ঠিক সেই সময় ইভানের ফোন আসলো অ্যারিসের ফোনে। অ্যারিস ফোন ধরার জন্য শেষ শক্তি দিয়ে হাত এগিয়ে নিয়ে গেল। হাত থেকে ঝরা রক্তে ফোনও রক্তাক্ত হয়ে গেল। ফোনটা রিসিভ করে কানের কাছে নেয়। ওপাশ থেকে ইভানের উৎফুল্ল কণ্ঠ ভেসে আসে, "ভাইয়া, কোথায় তোমরা? তোমার বার্থডের জন্য স্পেশাল কেক নিয়ে এসে পড়েছি, জলদি ফেরো!"
অ্যারিস কোনোমতে অস্ফুট স্বরে গোঙানির মতো করে বলল, "ই...... ইনায়া......! ইনায়াকে বাঁচা..."
ইভান চমকে উঠল, "কী? কী বলছ ভাইয়া? কোথায় আছো তোমরা? ভাবীর কী হয়েছে? তোমার গলা এমন শোনাচ্ছে কেন? ভাইয়া কথা বলো!"
কিন্তু ওপাশ থেকে আর কোনো শব্দ এল না। অ্যারিস ততক্ষণে নিস্তেজ হয়ে স্টিয়ারিংয়ের ওপর ঢলে পড়েছে।
ভয়ে আর আশঙ্কায় ইভান এক মুহূর্ত দেরি না করে আদিয়ানকে সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। অ্যারিসের ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করে তারা পাগলের মতো গাড়ি ছুটল সেই নির্জন রাস্তার দিকে।
তারা যখন সেখানে পৌঁছাল, চারদিক সুনসান। যে ট্রাকটি ধাক্কা দিয়েছিল, তার কোনো চিহ্ন নেই। রাস্তার পাশে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে অ্যারিসের প্রিয় গাড়িটি। ভেতরে অ্যারিসের নিথর দেহ, যার শ্বাস চলছে কিনা বোঝা দায়। নিচে আইরা ভয়ে আর কান্না করছে। একটু পরপর বা....বা বাবা করছে।
ইভান আর আদিয়ান অ্যারিসের এই অবস্থা দেখে রীতিমত শিউরে উঠল। দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স আর ইমার্জেন্সি টিমকে কল দিল তারা। ইভান গাড়ির ভেতর থেকে আইরাকে বের করল। আদিয়ান ইনায়াকে দেখতে না পেয়ে পাগলের মতো আশেপাশে 'ইনায়া' 'ইনায়া' বলে চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু ঘন অন্ধকার আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে ইনায়ার কোনো সাড়া মিলল না।
খবরটা যখন ইনায়ার বাবা-মায়ের কাছে পৌঁছাল, আনিসুর রহমান সেই শোকে সাথে সাথেই হার্ট অ্যাটাক করে বসলেন। আফরিন সুলতানা কান্নায় ভেঙে পড়ে হাহাকার করতে লাগলেন, "সব কেন আমার মেয়ের সাথেই হয়? কেন খোদা?"
হাসপাতালের করিডোরে তখন এক শোকাতুর পরিবেশ। আনিসুর রহমানকে ইমার্জেন্সি রুমে নেওয়া হয়েছে। রোহান, সুবা, ইরা, আফরিন সুলতানা সেখানে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে। ইরা বুঝতে পারছে না সবাই কেন কাঁদছে? তার বাবা ঠিক হয়ে যাবে তো ডক্টর বলেছে ।
ইনায়ার ব্যাপারটা ইরাকে জানায়নি, সে শুধু চুপচাপ একটা চেয়ারে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আফরিন সুলতানা নিজেকে স্থির রাখতে না পেরে দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে গেলেন।
অ্যারিসের সাথে আইরাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।
চল্লিশজন পুলিশ সদস্য এলাকাটি ঘিরে ফেলেছে। সার্চলাইটের আলো আর ড্রোনের গুঞ্জনে রাতের আকাশ ভারী হয়ে উঠেছে। তারা ঝোপঝাড়, ঢালু খাদ— সব তন্ন তন্ন করে খুঁজতে লাগল।
হাসপাতালের সাদা দেয়াল আর ওষুধের কটু গন্ধে অ্যারিসের জ্ঞান যখন ফিরল, তখন ভোরের আলো জানালার পর্দা চুইয়ে ভেতরে ঢুকছে। মাথার ব্যান্ডেজটা পাথরের মতো ভারী লাগছে, হাতে বিঁধে থাকা স্যালাইনের সুঁইটা অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পুরো শরীর, অ্যারিস ঝাপসা চোখে চোখ খুলল— সবই অচেনা, সব রহস্যময়। স্মৃতির পাতায় শেষ দৃশ্যটা ভেসে উঠল— ট্রাকের সেই তীব্র আলো আর ইনায়ার গড়িয়ে পড়ে যাওয়া। সে কি তবে বেঁচে আছে? কোথায় আছে এখন?
পাশে তাকাতেই দেখল শামীমা বেগম আইরাকে নিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন, আর পাশেই দেয়ালে হেলান দিয়ে আধোঘুমে সায়মা।
আর কাউকে দেখতে না পেয়ে অ্যারিস অস্থির হয়ে শামীমা বেগমকে ডাকল, "আম্মু! আমার ইনায়া কোথায়? ও কি সুস্থ আছে? পাশের বেডেই আছে তাই না?"
শামীমা বেগম চোখ মেলে তাকালেন, কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর ঠোঁট দুটো কাঁপছে, চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়েছে। সায়মাও জেগে উঠে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
অ্যারিস এবার চিৎকার করে উঠল, "আম্মু, আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না! বলো, আমার ইনায়া কোথায়? কেন তোমরা কাঁদছ?"
শামীমা বেগম ভাঙা গলায় কোনোমতে বললেন, "সেখান থেকে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ইনায়াকে পুলিশ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে, কিন্তু ও নেই।"
মুহূর্তেই অ্যারিসের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। পাগলের মতো সে হাতের স্যালাইন টান দিয়ে খুলে ফেলল। চুইয়ে পড়া রক্তে নিজের শার্ট ভিজে গেল, কিন্তু সেদিকে তার ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বিছানা ছেড়ে নামতেই শামীমা বেগম আটকাতে চাইলেন।
"একদম টাচ করবে না আমাকে! করলে খুব খারাপ হয়ে যাবে!" অ্যারিসের কণ্ঠস্বর এক ভয়ানক উন্মাদনা। ডাক্তাররা ছুটে এসে তাকে আটকাতে চাইলেন, কিন্তু শোকাতুর এক সিংহের শক্তির সামনে তারা নস্যি। সবাইকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছুটে বেরিয়ে গেল।
ঘটনাস্থলে তখনো সূর্যের প্রথম রশ্মিগুলো খেলা করছে, কিন্তু সেখানে জমে থাকা মানুষের ভিড়ে কোনো আনন্দ নেই। ইভান, আদিয়ান আর আফরিন সুলতানা তখনো সেই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। পুলিশ, ড্রোনের শব্দ আর মানুষের গুঞ্জনে বাতাস ভারী। আনিসুর রহমান তখনো হাসপাতালের ইমার্জেন্সি রুমে, তাই সুবা, ইরা আর রোহানকে সেখানেই রেখে আসা ।