ফন্ট সাইজ:
থিম:
নিষিদ্ধ আসক্তি

পর্ব 18

লেখক: F. Tabassum

দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে সেপ্টেম্বর মাস চলে এল, সেই সাথে ঘনিয়ে এল ইনায়ার ডেলিভারি ডেট। বাড়ির সবাই যেন তটস্থ হয়ে আছে। সায়মাকে পড়াচ্ছিল হঠাৎ ইনায়ার তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হলো। অ্যারিস ইনায়াকে পাঁজাকোলা করে নিল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাড়িতে হইচই পড়ে গেল। অ্যারিস, ইভান আর আদিয়ান মিলে দ্রুত ইনায়াকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। বাকিরাও পিছনে পিছনে আসছিল।
ডাক্তাররা তড়িঘড়ি করে ইনায়াকে ইমারজেন্সি রুমে নিয়ে গেলেন। বাইরে করিডোরে সবাই বসে ছিল। অ্যারিসের কপালে চিন্তার ভাঁজ, বুকটা দুরুদুরু কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর একজন ডাক্তার বেরিয়ে এলেন। "পেশেন্টের কন্ডিশন কিছুটা ক্রিটিক্যাল। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে। আমাদের ইমিডিয়েটলি ব্লাড লাগবে। ইনায়ার ব্লাড গ্রুপ 'ও নেগেটিভ'। আমাদের ব্লাড ব্যাংকে এই গ্রুপের রক্ত এখন স্টকে নেই। আর আপনারা তো জানেন, 'ও নেগেটিভ' গ্রুপ খুব রেয়ার।"

ডাক্তারের কথায় অ্যারিসের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। অ্যারিস কালক্ষেপণ না করে দ্রুত নিজের ফোন বের করে কাউকে ফোন করল। ১৫ মিনিটের মাথায় তিনজন লোক হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছাল, তারা অ্যারিসের অফিসের লোক।
সব সময় পাথরের মতো শক্ত থাকা অ্যারিস আজ আর নিজেকে সামলাতে পারল না। করিডোরের দেয়াল ধরে সে অঝোরে কাঁদতে শুরু করল। ইভান এসে তার কাঁধে হাত রাখল কিন্তু অ্যারিসের কানে তখন কেবল ডাক্তারের কথাগুলো বাজছে। জীবনের সব যুদ্ধ জয় করা অ্যারিস আজ যেন এক অনাগত প্রাণের জন্য স্রষ্টার কাছে নিঃশব্দে ভিক্ষা চাইছে। হাসপাতালের সেই সাদা করিডোরটা যেন মুহূর্তেই নরককুণ্ডে পরিণত হলো। অপারেশন থিয়েটারের দরজা ঠেলে ডাক্তার যখন ঘর্মাক্ত মুখে বেরিয়ে এলেন, অ্যারিস পাগলের মতো ছুটে গিয়ে তার সামনে দাঁড়াল। ডাক্তারের কণ্ঠ বড্ড ছিল নিচু এবং অপরাধবোধে ভরা।
"মিস্টার অ্যারিস, পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আমরা অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা মা আর বাচ্চার মধ্যে কেবল একজনকে বাঁচাতে পারব। কার জীবন আমরা অগ্রাধিকার দেব?"
অ্যারিসের কানে যেন বজ্রপাত হলো। সে চিৎকার করে পুরো হাসপাতাল কাঁপিয়ে বলে উঠল, "আমার বাচ্চার দরকার নেই, আমি কিছু চাই না! শুধু আমার ইনায়াকে ফিরিয়ে দিন। আমার বউয়ের যেন কিছু না হয়! আমি আমার ইনায়াকে চাই।"
অ্যারিসের কান্না এবার আর কেবল ডুকরে ওঠা নয়, তা এক পৈশাচিক আর্তনাদে রূপ নিল। জীবনের সব ঐশ্বর্য, সব ক্ষমতা আজ তার কাছে তুচ্ছ। সে করিডোরের দেয়ালে মাথা কুটে মরছিল, কিন্তু অ্যারিসের গগনবিদারী চিৎকারের সামনে ইভানের সান্ত্বনা খড়কুটোর মতো উড়ে যাচ্ছিল।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর অপারেশন থিয়েটারের ভারী দরজাটা আবার খুলল। একজন নার্স কাপড়ে মোড়ানো ছোট একটি মানবসন্তানকে কোলে নিয়ে ধীরপায়ে বেরিয়ে এলেন। নার্সকে দেখা মাত্রই অ্যারিস অমানুষিক এক আর্তনাদ করে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। সে ভেবে নিল, বাচ্চা বেঁচে আছে মানেই ইনায়া আর নেই।
অ্যারিস পাগলের মতো ফ্লোরে গড়াগড়ি খেয়ে চিল্লাতে লাগল, "আমি বারবার বলেছিলাম আমার বউকে বাঁচাতে! ওরা কেন এমন করল আমার সাথে? আমি ওকে ছাড়া বাঁচব না, আমি আমার বউকে চাই, এখনই, এই মুহূর্তে আমার সামনে এনে দাও। ইনায়া কে চাই আমি, যে কোনো মূল্যে হোক আমার সামনে হাজির করো। ওকে ছাড়া আমি আমার জীবন কল্পনা ও করতে পারি না। "

