আনিসুর রহমানও বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, "ইনায়া, এটা কী হচ্ছে? যদিও আদিয়ানের সাথে চেহারার সাথে মিল আছে, ও কি সত্যিই আমাদের আদিয়ান?
ইরা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। যে ভাইকে সে সকালে গাড়িতে মৃত জেনে এসেছে, সে যখন জ্যান্ত হয়ে তাদের সামনে বসে আছে।
আদিয়ান স্থির গলায় বলল, "আমি জানি আম্মু, এই মুহূর্তে তোমার কাছে যুক্তিটাই বড়, তুমি ডিএনএ টেস্ট করাও, তাহলেই সব প্রমাণ পাবে।"
আফরিন সুলতানা তার দীর্ঘদিনের পারিবারিক বন্ধু এবং ডাক্তার মাইনুল খানকে ফোন করলেন। আধঘণ্টার মধ্যেই ড. মাইনুল প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে হাজির হলেন। তিনি আদিয়ান এবং আনিসুর রহমানের স্যাম্পল সংগ্রহ করে ল্যাবের দিকে রওনা হওয়ার আগে বলে গেলেন, "আফরিন, আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পরীক্ষাটা করাব, দুই ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট পেয়ে যাবে।"
আদিয়ান সোফার এক কোণে শান্ত হয়ে বসে আছে, আর ইনায়া মাথা নিচু করে নিজের আঙুল নাড়াচাড়া করছে, এবার লুকানোর আর কিছু নেই। আনিসুর রহমান বড় বড় চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছেন, তাঁর চোখে অজস্র প্রশ্ন। ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুখ তুলল, স্পষ্ট স্বরে সে বলতে শুরু করল, "আমি তোমাদের সবকিছু বলছি একদম শুরু থেকে।"
সবকিছু শুরু হয়েছিল প্রায় তিন বছর আগে, আমি তখন হাই স্কুলে পড়তাম। বাংলা ক্লাসে আমি আর সুবা মন দিয়ে ক্লাস করছিলাম, হঠাৎ প্রিন্সিপাল এসে জানায়, সুবার বাবা ভীষণ অসুস্থ, তিনি সুবাকে দেখতে চেয়েছেন। সুবা তখন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য, কি করবে বুঝতে না পেরে কান্না শুরু হয়ে গেল। ওকে থামিয়ে স্যারের থেকে ছুটি নিয়ে সুবাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা দেই। স্কয়ার হাসপাতালের সামনে গিয়ে থামি। সুবাকে ওর ফ্যামিলির কাছে বুঝিয়ে দিয়ে আমি যখন ফেরার কথা ভাবছিলাম, তখন মনের অজান্তেই পা দুটো থমকে গেল। ভাইয়ার মৃত্যুর পর ওই হাসপাতালে আর কোনোদিন পা রাখিনি, চারপাশটা অনেক বদলে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে আমি ঠিক সেই কেবিনটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, যেখানে ভাইয়া শেষবার ছিল। ভেতরটায় একজন অচেনা মেয়েকে দেখলাম। পিছন ঘুরতেই একজন বয়স্ক লোকের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলাম। দ্রুত তাঁকে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকাতেই সাথে সাথেই চিনে ফেলি তাঁর হাতে থাকা সেই বড় জন্মদাগ দেখে। তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্নতা কর্মী রহমত আঙ্কেল। আমি উনাকে জিজ্ঞেস করি, কেমন আছেন আঙ্কেল? - তিনি প্রথমটায় আমাকে চিনতে পারেনি, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আমি তখন উনাকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম, "আরে আঙ্কেল, আপনার মনে নেই??? ২০০৮ সালের দিকে এই কেবিনেই একটা পিচ্চি ভর্তি ছিল, হার্টের পেশেন্ট। তার একটা ছোট্ট বোন ছিল, যার চুলের রঙ ছিল সাদা। আপনি সারাক্ষণ ওই মেয়েটাকে খেপিয়ে মারতেন, চুল সাদা ছিল বলে।" কথাটা শোনামাত্রই রহমত আঙ্কেলের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। তিনি উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'ওহ্ হ্যাঁ! আমার মনে পড়েছে, সেই ছেলেটা তার বোনকে কী যে ভালোবাসত! সারাক্ষণ শুধু বোনের গল্পই করত সে।'- আমি একটু ম্লান হেসে বললাম, "আঙ্কেল, সেই ছোট্ট মেয়েটা এখন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে।"
তিনি অবাক হয়ে আমাকে ওপর-নিচ দেখলেন। 'মাশাআল্লাহ্! এখন তো অনেক বড় হয়ে গেছো, কিন্তু তোমার চুল তো দেখছি এখন একদম কালো? আমি হাসলাম, 'আঙ্কেল, ওটা তখন শখ করে কালার করেছিলাম। এখন তো একদম ন্যাচারাল।'
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কেন হাসপাতালে এসেছি, আমি জানালাম বান্ধবীর বাবার কথা। কথা বলতে বলতে আমরা যখন করিডোর দিয়ে যাচ্ছি, দেখলাম ড. মোহাম্মদ রাব্বি সাহেবের রুমটা বেলুন আর রঙিন কাগজ দিয়ে সাজানো, যেন কোনো উৎসবের প্রস্তুতি চলছে। আমি কৌতূহল নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, "রুমটা এভাবে সাজানো কেন? রহমত আঙ্কেল মুচকি হেসে বললেন, 'কাল ডাক্তার সাহেবের ছেলের জন্মদিন, উনি প্রতি বছর এভাবে ঘর সাজান, কেক কাটেন, এমন কি আমাদের সবাইকে বিরিয়ানিও খাওয়ান। ডাক্তার সাহেব তার ছেলেকে জানের থেকেও বেশি ভালোবাসেন।'
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'ছেলে এখন কী করে? কোথায় থাকে? রহমত আঙ্কেল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, 'সেটা তো জানিনা মা, তবে লোকমুখে শুনেছিলাম ছেলেটা নাকি বিদেশের কোনো বড় কলেজে পড়াশোনা করে।' ইনায়া সরাসরি আফরিন সুলতানার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, "সেদিন বাড়ি ফিরে আমি তোমাকে হুট করে একটা প্রশ্ন করেছিলাম, মনে আছে আম্মু? আমি জানতে চেয়েছিলাম ভাইয়ার অপারেশন যে ডাক্তার করেছিলেন, তার ছেলের বয়স কত?"
