দেখতে দেখতে সিয়ামের মাস শেষ হলো। আকাশে শাওয়ালের একফালি চাঁদ উঁকি দিতেই চারদিকে আনন্দের রোশনাই ছড়িয়ে পড়ল। চলে এল পবিত্র ঈদুল ফিতর।
ঈদের সকাল। বাইরের আকাশে মিষ্টি রোদ। অ্যারিস খুব ভোরে গোসল সেরে সাদা রঙের একটি কাজ করা পাঞ্জাবি পরে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে চুলগুলো ঠিক করে নিচ্ছিল, ইনায়া তখনো বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে ছিল। সে একদৃষ্টিতে তার সুপুরুষ স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল।
ইনায়া দুষ্টুমি করে বলে উঠল, "ওয়াও! কী সুন্দর একটা ছেলে। আচ্ছা মিস্টার, আপনার কি কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে?" —
অ্যারিস আয়নায় প্রতিফলনে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। "না, আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই, তবে একটা সুন্দরী বউ আছে। আর সেই সুন্দর বউটা এখন প্রেগন্যান্ট।"
ইনায়া খিলখিল করে হেসে উঠল। অ্যারিস এগিয়ে এসে ইনায়ার কপালে গভীর করে একটি ভালোবাসার চুমু এঁকে দিল। ঘড়ির কাঁটা বলছে ঈদের নামাজের সময় হয়ে এসেছে। অ্যারিস তৈরি হয়ে নিচে নেমে এল। বাড়ির সামনে ইভান,জিয়ান ফেং, আনিসুর রহমান আর আদিয়ান অপেক্ষা করছিল। সবার পরনে নতুন পাঞ্জাবি, মুখে ঈদের হাসি। অ্যারিস সবার সাথে কোলাকুলি শেষ করে নামাজের জন্য মসজিদের দিকে রওনা হলো।
নামাজ শেষে অ্যারিস ড্রইংরুমে পা রাখতেই দেখল— দুই মক্কেল একদম তৈরি! ইভান আর ইরা একদম হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখমুখে একটাই দাবি— 'সালামি'।
অ্যারিস মুচকি হেসে পকেট থেকে কড়কড়ে 100 টাকার একটা বান্ডিল বের করে ইরার হাতে ধরিয়ে দিল। ইরা তো খুশিতে আটখানা। সে টাকাগুলো হাতে নিয়ে নাচতে নাচতে আদিয়ানের কাছে ছুটল আরও সালামি আদায় করতে।
ইরা যেতেই ইভান হাত বের করে হাসল, "ভাইয়া, এবার আমারটা?"
অ্যারিস খুব গম্ভীর মুখে পকেটে হাত ঢোকাল। তারপর অতি সাবধানে মাত্র এক টাকার একটা কয়েন বের করে ইভানের হাতের তালুতে রাখল। ইভান তো থ! সে একবার হাতের ওই জং ধরা এক টাকার কয়েনটার দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার অ্যারিসের দিকে তাকাচ্ছে। তার চোখ চড়কগাছ।
"ভাইয়া! সিরিয়াসলি? এক টাকা?" ইভানের গলায় আকাশ ভেঙে পড়ার শব্দ।
অ্যারিস ভ্রু কুঁচকে নির্বিকার গলায় বলল, "তোকে তো ঠিক ভিক্ষুকের মতোই দরজায় হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম, তাই এক টাকাই দিলাম। বেশি আশা করিস না!"
সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে থাকা ইনায়া এতক্ষণ দৃশ্যটা উপভোগ করছিল। অ্যারিসের কথা শুনে জোরে হেসে উঠল।
ইভান এবার মুখটা বাংলা পাঁচের মতো করে ইনায়ার দিকে ফিরল। "ভাবী, তুমিই আমার শেষ ভরসা। অন্তত তুমি এই কিপটা লোকটার মান রাখো!"
ইনায়া হেসেই যাচ্ছিল, তবে সে ইভানকে নিরাশ করল না। ড্রয়ার থেকে বের করে দিল একদম নতুন কড়কড়ে ২০০ টাকার একটা বান্ডিল।
ইভান খুশিতে গদগদ হয়ে অ্যারিসকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, "ভাবী, তুমি এই হাড়কিপ্টে ছেলেটাকে কেন যে বিয়ে করলে! ওর পকেটে তো মাকড়সা বাসা বেঁধেছে।"
অ্যারিস পাঞ্জাবির পকেট থেকে খুব সুন্দর একটা পাতলা খাম বের করে ইনায়ার হাতে তুলে দিল। ইভান আড়চোখে খামটার দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকাল। "ভাইয়া, এই পাতলা খামে কি ১০ টাকার নোট ভরেছ নাকি? খাম তো দেখাই যাচ্ছে না!"
ইনায়া আলতো করে খামটা খুলল। ভেতরে কোনো টাকা নেই, বদলে বেরিয়ে এল কুচকুচে কালো রঙের একটা কার্ড। ব্ল্যাক কার্ড, যার লিমিট নেই বললেই চলে।
ইভান হা করে একবার কার্ডটার দিকে তাকাচ্ছে আর একবার নিজের হাতের এক টাকার কয়েনটার দিকে। তার মাথায় যেন বাজ পড়ল।
"ভাইয়া, এটা অন্যায়, এটা চরম জুলুম।" ইভান প্রায় কান্নার সুরে চিৎকার করে উঠল, "নিজের আপন ভাইকে দিলে এক টাকা আর ভাবীকে একদম ব্ল্যাক কার্ড? না এ হতে পারে না।"
"আমি আমার 'কিয়ান গ্রুপ' তোরে দিয়ে দিচ্ছি, তারপরও আর কি চাস?"
"না, আমি কোম্পানি চাই না। আমার স্যালামি চাই।"
অ্যারিস আবার পকেটে হাত দিয়ে দুই টাকার কয়েন বের করে দিল। ইনায়া এবার আরো জোরে হেসে উঠল। অ্যারিস ইনায়া পাশে বসে বলে, "ঈদ মোবারক ওয়াইফি।"
ইনায়া নিজের হাসিই থামাতে পারছে না। অনেকদিন ইনায়াকে মন খুলে হাসতে দেখে অ্যারিসও ভীষণ খুশি। ইভান কান্না করতে করতে মায়ের কাছে চলে যায়।
ঈদের রেশ কাটতে না কাটতে ইনায়ার পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। পরীক্ষার দিনগুলোতে ইনায়ার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করা হলো। তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে একটা আলাদা রুমে বসে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।
ইষান করিডোরে দাঁড়িয়ে সবাইকে দেখছিল, কিন্তু ইনায়াকে কোথাও দেখছিল না।
আদিয়ানকে ইনায়ার জিজ্ঞেস করে, "স্যার, ইনায়া কি পরীক্ষা দিচ্ছে না? ওকে তো কোথাও দেখছি না?"
আদিয়ান ফাইলপত্র গোছাতে গোছাতে বলে, হ্যাঁ, দিচ্ছে তো। তবে ও একটু অসুস্থ তাই আলাদা রুমে বসে পরীক্ষা দিচ্ছে।"
ইষান আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। কি বা জিজ্ঞেস করবে? তবে পুরো ইউনিভার্সিটি ঘুরেও ইনায়া কে খুঁজে পায় না। কখন আসে কখন যায় দেখে না। ইষানের ভীষণ মন খারাপ হলো...............