অ্যারিসের এই হাহাকার আর বুকফাটা কান্না দেখে হাসপাতালের অন্য রোগীদের স্বজনরাও চোখ বড় বড় করে দেখছিলো। নার্স পুরো হাঁ করে অ্যারিসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অ্যারিস ফ্লোরে হাত-পা আছড়াচ্ছিল, তার পাঞ্জাবি ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে, চোখের জলে মুখ ভিজে একাকার।
সে আদিয়ানের শার্ট খামচে ধরে বলছিল, "ভাইয়া, ওরা আমার ইনায়াকে মেরে ফেলল কেন? আমি তো বাচ্চা চাইনি। আমি শুধু ইনায়াকে চেয়েছিলাম। আমার ইনায়াকে ফিরিয়ে দিতে বলো, আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না। আমার ইনায়া কে ফিরিয়ে দিতে বলো। নইলে আমি এই হাসপাতাল বন্ধ করে দিবো। আমার ইনায়াকে না পেলে.... আমার ইনায়া ..... "

পুরো করিডোরে তখন এক শোকাতুর স্তব্ধতা আর অ্যারিসের বিলাপ, সবাই কাঁদছিল, কিন্তু অ্যারিসকে শান্ত করার মতো শক্তি কারো ছিল না। অ্যারিস নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। পাশে থাকা এক নার্সের ট্রলি থেকে বিদ্যুৎবেগে একটা ধারালো সার্জিক্যাল ছুরি তুলে নিল সে। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ, উন্মাদের মতো কাঁপছে শরীর।
"ইনায়া নেই মানে আমিও নেই, ওকে ছাড়া এই দুনিয়ায় আমার কোনো প্রয়োজন নেই।"— চিৎকার করে অ্যারিস নিজের গলায় ছুরিটা বসাতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে নার্স চিৎকার করে উঠলেন, "থামুন! মিস্টার অ্যারিস, থামুন! আমার বউ বেঁচে আছে।"
অ্যারিসের হাতটা গলার খুব কাছে গিয়ে থেমে গেল। ধারালো ছুরির পোঁচ লেগে গলায় হালকা রক্ত ঝরতে শুরু করেছে, কিন্তু সেদিকে তার কোনো খেয়াল নেই। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে নার্সের দিকে তাকিয়ে তোতলামি করে বলল, "কী... কী বললেন? আবার বলেন?"
নার্স বললেন, "আপনার স্ত্রী বেঁচে আছে, তার কিছু হয়নি। আর আপনাদের কোল আলো করে ফুটফুটে এক রাজকন্যা এসেছে। মা আর মেয়ে দুজনেই সুস্থ আছে। আমি এই সুখবরটাই দিতে আসছিলাম, কিন্তু আপনার এই পাগলামি দেখে আমি কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলেছিলাম।"
অ্যারিসের হাত থেকে ছুরিটা টপ করে ফ্লোরে পড়ে গেল। তার সারা শরীর যেন হঠাৎ করে অবশ হয়ে এল। দেয়ালে ভর দিয়ে সে কোনোমতে নিজেকে সামলাল। গলার কাটা জায়গাটা থেকে সামান্য রক্ত গড়িয়ে তার সাদা পাঞ্জাবির কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু অ্যারিসের মুখে তখন এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।
সে ধরা গলায় বলল, "আমি... আমি আমার বউয়ের কাছে যাব। আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলুন।"
নার্স মৃদু হেসে বললেন, "ডেলিভারি নরমালে হয়েছে, তাই পেইন সহ্য করতে না পেরে উনি সাময়িকভাবে জ্ঞান হারিয়েছেন। তবে ভয়ের কিছু নেই, কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসবে। একটু ধৈর্য ধরুন।"