আফরিন সুলতানা ভ্রু কুঁচকে একটু ভাবলেন, তার বললেন, 'হ্যাঁ, মনে আছে। আমি তো অবাক হয়েছিলাম তোর প্রশ্নে, কারণ আমি নার্সদের থেকে শুনেছি তার নিজের শারীরিক সমস্যার কারণে কোনোদিন বাবা হতে পারে নি তিনি, আর ওটা নিয়ে তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন, আর তার ডিভোর্স ও হয়েছিল আদিয়ানের অপারেশনের দিন।'
ইনায়া মাথা নাড়ল, "ঠিক তাই। ওটা শুনে আমি নিজে দ্বিধায় পড়ে যাই। যার কোনো সন্তান নেই, সে প্রতিবছর কার জন্মদিন পালন করে? ঘর সাজায়, বিরিয়ানি খাওয়ায়-পুরো ব্যাপারটা কি নিছক পাগলামি? নাকি উনি অন্য কারো বাচ্চা চুরি করেছে? কিন্তু হিসেবে মিলছিল না, যদি ছোট থাকতে চুরি করতেন, তবে ছেলেটা এখন হাই স্কুলে পড়ত। আর যদি বড় অবস্থায় কাউকে তুলে আনতেন, তবে সেই ছেলেটা এতদিন কেস করেনি কেন? পালিয়ে যায়নি কেন??
সেই চিন্তায় সারা রাত আমার চোখে ঘুম ছিল না। মনে মনে পুলিশ হওয়ার অনেক শখ ছিলো। ব্যাপারটা আমার কাছে রহস্য লেগেছিল অনেক। কোনো না কোনো ব্যাপার তো আছেই এর মধ্যে। পরদিন স্কুলে না গিয়ে হাসপাতালে চলে যাই, কিন্তু গিয়ে অবাক হলাম, ঘর সাজানো থাকলেও সেখানে কোনো ছেলে নেই। ড. রাব্বি নিজেই কেক কাটছেন, নার্স, কিছু লোক নিয়ে আনন্দ করছেন। কিছুক্ষণ পর আমি সুবার আত্মীয় সেজে ওনার রুমে ঢুকলাম কথা বলার বাহানায়। উনি তখন ওয়াসরুমে ছিলেন, আমি চট করে ওনার সারা ঘরটা দেখে নিলাম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে ছেলেকে উনি এত ভালোবাসেন বলে দাবি করেন, সেই ছেলের একটি ছবিও ওনার টেবিলে বা দেওয়ালে ছিল না।"
ইরা পাশে বসে নখ কামড়াচ্ছে, ইনায়া বলতে লাগল, "আমি পরে তার সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া চেক করি সেখানেও কোনো ছবি ছিল না। তখন আমি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলাম যে, একা একা থাকতে থাকতে আর ডিভোর্সের শোকে উনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, এই ছেলে বা জন্মদিন—সবই হয়তো কল্পনা। কিন্তু আমার ভুল ভাঙল সুবার বাবা যেদিন সুস্থ হলেন, সেদিন। আমি সেদিন সুবার বাবাকে দেখে কেবিন থেকে বের হচ্ছি, ঠিক তখনই দেখলাম ড. রাব্বি সেই কেবিনের সামনে দাঁড়ানো, তার এক হাতে বড় বাক্স, অন্য হাত দিয়ে ফোন বের করছিল। আমি ওনার সাথে কথা বলার জন্য পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম, উনি তখন ফোনের ওপাশে থাকা কাউকে বলছিলেন—'হ্যালো বাবা, ভালো আছো? কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো?'
ইনায়া একটু থামল, তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, "ওপাশ থেকে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, খুব পরিষ্কার এক যুবকের গলা। সে বলল, 'হ্যাঁ বাবা, আমি ভালো আছি। এখানে তেমন সমস্যা নেই। আর বাবা, আমি তোমাকে পরে ফোন দেব, এখন আমার পরীক্ষা শুরু হবে।'
ফোনটা কেটে গেল আর আমি সেখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।"
ড্রয়িংরুমের সবাই যেন পাথর হয়ে তার প্রতিটি শব্দ গিলে খাচ্ছে। ইনায়া আবার বলতে শুরু করে—
"ডক্টর রাব্বি ফোন রেখে হনহন করে করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ বাঁক নিতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা এক নার্সের সাথে ওনার জোরে ধাক্কা লাগে। হাতে থাকা বাক্স পড়ে যায়, অনেক জিনিসপত্র ছড়িয়ে পড়ে। ছোট একটা ব্রেসলেট দূরে ছিটকে পড়ে যা ডক্টর রাব্বি দেখতে পায় না। ডক্টর রাব্বি তাড়াহুড়ো করে বাক্সটা তুলে নিয়ে চলে গেলেন। কিন্তু ব্রেসলেটটা ওনার নজরে পড়ল না। আমি ব্রেসলেটটা তুলে ব্যাগে রেখে দেই। সন্ধ্যাবেলা বই বের করার সময় ওই ব্রেসলেটটা নিচে পড়ে। তুলে যখন ব্রেসলেটের দিকে তাকাই, আমার বুকের ভেতরটা যেন ধক করে উঠল। ব্রেসলেটের গায়ে খোদাই করে লেখা—'আদিয়ান'। মনে পড়ে গেল ২০০৮ সালের সেই কক্সবাজার ভ্রমণের কথা। আব্বু আমাদের দুই ভাই-বোনকে নিজেদের নাম খোদাই করা দুটো ব্রেসলেট বানিয়ে দিয়েছিলেন। আমারটা ড্রয়ারে যত্ন করে রাখা আছে আর ভাইয়াটা তার সঙ্গেই হারিয়ে গিয়েছিল বলে জানতাম। নিজেরটা বের করে মিলিয়ে দেখলাম—দুটোই পুরো হুবহু একই রকম। আমি কিছুটা অবাক হলেও এই ব্যাপারটা