পরদিন সকাল।
সূর্যের মিষ্টি আলো যখন হোটেলের জানালায় উঁকি দিল, তখনই শুরু হলো সমুদ্রের পাড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। ইনায়ার পরনে শুভ্র সাদা রঙের একটি লং ড্রেস, সাথে কাঁধের ওপর ওড়না রাখা, লাল রঙের স্কার্ট, মাথায় একটি হ্যাট আর পিঠময় ছড়িয়ে থাকা খোলা চুল। অ্যারিস ইনায়ার এই অসাধারন রূপ দেখে সে নিজেকে সামলাতে পারল না। রুমের দরজা বন্ধ করে সে ইনায়াকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল আর তার কপালে ও গালে অনেকগুলো চুমু খেল।
ইনায়া বিরক্ত হয়ে বলে, "অ্যারিস!"
অ্যারিস: "একদম চুপ থাকো। মারাত্মক সুন্দর লাগছে তোমায়! চোখ ফেরাতে পারছি না। "
— " আমাদের যেতে হবে তো "
অ্যারিস ইনায়ার গালে আরো দুটো চুমু দিয়ে বলে, "একটু পর , আগে বউ তারপর বাকি সব "
ইনায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে , এই লোক যা বলে তাই করবে বাঁধা দিলেও শুনবে না! কিছু বলা মানে নিজের এনার্জি নষ্ট করা ।
ছোট আইরাকে সাজানো হয়েছে টকটকে লাল রঙের একটি ফ্রক, যাতে তাকে একদম পরীর মতো লাগছে। অ্যারিস নিজে সাদা শার্ট আর কালো প্যান্টের সাথে সানগ্লাস পরে তার চিরাচরিত হ্যান্ডসাম লুকে প্রস্তুত।
সুবা পরেছে আকাশী নীল রঙের শাড়ি, চুলগুলো খোলা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। আদিয়ান তার সাথে মিলিয়ে আকাশী শার্ট ও কালো প্যান্ট। দুজনকে নীল দিগন্তের প্রতিচ্ছবি মনে হচ্ছিল।
সায়মা কালো রঙের লং ড্রেস কাঁধে ওড়না, চুল গুলো খোলা রেখেছে।
আর ইভান কালো রঙের শার্ট প্যান্ট, কালো সানগ্লাস তাকে বেশ হ্যান্ডসাম লাগছে!
সবাই মিলে সমুদ্রের বালুকাবেলায় গিয়ে নামল। আইরা তখন মাহি আর রোহানের কাছে। সবাই মিলে লোনা জলে পা ভেজালো, চলল একের পর এক ছবি তোলার উৎসব।
অবিরাম মজা আর হইহুল্লোড় শেষে দুপুরে সবাই রুমে ফিরল। সমুদ্রের নোনা পানি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সবাই গোসল সেরে নিল। ক্লান্ত অ্যারিস একটু ঘুমের খোঁজে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। রুমে মাহি ছিল দেখে ইনায়া আইরাকে মাহির কাছে রেখে একটু বের হলো। সাথে সুবা আর সায়মাও ছিল।
সুবা আজ ঠিক করেছে সে আদিয়ানের জন্য একটা সারপ্রাইজ গিফট কিনবে, ভালো মানের কোনো পারফিউম। হোটেল থেকে বের হওয়ার সময় ইনায়া আর সায়মা জানতো না তারা ঠিক কোথায় যাচ্ছে, কিন্তু রাস্তায় নামার পর সুবা তার মনের কথা জানালো। তিন জন মিলে পারফিউমের দোকান খুঁজতে শুরু করল।
তাদের অগোচরেই একটা কালো গাড়ি তাদের পিছু নিচ্ছিল। গাড়ির কাঁচের ওপাশ থেকে এক আগন্তুক লোক অদ্ভুত দৃষ্টিতে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। সে যেন কোন পরিকল্পিতভাবেই ইনায়াকে অনুসরণ করছিল।
অনেক খোঁজা খুঁজি করে অবশেষে তারা একটি পারফিউম শপে ঢুকল। বেশ কয়েকটা ব্র্যান্ড ট্রাই করার পর সুবার পছন্দ হলো "Bleu de Chanel"। সুবাসটা কেমন তা পরীক্ষা করার জন্য সে ইনায়ার গায়ে একটু স্প্রে করল। ইনায়া ঘ্রাণটা নিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল, "খুবই সুন্দর, এটা নিতে পারিস।"
পারফিউম কেনা শেষ করে তারা যখন দোকান থেকে বের হলো, সেই রহস্যময় লোকটা দ্রুত দোকানে ঢুকে ঠিক একই পারফিউম কিনল।
হোটেলের সামনে এসে তিন জন দাঁড়ালো। হঠাৎ ইনায়ার মনে হলো, সুবা তার স্বামীর জন্য কিনছে অথচ সে অ্যারিসের জন্য কিছুই নিল না! সে বলল, "আমাদের উচিত যার যার হাজব্যান্ডের জন্য কিছু কেনা। আমি তো টাকা আনি নি, তোরা দাঁড়া আমি আসছি।" সায়মাও টাকা আনতে ইনায়ার সঙ্গী হলো।
ইনায়া রুমে ঢুকে দেখল অ্যারিস বেশ মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কাজ করছে। পাশে মাহি দাঁড়িয়ে আছে আইরাকে নিয়ে। ইনায়া কোনো কথা না বাড়িয়ে দ্রুত ব্যাগ থেকে টাকার ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে গেল। ইনায়া চলে যাওয়ার পর অ্যারিসের নাকে একটা অচেনা কিন্তু কড়া সুবাস ভেসে এলো। সে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, "কেমন একটা স্মেল আসছে না?"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহি জানালো, "Boss এটা 'Bleu de Chanel' পারফিউম। আমার বোনের হাজব্যান্ড একবার আমাকে গিফট করেছিল, তাই চিনি।"
অ্যারিস অবাক হলো। ইনায়া তো সব সময় "Dior J'adore" ব্যবহার করে, আর আমি "Dior Leather Oud Eau de" ব্যবহার করে, তাহলে ইনায়ার গায়ে এই নতুন সুবাস কোত্থেকে এল?