এরপর নার্স কাপড়ে মোড়ানো সেই ছোট কিউটটিকে অ্যারিসের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। অ্যারিস অতি সাবধানে, কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের মেয়েকে প্রথমবার কোলে তুলে নিল। মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে যে মানুষটা মরতে বসেছিল, সেই এখন তার মেয়ের নরম গালে নিজের ভেজা মুখটা ঠেকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। সে মেয়ের কানে মুখ নিয়ে ফুপিয়ে উঠে আজান দিলো।

সবার চোখের জল মুছে মুছে হাসি ফুটে উঠল। তারা সবাই মিলে ঘিরে ধরল নতুন মেম্বারকে। অ্যারিস তার মেয়ের কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে মনে মনে বলল, " তোর মায়ের মতো হয়েছিস, আর একটু হলেই আমার হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো "

ইনায়ার জ্ঞান ফিরতেই অ্যারিস বাচ্চাটাকে আফরিন সুলতানার কোলে দিয়ে ঝড়ের বেগে কেবিনের দিকে ছুটল। ইনায়া তখন আধশোয়া হয়ে বালিশে হেলান দিয়ে বসে ছিল, ফ্যাকাশে মুখে এক চিলতে ক্লান্ত হাসি। অ্যারিস দৌড়ে গিয়ে ইনায়াকে জড়িয়ে ধরল। গভীর আবেগে আর অজানাকে হারানোর ভয়ে সে ইনায়ার কপালে আর গালে বারবার চুমু খেতে লাগল। অ্যারিসের এই রূপ ইনায়ার কাছে একেবারেই নতুন। এমন পাথরের মতো শক্ত মানুষটার চোখে জল দেখে ইনায়ার নিজের চোখেও পানি চলে এল। সে তার কাঁপা কাঁপা বাম হাত বাড়িয়ে অ্যারিসের গালের জল মুছে দিল। ইনায়ার চোখ যায় অ্যারিসের গলায়, সেখানে জমাট বাঁধা রক্ত দেখে ইনায়ার বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আর্তনাদ করে জিজ্ঞেস করল, "এখানে কী হয়েছে? রক্ত কেন?"
আদিয়ান সেই আত্মঘাতী পাগলামির কথা সবটা খুলে বলল। সব শুনে ইনায়ার চোখ রাগে আর অভিমানে টলমল করে উঠল। তার ডান হাতে স্যালাইন চলছে, বাম হাত দিয়েই সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল অ্যারিসের গালে।

অ্যারিস উল্টো ইনায়ার হাতের তালুতে হাত রেখে চিন্তিত মুখে বলল, "আরে ইনায়া! তোমার হাতে ব্যথা লাগবে তো! একটু শান্ত হও।"
ইনায়া রাগে ফেটে পড়ে যখন দ্বিতীয় থাপ্পড়টা দিতে যাচ্ছিল, তখন আদিয়ান দ্রুত এসে তার হাতটা ধরল।
আদিয়ান সবাইকে নিয়ে বাইরে চলে যায়। সবাই চলে যেতেই ইনায়ার শক্ত বাঁধনটা ভেঙে গেল। সে অ্যারিসকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠল। "তোমার কিছু হয়ে গেলে আমার বাচ্চাটাকে কে দেখত অ্যারিস? তুমি কি একবারও ওর কথা ভাবলে না?"
অ্যারিস ইনায়ার চুলে মুখ গুঁজে ধরা গলায় বলল, "বাচ্চা দেখার জন্য অনেক মানুষ আছে, কিন্তু তোমার কিছু হলে আমি এই পৃথিবীতে কার মুখ চেয়ে থাকতাম? আমি তো এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম আমি তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি... আমার সব শেষ হয়ে গেছে।"
অ্যারিস আবার শিশুর মতো কাঁদতে শুরু করল। ইনায়া জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করল। দীর্ঘক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শান্ত হওয়ার পর অ্যারিস ইনায়া কে অনেক গুলো চুমু দিল।

—" আমায় ছেড়ে যাবে না কোথাও, বুঝলে? তোমার স্বামী তোমাকে ভীষণ রকম ভাবে ভালোবাসে । একটু দূরে গেলেই কতটা কষ্ট হয় জানো? "

— "হুমম জানি তো, আপনি আমাকে ভীষণ ভালোবাসেন। আপনাকে ছেড়ে যাবো না কোথাও আমি , সারাজীবন আপনার সাথে থাকার জন্যে বিয়ে করেছি, ছেড়ে কেনো যাবো? "

— "এইতো লক্ষী বউ আমার। সারা জীবন এমন লক্ষী হয়ে থাকবে। "

— "ওকে মাই হাজবেন্ড "

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 18 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন