজ নিজের শ্বশুরবাড়িতে না গিয়ে বাবার বাসাতেই ছিল। বাবার শরীরটা এখনো পুরোপুরি ফিট নয়, তাই সে সারাক্ষণ ছায়ার মতো পাশে পাশে আছে। বিশ্রাম নেওয়ার পর ড্রয়িংরুমে সবাই যখন একসাথে বসল, ইনায়া দেখল এটাই সুযোগ। সে জানে, তার হাতে থাকা খবরটা এই পরিবারের জন্য এক বিশাল বড় ধাক্কা হতে যাচ্ছে। সে পকেট থেকে ফোন বের করে যায়েদ স্যারকে একটা মেসেজ দিল— "চলে এসো।" ওপাশ থেকে ফিরতি মেসেজ এল, "এখনই বের হচ্ছি।"
ইনায়া সোফায় বাবা-মায়ের মুখোমুখি বসল, তার চোখেমুখে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা। সে গভীর শ্বাস নিয়ে বলল, "আব্বু, আম্মু তোমাদের একটা অনেক ইম্পর্ট্যান্ট আর সারপ্রাইজিং কথা বলার আছে।"
আনিসুর রহমান মৃদু হেসে বলেন, "বল মা, কী বলতে চাস?"
ঠিক সেই মুহূর্তেই কলিং বেলটা বেজে উঠল। এই অসময়ে কে আসতে পারে ভেবে ইরা কৌতূহল নিয়ে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়ানো সুঠাম দেহের এক সুদর্শন অপরিচিত ব্যক্তিকে দেখে ইরা কিছুটা হতভম্ব খেয়ে গেল। সে কোনো কথা না বলে দ্রুত ফিরে এসে বাবার পাশে বসল। যায়েদ ধীরপায়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন। দূর থেকে যায়েদকে হেঁটে আসতে দেখে আফরিন সুলতানার কপাল ভাঁজ পড়ল। অ্যারিস নেই, এই সময়ে ইনায়া কাকে বাড়িতে ডেকেছে? তিনি কিছুটা কঠোর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "ইনায়া, কে এই লোক? তুই কি অ্যারিসকে চিট করছিস?"
ইনায়া আঁতকে উঠল। "না আম্মু! ছি! কী বলছ এসব?"
ততক্ষণে যায়েদ একদম কাছে চলে এসেছেন। তিনি সোফায় বসে সরাসরি আফরিন সুলতানার চোখের দিকে তাকালেন। সেই চেনা চাহনি, সেই চিবুকের গঠন— মুহূর্তের মধ্যে যেন সময় থমকে গেল। আফরিন সুলতানার দীর্ঘদিনের জমানো পাথরটা যেন ফেটে চৌচির হয়ে গেল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে "আদিয়ান!" বলে চিৎকার করে জায়েদকে জড়িয়ে ধরলেন।
ড্রয়িংরুমের বাতাস তখন থমথমে। কয়েক সেকেন্ড পরেই আফরিন সুলতানার বিচারক মন জেগে উঠল। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে আদিয়ানকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিলেন। তাঁর চোখে এখন মমতা নয়, বরং তীক্ষ্ণ সন্দেহ। আফরিন সুলতানা প্রমাণ ছাড়া নিজের চোখের জলকেও বিশ্বাস করেন না। একজন মানুষ যাঁর হার্ট অপারেশন হয়েছিল এবং যাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়েছিল, সে বছরের পর বছর পরে এভাবে হুট করে সামনে চলে আসবে— এটা আইন বা যুক্তি কোনোটাতেই মিলছে না।
আফরিন সুলতানা নিজেকে শান্ত করে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, "আদিয়ান তো মারা গেছে। আমার চোখের সামনে তাকে শেষ বিদায় দেওয়া হয়েছে। কে আপনি? কে? এখানে কেনো এসেছেন?