তখন এক সাইডে রেখে ড. রাব্বির ব্যাপারে তথ্য বের করতে শুরু করি। আমার তখন এমন কাউকে দরকার ছিল যে আইনের ভেতর থেকে গভীরে গিয়ে তদন্ত করতে পারবে। ওই সময়টা আম্মু তখন কোর্টের মামলা নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত আর আব্বু ব্যবসার চাপে দিশেহারা। নিজেই সবটা বের করার সিদ্ধান্ত নেই। সুবার ভাই পুলিশ অফিসার। আমি ওনার সাথে আলাদাভাবে দেখা করলাম। রাকিব সাহেব আমার সব কথা শুনলেন। কিন্তু শোনা শেষ করে উনি একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "দেখো খুকি, তোমার নিছক সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে আমি একজন নামকরা ডাক্তারকে অ্যারেস্ট করতে পারি না। কোনো এভিডেন্স ছাড়া কাউকে হ্যারাস করা পুলিশের কাজ নয়।"
উনি চলে যেতে শুরু করতেই আমি প্রায় চিৎকার করে উনাকে থামালাম। বললাম, স্যার, আমি নিশ্চিত উনি কাউকে আটকে রেখেছেন, নয়তো কারো বাচ্চা চুরি করেছে! ওনার ফিজিক্যাল সমস্যার কারণে কোনো সন্তান হয় না, যে জন্য ওনার স্ত্রী উনাকে ডিভোর্স দিয়েছেন। সেই মানুষের যদি সন্তানই না থাকে, তবে এই কলেজে পড়া ছেলেটা কোত্থেকে এল? আকাশ থেকে পড়েছে? নাকি তিনি ইললিগ্যাল কিছু করছেন?
আমার যুক্তিগুলো ওনার মনে ধরল। রাকিব সাহেব থেমে বললেন, ঠিক আছে, আমি আগে তোমার কথাগুলোর সত্যতা যাচাই করব। যদি দেখি তুমি যা বলেছ তা সত্যি, তবেই আমি ইনভেস্টিগেশন শুরু করব। কিন্তু মনে রেখো ইনায়া, যদি তোমার দেওয়া ইনফরমেশন মিথ্যে হয়, তবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার দায়ে তোমাকে আমি দুই দিন জেলে আটকে রাখব। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলি, "ঠিক আছে স্যার, আমি রাজি।"
ইনায়া একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল, "দুই দিন পর অফিসার রাকিব আমার সাথে দেখা করলেন। ওনার চোখমুখে তখন অন্যরকম এক গাম্ভীর্য। তিনি জানালেন, ড. রাব্বির মেডিকেল হিস্ট্রি চেক করে সে নিশ্চিত হয়েছেন যে ওনার শারীরিক সমস্যার কারণেই কোনো সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ড. রাব্বি কার বাচ্চা চুরি করেছেন, সেই রহস্যের জট তখনও খোলেনি।
সেদিন বিকেলে আবার রহমত আঙ্কেলের সাথে দেখা করি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ডা. রাব্বির বর্তমান আর অতীতের আচার-ব্যবহার কেমন?
তিনি জানালেন; বর্তমানে উনি সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করে, অনেক হাসিখুশি থাকে, বাচ্চাদের ভীষণ ভালোবাসে, ঠিকমতো হাসপাতালেও আসে। তবে যখন তার ডিভোর্স হয়েছিল তখন ওনারে অনেক কান্না করতে দেখেছি। তার বউ যেদিন ডিভোর্স লেটার পাঠায়, ডাক্তার সাহেব সাথে সাথে তার বউকে কল দেয়। তার বউয়ের যে দেমাগ! ডাক্তার সাহেব তো ভালো মানুষ দেইখা কিছু কয় নাই, তার বউ তাকে কী বলে জানো, ' তোর সমস্যা থাকলে বিয়া করছো কেন? তোর তো টাকা পয়সাও নাই, ওই একটু ডাক্তারি করে দুই-পয়সা ইনকাম করো, তাতে বাসা ভাড়া আর বাজার করতেই শেষ, আরো অনেক কিছু বলছিল। ফোন কাটার পর ডাক্তার সাহেব অনেক কান্না করছিল। আমারে দেইখা জিগায়, চাচা, আমি অনেক টাকা ইনকাম করব কীভাবে? আমি কইলাম, স্যার আমি তো শুধু এখানে ঝাড়ু-পোছা করি, আমি কেমনে কমু, স্যার আপনি তো মেলা টাকা ইনকাম করেন।সাহেব চোখ মুছে বলল, 'আমার অনেক টাকার দরকার, অনেক টাকা। কিছুক্ষণ মনে মনে হিসেবনিকেশ করল। তখন তোমার ভাইয়ের অপারেশনের টাইম হওয়াতে তিনি চলে যায়। সেদিন অপারেশন শেষ করে ড. রাব্বি দশ দিনের ছুটি নিয়ে চলে যায়। আবার ১০ দিন পর ফিরে আসল। সাহেব ভীষণ হাসি খুশি ছিলেন। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত তাকে মন খারাপ করতে দেখি নি। আমি তার সমস্ত কথা রেকর্ড করে, বাসায় এসে প্রতিটা তথ্য নোট করলাম। দুই দিন পর রাকিব সাহেব দেখা করে জানায়, তিনি নাকি বিশেষ কিছুই খুঁজে পায়নি। তখন আমার মেজাজ সম্পূণ গেল। মনে মনে হাজারটা গালি দিলাম—'শালা, তোকে অফিসার বানিয়েছে কে? হাঁটু সমান বুদ্ধি নিয়ে আসছিস কেস সলভ করতে। আমি রাগে চোখ সরু করে রাকিব সাহেবের দিকে তাকাতেই, আমার চাহনি দেখে রাকিব কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে সিটে নড়েচড়ে বসলেন। আমতা আমতা করে বললেন, 'দেখো ইনায়া, তুমি বলেছিলে কাউকে না জানিয়ে পারসোনালি হ্যান্ডেল করতে, তাই একা সব করতে গিয়ে একটু সময় লাগছে। একা তো সব কুলিয়ে ওঠা যাচ্ছে না।' আমি আমার কাছে থাকা প্রমাণ দেখিয়ে বললাম —' শুনুন, ২০০৮ সালের ৮ই অক্টোবর রাতে ড. রাব্বি কার কার সাথে কথা বলেছে, তার সমস্ত ডিটেইলস আমার চাই। আর ওই রাতের হাসপাতালের ইন-আউটের গেট থেকে শুরু করে সব জায়গার সিসিটিভি ফুটেজ আমার চাই। ড. রাব্বির সমস্ত ব্যাংক একাউন্টের লেনদেনের ডিটেইলস চাই। সব মানে সব।
