২০ এপ্রিল, ২০২৪।
প্রতিদিনের মতোই অ্যারিসের সকালটা শুরু হলো ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে। গোসল সেরে নাস্তা শেষ করে সে যখন অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল, ইনায়া তার গলায় টাইটা বেঁধে দিল। যাওয়ার আগে ইনায়া আর ছোট আইরাকে গভীর ভালোবাসায় সিক্ত করে অ্যারিস অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। কাজের চাপে অ্যারিস হয়তো ভুলেই গেছে আজ তার নিজের জন্মদিন। কিন্তু ইনায়া ভোলেনি। গতবার আইরা পেটে থাকায় সেভাবে কিছু করতে পারেনি, তাই এবার তার আয়োজনে কোনো খামতি নেই। নিজেদের রুম খুব সুন্দরভাবে সাজানো, নিজের হাতে বার্থডে কেক বানাল। অ্যারিসের ২৭তম জন্মদিন উপলক্ষে সে বেছে বেছে ছোট-বড় মিলিয়ে ঠিক ২৭টা গিফট সাজিয়ে রেখেছে।
সন্ধ্যা নামার আগেই ইনায়া নিজে পড়ে নিলো একটা নীল রঙের শাড়ি, সাথে ম্যাচিং ইয়ারিং আর রিনিঝিনি শব্দ তোলা চুড়ি। এতদিনে সে শাড়ি পরতে শিখে গেছে। আইরাকেও পরিয়ে দিল একই রঙের ছোট্ট একটি ফ্রক।
রাত ৮টা। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে অ্যারিস যখন রুমে ঢুকল, দেখল চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার। অ্যারিস কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে ডাকল, "ইনায়া, কোথায় তুমি? আইরা?"
হঠাৎ পুরো আলোয় ঝলমল করে উঠল। অ্যারিস দেখল, নীল শাড়িতে এক মায়াবী রূপ নিয়ে ইনায়া কেক হাতে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি হেসে সে বলল, "শুভ জন্মদিন, আমার প্রিয় স্বামী।" বিছানায় বসে ছোট্ট আইরাও নীল পরী সেজে হাত-পা ছুড়ছে। অ্যারিস মুগ্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ। টাইটা ঢিলে করতে করতে সে ইনায়াকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল। ইনায়া ঘাড়ে অ্যারিসের তপ্ত নিঃশ্বাস পাচ্ছিল। ফিসফিস করে বলে, "থ্যাংক্স ইউ মাই ওয়াইফ।"
এরপর সবাই মিলে কেক কাটল। ইনায়াকে খাইয়ে দেওয়ার পর ছোট্ট আইরার মুখেও একটু ক্রিম তুলে দিল অ্যারিস।
ইনায়া যখন একের পর এক গিফট অ্যারিসের সামনে হাজির করল, অ্যারিস তো রীতিমতো চমকে গেল। "এতগুলো গিফট?" সে বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করল।
ইনায়া মুচকি হেসে জবাব দিল, "তোমার ২৭তম জন্মদিন, তাই ২৭টা গিফট।" অ্যারিস হাসল, তবে তার চোখে অন্য কোনো পরিকল্পনা খেলা করছিল। সে বলল, "এসব এসে দেখব।"
ইনায়া অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "এসে দেখব মানে?"
অ্যারিস তার কথার উত্তর না দিয়ে ইনায়া আর আইরাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাতের শহরে। গাড়ি ছুটছে রাজপথ দিয়ে— অ্যারিস ড্রাইভ করছে, আর পাশে বসে ইনায়া তার কোলজুড়ে আগলে রেখেছে তাদের ভালোবাসার প্রতীক ছোট্ট আইরাকে।
গাড়ির ভেতর হাসাহাসি আর খুনসুটিতে মেতে ছিল ইনায়া আর অ্যারিস। লং ড্রাইভের নেশায় তারা কখন যে ঢাকার সীমানা ছাড়িয়ে নির্জন হাইওয়েতে চলে এসেছে, টেরই পায়নি।
হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে সামনে থেকে ধেয়ে আসা একটি ট্রাকের তীব্র হেডলাইট অ্যারিস ও ইনায়ার চোখে পড়ে। বিপদ আঁচ করতে পেরে ইনায়া মুহূর্তের মধ্যে কোলে থাকা আইরাকে সিটের নিচে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দেয়।
পরমুহূর্তেই বিকট এক শব্দে ট্রাকটি তাদের গাড়িকে ধাক্কা দেয়। ধাক্কার প্রচণ্ডতায় গাড়ির দরজা খুলে যায় এবং ইনায়া ছিটকে গিয়ে রাস্তার ধারের ঢালু খাদে হারিয়ে পড়ে। স্টিয়ারিংয়ে থাকা অ্যারিসের গাড়ির গ্লাস ভেঙে তার মাথায়, হাতে ঢুকে যায়। হাতের চেয়ে মাথার আঘাত টা বেশি লেগেছে , গলগল করে রক্ত ঝরে তার সাদা শার্ট লাল হয়ে যায়। অ্যারিসের চোখের পাতা বুজে আসছিল, কিন্তু ঝাপসা দৃষ্টিতে সে দেখতে পাচ্ছিল ইনায়া অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে বাঁচানোর জন্য শেষ শক্তিটুকু বেঁচে থাকলেও, মাথা ঝিনঝিন করে চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। সিটের নিচে থাকায় ছোট্ট আইরা বড় কোনো চোট পায়নি, সে কেবল ভয়ে জোরে জোরে কান্না করছে ।