কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সমুদ্রের একদম কাছের সেই বিলাসবহুল হোটেলে পৌঁছে গেল। আগে থেকেই বুকিং করা ছিল বলে দেরি না করে সবাই চাবি নিয়ে নিজের নিজের রুমে ঢুকে পড়ল। অ্যারিস সারারাত গাড়ি চালিয়ে এবং জাগনা থাকায় একদম ক্লান্ত ছিল, সে বিছানায় পিঠ ঠেকানো মাত্রই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
সকাল ৯টার দিকে ছোট আইরার কান্নায় ইনায়ার ঘুম ভেঙে গেল। অ্যারিসের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটিয়ে ইনায়া আইরাকে সামলে নিল। তাকে খাবার খাইয়ে কিছুক্ষণ খেলা শুরু করল। তারপর বারান্দায় নিয়ে গিয়ে দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্রের ঢেউ দেখে খিলখিল করে হাসছে। ইনায়া তার মেয়ের সাথে সেই মায়াবী মুহূর্তের কিছু ছবি তুলে রাখল। কিছুক্ষণ পর রোহান খাবার দিয়ে যায়। অ্যারিস তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে।
অ্যারিস যখন ঘুম থেকে উঠল, তখন আকাশ সিঁদুর রাঙা হয়ে গেছে— সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সবাই ফ্রেশ হয়ে ডিনারের জন্য নিচে নামল। সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় রাতে বেশ ঠাণ্ডা পড়ে, তাই সবাই গরম পোশাক জড়িয়ে নিল। ছেলেরা শার্টের ওপর ওভারসাইজড কোট পড়লো , আর মেয়েরা কালারফুল স্টাইলিশ হুডি। ছোট আইরাকেও নরম গরম পোশাকে তুলতুলে এক পুতুলের মতো লাগছিল।
খাওয়া শেষ করে সবাই সমুদ্রের ধারের ছোট ছোট দোকানগুলো ঘুরে দেখতে শুরু করল। আচারের দোকান থেকে শুরু করে চকোলেট আর চিপসের বাহারি আইটেম— সবাই মিলে ব্যাগ ভর্তি করে কেনাকাটা করল। কেনাকাটার ভিড়ের মাঝেই অ্যারিস চট করে মাহির কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল। ইশারা পেতেই মাহি রোহানকে নিয়ে সরে পড়ল। ইনায়া তখন একটা গিটারের দিকে একপলক তাকিয়েই নজর সরিয়ে নিল, কিন্তু অ্যারিসের তীক্ষ্ণ চোখ সেটা এড়াল না। সে মুহূর্তেই দোকানের সবচেয়ে দামী আর সেরা গিটারটা কিনে নিল। ইনায়া অবাক হয়ে বলল, "আরে, আমি তো জাস্ট একনজর তাকিয়েছিলাম, তার জন্য এটা কিনতে হবে?" অ্যারিস মুচকি হেসে মাথা ওপর নিচ করল, যার অর্থ— "তোমার চোখের প্রতিটি চাওয়াই আমার কাছে হুকুম।"
ইনায়া আইরাকে কোলে নিয়ে দোকানের বাহারি জিনিস দেখছিল, এমন সময় অ্যারিসের ফোনে মাহির মেসেজ এল— "Done Boss!"
অ্যারিস সবাইকে নিয়ে তাদের হোটেলের কাছে, সমুদ্র সৈকতের এক নির্জন কোণে বালুর ওপর সাজানো একটা জায়গায় এল। সেখানে এক তাবু টানানো, যার ভেতরটা দেখে সবার চোখ কপালে উঠল! তাবুর ভেতরটা মায়াবী সব লণ্ঠন আর ফেয়ারি লাইট দিয়ে সাজানো। নরম কার্পেট আর প্রচুর আরামদায়ক কুশন বিছানো। সমুদ্রের নোনা বাতাস আর মৃদু গর্জন ভেতর থেকে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ তৈরি করছে।
সবাই গোল হয়ে বসল। বাইরে হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বইছে, তাই ইনায়া একটা বড় নরম কম্বল আইরার গায়ে জড়িয়ে দিল।
সায়মা হঠাৎ উৎসাহী হয়ে বলে উঠল, "চলো, ট্রুথ অর ডেয়ার খেলি।" সবাই একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। খেলা শুরু হতেই বোতলটা ঘুরালে সুবার দিকে থামে।
— "ট্রুথ অর ডেয়ার?"
— "ট্রুথ!"
আদিয়ান: "তুমি কি আমাকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পছন্দ করো?"
সুবা কিছুটা লজ্জা পেল, মাথা ওপর নিচ করে হ্যাঁ বলল। আদিয়ানের মুখে তখন বিস্ময়ের হাসি।
পরের বোতল ঘোরোতেই সেটা থামল ইনায়ার দিকে।
— "ট্রুথ অর ডেয়ার?"
— "ডেয়ার"
অ্যারিসের চোখ দুটো তখন ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে ইনায়ার দিকে একটু ঝুঁকে বলল, "সবার সামনে আমাকে একটা কিস করো।"
ইনায়ার গাল মুহূর্তের মধ্যে টকটকে লাল হয়ে গেল। সে অস্ফুট স্বরে বলল, "অসভ্য! এখানে সবাই আছে তো।"
অ্যারিস জেদ ধরে বলল, "রুলস ইজ রুলস। জলদি করো, আমার আবার ধৈর্য কম তা তো জানোই।"
সবার হাসাহাসি আর তালি দেওয়ার মাঝে ইনায়া নিরুপায় হয়ে অ্যারিসের কাছে গিয়ে চট করে ওর গালে একটা আলতো চুমু খেল। অ্যারিস মুচকি হাসে।
পরের বোতল ঘোরাতেই সেটা মাহির দিকে।
— "ট্রুথ অর ডেয়ার?"
— "ডেয়ার"
ইভান: "এক্ষুনি তোর জিএফ-কে ফোন করে বিয়ের জন্য প্রপোজ করবি!"
মাহী কাঁচুমাচু হয়ে বলল, "ভাই, আমার তো জিএফ-ই নাই! প্রপোজটা করব কারে?" মাহির অসহায় চেহারা দেখে সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
ইভান বোতল ঘুরাতেই আদিয়ানের সামনে থামে।
— "ট্রুথ নাকি ডেয়ার?"
— "ডেয়ার"
ইভান: "সুবা ভাবীর জন্য একটা রোমান্টিক কবিতা বলতে হবে। কিন্তু শর্ত একটাই, কবিতাটা হতে হবে একদম মজার।"
আদিয়ান একটু ভেবে বলতে শুরু করলো:
সুবা, ওগো সুবা, তোমায় দেখে হারায় ঘুমটা।
তুমি যখন বলো "কিছু না", তখনই বুঝি বিপদটা!
তোমার সাথে তর্ক করা, নিজের কবর নিজে খোঁড়া। তবুও প্রিয়, মানি এই কথা, তুমিই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর ঝামেলাটা!
আদিয়ানের কবিতা শুনে ইনায়া , ইভান আর সায়মা হাসতে হাসতে কুশনে গড়িয়ে পড়ল। অ্যারিসও মুচকি হাসছে। সুবা একটা বালিশ ছুড়ে মারল আদিয়ানের দিকে, "এই তোমার রোমান্টিকতা? দাঁড়াও, বাসায় গিয়ে তোমার খবর আছে!"
বোতল ঘুরালে আবারও ইনায়ার সামনে থামে।
— "ট্রুথ নাকি ডেয়ার?"
— "ডেয়ার"
অ্যারিস কিছু বলতে যাবে, ইনায়া হাত দিয়ে অ্যারিসের মুখ চেপে ধরল।
"খবরদার! তুমি কোনো ডেয়ার দেবে না।" ইনায়ার এমন কথায় সবাই মুখ চেপে হাসছিল।
সুবা সুযোগ বুঝে গিটারটার দিক ইশারা করে বলল, "অ্যারিস ভাইয়া তোমাকে এত শখ করে গিটার কিনে দিল, গিটার বাজিয়ে একটা গান শোনাও।"
ইনায়া আইরাকে সাবধানে অ্যারিসের কোলে দিয়ে নতুন গিটারটা তুলে নিল। তার বাম হাতে আঙ্গুল ছোঁয়াল, টুং টাং করে দু-একটা সুর তোলার চেষ্টা করল। সবাই ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া একটু গলা পরিষ্কার করে গান ধরল—
"দেখেও দেখো নি তো
ঘুরছি আমি কতো
আগে পিছে আশেপাশে রোজ তোমায়
বারে বারে নিয়ে নিয়ে গেছি খোঁজ তোমার...
মুখে বল না কিছু,
চোখেরা নেবে পিছু
সারাদিনই আমি দৌড়ে ফিরতে চাই
তুমি তুমি করে দৌড়ে মরতে চাই...
এক পা দু পা তাল মেলাতে ভয়টা কেন পাও
জানতে গেলে যাও পালিয়ে বল না কি চাও...?"
ইনায়া হঠাৎ সুর থামিয়ে দিল। অ্যারিস সুর ধরল—
"যদি সত্যি জানতে চাও,
তোমাকে চাই, তোমাকে চাই
যদি মিথ্যে মানতে চাও,
তোমাকেই চাই"
মনে হচ্ছে একে অপরকে গানের মাধ্যমে মনের কথা বলছে।
পরেরবার বোতল ঘুরালে ইভানের দিকে যায়.
— "ট্রুথ নাকি ডেয়ার?"
— "ডেয়ার"
ইনায়া : বাংলাদেশের বিখ্যাত ভিলেন ডিপজলের দুইটা ডায়লগ বল!
ডেয়ার শুনেই সবাই হাসি শুরু করলো...
ইভান : থামো সবাই, আগে বলতে তো দাও
প্রথম টা......
"ঐ খবরদার! ছবি তুলবিনা, ছবি তুলবিনা! ভালো ভালো পিকচার আমার বাসায় আছে। সাপ্লাই দিমুনি সাপ্লাই দিমুনি, যা! আউল-বাউল অবস্থায় ছবি তুলবিনা কইয়া দিলাম। ঐ চল! ... ঐ হুরের পুত, রেডি হয়া থাক। তরে আমি গান শুনামু... ......
সবার হাসি কে থামাবে?
ইভান নিজেও হাসছে, তবে হাসি চেপে রেখে বলে আরেকটা শোনো তো সবাই
দ্বিতীয় টা.........
"আমারে চিনছস? আমি সানডে মান্ডে ক্লোজ করছি, ওয়ান-টু তে খালাস করছি, সিস্টেম চালু কইরা আজ এইখানে দাঁড়াইছি। তোর মরণের চুলকানি উঠছে, আমি তোরে মলম লাগাইয়া দিমু।"
সবার পুরো দমবন্ধ হওয়ার অবস্থা! হাসতে হাসতে চোখ থেকে পানি পড়ছে সায়মার!
রাত ১১টা পর্যন্ত সেই তাবুর ভেতর আড্ডা, গান আর হাসাহাসির আসর চলল। সবাই যখন কিছুটা ক্লান্ত, তখন অ্যারিস তাবু ছেড়ে সবাই হোটেলের দিকে রওনা হলো.........