রাকিব সত্যি সত্যি থমকে যায়। সেদিন রাতের মধ্যেই রাকিব সমস্ত তথ্য আর ফুটেজ আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ল্যাপটপ নিয়ে বসে পড়ি। হাজার হাজার সেকেন্ডের ফুটেজ, অফুরন্ত কললিস্ট— সব একা তাকে স্ক্রিনিং করতে হবে। ফুটেজ দেখতে দেখতে লক্ষ্য করলাম—সেদিন রাতে সব ঠিক থাকলেও অদ্ভুতভাবে ভাইয়ের অপারেশন থিয়েটারের বাইরের ফুটেজটুকু ডিলিট করা। সাথে সাথে সেই ফুটেজ রিকভার করতে বসলাম। কয়েক ঘণ্টা পর রিকভার করা ফুটেজ স্ক্রিনে ভেসে উঠল, তা দেখার সাথে সাথে আমার পায়ের তলার মাটি সরে যায়। ইনায়া তার ল্যাপটপটা সবার সামনে ঘুরিয়ে ধরল। একটা ভিডিও চলতে শুরু করল। ড্রয়িংরুমের সবাই স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়ল। ফুটেজে দেখা যাচ্ছে;
ড. রাব্বি অপারেশন ঠিক মতোই করেছেন। ভাইয়া তখনও বেঁচে ছিল, শেষ মুহূর্তে তিনি এমন একটা ইনজেকশন দিলেন, যার প্রভাবে কিছুক্ষণের জন্য মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তোমাদের সামনে এসে মৃত ঘোষণা করার পর যখন কেবিনে শিফট করার কথা বলে বডি নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, মাঝপথে তিনি বডি চেঞ্জ করে দেয়। যে রুমে নকল ডেডবডি রাখা ছিল, কিছুক্ষণ পর সেখানে একটা বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ইচ্ছে করে, বডিটা এমনভাবে নষ্ট হয়ে যায় যে তোমাদের পক্ষে আর চেনা সম্ভব ছিল না ওটা আদিয়ান কি-না।"
আফরিন সুলতানার চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় পানি পড়ছে। আনিসুর রহমান স্তব্ধ হয়ে ভিডিওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইরা অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল, "তারপর কী হলো আপু??"
ইনায়া বলতে লাগল : "আমি ডক্টর রাব্বির সেই ১০ দিনের ছুটির প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব বের করলাম, সেই সময়ে তিনি বারবার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজমল শাহ'র বাসায় গিয়েছিলেন, আমি যখন ড. রাব্বির ব্যাংক ডিটেইলস চেক করে আমার চোখ কপালে উঠল, ড. রাব্বি আজমল শাহকে বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন, তখন মাথায় আসেনি একজন সামান্য ডাক্তার এত টাকা পেলেন কোথায় আর কেনই বা মন্ত্রীকে দিচ্ছেন! কিন্তু পরে বুঝলাম, ভাইয়াকে দেশ থেকে গোপনে পাচার করতে ওই প্রভাবশালী হাতটার দরকার ছিল। আমি ড. রাব্বির কল ডিটেইলস চেক করে দেখি একটা নম্বরে অনেক কল দিয়েছে, লোকেশন বের করে দেখি সেটা চায়নার সাংহাই সিটির একটা বিল্ডিং, সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই, বাসায় বলেছিলাম স্কুল থেকে স্টাডি ট্যুরে যাব, তোমরা পারমিশনও দিয়ে দিলে, আগে থেকে পাসপোর্ট থাকায় তেমন সমস্যা হলো না। পরদিনই লোকেশন ট্র্যাক করে চায়নার সেই বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়ায়, ফ্লাইট বিকেলে থাকায় সেখানে যেতে যেতে কিছুটা সন্ধ্যা ছাড়িয়ে রাত হয়, সামনে আবছা অবস্থায় একজন ব্যক্তিকে দেখলাম, আমার দিকে হেঁটে আসতে, আমি আমার নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আদিয়ানকে দীর্ঘ ১২ বছর পর দেখে আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ভাইয়া আমার পাশ কাটিয়ে চলে যায়, এমনভাবে চলে যায় যেন সে আমাকে চিনতেই পারছে না, আমার কিছুটা সন্দেহজনক মনে হলো, আমি ওর পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলাম আর অঝোরে কাঁদতে লাগলাম, আমার কান্না দেখে ভাইয়া থমকে দাঁড়াল, আমাকে জিজ্ঞেস করে, 'আপনি কাঁদছেন কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?'
