এনগেজমেন্টের রেশ কাটতে না কাটতে-ই মুড়াপাড়া থেকে ফিরে আসা হলো, কিন্তু বিশ্রামের তো নেই, কারণ ইভানের জেদ— সে সায়মাকেই বিয়ে করবে। তাই শামীমা বেগম, জিয়ান ফেং, ইভান আর ইনায়া মিলে আইরাকে সাথে নিয়ে সরাসরি সায়মাদের বাড়িতে হাজির হলো।
সায়মার বাবা-মা কৌতূহল চোখে আগত মেহমানদের দেখছিলেন। ইনায়াকে সেখানে দেখে তারা ভীষণ অবাক হলেন। রফিক সাহেব ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, "ইনায়া, তুমি ওনাদের সাথে?"
শামীমা বেগম মিষ্টি হেসে বললেন, "ইনায়া আমার বড় ছেলের বউ। আইরা কে দেখিয়ে বলে, আর এই পুচকেটা আমার নাতনি, ইনায়ার মেয়ে আইরা ফেং।"
শামীমা বেগম প্রস্তাব রাখে সায়মাকে তার ছোট ছেলের বউ হিসেবে ঘরে তোলার। সায়মার পরিবার তো অবাক। ইনায়াকে তারা খুব পছন্দ করে, কারণ সায়মাকে সে নিজের ছোট বোনের মতো আগলে রাখে। ইনায়ার মতো এমন একজন মানুষ যে বাড়ির বড় বউ, সেই বাড়িতে সায়মাকে দিতে তাদের বিন্দুমাত্র অমত নেই। রফিক সাহেব যখন মনে মনে হ্যাঁ বলতে যাবেন, ইনায়া তাকে চোখের ইশারায় না করতে বলল। সায়মার বাবা ইশারাটা ধরে ফেললেন এবং মুহূর্তের মধ্যে নিজের সুর গম্ভীর করে নিলেন। রফিক সাহেব গলা পরিষ্কার করে বললেন, "দেখুন, প্রস্তাবটা নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু সায়মা এখনো ছোট, ওর পড়াশোনা বাকি। আর হুট করে এভাবে একটা সিদ্ধান্তে আসা আমাদের জন্য কঠিন। আমরা এই বিয়েতে এখনই মত দিতে পারছি না।"
এর মধ্যে সাহানা বেগম (সায়মার মা) অনেক খাবার নিয়ে আসে।
কথাটা শোনামাত্র ইভান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে এক সেকেন্ড দেরি না করে সোজা গিয়ে রফিক সাহেবের দু পা জড়িয়ে ধরল। রফিক সাহেব অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, "আরে একি! কী করছ? পা ছাড়ো বলছি!" রফিক সাহেব পা ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু ইভানের ধরা যেন আঠার মতো লেগে আছে।
ইভান মুখটা করুণ করে ফোঁঁপাতে ফোঁঁপাতে বলল, "না! আগে বিয়েতে রাজি হন, তারপর ছাড়ব। তার আগে এক চুলও নড়ছি না আমি।"
রফিক সাহেব এবার একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বললেন, "আরে বাবা, আমার মেয়েকে আমি যেখানে ইচ্ছে বিয়ে দেব, তাতে তোমার কী? পা ছাড়ো বলছি!"
ইভানের ভেতরের জেদ এবার মাথায় চড়ে বসল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, "খবরদার! সায়মা শুধু আমার। আমি ছাড়া অন্য কারো সাথে ওর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে আমি কিন্তু বোম মেরে সব উড়িয়ে দেব! একদম সিরিয়াস আমি!"
রফিক সাহেবও দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি চোখ রাঙিয়ে বললেন, "বেশি বাড়াবাড়ি করলে তোমাকে ও আমি উড়িয়ে দেব। ছাড়ো পা!"
ইভান এবার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শেষ অস্ত্রটা ব্যবহার করল। গলার সুর নামিয়ে খুব মায়া মাখিয়ে বলল, "চাচা, আপনি এমন করছেন কেন? মনে করেন না আমি আপনার ছেলে......।"
ইভানের বাক্যটা শেষ করার আগেই রফিক সাহেব চট করে বলে উঠলেন, "ও আচ্ছা! তুমি যদি আমার ছেলে হও, তাহলে তো সায়মা তোমার বোন! ব্যস, বিয়ে ক্যানসেল! ভাই-বোনের কি আর বিয়ে হয়?"
কথাটা শোনা মাত্রই ইভানের মুখ হা হয়ে গেল। সে হাহাকার করে কেঁদে উঠে ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। "ভাবী! ও ভাবী! প্লিজ ওদের একটু বোঝাও। দেখো চাচা কী সব আজেবাজে কথা বলছে!"
এদিকে সোফায় বসে ইনায়া আর শামীমা বেগম এতক্ষণ দম আটকে হাসি চেপে রাখছিলেন। রফিক সাহেবের 'ভাই-বোন' লজিক শুনে তারা আর নিজেদের সামলাতে পারলেন না। দুজন হাসতে হাসতে প্রায় সোফা থেকে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। জিয়ান ফেং এর কোলে আইরা থাকায় নিজের হাসি কন্ট্রোল করছেন।
ইভান এবার সত্যি সত্যিই কান্না শুরু করে দিল। সে কাঁদতে কাঁদতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, "মা! তুমি এসব দেখে হাসছ? তুমি আমার মা হতে পারো না। নিজের ছেলের এই অবস্থা দেখে কেউ হাসে? তুমি বরং ওই চাচারই বোন হও গে যাও!"
ইভানের পাগলামি দেখে অবশেষে রফিক সাহেবের মন গলল। ড্রইংরুমের সেই হাসাহাসির মাঝেই ঠিক হলো— সবাই যখন রাজি, তখন আর দেরি কেন? যদি সায়মা বিয়ের জন্য বেশ ছোট ছিলো তবে যাকে ভালোবেসেছে তাকে বিয়ে করতে সমস্যা কোথায়? সে তো রাজি!
সেদিনই ঘরোয়াভাবে ইভান আর সায়মার আংটি বদল হয়ে গেল।
ঠিক হলো, আগামী 16 নভেম্বর একসাথে তিন জোড়া দম্পতির শুভ পরিণয় সম্পন্ন হবে।