ভাবতে ভাবতে অ্যারিস ফেসবুক স্ক্রল করতে লাগলো। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ইষানের পোস্টে । সেখানে একটা "Bleu de Chanel"-এর ছবি, সাথে ক্যাপশন — "স্পেশাল একজন মানুষের দেওয়া গিফট......"
অ্যারিসের মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। কোনো কিছু না ভেবেই হাতের কাছের ফোনটা আছাড় দিয়ে ভাঙল সে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুম তছনছ করতে শুরু করল। তার এই আবহ রূপ দেখে মাহি তড়িঘড়ি করে আইরাকে নিয়ে রুমের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে দাঁড়ালো।
এর কিছুক্ষণ পর ইনায়া ফিরে এলো। তার হাতে একটি শপিং ব্যাগ, মাহি তাকে দেখে আতঙ্কিত কণ্ঠে বলল, "ম্যাডাম, এখন ভেতরে যাবেন না। বস সবকিছু ভেঙে চুরমার করছেন।"
ইনায়া শান্ত গলায় বলল, "আইরাকে ভাইয়ার কাছে নিয়ে এসো। আর রুমে যেন কেউ না ঢোকে।" বলেই সে শক্ত পায়ে রুমের ভিতরে ঢুকলো।
ভিতরে গিয়ে দেখলো সব ছন্নছাড়া। সবকিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। অ্যারিসের হাতে নিজের পারফিউমের বোতলটা ধরা, যা ভেঙে কাঁচ তার হাতের তালুতে ঢুকে গেছে। রক্ত ঝরছে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নাই। তার চোখমুখের অবস্থা এতটাই খারাপ যে চেনা দায়।
ইনায়া ধীর পায়ে অ্যারিসের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। ইনায়াকে দেখামাত্রই অ্যারিস তার কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠলো। ইনায়া নরম সুরে জিজ্ঞেস করলো, "কী হয়েছে? এত রাগ কেন করছো?"
অ্যারিস ধরা গলায় একটাই কথা বললো, "বউ, আমাকে ছেড়ে যেও না প্লিজ......"
ইনায়া তাকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে দিতে বললো, "দেখো, আমি তোমার কাছেই আছি। আমি কোথাও যাব না তো।"
অ্যারিসের অবুঝ শিশুর মতো কান্না যেন থামছিলই না। ইনায়া যখন তাকে জড়িয়ে ধরল, অ্যারিস তখন তার সমস্ত ভয় আর অভিমান উগড়ে দিতে চাইলো। গভীর ভালোবাসায় সে ইনায়াকে নিবিড়ভাবে চুমু খেতে শুরু করল, যেন এই মুহূর্তেই তার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমান।
ইনায়া আলতো হেসে জিজ্ঞেস করল, "এখন খুশি তো?!"
অ্যারিস আদুরে গলায় বলল, "না, আমার আরও চাই......"
ইনায়া আর না করতে পারল না। অ্যারিসের কপালে আর গালে চেপে ধরল ভালোবাসার চিহ্ন এঁকে দিয়ে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। একটু থিতু হওয়ার পর ইনায়া গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এবার বলো তো, কী হয়েছে আসলে?"
অ্যারিস তখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার রেশ টেনে পুরো ঘটনাটা খুলে বলল।
সব শুনে ইনায়ার বিরক্তি তে কপাল কুঁচকালো, বলল, "তুমি কি আসলেই পাগল? আমি কেন ওকে পারফিউম গিফট করতে যাব? সুবা আদিয়ানের জন্য গিফট কিনতে গিয়েছিল, তখন ওই সুবাস পছন্দ হওয়ায় আমার গায়ে জাস্ট একটু স্প্রে করে দেখেছিল। ব্যস, এইটুকুই।"
ইনায়া দ্রুত মেডিসিন বক্স নিয়ে এল। অ্যারিসের হাতের তালুতে ঢুকে থাকা কাঁচের টুকরোগুলো অতি সাবধানে বের করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। ব্যান্ডেজ করতে করতে সে চিন্তিত মুখে বলল, "ডান হাতটা তো এভাবে কাটলে, এখন খাবে কীভাবে?"
অ্যারিস মুখে একটা চওড়া হাসি টেনে বলল, "কেন, তুমি আছো না।"
ইনায়া আর কথা বাড়াল না, ব্যাগ থেকে তার আনা বিশেষ গিফটটি বের করে অ্যারিসের হাতে দিল। একটি কুচকুচে কালো রঙের টাই। গিফটটা পেয়ে অ্যারিসের বিষণ্ণ মুখটা নিমেষেই খুশিতে ঝলমল করে উঠল.....