আমি তখন অভিনয়ের আশ্রয় নিলাম, ডুকরে কেঁদে উঠে বললাম, "আমার ছোট ভাইটার হার্টের সমস্যা, আমার পরিবার ভীষণ গরিব, ডাক্তার দেখানো তো দূরে থাক, ওষুধ কেনার টাকাও নেই, কিছু টাকা জোগাড় করেছিলাম তা চুরি হয়ে গেছে।
ও মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, ওর চোখে দয়া ফুটে উঠল, ও বলল, 'আমারও তো হার্টের সমস্যা, আমি ওষুধ কেনার জন্যই বের হয়েছিলাম, চলো তোমাকেও কিনে দেব।' ওর সাথে যাই, আমাকেও ওষুধ কিনে দেয়, তবে খেয়াল করে দেখলাম প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ১টা ওষুধ বেশি ছিল, আমি সেখান থেকে একটা ক্যাপসুল গোপনে নিয়ে নিলাম, আমি সব ওষুধগুলো ল্যাব টেস্ট করতে পাঠাই, রাত ১১:৩৪ মিনিটে রিপোর্ট চলে আসে, রিপোর্ট নরমাল, ঐগুলা হার্টের ওষুধই, আমি হতাশ হলাম, ভাবলাম যদি ওষুধে সমস্যা না থাকে, তবে ভাইয়া আমাকে ভুলে গেল কীভাবে? এরপর ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ে ওষুধের দিকে। আদিয়ান এর দেওয়া সব ওষুধ ট্যাবলেট হলেও যেটা আমি গোপনে এনেছি ঐটা ছিল ক্যাপসুল। আমি আবার সেটা ল্যাব টেস্টে পাঠাই, কয়েক ঘণ্টা পর, ডাক্তার নিজে আমাকে ফোন করলেন, ওনার গলায় ছিল বিস্ময়, "ম্যাডাম, আপনার সন্দেহই ঠিক ছিল, এই ক্যাপসুলের ওপরের অংশ আর প্যাকেটটা ভিটামিনের হলেও ভেতরের আসল উপাদানটা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এক ধরনের নিউরো-ব্লকার ড্রাগ, এই ওষুধ নিয়মিত খেলে মানুষের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশ ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়, যার ফলে মানুষ তার অতীত স্মৃতি পুরোপুরি ভুলে যায়। ডক্টরকে জিজ্ঞেস করলাম, যদি খাওয়া বন্ধ করে দেয় তাহলে? ডক্টর বলল, 'এটা খুবই অল্প পরিমাণে দেওয়া হয়েছিল, যদি বন্ধ করে তাহলে আগের স্মৃতি মনে পড়বে, তবে একটু সময় লাগবে, হতে পারে ১০ দিন, ২০ দিন অথবা ৩০ দিনও লাগতে পারে, এটা ওর ব্রেইন এর উপর নির্ভর করে।'
সেদিন আমার কাছে সব কিছু জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল, ডক্টর রাব্বি কেবল ভাইয়াকে চুরি করেননি, তিনি সুপরিকল্পিতভাবে ড্রাগ খাইয়ে আদিয়ানের মস্তিষ্ক থেকে আমাদের সবার স্মৃতি মুছে দিয়েছেন। ইনায়ার এই কথা শুনে আফরিন সুলতানার হাত কাঁপছে, আনিসুর রহমান যন্ত্রনায় চোখ বন্ধ করে ফেললেন, ইরা কান্নায় ভেঙে পড়ল, সে জানত না তার অদেখা বড় ভাইটির ওপর দিয়ে এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে।
ইনায়া সবাইকে থামিয়ে বলতে লাগল,
"পরদিন যখন আদিয়ানের সাথে দেখা হয়, রিপোর্টটা ওর হাতে দিয়ে সব সত্যিটা এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললাম। ও প্রথমে পাথর হয়ে গিয়েছিল, কিছুই বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও বলছিল, "ডক্টর রাব্বি আমার বাবা, তিনি কেন আমার ক্ষতি করবেন? আমি সত্যটা লুকিয়ে রিকুয়েস্ট করলাম, "শুধু এক মাসের জন্য ওই নীল ক্যাপসুলগুলো খাওয়া বন্ধ রাখো, যদি এক মাস পর তোমার মনে হয় আমি মিথ্যে বলছি, তবে আমি আর কোনোদিনও তোমার সামনে আসব না।" ভাইয়াকে অনেকক্ষণ বোঝানোর পর শেষমেশ রাজি হলো, আমি নিজের নম্বরটা ওর ফোনে সেভ করে দিয়ে বুকভরা আশা নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এলাম। দিনগুলো কাটছিল উৎকণ্ঠায়, ১৯-২০ দিন পর হঠাৎ মাঝরাতে একটা বিদেশী নম্বর থেকে কল এল। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুধু একটা শব্দ ভেসে এল 'ইনায়া'। ওই এক শব্দেই তাকে বুঝতে পারি ভাইয়ার সব মনে পড়ে গেছে, দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর তাকে বলি ফুল বডি চেকআপ করাতে, কারণ ওই ড্রাগের প্রভাবে শরীরে যদি কোনো ক্ষতি হয়। কার্ডিওলজিস্টের কাছে ফুল বডি চেকআপ করায়, রিপোর্ট আসার পর আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল, এমনিতেই ওর হার্টে আগে থেকেই জটিলতা ছিল, তার ওপর ওই বিষাক্ত ড্রাগগুলো ওর শরীরের ভেতরটা ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল। ডাক্তার জানালেন, কয়েক মাসের মধ্যেই ওর আবারও একটা হার্ট অপারেশন করতে হবে, এই ধর ৪/৫ মাস।
আমি তখন দিশেহারা, একা একা মেয়ে এত টাকা কোথায় পাব? তখনই আমার মাথায় এল বিয়ের সেই গয়নাগুলোর কথা। আম্মু, তুমি আমার বিয়ের জন্য যে গয়নাগুলো দিয়েছিলে ব্যাংকের লকারে রাখার জন্য, আমি সেগুলো বিক্রি করে অনেক বড় একটা অ্যামাউন্ট জোগাড় করি। ইনায়া থামল, আফরিন সুলতানা অস্ফুট স্বরে বললেন, 'তুই একাই এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিস? আমাদের একটিবারও জানানিলি না? ইনায়া স্বাভাবিকভাবে বলে, 'আম্মু, আমি দেখতাম তুমি প্রায় প্রতি রাতে ভাইয়ের জন্য চুপিচুপি কাঁদতে। আমি যদি তখন তোমাদের আশা দিতাম আর অপারেশনে যদি উলটাপাল্টা কিছু হয়ে যেত, তবে সেই শোক সামলানোর শক্তি আমার ছিল না। তাই ভেবেছিলাম ভাইয়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফিরলে তবেই সব জানাব।" একটু কাঁদো কাঁদো গলায় যোগ করল, "কিন্তু মাঝখান থেকে আমার এতগুলো সোনার গয়না হাতছাড়া হয়ে গেল!"
আদিয়ান এতক্ষণ বোনকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখছিল। ইনায়ার শেষ কথাটি শুনে ঠোঁট চিপে হাসল আর বলল, "আচ্ছা, আমি এর থেকে দ্বিগুণ গয়না বানিয়ে দেব।"
ইনায়া আবার বলতে শুরু করল, "ভাইয়ার অপারেশনের তখনও চার-পাঁচ মাস বাকি। হাতে এতগুলো টাকা—সব অলস ফেলে রাখব? ব্যাংকে রাখলে তো সামান্য কিছু লাভ আসবে। ভাবলাম, যদি একটা বিজনেস স্টার্ট করি তবে তো টাকা আর টাকা। তখন আব্বু কীভাবে বিজনেস করে, লাভ ক্ষতির হিসাব কীভাবে মেলায়—সেসব আগে থেকে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করলাম। আব্বুর অজান্তেই ওনার আইডিয়াগুলো নিয়ে নিজের বিজনেসের ব্লু-প্রিন্ট সাজিয়ে ফেললাম।"
সবার চোখ তখন ইনায়ার ওপর স্থির। সে বলে চলল,
"সেই গয়না বিক্রির টাকা দিয়ে চায়নাতেই একটা ব্যবসা শুরু করি। প্রথম দুই মাস বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু তৃতীয় মাসে এসে বিশাল এক ধাক্কা খেলাম। প্রজেক্টে বড় লস! আমি তখন দিশেহারা, ভাবছিলাম এই ব্যবসা বন্ধ করে দেব। তবে সেই মুহূর্তে 'কিয়ান গ্রুপ' আমাদের বিজনেসে ইনভেস্ট করতে চাইল। আমি ভীষণ অবাক হলাম, এত বড় কোম্পানি কেন আমাদের ব্যবসাতে ইনভেস্ট করবে?? তবে ওই সময় ওইসব চিন্তা বাদ দিয়ে রাজি হয়ে গেলাম।" ইনায়া বলতে বলতে নিজের কথাতেই যেন নিজে থমকে গেল, "ওয়েট...... ওয়েট.... কিয়ান তো আরিয়াসের ডাকনাম!
পিছন থেকে একটি শান্ত কণ্ঠ ভেসে এল—"হ্যাঁ, ওটা আরিয়াসেরই কোম্পানি।"
সবাই ঘুরে তাকাল। শামীমা বেগম আর ইভান অনেক আগেই এ বাড়িতে এসেছে আনিসুর রহমানকে দেখতে। এতক্ষণ তারা দাঁড়িয়ে ইনায়ার সব কথা শুনছিলেন। এবার তাঁরা সামনে এসে ড্রয়িংরুমে বসলেন।
ইনায়া অবাক তাকিয়ে থেকে আবার বলতে শুরু করে, "সেই ইনভেস্টমেন্টের পর আমার বিজনেস শুধু রিকভারিই করল না, পরের মাসেই ডাবল লাভ নিয়ে এল। আস্তে আস্তে "In Group" চায়নাতে নামকরা হতে শুরু করল।" আনিসুর রহমান এবার বিস্ময়ভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, "কী গ্রুপ বললি? ইন গ্রুপ? আরে কয়েকমাস আগেই তো ওই কোম্পানির সাথেই আমার পার্টনারশিপ ডিল সাইন হয়েছে।"
ইনায়া কিছুটা লজ্জায় মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, "আসলে ওটা আমারই কোম্পানি ছিল বাবা।"
আনিসুর রহমান স্তম্ভিত হয়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। যে মেয়েকে তিনি সারা জীবন কেবল আল্লাদী বলে জানতেন, সে আড়ালে থেকে এত বড় এক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে এবং খোদ নিজের বাবার সাথেই ব্যবসায়িক টেক্কা দিয়েছে—এটা বিশ্বাস করতে তাঁর কিছুটা সময় লাগছে।
ইরা কৌতূহলে ছটফট করতে করতে বাবার হাত চেপে ধরল, "আরো থামো তো বাবা! আপু তুমি বল...... তারপর কী হলো?
ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলা শুরু করল,
"৬ মাসের মধ্যে আমার সেই গয়না বিক্রির টাকার তিন গুণ বেশি প্রফিট চলে আসে। ভাইয়ার অপারেশন হলো এবং সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে অপারেশনটা সাকসেসফুল হয়। কয়েক মাসের মধ্যেই ভাইয়া পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠল। কিন্তু আমার জন্য তখন জীবনটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এক বিশাল যুদ্ধক্ষেত্র, একদিকে আমার পড়াশোনা, অন্যদিকে সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারে বিজনেসের পাশাপাশি ভাইয়ের দেখাশোনা। ভাইয়া যখন পুরোপুরি সুস্থ হলো, তখন তাকে বিজনেসের কথা জানাই। ও প্রথমে খুব বকা দিয়েছিল—একা মেয়ে হয়ে এত বড় ঝুঁকি নেওয়ার জন্য। কিন্তু তখন তো কোম্পানি অলরেডি অনেক বড় হয়ে গেছে। এরপর আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট আর ভাইয়া মিলে বিজনেস দেখতে শুরু করল। ওখানেই ভাইয়া নিজের L.L.B আর L.L.M. শেষ করল। এরপর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে লেকচারারের জব নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসে। ভাইয়া বাংলাদেশে আসার পর কথা জানতে পেরে ড. রাব্বি পাগলের মতো খোঁজ নিতে শুরু করেন। তিনি হন্যে হয়ে খুঁজছিলেন সেই ব্যক্তিকে। যখন তিনি জানতে পারলেন এই সবকিছুর পেছনে আমি আছি, তখন তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। সেদিন আমার ওপর যে অ্যাটাকটা হয়েছিল, ওটা ওনারই প্ল্যান ছিল। ভাগ্যক্রমে আমি সেদিন বেঁচে যাই।
আনিসুর রহমান আর আফরিন সুলতানার মাথায় এতক্ষণে পুরো ছবিটা পরিষ্কার হলো। তাঁরা এবার বুঝতে পারেন, ড. রাব্বি কেন ইনায়াকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
"ড. রাব্বি ধরা না পড়া পর্যন্ত আমি ভাইয়াকে তোমাদের সামনে আনতে চাইনি। আমার ভয় ছিল, ড. রাব্বি যদি ভাইয়ার কোনো ক্ষতি করে ফেলে। যখন খবর পেলাম ডক্টর রাব্বি মারা গেছেন, সাথে সাথেই তোমাদের সাথে দেখা করাতে নিয়ে আসলাম।
আদিয়ান সব চোখের কোণে জল, মনে মনে বলল; যে বোনটি ছোটবেলায় ভাইয়ার হাতের আঙুল ধরে হাঁটত, আজ সেই বোনটিই তাকে যমদূতের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে তার মা-বাবার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে।
ইনায়ার কণ্ঠস্বর এবার পুনরায় কঠিন হয়ে এল। সে বলতে লাগল:
"ড. রাব্বি তার স্ত্রীকে অন্ধের মতো ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসা যখন অপমানে রূপ নিল, তখন তিনি নিজের পৌরুষ আর সম্মান পুনরুদ্ধারের আশায় তিনি এমন এক জঘন্য পথ বেছে নিলেন যা কোনো সুস্থ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। প্রথমে তিনি আমাদের বুক থেকে ভাইকে ছিনিয়ে নিলেন, তারপর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজমল শাহ'র ক্ষমতার অপব্যবহার করে ভাইয়ার অতীতের সমস্ত রেকর্ড ডাটাবেস থেকে মুছে ফেললেন, ভাইয়াকে নিজের ছেলে হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং তাকে সুদূর চায়না পাঠিয়ে দিলেন—যাতে কেউ কোনোদিন হদিস না পায়। আর এই সমস্ত কিছু ড. রাব্বি করেছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাহায্য নিয়ে। কিন্তু এই বিশাল রাজকীয় জীবন আর মন্ত্রীকে দেওয়ার মতো টাকা আসছিল কোত্থেকে? তদন্তে যা বেরিয়ে এল তা শুনলে কারওরই শরীর ঠিক থাকবে না। ড. রাব্বি মৃত মানুষের পবিত্রতা নষ্ট করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। তিনি অপারেশন থিয়েটারে আসা মৃত ব্যক্তিদের শরীর থেকে কিডনি, চোখ, লিভার—যা কিছু চড়া দামে বিক্রি করা যায়, তা পরিবারের অনুমতি ছাড়াই গোপনে বের করে নিতেন। সেই অঙ্গগুলো ইললিগ্যাল পথে বিদেশে পাচার করে তিনি কোটি কোটি টাকা ইনকাম করতে শুরু করেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক সাদা কোট পরা কসাই।'
ইরা ভয়ে বাবার হাত শক্ত করে চেপে ধরল। আফরিন সুলতানা স্তম্ভিত হয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকালেন, যে কিনা এই নরপিশাচের দেওয়া ওষুধ খেয়ে তাকেই বাবা মেনে এতদিন দূরে ছিল।
ইনায়া বলে চলল, "অফিসার রাকিব তখন সব জানলেও তাকে অ্যারেস্ট করেননি, কারণ ড. রাব্বিকে সব দিক দিয়ে ধরা হলে বা বিপদে পড়লে সরাসরি আদিয়ানের ওপর আঘাত আসতে পারে। ভাইয়ের জীবনের নিরাপত্তার খাতিতেই আমাদের এতদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে।"
ইনায়া একটু থেমে, দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, "ইনায়া বেঁচে থাকতে তার ভাইয়ের এক চুল পরিমাণ ক্ষতি করবে—সেটা অসম্ভব!"
ইনায়ার এই জেদ মাখা কথাগুলো শুনে আদিয়ানের ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটে উঠল।
হঠাৎ কলিং বেলের তীক্ষ্ণ শব্দে পুরো বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন ড. মাইনুল খান, যার হাতে থাকা খামটির ওপর ফুলে আছে একটি পরিবারের দীর্ঘ বছরের প্রতীক্ষা আর দীর্ঘশ্বাস। আফরিন সুলতানা দ্রুত পায়ে তার সামনে গিয়ে রিপোর্ট নিয়ে দেখে ৯৯.৯৯% মিল। আদিয়ান তাদের ছেলে।
মুহূর্তেই পুরো বাড়িতে যেন খুশির জোয়ার বয়ে গেল। এতদিন পর নিজের ছেলেকে ফিরে পেয়ে আফরিন সুলতানা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেলেন। বাড়ির প্রতিটি কোণ আজ হাসি আর আনন্দের কান্নায় মুখরিত। ইনায়া সোফার এক কোণে বসে তার মা আর বাবাকে দেখছিল। কত বছর পর আজ মাকে এভাবে প্রাণখুলে হাসতে দেখল সে! মা বাবার এই অকৃত্রিম হাসিমুখানি দেখার জন্যই তো সে এতদিন ধরে নীরবে এতটা ত্যাগ স্বীকার করেছে, একা একা হেঁটেছে। ইনায়ার মনে মনে শুধু একটাই শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল— "অবশেষে...!"
ইরা আজ ভীষণ খুশি, কারণ আজ থেকে তার বড় ভাইও আছে। আদিয়ানকে ঘিরে সবাই আড্ডা দিতে বসে পড়ল। ইনায়া আর আফরিন সুলতানা রান্নার কাজে ব্যস্ত। আফরিন সুলতানা রান্নাঘরে থাকলেও ইনায়া তাকে কোনো কাজ করতে দিচ্ছে না। একাই আদিয়ানের পছন্দের খাবার রান্না করছে।
অ্যারিস নিজের বাসায় ফিরে যখন কাউকে পেল না, তখন তার বুঝতে এক মুহূর্তও দেরি হলো না যে সবাই ইনায়াদের ওখানে ডেরা গেড়েছে। নিজে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে সে কালো রঙের ট্রাউজার আর সাদা একটা শার্ট পরে বেরিয়ে পড়ল। ইনায়াদের ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই অ্যারিস দেখল সবাই আদিয়ানকে নিয়ে মেতে আছে। ইনায়াকে দেখতে না পেয়ে, এদিক ওদিক তাকাতেই রান্নাঘরে দেখলো। আগুনের তাপে ইনায়ার মুখটা লাল হয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। অ্যারিসের মেজাজ সপ্তম চড়ে গেল। সে গিয়ে ইনায়াকে রান্নাঘর থেকে টেনে বের করল। "তোমাকে রান্না করতে বলেছে কে?" আরিয়াসের কণ্ঠে বজ্রকঠিন ধমক।
ইনায়া কিছু বলতে যাওয়ার আগেই আরিয়াস ঘুরে আফরিন সুলতানার দিকে তাকাল। কিছুটা কড়া সুরেই বলল, "শাশুড়ি মা, আপনি কি ইনায়াকে দিয়ে রান্না করানোর জন্য এখানে এনেছেন? আপনার কাছে এটা একদমই আশা করিনি।"
আফরিন সুলতানা চোখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে নিল, "আমি আবার কী করলাম? আমি তো এসেছিলাম রান্না করতে, তোমার বউ আমাকে সরিয়ে নিজেই রান্না করছে।"
ইনায়া মিনমিন করে বলে, "আর একটা রান্নাই বাকি আছে। ওটা শেষ করি প্লিজ।
অ্যারিস ইনায়ার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল, তারপর শার্টের হাতা গুটিয়ে গম্ভীর্যের সাথে বলল, "একদম না। সরে দাঁড়াও। কী করতে হবে বলো, আমি করে দিচ্ছি।" ইনায়া ভীষণ অবাক হলেও অ্যারিসকে সব বলে বলেও দেয়। বাকি রান্নাটা অ্যারিসই শেষ করল। খাবার টেবিলে ধোঁয়া ওঠা গরম সব পদ সাজানো হলো, সবাই এসে খেতে বসল। সবাই খেতে খেতে বলল, ভীষণ মজার হয়েছে।
হাসি-ঠাট্টার মাঝে আফরিন সুলতানা গ্লাসে পানি নিতে নিতে বললেন, "আচ্ছা, এই আজমল শাহ নামটা কেমন যেন চেনা চেনা লাগছে ভীষণ।"
ইনায়া খেতে খেতে নির্লিপ্ত গলায় বলল, "চিনবে না কেন মা? আশরাফ শাহ-র বাবা তিনি, বাবা ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আর ছেলে এখন আইনমন্ত্রী। পুরো পরিবারই তো ক্ষমতার দাপটে অন্ধ।"
আফরিন সুলতানা কর্কশ কণ্ঠে বলে উঠলেন, "শালা, দুইটাই চোর! ওপর দিয়ে ফিটফাট আর ভেতর দিয়ে সব দুর্নীতির আখড়া।"
অ্যারিস বলে উঠল, "শাশুড়ি মা, দুইটা না—হবে তিনটা। আশরাফ শাহ-র গুনধর ছেলে ইষান শাহ আবার আমার বউয়ের দিকে নজর দেয়। সারাক্ষণ ছায়ার মতো পিছু লাগে।"
ইনায়া উল্টো দিকে ঘুরে হাসতে লাগল। আরিয়াস এবার সত্যিই একটু রেগে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমার মাঝে মধ্যে মন চায় ওরে একদম জ্যান্ত পুঁতে ফেলি। কিন্তু...... কিন্তু...... কিন্তু...... যেদিন ও জানতে পারবে ইনায়ার হাজব্যান্ড আছে, এমনকি বাচ্চাও আছে—সেদিন ওর মুখটা দেখার মতো হবে। ইশশশশ, ভাবলেই শান্তি লাগছে।"
আরিয়াসের এই 'জেলস' মাখা কথা শুনে পুরো ডাইনিং টেবিল হাসিতে ফেটে পড়ল। আদিয়ান নিজের হাসিকে কোনো মতে চেপে রেখে, আরিয়াসের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, "ব্রাদার-ইন-ল, তুমি তো দেখি সেই লেভেলের জেলস পারসন! ওই ছেলে যে এখনো তোমার হাত থেকে বেঁচে আছে, ওটাই তো ওর সাত জন্মের ভাগ্য। তোমার যা মেজাজ, ওর তো অনেক আগেই ভ্যানিশ হওয়ার কথা ছিল।"
আদিয়ানের কথায় সবাই আরেক দফা অট্টহাসিতে মেতে উঠল।
পর্ব 12
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 12 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান